প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Friday, May 3, 2024

চৈতন্য হোক | তপতী রায়

বাতায়ন/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/সৈয়দ হাসমত জালাল সংখ্যা/২১শে বৈশাখ, ১৪৩১

ধারাবাহিক গল্প

তপতী রায়

চৈতন্য হোক

১ম পর্ব

ভাবনা, চিন্তা, কল্পনা, স্বপ্ন, সব কিছুই অবচেতন মনে ভেসে আসে, ভেসে ভেসে চলে যায়মন্থর গতিতে ঠিক নিজের মতো করে। ভাঙা জানলার পাশ দিয়ে দেখা যায়, এক টুকরো নীল আকাশ। কখন কালো, কখন ধুসর, কখন বা ধোঁয়াটে। ঠিক সাধনা দেবীর মনের মতো। প্রথমে একতলা, তারপর দোতলা, তিনতলা হয়ে শেষ পর্যন্ত ছাদের চিলে কোঠার ঘরেএকটি ভাঙা তক্তা। একটি সাবেকি আমলের আলমারি। একটি কালো ট্রাঙ্ক। আর একটি 

ঠাকুর রামকৃষ্ণের ছবি। সেই অদ্ভুদ ভঙ্গিমা, সারা বিশ্বের মানুষকে আশীর্বাদ করছেন ‘চৈতন্য হোক’ বহু বছর আগে ছেলে বউ, মেয়ে জামাই, দক্ষিণেশ্বর দর্শন করে উপহার এনে ছিল সাধনা দেবীর জন্য
সারা রাত ঘুম হোল না সাধনাদেবীর। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন ঠাকুরের দিকে। ভোরের আলোর ফোটার সাথে সাথে মনে হলো সত্যি সত্যি তার চৈতন্য হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রূখে দাঁড়াবার। তিনি আর মাথা নিচু করে থাকবেন না।
স্নান সেরে, সূর্য প্রণাম, করে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে একতালায় নামলেন। বড় খোকা, ছোট খোকা, সদ্য বড় হওয়া দুই নাতি, উকিল জামাই মেয়ে ছুটে এলো তার কাছে। সাধনাদেবী ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ঘরের চাবি কাগজপত্র পরীক্ষা করে সকলকে উপেক্ষা করে বেড়িয়ে গেলেন।
প্রায় বছর দুই বাদে রাস্তায় বেরোলেন। শেষ বেরিয়েছিলেন স্বামীর মৃত্যুর এক মাস পর। বড় ছেলে আর জামাইয়ের সাথে। তারপর থেকেই কাগজপত্র পেনশন বেহাত হয়ে গেল। একতলা, দোতলা, তিনতলা করে শেষ পর্যন্ত চিলে কোঠার ঘর। কেবল গয়নার বাক্সটা পায়নি। বাড়ির পুরোনো কাজের লোক একদিন চুপি চুপি বলে গেল, ‘গয়নার বাক্স সরান। সবাই নানা রকম ফন্দি করছে। এবার ওইটুকুও হাত ছাড়া হবে। আমারও এ বার মনে হয় এই বাড়ির কাজ যাবে। নতুন লোক আসছে। যাবার আগে বলে গেলাম। সাবধান’!
শোনামাত্র স্বামীর বাল্যকালের বন্ধু জ্যোতিবাবুকে ডাকলাম। উনি আগে প্রায় আসতেন, নানা রকম উল্টোপাল্টা কথার জন্য আমিই বারণ করেছি, এ বাড়িতে আসতে।  আসা বন্ধ হতেই নানা রকম অন্যায় কাজ শুরু হয়েছে। সেদিন সব বিয়ে বাড়ি গিয়েছিল, সুযোগ পেয়ে গয়নার বাক্স জ্যোতিবাবুকে ডেকে এনে দিয়ে দিলাম, ‘এইটুকু সম্বল, আপনার কাছে গচ্ছিত রাখলাম’। অনেক খোঁজাখুঁজি করেছিল। না পেয়ে বহু মন্দ কথা, বহু জ্বালাতন সহ্য করতে হয়েছে। বোবার শত্রু নেইসবাই চুপ করে গেল। জামাই মাঝে মধ্যে এটা সেটা নিয়ে খোসামদ করতে আসত। কথায় আছে না, ‘জন, জামাই, ভাগনা, তিন নয় আপনা’।
রাস্তায় যেতে যেতে পুরনো দিনের কত কথা মনে পড়ল। তার প্রথম সন্তান হবার কথা। আমার স্বামী নবীন আর আমি ছেলের হাত ধরে স্কুলে ভর্তি করার কথা। সে এক অফুরন্ত আনন্দের দিন। আস্তে আস্তে এক ছেলে, এক মেয়ের জন্ম। ওদের মঙ্গলের জন্য কত পুজো-আচ্ছা বাড়িতে। দিনের পর দিন রাতে দুজনে চা রুটি খেয়ে তিনতলা তৈরি করলাম, ছেলেমেয়ের জন্য। বোধহয় আমার শিক্ষার কোথায় ফাঁক ছিল। অন্ধ ভালবাসলে হয় না। কষ্ট করছি বুঝতে দিতে হয়। কতবার ঠাকুরের ওই চৈতন্য রূপ দেথেছি। এমন আলোড়ন তো কখনও হয়নি। তবে কী শেষ বেলায় এসেই মানুষের চৈতন্য হয়। আসলে কেউ কারো নয়। আমিও কারো নয়। নানা রং মিশিয়ে তুলির টানে একটা সুন্দর ছবি যেমন তৈরি হয়, আমরাও স্বামী-স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি, বাড়ি-ঘর, কাঁসর, ঘন্টা দিয়ে সংসার সাজাই। আস্তে আস্তে ভাঙতে ভাঙতে একলা হয়ে পড়ি। তবু কি চৈতন্য হয়! মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত ছেঁড়া দড়িটা টানতে থাকি। সাধনাদেবী অনেকক্ষন খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল, মনে হলো ওদের আরও কিছু প্রয়োজন। চিলেকোঠার ঘরটার জন্য হচ্ছে না। এইটুকু করে দেব।

ক্রমশ…

1 comment:

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)