বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ছোটগল্প/২য়
বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই আশ্বিন, ১৪৩১
শারদ | ছোটগল্প
সুজয় সাহা
বাংলো বাড়িতে বিপর্যয়
"সাপটি ফণা তুলতে তুলতে ধীরে ধীরে তার বুকের উপর এগিয়ে যেতেই সে একটি টর্চ লাইট জ্বালিয়ে ধরল তার চোখের সামনে। সাপটি সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে মেঝে থেকে উঠে এল আরেকটা মূর্তিমান ভয়াবহ ভীষণ হিংস্র এক দানব। তার চোখ জলন্ত কয়লার মতো। চাহনিতে ভয়াবহ নারকীয় ভাবমূর্তি।"
প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ধনঞ্জয় কলেজের গেটের সামনে এসে পকেট থেকে
মোবাইল বের করে বাড়িতে ফোন করবে ভাবছে কিন্তু নেটওয়ার্কের গণ্ডগোল হওয়ার জন্য বারেবারে ফোনটা কেটে যাচ্ছে। ধনঞ্জয় রিষড়ার বিধানচন্দ্র
কলেজের রাত্রিকালীন বানিজ্য বিভাগের ছাত্র। রাস্তাও একদম জনশূন্য। একটিও অটো
রিকশার দেখা মিলছে না। সে কোনোরকমে মাথায় ছাতা ধরে পা চালাতে থাকে। কিছুটা রাস্তা
যেতেই আচমকা একটা পুরাতন ভগ্নপ্রায় বিশাল বাংলো তার চোখে
পড়ে। কই প্রতিদিনই তো
ওই রাস্তা দিয়ে সে যাতায়াত করে কষ্মিনকালেও তো চোখে পড়েনি তাঁর বাংলোটি। দেখতে
পুরো ভূত বাংলোর মতোই। কিন্তু কী আর করা যাবে হাতে যখন লক্ষ্মী পেয়েছে তখন লক্ষ্মীকে
হাতছাড়া না করাটাই ভাল। তাই আর কোনো বিকল্প উপায় নেই ভেবে একপ্রকার বাধ্য হয়ে
সে ঝড় জলের রাতে জরাজীর্ণ বাংলোর দিকে এগিয়ে চলল। ধনঞ্জয় বাংলোর দরজার সামনে
গিয়ে চিৎকার করতে লাগল– “কেউ আছেন?” দুই–তিনবার দরজায় টোকা দেবার পর একজন বৃদ্ধ লন্ঠন হাতে নিয়ে দরজা খুলে
বেরিয়ে আসে এবং জিজ্ঞাসা করল– “কী চাই?”
ধনঞ্জয়: আজকের রাতটা আমি এখানে থাকতে চাই, যদি থাকতে দেন একটু দয়া করে।
বৃদ্ধ লোকটি অদ্ভুত হাসি হেসে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে বলে। বৃদ্ধ
লোকটি বাংলোর একটি ঘর দেখিয়ে বলে, –নাও
আজকের রাত্রিটা কোনোরকমে এখানে মাথা গুঁজে কাটিয়ে দাও কাল সকালে নাহয় বাড়ি চলে
যেও। এখন খাবার বাড়ছি খেতে এসো।
আশ্চর্যজনক ভাবে হালকা ভয় ধনঞ্জয়ের মনের মধ্যে কাজ করতে
শুরু করে। তাই পাখির মতো দু–চারটি ভাতের দানা মুখে পুরে উঠে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। বাইরে থেকে
শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে। মনে হয় বাড়ির বাইরে তারা ঘোরাঘুরি করছে। ঝড় কমেছে
কিন্তু বৃষ্টির তীব্রতা বেশ বেড়েছে তার সঙ্গে মাঝে মাঝে বিদুৎ চমকাচ্ছে। সেই
বিদুৎতের আলোর ঝলকানিতে বাড়ির চারপাশে বিশেষ কিছু দেখা যাচ্ছে না। এসব ভাবতে
ভাবতে কখন যে ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছে সে নিজেও জানে না। গভীর রাত, চারিদিকে নিস্তব্ধ। ধনঞ্জয় হঠাৎ ঘুমের মধ্যে এপাশ-ওপাশ করতে করতে একটা ভীষণ বিরক্তিজনক ব্যথা অনুভব করল পায়ের মধ্যে। চোখ
মেলতেই সে দেখে তার পায়ের মধ্যে একটি সাপ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে
রয়েছে আর ফণা তুলে কেবলই ফোঁস ফোঁস করছে। সাপটি ফণা তুলতে তুলতে ধীরে ধীরে তার বুকের উপর
এগিয়ে যেতেই সে একটি টর্চ লাইট জ্বালিয়ে ধরল তার চোখের সামনে। সাপটি সঙ্গে সঙ্গে
সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে মেঝে থেকে উঠে এল আরেকটা মূর্তিমান ভয়াবহ ভীষণ
হিংস্র এক দানব। তার চোখ জলন্ত কয়লার মতো। চাহনিতে ভয়াবহ নারকীয় ভাবমূর্তি।
সেই মূর্তিমান দানব ধনঞ্জয়ের দিকে হাত দুটো প্রসারিত করল। বেশি সময় নষ্ট না করে ধনঞ্জয় হাতের সামনে
রাখা টর্চ লাইট আবার জ্বালল দানবটির দিকে। সাথে সাথে সেই দানবটি নিজের হাতদুটো
গুটিয়ে নিয়ে সেই ঘর থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। এসব ঘটনায় নাস্তানাবুদ হওয়ার জন্য মাঝরাতে ধনঞ্জয়ের ঘুমটা ভেঙে যায়।
সে তখন বৃদ্ধটিকে সমস্ত ঘটনাবলি বিস্তারিত জানায়। বৃদ্ধটি তখন তাকে জানায় –
“আরে এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার, তারপর আজ
অমাবস্যার রাত তাই তেনারা নতুন কাউকে দেখলেই তার উপর উৎপাত করতে চলে আসে। এখন আর এসব ভেবে লাভ নেই যাও অনেক রাত হয়েছে ঘুমিয়ে পড়োগে”। ধনঞ্জয় ভাবল ঠিকই তো অনেক রাত হয়ে গেছে এখনও
এই সামান্য ঘটনা নিয়ে বেশি চিন্তা না করে ঘুমিয়ে পড়াটাই ভাল। সে আবার ঘুমানোর
চেষ্টা করে। খানিকক্ষণ বাদে সে নিজের বুকের উপর একটি কালো
কুচকুচে বেড়ালকে বসে থাকতে দেখে ভয়ে লাফিয়ে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে সেই বিড়ালটি
সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং আবার সেই মূর্তিমান আতঙ্ক আবার সেই ঘরে উপস্থিত হয়।
এরপর সে যা দেখল সেটা দেখে তার শরীরের রক্ত সঞ্চালন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। সেই মূর্তিমান দানবটি তার
রূপ পাল্টায় এবং বৃদ্ধটির রূপ ধারণ করে। তার ঠিক পরক্ষণেই
একটি লোক কোত্থেকে হঠাৎ এসে দানবটির মুখে মশালের আগুন জ্বেলে ধরে। এবং সেই
মূর্তিমান দানবটি সেখানে সম্পূর্নভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। ধনঞ্জয় সেই আগন্তুক
ব্যাক্তিকে ধন্যবাদ জানিয়ে সেই বাংলো থেকে বেরিয়ে ওই ভরা বৃষ্টির মধ্যেই প্রানের ভয়ে
পালিয়ে যায়।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment