প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Wednesday, March 12, 2025

স্মৃতি সুধায় [১ম পর্ব] | পারমিতা চ্যাটার্জি

বাতায়ন/রং/ধারাবাহিক গল্প/২য় বর্ষ/৩২তম সংখ্যা/২৯শে ফাল্গুন, ১৪৩১

রং | ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা চ্যাটার্জি
 
স্মৃতি সুধায়
[১ম পর্ব]

"যারা শুধু ঘর সাজাবার জন্য ছবি কেনেন তাদের চেয়েও যারা ছবিটা সত্যিকারের কদর বুঝে কেনেন, আমার খুব আনন্দ হয়— তাই সেখানে দাম একটু কম হল বা বেশি ওই নিয়ে মাথা ঘামাই না। এই ভেবে আনন্দ পাই ছবিটা আমার যোগ্য জায়গায় যোগ্য মর্যাদায় আছে।"

 

সুজয় আর শ্রীচেতার আলাপটা হয়েছিল অদ্ভুতভাবে। একটা ছবির প্রদর্শনী হচ্ছিল শ্রীচেতা মানে শ্রী সেদিন কয়েকজন বান্ধবীর সাথে ওই প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিল গানের স্কুল ফেরত। শ্রী রবীন্দ্রভারতীর এমএ ক্লাসের ছাত্রী এটাই তার শেষ বছর। হ্যাঁ গান নিয়েই সে এমএ ফাইনাল দিচ্ছে তাছাড়া বেঙ্গল মিউজিক কলেজেও আলাদাভাবে বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ছায়া সেনের কাছে ট্রেনিং নেয়। গানকে অবলম্বন করেই তার ভবিষ্যতে এগিয়ে যাবার স্বপ্ন।

 
প্রদর্শনী ছিল সেদিন সুজয় সেনের খুব যে নামকরা তা নয় তবে ইদানীং একটু-আধটু নাম শোনা যায়। প্রত্যেকটা ছবিই আলাদা আলাদা সৌন্দর্য নিয়ে নিজস্ব ভঙ্গিমায় রয়েছে। অনেক বিদেশি পর্যটকও ছিলেন তার মধ্যে বেশ কিছু ছবি বিক্রি হয়ে গেল। শ্রী হঠা থমকে দাঁড়াল এসে একটি ছবির সামনে। একটা ঝড়ের সন্ধ্যায় অল্প বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে আর রাস্তা দিয়ে চলেছে হঠা ঝড়ের আক্রমণে উদভ্রান্ত একটি মেয়ে, ঝড়ে তার এলোমেলো চুল মুখের ওপর উড়ে এসেছে অবাধ্য আঁচলকে শাসনে রাখতে পারছে না বৃষ্টির জলে শাড়িটা গায়ে লেপটে শরীর ঢাকার বৃথা চেষ্টায় ভীত আতঙ্কিত মুখ। মাথার চুল দিয়ে জল টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে। শ্রী অনেকক্ষণ ছবিটার সামনে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। কী অসম্ভব জীবন্ত ছবিটা। অনেকদিন আগে ঠিক সে-ও এরকম এক ঝড়বৃষ্টির সন্ধ্যায় পড়েছিল। ভয়ার্ত মুখ নিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল— মনে হল হুবুহু সেই দৃশ্যটাই যেন কারও ক্যানভাসে রংতুলির মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। শ্রী ছবিটা কেনার জন্য ব্যাগ হাতড়ে দেখল কিন্তু অতটা টাকা তার ছিল না তখন সে ভাবল কিছু টাকা দিয়ে ছবিটা বুক করে যাই কাল এসে বাকিটা দিয়ে নিয়ে যাব। এমন সময় ছবির মালিক সুজয় সেন তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
-কী দেখছেন ম্যডাম? ছবিটা পছন্দ?
-হ্যাঁ মানে পছন্দ তো খুবই কিন্তু
-কিন্তু কী?
-আমি তো আজ অতটা টাকা আনিনি সাথে করে, আজ যদি অল্প কিছু দিয়ে বুক করি বাকিটা কাল এসে দিয়ে নিয়ে যাব তাহলে কি হবে?
-হ্যাঁ নিশ্চয় হবে
বলে সে তখুনি ছবিটা খুলে প্যাকিংয়ে দিয়ে দিল
-না না আজ আমি নেব না কাল পুরোটা দিয়ে নেব
-আমি বলছি তো নিয়ে যান
-কিন্তু
-আবার কিন্তু বলে...
-না মানে ছবিটার দাম তো তিন হাজার টাকা আর আমার কাছে এখন পাঁচশো টাকার বেশি নেই
-বেশ ওতেই হবে আমার ছবি কোন বাঙালি মেয়ের এত ভাল লেগেছে এতেই ছবির দাম উঠে গেছে
-না মানে ছবিটার মধ্যে কোথায় যেন...
-নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিলেন তাই তো?
-হ্যাঁ আপনি কী করে জানলেন?
-শিল্পীদের মন পড়তে জানতে হয় নাহলে ছবি ফুটিয়ে তোলা যায় না এ ছবি আপনার— কাল আর দয়া করে বাকিটা দিতে আসবেন না
-না না তাহলে আমি কিছুতেই ছবি নেব না
-নেবেন না? ধরুন না এই ছবিটা আমি আমার কোন এক গুণমুগ্ধ ভক্তকে দিতে চাইছি
-এত দামী ছবিটা? আপনার কত ক্ষতি হবে?
-জীবনটা কি সবসময় লাভক্ষতির হিসেবে চলে?
শ্রী খুব কাচুমাচু মুখ করে বলল,
-কিন্তু আমার খুব খারাপ লাগছে
সুজয় সে-কথার উত্তর না দিয়ে বলল,
-নামটা জানতে পারি?
-হ্যাঁ আমার নাম শ্রী মানে শ্রীচেতা রায়
-আপনিও কি কোন শিল্পচর্চা করেন?
-আমি গান গাই রবীন্দ্রসংগীত
-বাহ্ এইজন্যেই শিল্পের এত কদর বোঝেনযারা শুধু ঘর সাজাবার জন্য ছবি কেনেন তাদের চেয়েও যারা ছবিটা সত্যিকারের কদর বুঝে কেনেন, আমার খুব আনন্দ হয়— তাই সেখানে দাম একটু কম হল বা বেশি ওই নিয়ে মাথা ঘামাই নাএই ভেবে আনন্দ পাই ছবিটা আমার যোগ্য জায়গায় যোগ্য মর্যাদায় আছে।
শ্রীচেতা খুব মন দিয়ে ওর কথা শুনছিল তারপর বলল,
-আজকাল তো এরকম সত্যিকারের শিল্পী দেখাই যায় নাআপনার প্রতি শ্রদ্ধা আমার অনেক বেড়ে গেল
-না না অত শ্রদ্ধা করার মতন মানুষ আমি নই।
-আচ্ছা আসি তাহলে খুব ভাল লাগল আপনার সাথে আলাপ হয়ে।
যাবার আগে সুজয় নিজের একটা কার্ড দিয়ে বলল,
-যদি মনে হয় কখনও ফোন করতে পারেন।
শ্রী চলে গেল কিন্তু তার সরল নিষ্পাপ মুখ, দুটো গভীর কালো চোখের ছায়া ফেলে গেল শিল্পীর চোখে। সুজয়ের মনে হল সে তার নাম্বারটা তো দিয়েছে কিন্তু শ্রীর নাম্বারটা তো নেওয়া হল না তাহলে? আর যদি ও ফোন না করে যদি আর কোনদিন দেখা না হয় এসব ভাবনায় মনটা উথালপাতাল করছিল। এদিকে তার আরও দুটো ছবি দুজন বিদেশিরা বেশ ভাল দামে কিনে নিল। প্রদর্শনীর শেষে সে বাড়ি ফিরল বিরস মনে। কিন্তু মনটা তার ভালই থাকার কথা, পকেট ভর্তি টাকা। তার বাবার রেখে যাওয়া সাদাসিধে দু-কামরার বাড়ি। মা-ও আজ দুবছর হল চলে গিয়েছেন এখন সে একা। একটা ঘরে তার সাজানো স্টুডিয়ো অন্য ঘরটায় থাকে বিশেষ গোছানো নয় একে একা পুরুষ তায় শিল্পী। বহুদিনের পুরানো চাকর রামলোচন এসে বলল,
-খাবার দিমু না কি দাদা?
সে-ও বিরস উত্তর দিল,
-হ্যাঁ দাও।
খেয়ে নিয়ে সে ঘুমোবার চেষ্টা করল কিন্তু ঘুম আসে না কিছুতেই তখন স্টুডিয়োতে গিয়ে বসে শ্রীর মুখটা মনে করার চেষ্টা করল, তার চোখ দুটি সামনে ভেসে উঠল, তন্ময় হয়ে ছবি দেখার সেই মায়াবী মুখটা— হঠা তার ফোনটা বেজে উঠল ছুটে গিয়ে ফোনটা ধরল, ওপার থেকে ভেসে এলো একটা মিষ্টি গলা,
-আমি শ্রী বলছি—
নিজের মনের ভাব গোপন রেখে বলল,
-হ্যাঁ বলুন—
-আপনার ছবি আমায় ঘুমোতে দিচ্ছে না
নিরুত্তাপ গলায় সুজয় বলল,
-তাহলে ফেরত দিয়ে যান
-আপনি তো আশ্চর্য লোক মশাই
-কেন কী করলাম?
-যে ছবি মানুষকে ঘুমোতে দেয় না তা কখনও কেউ ফেরত দেয়?
-পরের পর রাত জাগলে শরীর খারাপ হতে পারে
-তখন আপনি আসবেন ডাক্তার হয়ে শরীর সেরে যাবে
-তাই বুঝি? আর আমার শরীর কে সারাবে?
-কেন আপনার তো কেউ ঘুম কেড়ে নেয়নি?
-যদি বলি আপনার চোখদুটো আমায় ঘুমোতে দিচ্ছে না তাহলে কি বিশ্বাস করবেন?
-হ্যাঁ করব।
 
এরপর থেকে দুজনের প্রায় দেখা হতে থাকল। দুজন দুধরনের শিল্পী। শ্রীর খোলা গলায় রবীন্দ্রসংগীত যেমন সুজয়ের মন ভরিয়ে দিত তেমনি সুজয়ের প্রাণ থেকে নিংড়ে আসা অপূর্ব সব ছবি শ্রীর মনে আঁকা হয়ে থাকত। সম্পর্কটা প্রেম পর্যায়ে যেতে বেশি সময় লাগল না। শিল্পীর সময় কখনও খারাপ কখনও ভাল হয়। সুজয় আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা ছাত্র। বিশ্বভারতীর কলাভবনেও বহুদিন প্রশিক্ষণ নিয়েছে তাই সে সহজেই একটা সরকারি স্কুলে অঙ্কন শিক্ষক হিসেবে চাকরি পেয়ে গেল। তাছাড়া বাড়িতেও তার স্টুডিয়োর একাংশে আঁকা শেখাবার ক্লাস খুলল। শ্রীও বেঙ্গল মিউজিক কলেজেই শিক্ষিকা হিসেবে কাজ পেল।
 
তারপর যা হয় শ্রীর মা শ্রীর বিয়ের জন্য দেখাশোনা আরম্ভ করলেন কিন্ত বাবা বললেন আগে মেয়ের মত নিতে হবে তার কাউকে পছন্দ কিনা জানতে হবে? মা বাবার কথা উড়িয়ে দিয়ে বললেন,
- আবার কী কথা? চিরকাল জানি বাবা-মা যা ঠিক করে দেবে তাই মেনে নিতে হয়
-সে তোমার-আমার সময় হত এখন আর হয় না।
শ্রী সুজয়ের কাছে এসে হতাশ সুরে এসে বলল,
-মা আমার বিয়ের জন্য ব্যস্ত হচ্ছেন কী করি বল তো?
-ব্যস্ত হওয়াটাই তো স্বাভাবিক তাই না?
-হ্যাঁ তা জানি কিন্তু
-আচ্ছা শ্রী তোমার ইচ্ছে করে না আমাদের প্রেমটা চিরকাল এমন সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকুক?
-সে তো করেই...
-জানো তো রোজকার ওঠাবসায় প্রয়োজনের মধ্যে ভালবাসাটা হারিয়ে যায়। মিলনের চেয়ে বিরহ প্রেমকে আরো নিকটে এনে দেয়যখন দেখা হয় না তখন কবে আবার দেখা হবে এই বেদনায় ছটট করি। প্রেমের মধ্যে বিরহ বেদনা না থাকলে ভালবাসা মরে যায়।
ক্রমশ…
 

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)