প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Friday, August 2, 2024

বড়ো মায়া হে | নিতাই ভট্টাচার্য

বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/৯ম/অমিতাভ গুপ্ত সংখ্যা/১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩১

অমিতাভ গুপ্ত সংখ্যা | ধারাবাহিক গল্প

নিতাই ভট্টাচার্য

বড়ো মায়া হে

[১ম পর্ব]

"আজ কালীপুজো। সকাল থেকে নিরম্বু উপবাস আরতির। সংসারের সব কাজ মিটিয়ে বিকেলবেলায় পুকুরে ডুব দিয়ে এসে নারকেল নাড়ু পাকিয়েছে। তারপর এক এক করে পুজোর সামগ্রী ডালায় সাজিয়ে রাখছিল, সারাদিন শ্বাস ফেলবার সময় নেই। এরপরেও যদি শুনতে হয় আরতি বসে থাকে সারাদিন, মেজাজ কার মাপের মধ্যে থাকে!"


"পেলু কোথায় গেলো?"
সন্ধ্যা বেলায় মাঠ থেকে ফিরে ছাগলটাকে দেখতে না পেয়ে চিৎকার করে সাধন।
দুয়ারে বসে ঝিমোচ্ছিল নবীন। ছেলের গলা শুনে চমকে ওঠে। বলে, "দেখ দেখি কোথায় গেলো!"
"কোথায় গেলো সেটা আমি জানবো?" বাপের কথার গায়ে পাল্টা প্রশ্ন চাপায় সাধন।
কথা না বাড়িয়ে চুপ করে যায় নবীন। সাধন বদরাগী ছেলে, এই ভাল তো এই মন্দ। মেজাজ বুঝে কথা বলে দেশ দুনিয়ার সবাই।
উঠোনে দাঁড়িয়ে আবার হওয়ায় গলা চড়ায় সাধন, ”পেলু কোথায় গেলো? আর কতবার জিজ্ঞাসা করতে হবে শুনি?"
রান্নাচালা থেকে কিছুটা রাগত স্বরে স্বামীর উদ্দেশ্যে আরতি বলে, "নিমতলায় বাঁধা ছিল। তারপর আর কিছু বলতে পারব না, আমি ছাড়াও বাড়িতে লোক আছে। সংসারের সব কাজই কি আমাকে করতে হবে?"
নবীন বৌমাকে শুনিয়ে বলে, "এ কি কথা বলছ বৌমা! তুমি একা পরিশ্রম করো আর আমরা সবাই বসে বসে খাই, তাই-তো?"
আরতি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। সাধন গলা তোলে, "সন্ধে নেমে এলো এখনো কারো সময় হলো না! সেই দুপুরে…”।
সাধন দৌড়ে যায় বাড়ির পিছন দিকে। ছাগলটা সেখানে বাঁধা ছিল।
নবীন মিনমিনে গলায় বলে, "ছাগল না পেলে এইবার দক্ষযজ্ঞ বাধবে রে, হে মা-কালী রক্ষে করো।"
নবীনের মুখের কথা শেষ হওয়া মাত্র বাজ পড়ে বাড়িতে। নিমতলায় ছাগলটিকে দেখতে না পেয়ে উঠোনে এসে চিৎকার করে সাধন, বলে "এইবার কোথায় খুঁজতে যেতে হবে? পেলু নেই, শুধু দড়িটা পড়ে রয়েছে! হয় শেয়ালে খেলে, নয়তো চুরি হলো রে।"
নবীন কেঁপে ওঠে ভিতরে ভিতরে বলে, "পইপই করে বারণ করেছিলাম।"
আরতি শ্বশুরকে শুনিয়ে বলে, "বারণের কথা না শুনিয়ে পেলুকে বাড়িতে নিয়ে এলেই হতো!"
নবীন বউমার কথার জবাব দেবার আগেই সাধন চিৎকার করে বলে, "কাকে কী বারণ করেছিলে সে কথা শুনে কোনো লাভ নেই আমার। মাঠে যাবার আগে বারবার বলেছি আকাশে আলো থাকতে থাকতে ওকে বাড়ি নিয়ে আসবে, বিকেল থেকেই শিয়ালের উপদ্রব শুরু হয়। আগের দিন দেখেও শিক্ষে হয়নি তোমাদের!"
সাধনের বাড়ির পিছনে ধান ক্ষেত, সবজি ক্ষেত। শিয়ালের উৎপাত লেগেই থাকে সারা বছর। কদিন আগেই শিয়ালের তাড়া খেয়ে দড়ি ছিঁড়ে পালিয়েছিল পেলু, মাঠ পেরিয়ে সোজা বাগদি পাড়ায় হাজির হয়েছিল। নেহাত বিশু বাগদির চোখে পড়েছিল, নয়তো হয়ে যেত সেদিন। সেই ঘটনার কথা স্মরণ করে ভীষণ চিৎকার করতে থাকে সাধন।
"আজ যদি তেমন কিছু…।”
তড়িঘড়ি রান্নাচালা থেকে বেরিয়ে উঠোনে আসে আরতি। বলে, "এদিক-ওদিক একটু খুঁজে দেখলেই হয়।"
"অন্ধকারে আমি কোথায় খুঁজব? সারাদিন রান্নাচালায় কী করিস?"
স্বামীর কথা গায়ে লাগে আরতির। বলে, "সংসারে আমি তো বসেই থাকি, সবার ডান হাত এমনি এমনি মুখে উঠছে?" বলে আবার রান্নাচালার দিকে মুখ ফেরায়।
"তুমি কাল থেকে আর রান্নাচালায় যেয়ো না বৌমা, তোমার শাশুড়ি যদি পারে তো খাবো নয়তো নয়। কথার ঝাল সহ্য হয় না।" নবীন বৌমাকে শুনিয়ে বলে।
"চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলছিস আজ বড্ড! এই সন্ধেবেলায় কোন রাজকাজে ব্যস্ত তুই?" গলা সপ্তমে তোলে সাধন।
আজ কালীপুজো। সকাল থেকে নিরম্বু উপবাস আরতির। সংসারের সব কাজ মিটিয়ে বিকেলবেলায় পুকুরে ডুব দিয়ে এসে নারকেল নাড়ু পাকিয়েছে। তারপর এক এক করে পুজোর সামগ্রী ডালায় সাজিয়ে রাখছিল, সারাদিন শ্বাস ফেলবার সময় নেই। এরপরেও যদি শুনতে হয় আরতি বসে থাকে সারাদিন, মেজাজ কার মাপের মধ্যে থাকে! সাধনের কথায় ঝেঁঝে ওঠে তাই, বলে, "কথা বলি না মানে এই নয় গলা তুলে কথা বলতে পারি না। আমি সারাদিন বসেই থাকি? পুজোর ডালা ভূতে সাজিয়ে দিয়ে গেলো। রাতের বেলায় বুড়ি কালির তলায় ভূতে পুজো নিয়ে যাবে। আমি এইবার পাড়া বেড়াতে বের হব।"
এমন কথা মেজাজে বাতাস দেয় সাধনের। বেশ কড়া কথা একটা কিছু বলতে যাচ্ছিল। সেই সময় নবীন সুর ধরে। আরতির কথা তার কানে গেছে। বিশেষত "পাড়া বেড়াতে যাওয়া" এই কথা শাশুড়িকে উদ্দেশ্য করেই বলেছে আরতি। বৌমার এই অন্যায় কথার প্রতিবাদ করে নবীন। বলে "বুঝি বৌমা বুঝি। আমরা পাড়া বেড়াতে যাই? সংসারের কাজ এমনি এমনিই হয়ে যায়!"
আরতি বলে, "ভুল কী বললাম শুনি? আজ পুজোর দিনেও সেই দুপুরবেলায় বেরিয়েছে মা। সুয্যি ডুবিয়েও বাড়ি ফেরবার নাম নেই।"
সাধন বলে, "তোরা থামবি!"
"থামবি বললেই তো আর থামা যায় না। অনেক কথা লোক মুখে কানে আসে। অশান্তির ভয়ে চুপ থাকি। এর ওর বাড়ি গিয়ে শুধু আমার নামে নিন্দে করা।" ফুঁসে ওঠে আরতি।
"কে কী বলেছে তোমার নামে?" প্রশ্ন ফেলে নবীন।
সেদিন পাল বাড়িতে আরতিকে নিয়ে দু কথা বলেছে সাধনের মা। সেই কথা পাল বাড়ির মেজোবউ আরতির কানে পৌঁছে দিতে সময় নেয়নি। আজ সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছে আরতি, শাড়ির আঁচল কোমরে বেঁধে বলে, "কেমন ঘরের মেয়ে আনলাম, বাচ্চাকাচ্চা হবার নাম নেই! মা ফিরলে জিজ্ঞাসা করে দেখবেন বলেছে কিনা।"

ক্রমশ…

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)