প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Friday, May 10, 2024

বিস্মৃতবীর | সুনন্দিনী শুক্লা

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/২য় সংখ্যা/২৮শে বৈশাখ, ১৪৩১

ধারাবাহিক গল্প

সুনন্দিনী শুক্লা

বিস্মৃতবীর

[৪র্থ পর্ব]

পূর্বানুবৃত্তি সূর্যদার বুকের ভেতরটা শিরশির করে উঠেছিল। একসময় তো সেও হেমেন্দ্রবাবুর কাছে এই একই আবদার করেছিল- প্রতিবাদ সভা করব। সেই লেগ্যাসি আজ পুনরায় ফিরে এসেছে দলিলুর রাখাল সুকুমারদের হাত ধরে। অনুমতি দিলেন মাস্টারদা। মাস্টারদা বক্তব্য রাখলেন। সবাই মিলে উপবাস রাখলেন সেই দিনটা। তারপর…

-পারবে গণেশ? এই জীবন কিন্তু বড় কঠিন, কঠোর! প্রিয়জনকে নিদারুণ দুঃখ দিয়ে এ পথে আসতে হবে। পারবে? মাস্টারদা বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে গণেশ মাথা ঝাঁকালো,
-পারব।
ইতিমধ্যে চৌরিচৌরার ঘটনায় অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেন গান্ধীজি। আমরা সবাই মূক বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এটা কী করলেন উনি! একদিন ভূপেন্দ্রনাথ
দত্ত এলেন সাম্যাশ্রমে। মাস্টারদার মুখোমুখি বসে অস্থিরভাবে বললেন,
- দেখুন গান্ধীজিকে সংগ্রামবিমুখ বলতে আমার মন চায় না। কিন্তু ওনার কার্যকলাপ যা দেখছি তাতে অন্য কিছু বলার কথা আমি ভাবতে পারছি না। মাস্টারদা শান্তভাবে বললেন,
- সমালোচনা করে লাভ নেই। এখন আমাদের নির্দিষ্ট কর্মপন্থা স্থির করতে হবে।
ভূপেনবাবু বললেন,
-শুরু করুন একটা সংগঠন। আপনি নেতৃত্ব গ্রহণ করুন। অন্তত যে কোন একটা জায়গা থেকে অভ্যুত্থান শুরু হোক। এটা পড়ুন। একটা হলুদ রঙের প্যামফ্লেট এগিয়ে দিলেন। হিন্দুস্থান রিপাবলিকান এসোসিয়েশন। লেখা আছে - 'হে ভারতের যুবকবৃন্দ তোমরা মরীচিকার মোহ ত্যাগ কর ও অকম্পিত হৃদয়ে বাস্তবের সম্মুখীন হও। যা অবশ্যম্ভাবী তাহা ঘটিবেই। নিজেকে বিভ্রান্ত করিও না। শান্তি ও স্বস্তি তোমরা পাইতে পারো না। শান্তিপূর্ণ ও বৈধ উপায়ে ভারতের স্বাধীনতা কখনোই অর্জিত হইবে না। ভারতীয় বিপ্লবীরা সন্ত্রাসবাদী বা নৈরাজ্যবাদী নহে, এ কথা ভারতবাসীকে বোঝাবার সময় এসেছে।’ মাস্টারদা চমৎকৃত হয়ে বললেন,
-বাহ! এটা কী?
- চন্দ্রশেখর আজাদের নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন। এই ঘোষণাপত্রের ভাষাটি একটি অল্পবয়সি ছোকরার। ভগৎ সিং। ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। আমাদের বাংলায় খুঁজলে কি দুই-একটিও পাওয়া যাবে না? কী বলেন?
১৯২৬ সালে নিরঞ্জন আর মাস্টারদা কলকাতার ওয়েলিংটন স্ট্রিটে পুলিশের চোখ এড়িয়ে পালাতে গিয়ে ধরা পড়লেন। মেদিনীপুর জেলে কিছুদিন রেখে ওদেরকে নিয়ে যাওয়া হল রত্নগিরি জেল, মহারাষ্ট্র। জেলবাসের সময়েই মাস্টারদার জীবনে ঘনিয়ে এল এক দুর্যোগ। বাড়ি থেকে বৌদিদি চিঠি লিখেছেন,
- 'একবার বাড়ি এসো। বধূমাতা শয্যাশায়ী। কবিরাজমশাই বলেছেন আরোগ্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ। দশ বছর আগে তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তোমাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে ভুল করেছিলাম। এই হতভাগিনীর আমৃত্যু দুঃখের কারণ হলাম আমি। পারলে তার মৃত্যুর সময় একবারটি এসো। শুনেছি এই সময়ে সরকার বাহাদুর রাজবন্দিদের বিশেষ সুযোগ দেয়।'
অবিলম্বে মাস্টারদা বাড়ি ফিরে যান। সন্ধেবেলা যখন বাড়ি ঢোকেন, সব নিস্তব্ধ। কবিরাজমশাই চিন্তিত মুখে দাওয়ায় বসে। দাদা একবার চোখ তুলে নামিয়ে নিলেন। মাস্টারদা প্রণাম করলেন। বৌদিদির মুখের দিকে তাকালেন। দুচোখে শুধুই ভর্ৎসনা ছাড়া আর কিছু নেই। তার কাছে যাওয়ার সাহস হলো না। স্ত্রীর ঘরে প্রবেশ করলেন মাস্টারদা। বিছানার সাথে প্রায় মিশে গিয়েছেন পুষ্পকুন্তলা বৌদিদি। বাকশক্তি আর নেই তার। মাস্টারদা তার পাশে গিয়ে বসলেন। শীর্ণ মাথাটা তুলে নিলেন নিজের কোলে।
- কী হয়েছে পুষ্প? খুব কষ্ট হচ্ছে?
বৌদিদির ঠোঁট দুবার নড়লো। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল। তারপর মাথাটা ঢলে পড়ল। দরজার কাছে গোঙানোর শব্দ শুনে দেখলাম বড়বৌদিদি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেলেন। মাস্টারদা মাথা নিচু করলেন। কাঁদছেন। এত মেতে ছিলেন দেশের কাজে, স্ত্রী ভাল আছেন কিনা সে খোঁজটুকু নেওয়ার কথা মনে পড়েনি। সবার সাথে আছেন, ভালই আছেন - এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি চলছিলেন। দেখলাম পকেট থেকে একটি চিঠি বের করে পড়ছেন তিনি। দেখা উচিত হবে কিনা ভেবেও ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আঁকাবাঁকা অক্ষরে তাতে লেখা, - 'তোমার দেওয়া দেবী চৌধুরানী বইটা কাল রাতে শেষ করেছি। আসার সময় নতুন কিছু বই নিয়ে আসবে। তাড়াতাড়ি ফিরবে। আমার প্রণাম নিও। ইতি পুষ্প।'  মাস্টারদার জীবন থেকে তার প্রিয় পুষ্প অকালে ঝরে পড়ল।
বৌদিদির মৃত্যুর পর টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছিলেন মাস্টারদা। সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী। সেরে উঠে নতুন উদ্যমে কাজে লাগলেন তিনি। ইতিমধ্যে জেল থেকে ফিরে এসেছেন অম্বিকা চক্রবর্তী, নির্মল সেন, অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষ। সেই সময়ে সুভাষচন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বাহিনী। সকলের পরণে খাকি পোশাক। সুশৃঙ্খল সামরিক ধাঁচের এই বাহিনী দেশবাসীকে চমকে দিয়েছিল। সুভাষচন্দ্র যেন পরাধীন ভারতবর্ষের মধ্যে ক্ষাত্রতেজ সঞ্চারিত করেছেন। তিনি তুললেন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি। চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা মাস্টারদার নেতৃত্বে একযোগে দাঁড়ালেন সুভাষচন্দ্রের পক্ষে।
১৯২৯ সালের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক নির্বাচিত হলেন মাস্টারদা। ঠিক হল সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য আদর্শনিষ্ঠ কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে হবে। স্থানে স্থানে তৈরি হল ব্যায়ামাগার। মাস্টারদা ও সহকর্মীরা নিজে হাতে বেছে বেছে স্বদেশপ্রেমিক যুবকদেরকে যুক্ত করতে লাগলেন সংগঠনে। চট্টগ্রামের জেলা সংগঠনে বক্তৃতা দিতে এলেন সুভাষচন্দ্র। বারবার তিনি বললেন,
- 'সময় খুব অল্প। দেরি করবে না। আমাদের যা করার অবিলম্বে করতে হবে। আর আবেদন নিবেদন নীতি নয়, সরাসরি অভ্যুত্থানের ডাক দাও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে।'
 

ক্রমশ…

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)