প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Friday, August 2, 2024

ধলো দরগার কালো মাটি | নাসির ওয়াদেন

বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/৯/অমিতাভ গুপ্ত সংখ্যা/১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩১

অমিতাভ গুপ্ত সংখ্যা | ধারাবাহিক গল্প

নাসির ওয়াদেন

ধলো দরগার কালো মাটি

[১ম পর্ব]


"সকালবেলায় নাস্তা-পানি খেয়ে বিবি মেহেরজান সাথে বৌমা আসমানীকে নিয়ে গাড়িতে ওঠে। ওরা যাবে ধলো দরগার মাজারে মানত দিতে‌। তাদের একমাত্র পুত্র নইমুদ্দির বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক হলো। নাতি-নাতনির মুখ দেখার খুব ইচ্ছে মেহেরজানের।"


ফুটি সকালে সূর্য ওঠার আগেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল শাকিব। ইজাজ মিয়ার কিরসান। সেই কবে থেকে মিয়ার বাড়িতেই ফাইফরমাশ খাটা। দেশ তখনও স্বাধীন হয়নি। সমগ্র মুলুক বাংলা এক অখণ্ড বিশাল দেশ। চারিদিকে শুধু লড়াই 
আর লড়াই। আকাশে উড়োজাহাজের আনাগোনা। কখন কোথায় যে বোমা, গুলি পড়বে তার ঠিক-ঠিকানা নেই। ইজাজ মিয়ার বাবা দৌলত মিয়া নবাবি আমলে বেশ কিছু জমি-জমার মালিক ছিল। গরিব প্রজারা ঠিকমতো খাজনা দিতে পারছে না। গায়েগতরে খেটে ঝোপঝাড় সাফসুতরো করে তাদের বাবা-ঠাকুরদারা যে সকল জমি তৈরি করে চাষাবাদ করত, সেই জমিই জমিদারেরা দখল করে নিয়েছে। জমিতে যে ফসল উৎপন্ন হয়, সেই ফসলের অর্ধেক প্রজার আর বাকি অর্ধেক রাজার। রাজা, জমিদারকে জমি দিয়ে  জমির সত্ত্ব হিসেবে খাজনা আদায় করত। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে, ঝোপঝাড় কেটে বানানো, খাল-ডোবা বুজিয়ে, পাহাড় ভেঙে ধানি জমিতে রূপান্তরিত করেছিল যারা, তারা নাকি মালিক নয়, সবই জমিদারের। আর মাথার উপরে রাজা, নবাব, বাদশা এরাই মালিক। নিয়তির পরিহাসে অনেকেই জমির খাজনা দিতে না পারায় জমি চাষ করা ছেড়ে জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করতে থাকে। জমিদারের পাইক, বরকন্দাজগণ গরিব মানুষের ঘরে গিয়ে রাজার ফরমান কুঁড়েঘরের বাতায় গুঁজে দিয়ে আসত। নির্দিষ্ট সময়ে ফসল জমা না দিলে একদিন জমিদারের লেঠেলবাহিনী এসে বাড়িঘর তছনছ করত ও ঘরে যা থাকত, তাই লুটপাট করে সর্বস্ব নিয়ে চলে যেত জমিদারের কাছারি বাড়িতে। এসব খুব ভাল করেই দেখেছে শাকিব জোলার পূর্বপুরুষেরা। ওরাই তখন কৃষিশ্রমিকে পরিণত হয়।

ঝুঁঝকির সময়, আড়মোড়া দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বসে শাকিব। হাতের আঙুল ঘষে চোখদুটো দলাই মলাই করে। তখনও তার ঘুমের নেশা ছাড়েনি। ঘরের ভেতর খড় দিয়ে তার উপর ছেঁড়া খেজুরপাটি বিছিয়ে, ময়লা কাঁথা দিয়ে বিছানা পাতানো তার। গায়ে ছেঁড়া, আধময়লা লেপ জড়িয়ে ঘুমোয়। আলো-আঁধারির খেলা চলছে আকাশের বুকে। একটা ছোট্ট দোয়েলপাখি শিস কেটে উড়ে গেল। পাশের বাড়ি থেকে ন-মাসের ছেলেটার কান্না ভেসে আসে তার কানে। পাড়ার একদল কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে গতরাতে হাত-পা সেঁকা আগুনের ছাইয়ে জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে। কুকুরি তার সন্তানদের ওম দিয়ে ঠান্ডা নিবারণের চেষ্টা করছে। একটা পেঁচা কাছারিবাড়ির অন্ধকার ঘর থেকে উড়ে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে গেল।
— না! আর ঘুমোলে হবে না। এখুনি গোরু দুট্যাকে খড়-খোল দিয়ে আসতে হবে। সে তো অনেক দূর… বলেই উঠে পড়েছে বিছানা থেকে।

ফজরের আজান শোনা গেল মসজিদের মাইক থেকে। আজানের ধ্বনি শুনে শাকিবের মন ভরে ওঠে। সে মূর্খ মানুষ। আজানের ধ্বনি তার মধুর লাগে কিন্তু তার মানে সে জানে না, বুঝতেও চায় না, সেসব বুঝেও লাভ নেই। আরবিটারবির ব্যাপার। তবে শুক্রবার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে যায় সে। মাঝে মাঝে কাজের চাপে সব জুম্মার নামাজও পড়া হয় না। যেদিন নামাজ পড়া হয় না, কেন, জানে না, সে রাতে তার চোখে ঘুম আসে না। মনে হয়, আশমান থেকে জিব্রিল ফিরিশতা এসে তাকে বলছে, কী শাকিব নামাজ পড়লে না? হাশরের ময়দানে জবাব দিতে পারবে? পুলিশিরাত পার হতে পারবে?
মনে মনে সে বলে, 'হে আল্লা, তুমি হামাকে গরিবের ঘরে জম্মো দিলা, দুবেলা পেট চালাতে, কামকাজ করতেই তুমাকে স্মরুণ করতে পারছি না। তুমি হামার সব গুনাহ্‌ মাফ করে দাও।'
— কোই, শাকু উঠ্যাছ, সানি-পানি দিয়্যাছ? শাকালো শাকালো বাহির হোতে হোবে।
— হ্যাঁ মিয়া সাহাব! হামি ঝুঁচকিতে উঠি, গোরু দুটাকে ভাল করি সানি-পানি, খোল-ভুসি দিঙ্ ন্যাদ ভরি দিয়্যাছি।
— ঠিক, ঠিক। এখান থেকি পাঁচ ক্রোশ দূরে বীরখেতি। শাকালো বেহির না হতে পারলে মাথার উপর সুরুজ উঠি য্যাবে।
— কোন কিছুরই ভাবনা কোরবেন না মিয়া সাহেব। হামি ঝুঁচকি ভোরে উঠি সব কাজ স্যারি ফ্যালাছি। বিবিজানকে বুলি দিয়্যাছি রেডি হোতে। ব্যস। গাড়ি জুড়ি চলি যাবো। গতরেতেই লালুকে নিঙ্ টপ্পর বেঁধে রেখ্যাছি।
ইজাজ মিয়া ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদের দিকে পা বাড়ায়। শাকিব গোয়াল ঘরে গিয়ে দেখে বলদ দুটো পরম নিশ্চিন্তে আগ্রহের সাথে খাবার খাচ্ছে। তাদের খেতে দেখে আনন্দিত হয়।
— যাক, এখন নিশ্চিন্তি, বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে কাছারিপুকুরের পাড়ে গিয়ে একটা নিশিন্দা গাছের সরু ডাল ভেঙে দাঁতন বানিয়ে দাঁত ঘষতে ঘুষতে ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়।

দুই

সকালবেলায় নাস্তা-পানি খেয়ে বিবি মেহেরজান সাথে বৌমা আসমানীকে নিয়ে গাড়িতে ওঠে। ওরা যাবে ধলো দরগার মাজারে মানত দিতে‌। তাদের একমাত্র পুত্র নইমুদ্দির বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক হলো। নাতি-নাতনির মুখ দেখার খুব ইচ্ছে মেহেরজানের। বারবার বলে ইজাজ মিয়াকে রাজি করিয়েছে। ধলো দরগার মাজারে মানত দিতে। ইজাজ মিয়া এসব মানে না। তবুও…

এই শীতে পৌষ সংক্রান্তিতে ধলো দরগার মাজারে বড় ধুম লাগে। মেলা বসে, হাজার হাজার মানুষ তাদের মনের খাস পূরণের উদ্দেশ্যে দরগায় পিরবাবার কাছে মানত করে। ওই দিনে গিয়ে সেখানে শিন্নি চড়াতে হয়। মেহেরজান বিবিও তার বৌমার পুত্র সন্তান না হওয়ায় পড়শির পরামর্শে মানত করে বলেছিল, 'বাবা পির সাহেব, আমার একটা বংশধর যাতে হয়, তার জন্য তুমি আল্লার কাছে আমার জন্যি সুপারিশ করো। আমি তোমার দরবারে বটগাছের ডালে ঘোড়া বাঁধব, শিন্নি চড়াব।
— জোরে ডাকাও হে গাড়োয়ান। বেলা যে মাথার উপর উঠে গেল? বলে হাঁক ছাড়ে মিয়া সাহেব।
— হট্, হট্, বলে দুপায়ে গোরুদুটোর পেটে গুঁতো মারতে মারতে গাড়োয়ান লেজদুটো ধরে চটকে দেয়। গোরুদুটো যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে। দৌড় লাগায়।
ক্রমশ…

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)