বাতায়ন/মাসিক/ধারাবাহিক উপন্যাস/২য় বর্ষ/২৮তম
সংখ্যা/২রা ফাল্গুন, ১৪৩১
অমরেন্দ্র চক্রবর্তী সংখ্যা | ধারাবাহিক
উপন্যাস
পারমিতা চ্যাটার্জি
শেষ
থেকে শুরু
[পর্ব – ১৪]
"সুচরিতাকেও খুব সুন্দর লাগছিল, একটা কালো শাড়ি পরেছিল, একঢাল খোলা চুল কাজলকালো চোখ, সেদিন প্রথম যেন, রাহুলের মনে হয়েছিল, সুচরিতাকেও তো ভারি সুন্দর লাগছে, কোনদিন তো এরকম মনে হয়নি, আসলে ও সুচরিতাকে ভাল করে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি, ও জানত মনকলিও ওকে ভালবাসে।"
পূর্বানুবৃত্তি মনকলি দুঃখ পেয়ে
চলে যাবার পরেরদিন রাহুল কলেজে গিয়ে প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করে প্রয়োজনীয় কিছু কথা
বলল। আরও কিছু কথা কনফিডেন্সিয়ালি বলার জন্য বাড়িতে ডিনারে আমন্ত্রণ জানাল। প্রিন্সিপালের
ঘর থেকে বেরিয়েই দেখল মনকলি যেন কান পেতে শুনছে। যারপরনাই বিরক্ত হলো রাহুল। তারপর…
রাহুল নিজের
ঘরে এসে সবে ফোনটা লাগাতে যাবে সুচিকে রাতে ডিনারের কথাটা বলার জন্য ঠিক তখনই দরজা
খুলে প্রায় ঢুকে পড়ে মনকলি জিজ্ঞেস করল,
-আমি কি একটু আসব?
-আবার কী হলো? বার বার ভাইস প্রিন্সিপালের ঘরে
ঢোকার নিয়ম নেই।
-কেন আমার সাথে এরকম করছ তুমি? কেন আমার কথাটা শুনছ না আমি এতটা
অসুস্থ জেনেও?
রাহুল পেপার
ওয়েটটা জোরে টেবিলে ঠুকে বলল,
-কতবার বলতে
হবে এটা কাজের জায়গা,
প্লিজ এখন আমি খুব ব্যস্ত, যখনতখন এভাবে ঢুকে পড়বেন না, আর আপনি এত অসুস্থ অবস্থায় কার ভরসায়
এখানে একা কাজ
করতে এসেছেন?
-যদি বলি তোমার ভরসায়।
-অনেকবার বলেছি আমাকে তুমি বলবেন না, আর স্যার বলবেন, যত সব
অসভ্যতা।
-এই যে স্যার এই অসভ্য মেয়েটার জন্য আপনি একদিন ভালবাসায় পাগল ছিলেন, আর আজ সুচি
আপনার কাছে সব হয়ে গেল তাই না? কারণ এখন আমার রূপে ভাটা পড়েছে, সুচিকে আমার চেয়ে
দেখতে সুন্দর হয়ে গেছে তাই তো?
-আমি এত অমানবিক নই, অধিকারের প্রশ্ন থাকে, কিছু হয়ে
গেলে পুরো দায়টা আমার ওপর এসে পড়বে, আমি তা নেব কেন? তবে নিশ্চয়ই
কামনা করব আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন, আর নিজের ঘরে ফিরে যান। এবার আমি কাজ করব, প্লিজ আপনি
আপনার কাজে যান, না
থাকলে কমনরুমে গিয়ে বসুন।
মনকলি চলে গেল, রাহুল হাত
থেকে ফোনটা রেখে দিয়ে কপাল টিপে ধরল দুহাতে। তারও খুব খারাপ লাগছিল মনকলির সাথে এত
কড়া ভাবে কথা বলে। যতই হোক মেয়েটা অসুস্থ। কিন্তু সেই বা কী করবে?
ওর দাদা আছে, স্বামী
আছে কেউ ওর দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেনি তবে কেন তার পেছনে পরে থেকে তার জীবনটা
জটিল করে তোলা!
এতদিন পর সে
সুচরিতার পবিত্র ভালবাসার পূর্ণতা দিতে যাচ্ছে শুধু সুচরিতার
ভালবাসার পূর্ণতা নয় সেই সাথে তার নিজেরও অপূর্ণ ভালবাসা পূর্ণতা পাচ্ছে এখন সত্যি
ভাল লাগছে না। কাল ওর দাদাকে ফোন করে জানাবে, ওর দায়িত্ব নিতে এখানে ও খুব অসহায় অবস্থায় আছে। আমার ওপর নির্ভর
করতে চাইছে কিন্তু এ মুহূর্তে আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। আমি ওর কোন গার্জেন নই বা আমার সাথে ওর সেই অর্থে কোন
সম্পর্ক নেই। আপনারা আসুন,
আর বুঝিয়ে ওকে বাড়ি নিয়ে যান। দূর কী সব ভাবছি বসে বসে, এদিকে
সুচিকে ফোন করতে হবে রাতের ডিনারের জন্য তা ভুলে দিব্যি বসে আছি।
তাড়াতাড়ি
ফোন তুলে ফোন করল, লাখিয়া ফোন
ধরল, রাহুল
বলল,
-তোর
বউদিদিকে একবার ডেকে দে তো।
-এহন সবুর কর এহনও আমার বউদিদি হননি।
রাহুল নিজের
মনে জিভ কেটে বলল,
-খুব পাজি
হয়েছিস, দিদি
কোথায়?
-হ এহন ঠিক হইসে, ডাকতেসি।
কিছুক্ষণ পর
সুচি এসে মিষ্টি রিনরিনে গলায় ফোন ধরে বলল,
-হ্যাঁ বলো?
-বলছি তোমার বাজারের অবস্থা কেমন? কী আনিয়েছিলে বাজার থেকে?
-কেন?
-আহ্ বল-না,
-বাপ রে! বাবুর মেজাজ যে দেখছি সপ্তমে।
-আরে যেটা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দে না।
-আবার তুই?
বলব না যাও।
-আচ্ছা আচ্ছা ভুল হয়ে বলো-না প্লি—জ…
সুচি খিলখিল
করে হেসে উঠে উত্তর দিল,
-একটু চিকেন আছে ডিম আছে আর কিছু সবজি।
-মাছ নেই?
-আজ বাজারে আমি নিজেই গিয়েছিলাম কিন্তু ভাল মাছ সেরকম পেলাম না।
-আরে এখানে এরচেয়ে বেশি ভাল মাছ পাবে না।
-ও আচ্ছা আমাকে লাখুয়া তো কিছু বলল না, আমি বললাম
তো ওকে মাছগুলো ভাল মনে হচ্ছে না, শুনে ও বিজ্ঞের মতন মাথা নাড়ল।
-বলছি আমাদের প্রিন্সিপাল আজ এই আটটা নাগাদ আমাদের বাড়ি আসবেন তোমার হাতের
রান্না খেতে আর আমাদের বিয়ের ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে।
-বাবা,
এর মধ্যে সব বলে ফেললে।
-হ্যাঁ এসেই আজ ওঁর ঘরে ঢুকে আমি বলার আগে উনি নিজেই সব বলে দিলেন, তখন আলোচনা হলো, যাক বিকেলে
যদি আমি মাছ নিয়ে যাই তুমি রান্না করে ফেলতে পারবে?
-হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি বলো-না কী
করতে হবে?
রাহুল এবার
খুশি খুশি গলায় বলল,
-আমি জানি তো
আমার সুচি খুব কাজের মেয়ে,
মেনু কি আমি ঠিক করতে পারি না কি? শুধু উনি মাছভাত খেতে খুব ভালবাসেন, তাই দুরকম
মাছ যাবার সময় নিয়ে যাব। বিকেলের দিকে টাটকা মাছ আসে নিয়ে একেবারে ঢুকব, ঠিক আছে? বাকি সব
তোমার ডিসিশন।
-ঠিক আছে,
দেখি তোমার হেঁসেলে পোস্ত পাই নাকি?
-আরে,
ওটা আর আমার হেঁসেল নয় ওটা ট্রান্সফার হয়ে গেছে শ্রীমতী
সুচরিতার হেঁসেলে।
-ও আচ্ছা বুঝলাম।
-কী বুঝলে?
-যা বোঝার তা বুঝেছি, এবার ছাড়ো আমাকে
রান্নাঘরে যেতে হবে তো?
-জোগাড় সব লাখিয়াকে দিয়ে করিয়ে নিও।
-ঠিক আছে স্যার তাই হবে।
-দাঁড়া বাড়ি যাই হচ্ছে তোর।
-আবার তুই?
এই আমি ফোন রাখলাম।
সুচরিতা ফোন
রেখে রান্নার জোগাড়ে লেগে গেল। রাহুলও
ফোনটা রাখল, মুখের
হাসিটা লেগে রইল, মনে
মনে অনেক ভাবনায় ডুবে গেল। চলে গেল অতীতে, যেদিন মনকলির কাছে প্রচণ্ড অপমানিত
হয়ে বাড়ি ছাড়ল, সেদিন সে একবারও
সুচরিতার মনটা পড়ার চেষ্টা করেনি, সুচরিতার বড় বড় কাজল কালো চোখ দুটোতে কী ভালবাসার স্পর্শ পায়নি? ওর ঠান্ডা শান্ত
স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের লজ্জা মাখানো কথা, লাজুক চাহনি, ওকে তখন
টানেনি কেন? আসলে
চঞ্চলতায় প্রাণে ভরপুর ওর দুষ্টুমি সবকিছু মিলিয়ে সেদিন মনকলিকেই মনের মাঝে
রেখেছিল, ওদের
বন্ধুদের মধ্যে সজলকে তো কত সুন্দর দেখতে, আর কী ব্রিলিয়ান্ট
ছিল, সে
তো সুচরিতাকে ভীষণ ভালবেসেছিল কিন্তু তখনকার ছেলেরা এত
সহজে মেয়েদের ভালবাসার কথা মুখে বলতে পারত না, ওই হালকা
গানে গল্পে বোঝানোর চেষ্টা করত। সেবার পাড়ার বিজয়া সম্মেলনীতে সজল উদাত্ত গলায় একদৃষ্টে সুচরিতার দিকে চেয়ে গেয়েছিল, "হয়তো তোমার
জন্য, হয়েছি
প্রেমে ধন্য, জানি
তুমি অনন্য, আশার
হাত বাড়াই"। কী অপূর্ব যে গানটা গেয়েছিল যে রাহুল
উত্তেজিত হয়ে বলে ফেলেছিল এরপর আর কারও গান চলে না।
সেদিন
সুচরিতাকেও খুব সুন্দর লাগছিল, একটা কালো শাড়ি পরেছিল, একঢাল খোলা
চুল কাজলকালো চোখ, সেদিন
প্রথম যেন, রাহুলের
মনে হয়েছিল, সুচরিতাকেও
তো ভারি সুন্দর লাগছে,
কোনদিন তো এরকম মনে হয়নি, আসলে ও সুচরিতাকে ভাল করে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি, ও জানত
মনকলিও ওকে ভালবাসে,
হয়তো বাসতও কিন্তু মাস্টার্সে রাহুলের দ্বিতীয় বিভাগ পাওয়াতেই ও পুরো ঘুরে
গিয়েছিল। আর সুচরিতা সম্বন্ধে সাময়িক দুর্বলতা থাকলেও রাহুল
এ কথা মানত সজল ওকে গভীরভাবে ভালবাসে তাই সুচরিতা সম্বন্ধে এধরণের ভাবনা মনে জায়গা
দেয়নি। অনেকবার রাহুল সজলকে বলেছিল,
-আমি ওকে বলব?
-কী বলবি?
তোর চোখই নেই তুই বুঝবি কী করে?
-মানে?
-মানে এই যে সুচি তোকে ভালবাসে।
-ধ্যাৎ তোর মতন সুন্দর ব্রিলিয়ান্ট
ছেলে যাকে ভালবাসে সে আবার…
-হ্যাঁ সেই আবার তোকে ভালবাসে, কারণ তুই খুব সহজ সরল ছেলে, তোর একটা
সুন্দর মন আছে, ও
সেই মনটার
সন্ধান পেয়ে গেছে। মনকলি অর্থ, বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা এইধরনের গ্ল্যামার পছন্দ করে, ও সত্যি
ভালবাসতে পারে না।
সজল হয়তো আজও সুচরিতাকে ভালবাসে। সজল গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেই বিদেশে পাড়ি
দিয়েছিল। কতদিন ওর সাথে দেখা হয়নি, ও যদি জানে আমি সুচরিতাকে বিয়ে করছি
তাহলে? তাহলে
কী হবে তা আর ভাবনার সময় নেই, যা ভাবার
ভাবা হয়ে গেছে।
ক্রমশ…

ভাল লাগল।
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো। যতি চিহ্নের উপর আরও একটু যত্ন নিবেন।
ReplyDeleteসব মিলিয়ে দারুণ লিখেছেন।