ধারাবাহিক
উপন্যাস
পারমিতা চ্যাটার্জি
শেষ
থেকে শুরু
[পর্ব – ১৯]
"প্রমোদবাবু সবাইকে ঘরের ব্যবস্থা করে চা আর টোস্টের অর্ডার দিয়ে দিলেন, রাতেরবেলায় খুব হালকা খাবার, আগামীকাল দুটো অনুষ্ঠান একসাথে, দুবাড়ির আশীর্বাদ সকাল-বিকেল করে, তারপরে আইবুড়োভাতের অনুষ্ঠান।"
পূর্বানুবৃত্তি প্রবীর আর সজল
মনকলির ভালো চিকিৎসার জন্য পুরুলিয়ায় বলরামপুর কলেজে মনকলির সঙ্গে দেখা করে কথাবার্তা
বলল। এদিকে রাহুল আর সুচরিতা তখন কলকাতায় বিয়ের কেনাকাটায় ব্যস্ত, দিদি-বৌদিরাও থেমে
নেই, কোমর বেঁধে লেগে পড়েছে। তারপর…
সুচরিতা মোটামুটি ফোন করতে করতে জেনে নিল মাসি, দুই মামা, মামি, একজন পিসি পিসতুতো দাদা আর তার বউ আর জেঠুর দুই ছেলেমেয়ে সবাই আসছে। আবার তাড়াতাড়ি করে রাহুলকে ফোন লাগাল, ফোন ব্যস্ত আছে, রাগ হল সুচরিতার, অকারণ রাগ, আসলে এতগুলো লোক এসে যাচ্ছে এদের সবাইকে নিয়ে পুরুলিয়ায় যাওয়া তারপর ওখানে আরেকটা গেস্টহাউস লাগবে কি না? তা আলোচনা করবে, না এখন তিনি ফোন ব্যস্ত রেখে গল্পই করে যাচ্ছেন।
রাগে গজগজ
করছে যখন ঠিক তখনই রাহুলের ফোনটা বেজে উঠল, ব্যস অমনি রাগ গলে জল হয়ে গেল।
রাহুলের সঙ্গে মোটামুটি যাওয়ার ব্যবস্থা আর
গেস্টহাউসের কথা বলে নিল আর রাহুল সোজা প্রিন্সিপালকে ফোন যিনি তাদের একমাত্র
মুশকিলআসান। কলকাতা থেকে ঠিক হল গোটা ছয়েক গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া হবে, এত তাড়াতাড়ি
অত লোকের টিকিট পাওয়া যাবে না।
সুচরিতা
বেরিয়ে পড়ল ব্যাংকের উদ্দেশ্যে বিকেল থেকে সব লোকজন আসতে শুরু করবে আর সে হিমসিম
খাবে। ব্যাংকের কাজ সেরে লকার থেকে গয়নার বাক্স নিয়ে, বিকেলের
জলখাবারের জন্য অনেকটা পরিমাণে সিঙারা আর মিষ্টি কিনে নিয়ে এল। বাসন্তীকে বাজারে
পাঠিয়ে চাল, ডাল, ডিম পাউরুটি
বিস্কুট মাখন এসব আনতে পাঠাল। বাড়ির সামনে সবজিওয়ালা বসে তার কাছ থেকে যাবতীয় সবজি
কিনে রাখল। ছোটমামা তাকে ফোন করে বলল, সে মাছ মুরগি কিনে নিয়ে আসবে সে যেন না কেনে।
কিছুক্ষণের
মধ্যে নিঝুম
বাড়িটা যেন মেতে উঠল। সুচরিতার এতক্ষণ নিজেকে খুব একা লাগছিল এখন বেশ ভালো
লাগছে। শুধু মা আর বাপিকে খুব মিস করছে, একটা গোপন ব্যথা বুকের মাঝে চিনচিন
করে উঠছে। সে গয়নার বাক্সটা লকারে তুলে রেখেছে কাল সকালে বার করে সবাইকে দেখাবে।
বাসন্তী একা
পেরে উঠবে না বলে দুদিনের জন্য একটা রান্নার লোক ঠিক করেছে। পরেরদিন জলখাবার খেয়ে
সব ছেলেরবাড়ির নমস্কারি কিনতে গেল, ওকে টাকা দিতে দিল না। সবাই মিলেই তত্ত্বের
শাড়ি, ফলশয্যার
শাড়ি, ছেলের
জন্য দামি ধুতি পাঞ্জাবি, শার্ট প্যান্ট দু সেট করে, সেজমামা
ছেলের সুটের
কাপড়, দুজনের
দুটো সুটকেস, কাঁসার
বাসনের সেট তো মা রেখেই গেছেন, সেজমামা তাই দুরকম ডিনারসেট কিনলেন, একটা
সবসময়ের ব্যবহারের জন্য আর একটা খুব ভালো কোরেলের ডিনারসেট।
ফিনফিনে কাচের টিসেট সব গুছিয়ে কেনা হল। মা-বাবা নেই বলে
মেয়েটার বিয়েতে যেন কোন ত্রুটি না হয়। মা-বাবা হারানো মেয়ে,
তাছাড়া বড়দির একমাত্র মেয়ে। সব যেন খুব ভালো করে হয় সেদিকে সবার স্বতন্ত্র
দৃষ্টি।
দেখতে দেখতে
দুদিন হয়ে গেল, আজ
আবার পুরুলিয়ায় যাবার দিন দু তরফেই গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া হচ্ছে। গাড়ি ভাড়া রাহুল
কিছুতেই কাউকে দিতে দিল না,
সে নিজেই প্রায় চোদ্দোটা গাড়ির ভাড়া দিল।
সুচরিতার
মায়েরও খুব ইচ্ছে ছিল রাহুলের সাথেই যেন সুচরিতার বিয়ে হয়, ওরা খুবই অবস্থাপন্ন
তাই হীরের বোতাম আর হীরের আংটি করে রেখে দিয়েছিলেন, মায়ের আশীর্বাদেই সব হচ্ছে। তাছাড়া
দুই মামা মিলে ছেলের সোনার চেন আর দুটো গিনি কিনলেন, একটা ছেলের একটা মেয়ের জন্য। এমনি আর গহনার দরকার নেই বড়দি গুছিয়ে সব করে গেছেন। তাও
মাসি পলা বাঁধানো দিলেন দুই দাদা মিলে সোনার চেন আর তার সাথে
বেশ বড়ো একটা লকেট,
ম্যাচ করে দুল, পিসিও এক জোড়া
বাউটিদুল দিল। সব জিনিসপত্র গুছিয়ে যেন নেওয়া হয় বউরা তোমরা সব দেখেশুনে নাও দুই
পিসি হাঁক দিলেন। যাওয়ার সময় বাবা-মায়ের ছবি দুটো সুচরিতা
নিয়ে নিল। সবার অলক্ষ্যে অশ্রু-সজল দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথা ঠেকিয়ে
প্রণাম করে নিল।
রাহুল
ছুটোছুটি করে কে কোন গাড়িতে যাবে তার ব্যবস্থা করছে, রাহুলের মেজদা এসে বলল, আহা বিয়ের
বরকে অত কাজ করতে নেই তুই বরং ওই বাড়িতে একবার গিয়ে সব দেখে আয় আমি এদিকটা দেখে
নিচ্ছি।
সুচরিতাদের
বাড়ির সামনে এসে দেখল সুচরিতা ছবিদুটো বুকে করে নিয়ে ছলছল চোখে দাঁড়িয়ে আছে। রাহুল
এসে বলল,
-কী হলো এত ম্লানমুখ কেন? আমি তো তিনদিন না দেখেই হাঁপিয়ে উঠেছি, তোমার তো আর
আমার জন্য মন খারাপ হয় না?
-হ্যাঁ তুমি তো আমার মনের মধ্যে গিয়ে দেখে এসেছ, হয় কী না হয় তুমি কী বুঝবে?
রাহুল সবার
চোখ এড়িয়ে সুচরিতার গালের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে বলল,
-বুঝিয়ে দাও
সুচরিতা
লজ্জায় লাল হয়ে বলল,
-কী হচ্ছে কী সবাই দেখবে যে!
রাহুল হেসে
মামাদের কাছে গিয়ে বলল,
-সব ঠিক আছে তো?
-হ্যাঁ সব ঠিক আছে, তুমি কি এই কথা জিজ্ঞেস করতে এলে না
বউয়ের মুখ দেখতে এলে?
-এমা! না না মেজদা আমাকে পাঠাল, আপনাদের সব
ঠিক আছে কিনা তা দেখতে।
মাসি বলল,
-তা দেখা
হয়েছে?
-হ্যাঁ হ্যাঁ
অপ্রস্তুত
হয়ে গেল।
-তোমার বউ পরে, আগে আমাদের মেয়ে।
-হ্যাঁ তা তো নিশ্চয়ই, তাহলে আমি যাই।
-হ্যাঁ বাবা এসো, যতই মন কাঁদুক বউকে তো আর তোমার সাথে দিতে পারব না, এখন থেকে
বিয়ে অবধি আমাদের সাথেই থাকবে।
রাহুল অবাক
মুখে বলল,
-ওখানে গিয়ে
তাহলে কোথায় থাকবে?
-কেন! আমরা যেখানে থাকব। বিয়ের আগে আর একসাথে থাকা চলবে না।
-আরে বাবা আমরা তো রেজিষ্ট্রি করছি তাতেও এত নিয়ম?
-হ্যাঁ বাবা তাতেও এত নিয়ম, নাও অনেকটা পথ এবার দূর্গা দূর্গা
করে রওনা হয়ে পড়ো।
বাসন্তীও ওদের সাথে চলল দিদির বিয়েতে, মহা খুশি সে। চোদ্দোটা গাড়ি পরপর রওনা হল, রাহুল সমানে প্রমোদবাবু মানে
প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলে যাচ্ছে কোথায় পৌঁছল, পথে দু-তিনবার দাঁড়িয়েছে, এতখানি পথ না দাঁড়িয়ে কি যাওয়া যায়! শক্তিগড়ে নেমে সবাই
বেশ ভালো করে জলখাবার খেয়ে নিল, রাহুল সুচরিতার পাশে বসে বলল,
-কী কেমন
লাগছে! এবার
থেকে আমরা সত্যি সত্যি স্বামী-স্ত্রী।
এদিকে
ছোটমামা কে কী খাবে জিজ্ঞেস করতে এসে ওদের দেখে বলল,
-ও এখানে তো
প্রেমের খেলা চলছে।
সুচরিতা
হেসে বলল,
-উফফ মামু
মোটেই কিছু হচ্ছে না।
রাহুল বলল,
-আমি কিছু
জানি না মামু আপনার ভাগ্নি বলল, তাই পাশে বসলাম।
-ইশ্ কী মিথ্যে কথা বলে!
রাহুল বলল,
-ওখানকার মতন
কিল-ঘুসি মেরো-না বাবা, এখানে
শ্বশুরবাড়ির লোক আছে কিন্তু।
-এতক্ষণে মনে পড়ল সে কথা।
-একটু ইচ্ছে করনে পাচে বসতে, ওখানে গিয়ে তো আলাদা আলাদা
থাকতে হবে, দূর
ছাই নিয়মের নিকুচি করেছে। মামু আপনার ভাগ্নিকে কচুরি দেবেন, পৃথিবীর
সবচেয়ে প্রিয় খাবার ওর,
মাছমাংসর চেয়েও প্রিয়।
-ঠিক আছে বাবা তোমার বউকে তাই দেওয়া হবে।
মোটামুটি
সবাই কচুরি তরকারি, সিঙারা
আর ল্যাংচা খেলো। কাল
আইবুড়োভাত, মিষ্টি
দুবাড়ির লোকই কলকাতা থেকে নিয়ে এসেছে, এখান থেকেও বেশ কিছু নেওয়া হল।
-রাহুল আর বেশি থামাথামি নয়, পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
আরও দু-এক জায়গায় নেমে শুধু চা-ই খাওয়া হল, তারপর চলে
এল রাঙামাটির
পথ পুরুলিয়া। এতটা রাস্তা এসে বয়স্ক লোকেদের বেশ কষ্ট হল। ওখানে পৌঁছে সবাই
খুব খুশি।
-এত সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলে কার না প্রেম
করতে ইচ্ছে করে বলুন মামু?
আমার ভাইটাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।
বলল, রাহুলের
মেজদা রাজেশ।
-না না এখানে তো আমারই মানে প্রেমের ইচ্ছে জেগে উঠছে।
-তা ডেকে দেব নাকি মামিকে?
-মামি কে?
দূর বাবা বউয়ের সাথে আবার প্রেম হয় নাকি?
প্রিন্সিপাল প্রমোদবাবু
সবাইকে ঘরের ব্যবস্থা করে চা আর টোস্টের অর্ডার দিয়ে দিলেন, রাতেরবেলায়
খুব হালকা খাবার, আগামীকাল দুটো অনুষ্ঠান একসাথে, দুবাড়ির
আশীর্বাদ সকাল-বিকেল করে, তারপরে আইবুড়োভাতের
অনুষ্ঠান।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment