বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক সংখ্যা/বরষা/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/১৪তম/১৪ই ভাদ্র,
১৪৩১
বরষা | ছোটগল্প
দেবশ্রী রায় দে সরকার
পর্জন্য
"বৃষ্টিকে সে নিজের নাম জানাল, বৃষ্টি বলল, "সত্যিই এক অসাধারণ নাম আপনার, পুরাণে মেঘ ও বৃষ্টির দেবতাকে পর্জন্য বলত, পৃথিবীকে উর্বর করেন যে ঋষি তিনি তো পর্জন্য, তাই না?"
রাস্তায় এক হাঁটু জল পেরিয়ে অফিস থেকে
কোনমতে বাড়ি ঢুকল পর্জন্য। সামান্যতম বৃষ্টি হলেও তাদের পাড়াতে জল জমবেই, কোথাও না জল থাকলেও তার বাড়ির সামনে জল
থাকবেই। আবর্জনা যুক্ত এই জলকে সকলে অপছন্দ করলেও পর্জন্য যেন নিজের জীবনের সঙ্গে
তাকে মানিয়ে নিয়েছে। বাড়ি ফিরেই স্ত্রীর নানা অভিযোগ কানে ভাসতে থাকে
তার, এই বাড়ি, এই পাড়া, এই
আবহাওয়া এই প্রকৃতি সবকিছু নিয়েই রিয়া সর্বদা অভিযোগই করতে থাকে। একটু নিজের
মতো করে জানলার পাশে বসে পর্জন্য। একা একা বৃষ্টিকে ছোটবেলা থেকে উপভোগ করতে
সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায় সে। জানলার কাচে বারবার নিজের নাম লেখে। রিয়ার সব কথা
কানে ভাসলেও নিজেকে যেন সবকিছু থেকে মুক্ত করে বৃষ্টির সাথে একাত্ম হতে চাইছে সে।
অবশেষে রিয়ার প্রচণ্ড চিৎকারে তার সমস্ত ঘোর কেটে যায়।
হঠাৎ মনে হয় আজ তো রিয়র বন্ধু সৌভিকের বাড়ি নিমন্ত্রণ। ইচ্ছা না থাকলেও যেতে হবে সেখানে। রিয়ার মন
রাখতে। বৃষ্টির গতি কমতে থাকে। পর্জন্য ও রিয়া সৌভিকের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা
দেয়, ওলা করে। সৌভিকের বাড়িতে সে এক হই হই ব্যাপার। আজ
সৌভিকের জন্মদিন, অনেক অফিসের বন্ধু এবং কিছু বাল্যবন্ধুর
নিমন্ত্রণ আজ। অন্তর্মুখী স্বভাবের পর্জন্য এইসব পরিবেশে একদম মানিয়ে নিতে পারে না,
চুপচাপ বসে থাকে। সৌভিকের বাড়িতে গিয়েই রিয়া হইহুল্লোরে মেতে গেল
বন্ধুদের সাথে, জানালার পাশে তখনও বসে শেষ হয়ে আসা বৃষ্টির
ফোঁটাগুলিকে দেখছে পর্জন্য। ক্রমশ একটা ফোঁটার সঙ্গে আরেকটা ফোঁটার দূরত্ব
বাড়ছে... মুষলধারায় যে ফোঁটাগুলি একত্রিত হয়ে পড়ত... এখন যেন সব আলাদা
আলাদা...
অনেকক্ষণ লক্ষ্য করেনি পর্জন্য, তার পাশের সোফায় বসে সৌভিকের এক সহকর্মী,
পর্জন্য এতক্ষণ গুনগুন করছে একটা গান এক মনে। তার মনে হয়েছিল,
সে একা বসে আছে... সৌভিকের সহকর্মীকে দেখে, পর্জন্য
অপ্রস্তুত হয়ে গেল, এবার সৌভিক কেক কাটবে সকলকে ডাকা হচ্ছে
টেবিলের সামনে, সৌভিকের সহকর্মী পর্জন্যকে বলল "চলুন,
সবাই ডাকছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন যে, কেক
কাটবে সৌভিক, আপনি আমাকে চেনেন না হয়তো, আমার নাম বৃষ্টি, আমি অনেকক্ষণই আপনার পাশে বসে আছি,
আপনি হয়তো খেয়াল করেননি, আপনার নামটা আমি
ঠিক জানি না।" চিরকাল অন্তর্মুখী পর্জন্য, কখনোই কারো
সঙ্গে নিজে থেকে আলাপ করেনি, বৃষ্টিকে সে নিজের নাম জানাল,
বৃষ্টি বলল, "সত্যিই এক অসাধারণ নাম
আপনার, পুরাণে মেঘ ও বৃষ্টির দেবতাকে পর্জন্য বলত, পৃথিবীকে উর্বর করেন যে ঋষি তিনি তো পর্জন্য, তাই
না?"
লাজুক পর্জন্য বলল, "আমার নামের মানে তো ৯৯% মানুষই জানে
না, আপনি জানেন, ভাল লাগল।" দুজনের
কথার মাঝে রিয়া এসে গেল, রিয়া বলল, "তোমাকে আলাপ করিয়ে দিই এ হলো সৌভিকের বান্ধবী বৃষ্টি। নভেম্বর মাসে ওদের
বিয়ে। আমাদের সবাইকে নিমন্ত্রণ করবে। কাল থেকে প্রি-ওয়েডিং শুট শুরু হবে। কারণ বৃষ্টি খুব তোমার মতোই বৃষ্টি
ভালবাসে। তাই ও চায় প্রি-ওয়েডিং শুটগুলো বর্ষাকালেই হোক।
নেক্সট সানডে থেকে থেকে ওরা ইকোপার্ক, মিলিনিয়াম পার্ক, আর প্রিন্সেপ ঘাটে শুট করবে। এখন চলো কেক কাটবে,
তোমাদের দুজনের জন্য অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে সৌভিক।" কেক
কাটার পর্ব শেষ হয় সৌভিক ও বৃষ্টির বিয়ের অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে যায়। সদাহাস্য
মুখ সৌভিক বলে, "বৃষ্টি খুব ভাল গান করেন তাই একটা গান করতে
অনুরোধ করছি," বৃষ্টি বলে, "হ্যাঁ
একটু আগে আমি একজনকে একটা গান গুনগুন করতে শুনেছি, তার পাশে
বসে, সে অবশ্য বুঝতে পারেনি, আমি সেই গানটাই করছি, কিন্তু আমারও একটা অনুরোধ আছে
পর্জন্য যদি আমার সঙ্গে গানটা গায় তাহলে আমার খুব ভাল লাগবে।" পর্জন্যকে
সকলে মিলে অনেক পীড়াপীড়ি করার পর, রাজি হয়... দুজনে মিলে
একসাথে গান ধরে, "ছায়া ঘনাইলো বনে বনে গগনে গগনে ডাকে
দেয়া," হইহুল্লোড় জাঁকজমকপূর্ণ পার্টিটা যেন হঠাৎ এক
আবেগঘন বৃষ্টিস্নাত পরিবেশে পরিণত হয়, দুজনের কন্ঠেই গানটির
অনুরণন পার্টির পরিবেশটাকেই বদলে দেয়। পর্জন্য জানলার কাচ দিয়ে বাইরের বৃষ্টির
ফোঁটাগুলির দিকে তাকায়... প্রতিটি আলাদা আলাদা ফোঁটায় দেখতে পায় নিজেকে রিয়াকে,
সৌভিককে আর বৃষ্টিকে...
***

আশাকরি এইটা প্রথম পর্ব
ReplyDeleteপরর্বতী র্পবের আশায় রইলাম
💐🌿🙏🌿💐অপূর্ব এক মুগ্ধতায মন ভরে গেল,,,,,,শুভেচ্ছা অন্তহীন 🌹🌹
ReplyDelete