বাতায়ন/রং/ধারাবাহিক গল্প/২য় বর্ষ/৩২তম
সংখ্যা/২৯শে ফাল্গুন, ১৪৩১
রং
| ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা চ্যাটার্জি
স্মৃতি সুধায়
[১ম পর্ব]
পারমিতা চ্যাটার্জি
[১ম পর্ব]
"যারা শুধু ঘর সাজাবার জন্য ছবি কেনেন তাদের চেয়েও যারা ছবিটা সত্যিকারের কদর বুঝে কেনেন, আমার খুব আনন্দ হয়— তাই সেখানে দাম একটু কম হল বা বেশি ওই নিয়ে মাথা ঘামাই না। এই ভেবে আনন্দ পাই ছবিটা আমার যোগ্য জায়গায় যোগ্য মর্যাদায় আছে।"
সুজয় আর শ্রীচেতার আলাপটা হয়েছিল অদ্ভুতভাবে। একটা ছবির প্রদর্শনী হচ্ছিল শ্রীচেতা মানে শ্রী সেদিন কয়েকজন বান্ধবীর সাথে ওই প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিল গানের স্কুল ফেরত। শ্রী রবীন্দ্রভারতীর এমএ ক্লাসের ছাত্রী এটাই তার শেষ বছর। হ্যাঁ গান নিয়েই সে এমএ ফাইনাল দিচ্ছে তাছাড়া বেঙ্গল মিউজিক কলেজেও আলাদাভাবে বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ছায়া সেনের কাছে ট্রেনিং নেয়। গানকে অবলম্বন করেই তার ভবিষ্যতে এগিয়ে যাবার স্বপ্ন।
-হ্যাঁ মানে পছন্দ তো খুবই কিন্তু…
-কিন্তু কী?
-আমি তো আজ অতটা টাকা আনিনি সাথে করে, আজ যদি অল্প কিছু দিয়ে বুক করি বাকিটা কাল এসে দিয়ে নিয়ে যাব তাহলে কি হবে?
-হ্যাঁ নিশ্চয়ই হবে।
বলে সে তখুনি ছবিটা খুলে প্যাকিংয়ে দিয়ে দিল।
-আমি বলছি তো নিয়ে যান।
-কিন্তু…
-আবার কিন্তু বলে...
-না মানে ছবিটার দাম তো তিন হাজার টাকা আর আমার কাছে এখন পাঁচশো টাকার বেশি নেই।
-বেশ ওতেই হবে আমার ছবি কোন বাঙালি মেয়ের এত ভাল লেগেছে এতেই ছবির দাম উঠে গেছে।
-না মানে ছবিটার মধ্যে কোথায় যেন...
-নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিলেন তাই তো?
-হ্যাঁ আপনি কী করে জানলেন?
-শিল্পীদের মন পড়তে জানতে হয় নাহলে ছবি ফুটিয়ে তোলা যায় না। এ ছবি আপনার— কাল আর দয়া করে বাকিটা দিতে আসবেন না।
-না না তাহলে আমি কিছুতেই ছবি নেব না।
-নেবেন না? ধরুন না এই ছবিটা আমি আমার কোন এক গুণমুগ্ধ ভক্তকে দিতে চাইছি।
-এত দামী ছবিটা? আপনার কত ক্ষতি হবে?
-জীবনটা কি সবসময় লাভক্ষতির হিসেবে চলে?
শ্রী খুব কাচুমাচু মুখ করে বলল,
-আপনিও কি কোন শিল্পচর্চা করেন?
-আমি গান গাই রবীন্দ্রসংগীত।
-বাহ্ এইজন্যেই শিল্পের এত কদর বোঝেন। যারা শুধু ঘর সাজাবার জন্য ছবি কেনেন তাদের চেয়েও যারা ছবিটা সত্যিকারের কদর বুঝে কেনেন, আমার খুব আনন্দ হয়— তাই সেখানে দাম একটু কম হল বা বেশি ওই নিয়ে মাথা ঘামাই না। এই ভেবে আনন্দ পাই ছবিটা আমার যোগ্য জায়গায় যোগ্য মর্যাদায় আছে।
শ্রীচেতা খুব মন দিয়ে ওর কথা শুনছিল তারপর বলল,
-না না অত শ্রদ্ধা করার মতন মানুষ আমি নই।
-আচ্ছা আসি তাহলে খুব ভাল লাগল আপনার সাথে আলাপ হয়ে।
যাবার আগে সুজয় নিজের একটা কার্ড দিয়ে বলল,
শ্রী চলে গেল কিন্তু তার সরল নিষ্পাপ মুখ, দুটো গভীর কালো চোখের ছায়া ফেলে গেল শিল্পীর চোখে। সুজয়ের মনে হল সে তার নাম্বারটা তো দিয়েছে কিন্তু শ্রীর নাম্বারটা তো নেওয়া হল না তাহলে? আর যদি ও ফোন না করে যদি আর কোনদিন দেখা না হয় এসব ভাবনায় মনটা উথালপাতাল করছিল। এদিকে তার আরও দুটো ছবি দুজন বিদেশিরা বেশ ভাল দামে কিনে নিল। প্রদর্শনীর শেষে সে বাড়ি ফিরল বিরস মনে। কিন্তু মনটা তার ভালই থাকার কথা, পকেট ভর্তি টাকা। তার বাবার রেখে যাওয়া সাদাসিধে দু-কামরার বাড়ি। মা-ও আজ দুবছর হল চলে গিয়েছেন এখন সে একা। একটা ঘরে তার সাজানো স্টুডিয়ো অন্য ঘরটায় থাকে। বিশেষ গোছানো নয় একে একা পুরুষ তায় শিল্পী। বহুদিনের পুরানো চাকর রামলোচন এসে বলল,
খেয়ে নিয়ে সে ঘুমোবার চেষ্টা করল কিন্তু ঘুম আসে না কিছুতেই তখন স্টুডিয়োতে গিয়ে বসে শ্রীর মুখটা মনে করার চেষ্টা করল, তার চোখ দুটি সামনে ভেসে উঠল, তন্ময় হয়ে ছবি দেখার সেই মায়াবী মুখটা— হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠল ছুটে গিয়ে ফোনটা ধরল, ওপার থেকে ভেসে এলো একটা মিষ্টি গলা,
নিজের মনের ভাব গোপন রেখে বলল,
-আপনার ছবি আমায় ঘুমোতে দিচ্ছে না।
নিরুত্তাপ গলায় সুজয় বলল,
-আপনি তো আশ্চর্য লোক মশাই।
-কেন কী করলাম?
-যে ছবি মানুষকে ঘুমোতে দেয় না তা কখনও কেউ ফেরত দেয়?
-পরের পর রাত জাগলে শরীর খারাপ হতে পারে।
-তখন আপনি আসবেন ডাক্তার হয়ে শরীর সেরে যাবে।
-তাই বুঝি? আর আমার শরীর কে সারাবে?
-কেন আপনার তো কেউ ঘুম কেড়ে নেয়নি?
-যদি বলি আপনার চোখদুটো আমায় ঘুমোতে দিচ্ছে না তাহলে কি বিশ্বাস করবেন?
-হ্যাঁ করব।
শ্রী সুজয়ের কাছে এসে হতাশ সুরে এসে বলল,
-ব্যস্ত হওয়াটাই তো স্বাভাবিক তাই না?
-হ্যাঁ তা জানি কিন্তু…
-আচ্ছা শ্রী তোমার ইচ্ছে করে না আমাদের প্রেমটা চিরকাল এমন সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকুক?
-সে তো করেই...
-জানো তো রোজকার ওঠাবসায় প্রয়োজনের মধ্যে ভালবাসাটা হারিয়ে যায়। মিলনের চেয়ে বিরহ প্রেমকে আরো নিকটে এনে দেয়। যখন দেখা হয় না তখন কবে আবার দেখা হবে এই বেদনায় ছটফট করি। প্রেমের মধ্যে বিরহ বেদনা না থাকলে ভালবাসা মরে যায়।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment