বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/৯ম/অমিতাভ গুপ্ত সংখ্যা/১৮ই
শ্রাবণ, ১৪৩১
অমিতাভ গুপ্ত সংখ্যা | ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা চ্যাটার্জি
দূরের তারা
[১ম পর্ব]
"অমল তখন হাতদুটো ধরে সামনে এনে অজস্র চুম্বনে ভরিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, আমায় এমনি করে চিরকাল ভালবাসবি তো? ও পাল্টা প্রশ্ন করল, তুমি বাসবে তো? অমল আবার ওকে জড়িয়ে নিয়ে বলেছিল, এই জুঁই ফুলের গন্ধে ভরা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাটা চিরকাল আমার বুকের ভেতর রাখা থাকবে।"
স্বর্ণলতা দেবী এক
বিখ্যাত সাহিত্যিক। বহু বিখ্যাত গল্প উপন্যাসের প্রণেতা তিনি। তার বই নিয়ে অনেক সিনেমা
নাটকও হয়েছে। কর্মজীবনে একটি কলেজের অধ্যাপনা করেন। কিন্তু তাঁরও একটা সুন্দর শৈশব,
সুন্দর মিষ্টি যৌবন ছিল। চার ভাইয়ের পর এক বোন ফুটফুটে স্বর্ণ যখন জন্মাল, তখন
বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। অমন রাশভারি বাবাও নাকি মায়ের পিঠে হাত দিয়ে
বলেছিল তোমার মেয়ে তোমার মতনই সুন্দর ফুটফুটে হয়েছে। ঠাকুমা হাঁড়ি হাঁড়ি রসগোল্লা
এনে গোটা পাড়ায় বিলিয়েছিলেন।
সেদিনের সেই স্বর্ণ আজ
স্বর্ণলতা দেবী নামে বিখ্যাত সাহিত্যিক।
স্বর্ণ সবার খুব আদরের।
দাদাদেরও চোখের মনি। বড়দা প্রবাল বাবাকে বলেছিল, বাবা ওকে যেন চট করে বিয়ের
পিঁড়িতে বসিও-না ওর খুব মেধা। স্বর্ণর প্রত্যেকটি দাদাই খুবই সুশিক্ষিত সবই তাদের
মায়ের প্রচেষ্টা। সংসারের এককোণে পড়ে থাকা মানুষটার মতামত কিছু বিষয়ে মতামত এত
জোরালো ছিল যে তাকে না মেনে কারুর উপায় থাকত না। সেখানে তাঁর জাঁদরেল শাশুড়ি ও
রাশভারি স্বামীও হার মেনে যেতেন।
বাবার বড় ব্যবসা ছিল,
স্বামী-শাশুড়ির ইচ্ছে ছিল ছেলেদের আর পড়াশোনা করে কী হবে? বাবার এতবড় ব্যবসাটা
দেখতে হবে তো? কোন ছেলেরই পড়াশোনা বাদ দিয়ে ব্যবসাতে ঢুকে পড়ার ইচ্ছে ছিল না।
মায়ের ইচ্ছে এবং জেদে চারজনেই উচ্চশিক্ষিত হয়েছে।
দাদারা সবাই নিজেদের
পেশায় কর্মরত। কেউ প্রফেসর, কারুর ল ফার্ম, একজন বড় ব্যাংক অফিসার একজন আইপিএস।
স্বর্ণ যখন দশম শ্রেণিতে পড়ে তখন তাকে অঙ্ক করাতে আসত তাদের পাশের বাড়ির একটি ছেলে অমল, অমল ডাক্তারি পড়ছে, তার সাথে টিউশনও করে। ইংরেজি বাংলায় স্বর্ণর কোন শিক্ষক লাগেনি কিন্তু অঙ্ক তার একদম ভাল লাগত না। তাই অমল আসত তাকে অঙ্ক বোঝাতে, পাশের একদম লাগোয়া বাড়িতে তারা থাকত। দুবাড়ির মধ্যে যাতায়াত খুব ভালই ছিল, একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। অমলের সাথে স্বর্ণের একটু মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, দুজনে দুজনকে গভীরভাবে ভালবেসে ফেলেছিল। অমলরা ছিল ব্রাহ্মণ আর স্বর্ণরা ছিল দত্ত। অমলের জেঠিমা খুব কড়া ছিলেন, তাঁর কথাই ছিল শেষ কথা। তিনি প্রবল আপত্তি করলেন কায়েতের মেয়েকে ঘরে নিয়ে আসার কথায়।
স্বর্ণ যখন দশম শ্রেণিতে পড়ে তখন তাকে অঙ্ক করাতে আসত তাদের পাশের বাড়ির একটি ছেলে অমল, অমল ডাক্তারি পড়ছে, তার সাথে টিউশনও করে। ইংরেজি বাংলায় স্বর্ণর কোন শিক্ষক লাগেনি কিন্তু অঙ্ক তার একদম ভাল লাগত না। তাই অমল আসত তাকে অঙ্ক বোঝাতে, পাশের একদম লাগোয়া বাড়িতে তারা থাকত। দুবাড়ির মধ্যে যাতায়াত খুব ভালই ছিল, একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। অমলের সাথে স্বর্ণের একটু মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, দুজনে দুজনকে গভীরভাবে ভালবেসে ফেলেছিল। অমলরা ছিল ব্রাহ্মণ আর স্বর্ণরা ছিল দত্ত। অমলের জেঠিমা খুব কড়া ছিলেন, তাঁর কথাই ছিল শেষ কথা। তিনি প্রবল আপত্তি করলেন কায়েতের মেয়েকে ঘরে নিয়ে আসার কথায়।
স্বর্ণর বাবা, মা,
দাদারা, ঠাকুমাও খুব অপমানিত হলেন। অমলের জেঠিমা তার জেদে অটল থাকেন। ভবানীপুরে
তাদের বাড়ি ছিল, সেই বাড়ি বিক্রি করে শ্যামবাজার অঞ্চলে চলে যান। খুব তাড়াহুড়ো করে
অমল ডাক্তার হওয়ার আগেই মোটামুটি সুশ্রী চেহারার একটি মেয়ে অনুপমার সাথে বিয়ে দিয়ে
দেন। যেখানে স্বর্ণ বিএ পাশ করে এমএতে ভর্তি হয়েছে সেখানে অনুপমা ম্যাট্রিক দেওয়ার
পর আর পড়াশোনাই করেনি।
বিয়ে যখন হয়েই গেছে তখন
অমলও চেষ্টা করল অনুপমাকে নিজের মনের মতন তৈরি করে নিতে। অমল স্ত্রীকে আইএতে ভর্তি
করল, কিন্তু দেখা গেল অনুপমার ঘরের কাজে যতটা আগ্রহ পড়াশোনায় তার একটুও নেই। নিত্যনতুন
জলখাবার বানিয়ে অমলের সামনে এনে ধরে, অমল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, খাবারটা খুবই
সুন্দর হয়েছে তবে পড়াশোনাও যে করতে হবে শুধু রান্না নিয়ে থাকলে তো হবে না। এবার
থেকে আমি তোমাকে টাস্ক দিয়ে যাব রোজ, যদি টাস্ক শেষ করতে পার তবেই তোমার তৈরি
জলখাবার খাব নাহলে কিন্তু ছুঁয়েও দেখব না। তিন-চারদিন বেশ মন দিয়ে টাস্ক করল তারপর
দেখা গেল, আবার সেই পুরানো অভ্যাসে ফিরে গেছে। অমল জলখাবারের থালা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে
বলল, এত করে বললাম তবুও তুমি পড়া না করে খাবার করলে? মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে
কেঁদে ফেলল অনু। কান্নার শব্দে মা ছুটে এলেন, মাকে দেখে সমস্ত রাগ উগরে দিয়ে অমল
বলল, গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করা যায় না। মা স্তব্ধ হয়ে গেলেন বুঝলেন ছেলের অভিমানটা
কোথায়? তিনিই বা কী করবেন? এ সংসারে তাঁর ছেলের ব্যাপারেও তাঁর কোন কথা চলবে না,
তার বড়জায়ের কথাই শেষ কথা এ বাড়িতে।
অমল খুব ভাল করে
ডাক্তারি পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে গেল। ততদিনে স্বর্ণ এমএ পাশ করে
কলেজে অধ্যাপনার কাজ নিয়েছে। বাবা-মা-ঠাকুমার হাজার অনুরোধ উপেক্ষা করেও বিয়ে করতে
পারেনি। নিজের জীবনের প্রেম হারিয়ে ভাল ভাল কয়েকটা প্রেমের উপন্যাস লিখে ফেলল। তার
মধ্যে দুটি উপন্যাসের কাহিনি অবলম্বনে সিনেমা তৈরি হয়েছে। খুব হিট করেছে। আরও দুটি
বইয়ের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে সে বাবার বাড়ি ছেড়ে এসে মাকে নিয়ে নিজে ছোট একটা বাড়ি
তৈরি করে আছে।
অনুপমা প্রথম দিকে বেশ৷
শান্তশিষ্ট থাকলেও পরের দিকে বেশ মেজাজ হয়। সারাদিন পর অমল হসপিটাল থেকে ফিরলে তার
সাথে ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে তুমুল অশান্তি শুরু করে। তাদের একটি কন্যাসন্তান হয়েছে, টুকটুকে
ফর্সা গায়ের রং, কোঁকড়াচুলে ঘেরা মুখখানি আর বড় কাজল কালো দুটি চোখ, তাকে যেন
স্বর্ণলতাকে মনে করিয়ে দিত।
অনুপমাকে খুব বেশি আদর
করা তার হয়ে ওঠেনি কিন্তু মাঝেমধ্যে ভাল ভাল উপহার এনে দিত। সে খুব সন্তুষ্ট হত আর
নিজে তার স্টাডিতে বসে নির্ঘুম রাত কাটাত। স্বর্ণের লেখা একটি সিনেমা সম্প্রতি
দেখে এসেছে, গল্পটির স্তরে স্তরে নিজেদের সেই গোপন মিষ্টি প্রেমকে খুঁজে পেল।
অনেকদিন পর ছটফটে স্বর্ণের দুষ্টু মিষ্টি মুখখানা চোখের সামনে ভেসে উঠল। মনে পড়ে
গেল, বৃষ্টিতে ভিজতে ও খুব ভালবাসত। দু বাড়িতে যাতায়াত করার জন্য মাঝখানে একটা
প্যাসেজ ছিল, অমল জানত, বৃষ্টি পড়ছে মানেই স্বর্ণ ছাদে এসেছে। ও চুপিচুপি ছাদে চলে
গেল। ছাদ ভর্তি জুঁই ফুলের গন্ধে ছাদটা ভরে উঠেছে, খুব সুন্দর একটা রোমান্টিক
পরিবেশ। স্বর্ণ গুণগুণ করে গান গাইছে, "আজি ঝরো ঝরো মুখর দিনে” অমল পেছন থেকে
গিয়ে ওর চোখ দুটো টিপে ধরেছিল, স্বর্ণ ঠিক বুঝতে পারছিল ওর হাতটা জোরে ধরে বলেছিল,
এবার! এবার কী! আমিও ছাড়ব না, ছাড়বি না তো?
- না
- ঠিক?
- হ্যাঁ
অমল তখন হাতদুটো ধরে সামনে এনে অজস্র চুম্বনে ভরিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, আমায় এমনি করে চিরকাল ভালবাসবি তো? ও পাল্টা প্রশ্ন করল, তুমি বাসবে তো? অমল আবার ওকে জড়িয়ে নিয়ে বলেছিল, না বেসে আর কোথায় যাব বল? এই জুঁই ফুলের গন্ধে ভরা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাটা চিরকাল আমার বুকের ভেতর রাখা থাকবে, শুধু এই সন্ধ্যাটাকে মনে করেই সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারব।
- না
- ঠিক?
- হ্যাঁ
অমল তখন হাতদুটো ধরে সামনে এনে অজস্র চুম্বনে ভরিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, আমায় এমনি করে চিরকাল ভালবাসবি তো? ও পাল্টা প্রশ্ন করল, তুমি বাসবে তো? অমল আবার ওকে জড়িয়ে নিয়ে বলেছিল, না বেসে আর কোথায় যাব বল? এই জুঁই ফুলের গন্ধে ভরা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাটা চিরকাল আমার বুকের ভেতর রাখা থাকবে, শুধু এই সন্ধ্যাটাকে মনে করেই সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারব।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment