বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/গদ্য/২য়
বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই আশ্বিন, ১৪৩১
শারদ | গদ্য
দীপক বেরা
এ শরতের বিষণ্ণ আগমনী এবং “উই ওয়ান্ট জাস্টিস”
"২০১৩ সালে তৈরি হওয়া সেই আইন কোথায়? — "দি সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট অব উইমেন অ্যাট ওয়ার্কপ্লেস (প্রিভেনশন, প্রোহিবিশন অ্যান্ড রিড্রেসাল) অ্যাক্ট? আসলে যা ঘটেছে তা কেবল উৎপাত বা হয়রানি নয়, তার চেয়ে অনেক বড় কিছু। অনেক বেশি ভয়ংকর, নারকীয়, দুর্বিষহ।"
দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডার জানান
দিচ্ছে শারদোৎসব আসন্ন। আর কদিন পরেই তো বাঙালির প্রাণের উৎসব দুর্গোৎসব। ভোরবেলা উঠোনের
শিউলি গাছটা থেকে শিউলি ঝরে পড়ছে একটি-দুটি। কিন্তু গ্রামের মাঠে-ঘাটে, পথের পাশে,
প্রান্তরে কাশফুল পূর্ণোদ্যমে তার সাদা চামর ঝুলিয়ে হাজির। এখন শরতের নীল আকাশে সাদা
পেঁজা তুলোর মতো মেঘ থাকার কথা, কিন্তু আকাশে বর্ষার কালো ভারী মেঘের ভ্রূকুটি যেন
কমছেই না।
সত্যিই আজ কালো মেঘের ভ্রূকুটি — আমাদের
সমাজে, আমাদের চারপাশে, আমাদের যাপনে। বেশ কিছুকাল যাবৎ আমরা সবাই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে
দাঁড়িয়ে আমাদের চারপাশের এই ঘটে চলা অন্যায়-অবিচারের ঘটনাপ্রবাহ দেখে চলেছি এবং দেখে
আসছি খুব সহজাত চোখে। যেন এটাই স্বাভাবিক, এটাই নিয়ম। চোখ, কান, মুখ সবই আছে, তবু আশ্চর্য
নির্লিপ্ততায় সবাই কেমন যেন নিরুদ্বেগ, নিরুত্তাপ! —কেউ প্রবাহেই ভেসে চলে, চলতে ভালবাসে।
অবশ্যই সেটা কেউ কেউ। আমরা সবাই তো আর সেটা পারি না, পারি না স্রোতের অনুকূলেই গা ভাসিয়ে
দিতে। অনেকেই আমরা পদে পদে হোঁচট খাই। আমাদের সংবেদনশীল মন আঁতকে ওঠে। দ্বন্দ্বময়
এক আস্তিক চেতনায় বেঁচে আছি। চারদিকে কেমন অকাতরে ছড়িয়ে পড়ছে রাজনীতির রঙিন ফানুস,
প্রলুব্ধ করছে মানুষকে এবং ধীরে ধীরে থাবা বসাচ্ছে মানুষের মনে এবং তরুণ প্রজন্মের
সুস্থ ও কোমল চেতনায়। ছড়িয়ে পড়ছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্লেগের ভাইরাসের মতো,
দলীয় মদতে রাজনীতির এই দুর্বৃত্তায়ন। সাম্রাজ্য হারানোর ভয়ে শাসক আজ বেপরোয়া, নির্মম,
মরিয়া হয়ে উঠছে।
গত ৯ই আগস্টের রাতে আমাদের এই শহর কলকাতায় ঘটে গেছে এক নারকীয় পৈশাচিক ঘটনা। সেদিন থেকেই তীব্র ক্রোধ, বেদনা, ধিক্কার ও শত শত প্রশ্ন আপামর মানুষের হৃদয়ে মাথা কুটছিল। কারণ, সেই রাতে, আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে, কে বা কারা, একজন কর্তব্যরত তরুণী চিকিৎসককে তাঁরই কর্মস্থলের সেমিনার রুমে বীভৎস অত্যাচার, নারকীয় ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করে।
এই মর্মান্তিক ঘটনা সংবাদপত্র, বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশিত হওয়া মাত্রই যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে এসেছে, তা হল— 'নিরাপত্তা'। ২০১৩ সালে তৈরি হওয়া সেই আইন কোথায়? — "দি সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট অব উইমেন অ্যাট ওয়ার্কপ্লেস (প্রিভেনশন, প্রোহিবিশন অ্যান্ড রিড্রেসাল) অ্যাক্ট? আসলে যা ঘটেছে তা কেবল উৎপাত বা হয়রানি নয়, তার চেয়ে অনেক বড় কিছু। অনেক বেশি ভয়ংকর, নারকীয়, দুর্বিষহ। দিন-রাত চোখের পাতা এক করে চিকিৎসা করে, সেবা করে, মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে রাখেন যাঁরা, সেই চিকিৎসকগণ যদি নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত না হতে পারেন, তাহলে আপামর জনসমাজ সন্ত্রস্ত হবে বইকি। এক গভীর কান্নার স্রোত সকলকে অধিকার করে নেবেই, যে কান্না নির্যাতিতা ও নিহতের জন্য সমবেদনার, যে কান্না তার পরিবারের প্রতি সহানুভূতির এবং যে কান্না গণমানুষের ক্রোধের, হতাশার, ত্রাসের ও দ্রোহের।
তাই গত ১৪ই আগস্ট— "মেয়েরা রাত দখল করো"র সেই ঐতিহাসিক মহামিছিল এই সমস্ত কিছুরই অনুসারী ও পরিবাহী। এই সমাজে একজন নারীর অন্তরে, নারী হয়ে বেঁচে থাকার যে জ্বালা, প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিবন্ধকতার পাথর সরিয়ে তার সারা জীবনের পথ চলার মাঝে দাঁতে দাঁত চেপে যে অক্লান্ত দুর্বিষহ লড়াই, যে সংগ্রাম, — এই রাত দখল, তারই প্রতীক।
বাড়ির কাছেই পার্কে রোজ কোনও-না-কোনও ব্যানারে মানুষের জমায়েত হচ্ছে। রাস্তায় রাজপথে অগণিত মানুষের মিছিল। নানা পেশার, নানা বয়সের মানুষের ত্রস্ত পা হেঁটে চলেছে অবিরাম। মুষ্টিবদ্ধ হাত, দৃপ্ত কন্ঠে উচ্চারিত— "উই ওয়ান্ট জাস্টিস" স্লোগান। এ যেন এক অন্য কোলকাতা, অন্য শহর। রোজকার জীবনের চেনা ছকের বাইরে এ যেন অন্য এক অচেনা রাজ্যের চালচিত্র।
গভীর বিস্ময়ে দেখি, ঢাকে কাঠি পড়ার
সময় এসে গেলেও এবারে কারও মনে যেন সেই 'পুজো আসছে' ভাবটা নেই। চলছে নিম্নচাপের অবিশ্রান্ত
বৃষ্টি। কোথাও জলের ছোবলে তলিয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। নদীর পাড় ভাঙছে নিয়ত। মালদহের ভূতনিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ
ঘরছাড়া। মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলির বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন। শহরেও জল গিলে নিচ্ছে
দৈনন্দিন জীবন। অথচ এই উৎসবকে ঘিরে বহু মানুষের সারা বছরের রোজগার নির্ভর করে। মাটি
ফেলে মণ্ডপের মাঠ ঠিক করা থেকে প্যান্ডেলের বাঁশের জোগানদার, মৃৎশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয়
মাটি সরবরাহকারী, প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা ঢাকির দল, আলোকসজ্জার সাধারণ কারিগর, এমনই
বহু মানুষ যুক্ত থাকে এই বিশাল কর্মযজ্ঞে— কাকে ছেড়ে কার কথা বলা যায়! কারখানায় কাজ
করা শ্রমিক বাবার কাছে সামান্য পুজোর বোনাস এই সময়ের একটু বাড়তি রোজগার। তাই দিয়ে
তিনি ফুটপাত থেকে তাঁর ছোট ছোট ছেলে ও মেয়ের জন্য জামাকাপড় কেনেন। পদ্মচাষি জলের জোঁক
তাড়িয়ে ফুল তোলার অপেক্ষায় দিন গোনেন। দুর্গতিনাশিনী দেবী সপরিবার বাবা-মায়ের বাড়ি
এলে ভক্তের অঞ্জলির পাশে তাঁদের পাতেও দু-এক টুকরো মহার্ঘ ফল-মাছ-মাংস জোটে। পুজোর
মরশুমে এমনই আশার আলো নিয়ে এঁরা সবাই পুজোর কাজে লেগে পড়েন। কিন্তু এবারে তাঁদের
মধ্যেও যেন খানিকটা আলোড়ন। পথে-ঘাটে এখন আর কান পাততে হয় না। এমনিতেই কত কথা এসে
পড়ে। বিচারের দাবি নিয়ে কথা, নিরাপত্তার কথা, মানবিকতার কথা। মিস্তিরি থেকে লোকাল
ট্রেনে ফেরা সাত বাড়ি কাজ সারা মেয়েটি, —সবার মুখেই এই খুন, ধর্ষণ, অত্যাচার, অন্যায়-অবিচারের
কথা বলতে শুনছি অহরহ।
এক জন মা, মাতৃস্থানীয়া, তাঁর কন্যার বিষয়ে নিশ্চিন্ত হবেন কবে? যে তরুণী চিকিৎসকের নারকীয় হত্যাকাণ্ড — ১৪ই আগস্ট মেয়েদের রাত দখলের প্রণোদনা, সেই তরুণীর মা এবং পৃথিবীর সকল মা-ই নিশ্চিতভাবে বিকৃতমানস পুরুষের কবল থেকে মেয়েকে আগলে রাখতে আমৃত্যু লড়াই করেন। অথচ— এক মায়ের কোল থেকে ফুলের কুঁড়ির মতো সম্ভাবনাময় মেয়েটা দলে পিষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তিনি কি কোনওদিন কল্পনা করেছিলেন, নাকি আমরা ভাবতে পেরেছিলাম?
প্রতিবেশী আক্রান্ত হলে সবাই একজোট হয়ে এই যে একটা জোরালো প্রতিবাদ উঠে এসেছে, এবারে মণ্ডপে মণ্ডপে বিষণ্ণ মায়ের মূর্তির সামনে ভক্তদের প্রাণে এটাই একমাত্র আশার আলো। এতদিন পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি সহ্য করে এসেছিল জনগণ। 'এ' ভাবছে, ওটা তো 'ওর' সমস্যা, 'ও' ভাবছে ওটা 'তার' সমস্যা, —আমার তাতে কী? আমি তো খেয়ে পরে বেঁচে আছি, তাহলেই হল। প্রত্যেকেই তার নিজের কথা ভাবে।
কোথাও একটা অশুভ শক্তির ভয়, আবার কোথাও ভয়কে জয় করতে না-পারার ভয়। ভয় কে না পায়? অপমানের ভয়, একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয়, সন্ত্রাসের ভয়, সর্বোপরি মৃত্যুর ভয়। নিছক পিঁপড়ের মতো ক্ষণিক জীবনের আশঙ্কা নিয়ে আমরা যারা বেঁচে থাকি, দশপ্রহরণধারিণীর প্রতি এইজন্যই তো আমাদের এত ভক্তি, আকুল আকুতি, করজোড়ে প্রার্থনা। একের হাতে যা শক্তি নেই, দশের হাতে তা আছে। একতাই শক্তি।
"প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,
দুর্যোগে পথ হয় হোক দুর্বোধ্য
চিনে নেবে যৌবন-আত্মা।"
এই নৈতিক বোধ জাগ্রত হয়েছে আজ সবার মনে। নিজের জীবনের বিনিময়ে একটি মেয়ের জীবন যেন লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয় জুড়ে দিয়ে গেছে।
এ শরতে মায়ের পুজোর উদ্যাপন অবশ্যই
হবে, আরতি হবে, আরাধনাও হবে। তবু কোথাও যেন বিষাদ-বিষণ্ণতার ছায়া, একটা কুয়াশার পর্দার
মতো ঢেকে রাখবে আমার, আপনার, সবার মনের শুভ উৎসব। অসুরনাশিনী, দনুজদলনী মায়ের আগমনী
বার্তার আরাধনায় মন্ত্রোচ্চারণের ভিতর উঠে আসবে সেই মহামন্ত্রধ্বনি—
"বিপদে মোরে রক্ষা করো
এ নহে মোর প্রার্থনা,
বিপদে আমি না যেন করি ভয়।"
একটা চিতার আগুন আরও অনেক শরীরে, শিরায় শিরায় অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে দিয়ে যায়। অগণিত, অসংখ্য মানুষের বুকের ভিতর সে তুষের আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলতেই থাকে। মনিকর্ণিকার দাউদাউ আগুন জ্বলতে জ্বলতে, বুকের ভিতর মথিত হতে হতে সেই আগুনই একদিন আলো হয়ে যায়।
এ শরতে মহাকাব্য আর ইতিহাসের আনাচকানাচ থেকে উঠে আসা অনন্ত জাগরণ— ধ্বনিত, প্রতিধ্বনিত হওয়া নাগরিক সমাজের, গণমানুষের সুসংহত প্রতিবাদী চেতনার স্বরের মন্থন শেষে উঠে আসা অনন্ত গরল থেকে উপচে পড়েছে আজ সেই অমৃত-সুধা, যার প্রতিটি ফোঁটার নাম— "উই ওয়ান্ট জাস্টিস"!
গত ৯ই আগস্টের রাতে আমাদের এই শহর কলকাতায় ঘটে গেছে এক নারকীয় পৈশাচিক ঘটনা। সেদিন থেকেই তীব্র ক্রোধ, বেদনা, ধিক্কার ও শত শত প্রশ্ন আপামর মানুষের হৃদয়ে মাথা কুটছিল। কারণ, সেই রাতে, আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে, কে বা কারা, একজন কর্তব্যরত তরুণী চিকিৎসককে তাঁরই কর্মস্থলের সেমিনার রুমে বীভৎস অত্যাচার, নারকীয় ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করে।
এই মর্মান্তিক ঘটনা সংবাদপত্র, বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশিত হওয়া মাত্রই যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে এসেছে, তা হল— 'নিরাপত্তা'। ২০১৩ সালে তৈরি হওয়া সেই আইন কোথায়? — "দি সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট অব উইমেন অ্যাট ওয়ার্কপ্লেস (প্রিভেনশন, প্রোহিবিশন অ্যান্ড রিড্রেসাল) অ্যাক্ট? আসলে যা ঘটেছে তা কেবল উৎপাত বা হয়রানি নয়, তার চেয়ে অনেক বড় কিছু। অনেক বেশি ভয়ংকর, নারকীয়, দুর্বিষহ। দিন-রাত চোখের পাতা এক করে চিকিৎসা করে, সেবা করে, মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে রাখেন যাঁরা, সেই চিকিৎসকগণ যদি নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত না হতে পারেন, তাহলে আপামর জনসমাজ সন্ত্রস্ত হবে বইকি। এক গভীর কান্নার স্রোত সকলকে অধিকার করে নেবেই, যে কান্না নির্যাতিতা ও নিহতের জন্য সমবেদনার, যে কান্না তার পরিবারের প্রতি সহানুভূতির এবং যে কান্না গণমানুষের ক্রোধের, হতাশার, ত্রাসের ও দ্রোহের।
তাই গত ১৪ই আগস্ট— "মেয়েরা রাত দখল করো"র সেই ঐতিহাসিক মহামিছিল এই সমস্ত কিছুরই অনুসারী ও পরিবাহী। এই সমাজে একজন নারীর অন্তরে, নারী হয়ে বেঁচে থাকার যে জ্বালা, প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিবন্ধকতার পাথর সরিয়ে তার সারা জীবনের পথ চলার মাঝে দাঁতে দাঁত চেপে যে অক্লান্ত দুর্বিষহ লড়াই, যে সংগ্রাম, — এই রাত দখল, তারই প্রতীক।
বাড়ির কাছেই পার্কে রোজ কোনও-না-কোনও ব্যানারে মানুষের জমায়েত হচ্ছে। রাস্তায় রাজপথে অগণিত মানুষের মিছিল। নানা পেশার, নানা বয়সের মানুষের ত্রস্ত পা হেঁটে চলেছে অবিরাম। মুষ্টিবদ্ধ হাত, দৃপ্ত কন্ঠে উচ্চারিত— "উই ওয়ান্ট জাস্টিস" স্লোগান। এ যেন এক অন্য কোলকাতা, অন্য শহর। রোজকার জীবনের চেনা ছকের বাইরে এ যেন অন্য এক অচেনা রাজ্যের চালচিত্র।
এক জন মা, মাতৃস্থানীয়া, তাঁর কন্যার বিষয়ে নিশ্চিন্ত হবেন কবে? যে তরুণী চিকিৎসকের নারকীয় হত্যাকাণ্ড — ১৪ই আগস্ট মেয়েদের রাত দখলের প্রণোদনা, সেই তরুণীর মা এবং পৃথিবীর সকল মা-ই নিশ্চিতভাবে বিকৃতমানস পুরুষের কবল থেকে মেয়েকে আগলে রাখতে আমৃত্যু লড়াই করেন। অথচ— এক মায়ের কোল থেকে ফুলের কুঁড়ির মতো সম্ভাবনাময় মেয়েটা দলে পিষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তিনি কি কোনওদিন কল্পনা করেছিলেন, নাকি আমরা ভাবতে পেরেছিলাম?
প্রতিবেশী আক্রান্ত হলে সবাই একজোট হয়ে এই যে একটা জোরালো প্রতিবাদ উঠে এসেছে, এবারে মণ্ডপে মণ্ডপে বিষণ্ণ মায়ের মূর্তির সামনে ভক্তদের প্রাণে এটাই একমাত্র আশার আলো। এতদিন পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি সহ্য করে এসেছিল জনগণ। 'এ' ভাবছে, ওটা তো 'ওর' সমস্যা, 'ও' ভাবছে ওটা 'তার' সমস্যা, —আমার তাতে কী? আমি তো খেয়ে পরে বেঁচে আছি, তাহলেই হল। প্রত্যেকেই তার নিজের কথা ভাবে।
কোথাও একটা অশুভ শক্তির ভয়, আবার কোথাও ভয়কে জয় করতে না-পারার ভয়। ভয় কে না পায়? অপমানের ভয়, একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয়, সন্ত্রাসের ভয়, সর্বোপরি মৃত্যুর ভয়। নিছক পিঁপড়ের মতো ক্ষণিক জীবনের আশঙ্কা নিয়ে আমরা যারা বেঁচে থাকি, দশপ্রহরণধারিণীর প্রতি এইজন্যই তো আমাদের এত ভক্তি, আকুল আকুতি, করজোড়ে প্রার্থনা। একের হাতে যা শক্তি নেই, দশের হাতে তা আছে। একতাই শক্তি।
"প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,
দুর্যোগে পথ হয় হোক দুর্বোধ্য
চিনে নেবে যৌবন-আত্মা।"
এই নৈতিক বোধ জাগ্রত হয়েছে আজ সবার মনে। নিজের জীবনের বিনিময়ে একটি মেয়ের জীবন যেন লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয় জুড়ে দিয়ে গেছে।
"বিপদে মোরে রক্ষা করো
এ নহে মোর প্রার্থনা,
বিপদে আমি না যেন করি ভয়।"
একটা চিতার আগুন আরও অনেক শরীরে, শিরায় শিরায় অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে দিয়ে যায়। অগণিত, অসংখ্য মানুষের বুকের ভিতর সে তুষের আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলতেই থাকে। মনিকর্ণিকার দাউদাউ আগুন জ্বলতে জ্বলতে, বুকের ভিতর মথিত হতে হতে সেই আগুনই একদিন আলো হয়ে যায়।
এ শরতে মহাকাব্য আর ইতিহাসের আনাচকানাচ থেকে উঠে আসা অনন্ত জাগরণ— ধ্বনিত, প্রতিধ্বনিত হওয়া নাগরিক সমাজের, গণমানুষের সুসংহত প্রতিবাদী চেতনার স্বরের মন্থন শেষে উঠে আসা অনন্ত গরল থেকে উপচে পড়েছে আজ সেই অমৃত-সুধা, যার প্রতিটি ফোঁটার নাম— "উই ওয়ান্ট জাস্টিস"!
***

No comments:
Post a Comment