প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Wednesday, September 25, 2024

শারদ | সারথি | রিয়া পোদ্দার

 

বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই আশ্বিন, ১৪৩১

শারদ | ছোটগল্প

রিয়া পোদ্দার

সারথি


"আগের দিন রোজকার মতো রাতে ফোন করে তার সঙ্গে ওনার স্ত্রী রিনাদেবীর সাথে কথা বলল ঘন্টা খানেকপুজো বেড়ানোর কথা জানতে চাইলে সে জানিয়েছিল সে এবার সমুদ্রে যেতে চায়নীল সমুদ্র ছুঁতে চায়। সেই মতো অলোকবাবু ও তার স্ত্রী ঠিক করেছিলেন একমাত্র ছেলের ইচ্ছে মতো গোয়া যাবেন।"


আজ সকাল থেকেই তিন নম্বর নিতাই চরণ লেনের মুখে জটলা। রবিবার সকাল হলেও এতটা ভিড় আর পাঁচটা দিনে থাকে না। আকাশের সাথে সাথে জটলা পাকানো মানুষগুলো মুখ ভার। আজ রোজকার রবিবারের মতো দুপুরে জমিয়ে মাংসভাতের রসদ জোগাড় করতে বাজারে থলি হাতে না গিয়ে পাড়ার মোরে পাড়ার অধিবাসীরা একত্রিত, পুজো আসতে 
ঢে দেরি। জটলার কারণে বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় তৃতীয় আর সর্বভারতীয় মেডিক্যাল পরীক্ষাতে কুড়ি জনের মধ্যে স্থান অর্জন করা অভিজ্ঞান সেনের জন্য অপেক্ষা। অভিজ্ঞানের বাবা সরকারি ব্যাংক অফিসার মা শিক্ষিকা, পাড়াতে বেশ হাসিখুশি মিশুকে পরিবার রূপে পরিচিত তারা। ছেলেটি পাড়ার গর্ব, অত্যন্ত নম্র ভদ্র ছেলে সে। এবার মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে সেখানে পড়তে গেছে কয়েক মাস হল। কাল হসপিটালের কাছের রেল লাইন থেকে তার ক্ষতবিক্ষত দেহ খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানকার রেল বস্তির অধিবাসীরা রেল লাইন ধরে বাড়ি ফেরার পথে তার খণ্ডিত দেহ পড়ে থাকতে দেখে খবর দেয় পুলিশে। পুলিশ এসে পকেটে থাকা আই কার্ড সনাক্ত করে নিয়ে যায় মর্গে, খবর দেওয়া হয় হসপিটাল ও বাড়িতে। বাড়িতে সবে তখন দম্পতি ফিরে চায়ের কাপ নিয়ে বসেছেন সামনের পুজোয় কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায় তার প্ল্যান করতে, টিকিট কাটতে হবে রুম বুক করতে হবে। হঠাৎ অলোক সেনের মোবাইলে অচেনা নাম্বার থেকে ফোন। ধরতে বলেন, পুলিশ স্টেশন থেকে বলছি, আপনার ছেলের সুইসাইড করেছে, আপনাদের তার মৃতদেহ সনাক্ত করতে আসতে হবে মর্গে। এক নিমেষে একটা করাল অন্ধকার গ্ৰাস করে অলোক বাবুর সামনে, টা দুঃস্বপ্ন না বাস্তব। সামনে বসে থাকা স্ত্রী রিনাদেবী, অলোকবাবুকে এভাবে ঘামতে দেখে জল এনে দেন। জল খেয়ে অঝোরে কেঁদে ফেলেন নিজেকে সামলাতে না পেরে, রিনাদেবী খবর শুনে সংজ্ঞা হারান। একে একে খবর পেয়ে হাজির হয় পাড়াপ্রতিবেশী আত্মীয়স্বজন। অলোকবাবুর ছোট শ্যালক উত্তমকে নিয়ে হাজির হন মর্গে। গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে কোনরকমে নাকে রুমাল চেপে ঢোকেন, নোংরা আর গন্ধ একেবারে সহ্য করতে পারত না উওম। এর মধ্যে কী করে চুপ করে শুয়ে থাকতে পারে সে। প্ল্যাস্টিক জড়ানো দেহটা না চাইলেও চিনতে হয়, জন্মদাতা যে অস্বীকার করার জায়গা নেই। রাত ভোর হওয়ার অপেক্ষা, আজকের রাতটা যেন বড় বেশি দীর্ঘ ক্লান্ত। তার বাবুর শেষ যাত্রার জন্য প্রস্তুতি করছে তার ভাই শ্যালক, রিনাদেবী সংজ্ঞাহীন তখনও। পুলিশ সুপার বলছেন সুইসাইড, কিন্তু বাবুর বন্ধুরা এসে জানায় এটা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। কোনদিন পরীক্ষাতে দ্বিতীয় হয়নি তার বাবু। তাহলে আজ কী এমন ঘটল যার জন্য চরম সিদ্ধান্ত নিতে হলো তাকে। সারা রাত এই চিন্তা গ্ৰাস করছিল অলোকবাবুকে। আগের দিন রোজকার মতো রাতে ফোন করে তার সঙ্গে ওনার স্ত্রী রিনাদেবীর সাথে কথা বলল ঘন্টা খানেক, পুজো বেড়ানোর কথা জানতে চাইলে সে জানিয়েছিল সে এবার সমুদ্রে যেতে চায়, নীল সমুদ্র ছুঁতে চায়। সেই মতো অলোকবাবু ও তার স্ত্রী ঠিক করেছিলেন একমাত্র ছেলের ইচ্ছে মতো গোয়া যাবেন। সেদিন ছেলেটার মধ্যে কোন অসংলগ্নতা লক্ষ্য করেননি কেউ বরং রোজকার মতো প্রাণশক্তিতে ভরপুর একটা তরতাজা প্রাণ, কী কারণে এ পদক্ষেপ নিল সে, কীসের অভাব ছিল তার জীবনে। তাদের স্বামী-স্ত্রীর সামর্থ্য অনুযায়ী সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন একমাত্র ছেলেকে, ভালবাসারও অভাব ছিল না, তাহলে। ছেলে অল্পতেই সন্তুষ্ট কোনদিন কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না তার। এই সব ভাবতে ভাবতে ভোরের আলো পুব আকাশে, আজ এক অন্যরকম ভোর, যে ভোরের কথা সন্তান হারানো বাপ-মায়েরা জানে শুধু মাত্র। দায়িত্ব আজ পিতার নয় পুত্রের, ছেলেকে বাবা ভেবে মুখাগ্নি করার পরীক্ষা অলোকবাবুর সামনে। বাড়ির সামনে একে একে ভিড় জমাচ্ছে আত্মীয়স্বজন পাড়াপ্রতিবেশী, এর মধ্যে হাজির ছেলের বন্ধুরা, তাদের কথায় কিছুদিন ধরেই একটা বিষয় নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিল অভি। ইন্টারন্যাল পরীক্ষাতে সে তাদের ক্লাসের জয়ের থেকে কিছুটা নম্বর কম পায়, সেই পেপার নিয়ে অধ্যাপক ডঃ ভট্টাচার্য্যের কাছে গেলে তার কপালে জোটে একটু বকুনি। তার থেকে প্রতি পরীক্ষাতে প্রথম হওয়া অভি জয়ের কাছে মেডিক্যাল কলেজে প্রথম ইন্টারনাল পরীক্ষাতে হেরে যাবে এটা মন থেকে মেনে নিতে পারছিল না সে। তাকে সেটা কোন জায়গায় কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল প্রকাশ না করলেও, সে পড়াশোনার সময়ও বাড়িয়ে দেয়, প্রায় সারা রাত ধরে পড়াশোনা করত সে কদিন। দ্বিতীয় পরীক্ষাতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি তাকে মন থেকে ভেঙে দিয়েছিল। এই মেধা কি তাকে গ্ৰাস করল? ততক্ষণে এসে হাজির কাচের স্বর্গরথ সাদা পদ্ম দিয়ে সাজানো, সাদা অভির প্রিয় রং। একটু একটু করে চোখ মেলেছে রিনাদেবী, ছেলেকে শেষ দেখা। আজ সে রাজার রাজা হয়ে শ্বেত পদ্মে শেষ যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। ছেলের নিথর শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে সেই ছোটবেলার বাবুকে ঘুম পাড়ানোর পর নিষ্পাপ হাসিটা ওর মুখে লেগে থাকত, আজ তাই লেগে আছে, তবে তার বাবু আজ চিরঘুমের দেশে অতিথি। চোখ জলশূন্য বুকটা জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে রিনাদেবীর। অলোকবাবু চেপে বসলেন স্বর্গরথের সামনে চালকের পাশে, পেছনের বিশাল জনসমুদ্র, তার বাবুর শেষ যাত্রা। তিনি এ যাত্রার মূল সারথি, অনেকটা মহাভারতের কৃষ্ণ অর্জুনের মতো, আজ অলোকবাবুর ভূমিকা পিতার নয় পুত্রের। বিকালে মা গঙ্গায় অস্থির সাথে সাথে ভেসে গেল অলোকবাবুর বাবুর অপরিসীম মেধা, যে মেধা কেড়ে নিয়েছে অভির জীবন। ফেরার পথে বড় বেশি হালকা মনে হচ্ছে অলোকবাবুর, বাবু এতটা মেধাবী না হলে আজ হয়তো থাকত তাদের মাঝে হয়তো ছাপোষা সাধারণ হয়ে। তবু-তো থাকত সে কোল জুড়ে
 

সমাপ্ত


No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)