বাতায়ন/ঝড়/ছোটোগল্প/৩য় বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩২
ঝড় | ছোটোগল্প
হ.ম. মুরাদ
মিয়া
ঝড়ের
পরে
"রতন দ্বিধা ঝেড়ে ফেলল। দরজা খুলতেই দেখা গেল, এক গর্ভবতী নারী থরথর করে কাঁপছে, কাপড়ে জল লেগে পুরো শরীরে লেপ্টে গেছে। ভয় আর আতঙ্কে তার মুখটা বিবর্ণ হয়ে আছে।"
সন্ধ্যার আলো ম্লান হতে না হতেই আকাশের রং বদলে যেতে লাগল। সোনালি আভা একসময় লালচে হয়ে গেল, তারপর ধূসর, শেষে কালো। যেন বিশাল এক দানব গিলে ফেলছে গোটা আকাশকে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ক্রমেই বেড়ে চলেছে, গাছের পাতাগুলো অস্থির হয়ে কাঁপছে। গ্রামের মানুষ জানে, এক ভয়ংকর ঝড় আসছে।
রতন এসবের তোয়াক্কা না করে
বসে ছিল বারান্দায়। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল দূরে দিগন্তের দিকে। মা বারবার বলে যাচ্ছেন,
-আজ রাতেই ঝড় আসবে,
রতন!
বাইরে যাস না বাবা, তোর বাবার মতো যদি
তোকেও হারিয়ে ফেলি?
রতন একরকম বিরক্ত হয়েই বলল,
-আরে মা! ঝড় কি আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে নাকি? আমি কি বাতাসের ওজনের চেয়েও হালকা?
কথাটা বললেও বুকের ভেতর একটা
অস্বস্তি হচ্ছিল। বাবার কথা মনে পড়ল। দশ বছর আগে এমনই এক রাতে বাবা নৌকা নিয়ে মাছ
ধরতে গিয়েছিলেন, আর ফিরে আসেননি। নদীর
পানি বেড়ে গিয়েছিল, স্রোতের তোড়ে কোথায়
ভেসে গিয়েছিলেন, কেউ জানে না। শুধু
পাওয়া গিয়েছিল উল্টে যাওয়া নৌকাটা, আর কিছু ছেঁড়া জাল।
বাবার মৃত্যুর পর থেকেই
সংসারের হাল ধরতে হয়েছে রতনকে। রিকশা চালিয়ে মা আর ছোটো বোন রুমাকে কোনোভাবে বাঁচিয়ে
রেখেছে এতদিন। আজও ঝড় আসছে, কিন্তু আজ আর সে সেই
ছোট্ট ছেলেটি নেই, যে বাবাকে ফিরে
পাওয়ার জন্য রাতভর কেঁদেছিল।
রাত যত গভীর হচ্ছে, বাতাসের গতি তত ভয়ংকর হয়ে উঠছে। টিনের চাল দমকা হাওয়ায় থরথর
করে কাঁপছে, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি পুরো
ঘরটাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়। মা আর রুমা কাঁথা মুড়ি দিয়ে বসে আছে এককোণে। এমন সময়
বাইরে থেকে একটা কণ্ঠ শোনা গেল—
-বাঁচাও! কেউ
আছ?
রতনের গা শিউরে উঠল। এই ঝড়ের
রাতে কে বাইরে? দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেল সে। মা
শক্ত করে হাত চেপে ধরলেন,
-দরজা খুলিস না! তোর বাবাকেও সেদিন এমনি করে রাতে ডেকেছিল
কেউ, ডাক শুনে সে চলে গিয়েছিল...
তারপর আর ফেরেনি!
কিন্তু মানুষের বিপদে মানুষই
পাশে না দাঁড়ালে আর কে দাঁড়াবে? এই ভাবনায় রতন দ্বিধা
ঝেড়ে ফেলল। দরজা খুলতেই দেখা গেল, এক গর্ভবতী নারী থরথর করে কাঁপছে, কাপড়ে জল লেগে পুরো শরীরে লেপ্টে গেছে। ভয় আর আতঙ্কে তার
মুখটা বিবর্ণ হয়ে আছে।
রতন দেরি না করে তাকে ঘরের
ভেতরে নিয়ে এল। মা সঙ্গে সঙ্গে শুকনো কাপড় বের করে দিলেন, রুমা গরম পানি নিয়ে এল। মেয়েটির নাম মিনতি, পাশের গ্রাম থেকে এসেছে। তার স্বামী বন্যার পানিতে ভেসে
গেছে, সে প্রাণ বাঁচাতে কোনোরকমে
এখানে এসেছে।
রতনের মনে পড়ল বাবার কথা, সেই একইরকম ঝড়,
একইরকম
হারিয়ে যাওয়া। মানুষের জীবনে ঝড় যেন একটা অভিশাপ! কিন্তু, প্রকৃতির ঝড় আর জীবনের ঝড় কি এক?
ঝড় থেমেছে। বাইরে গিয়ে দেখা
গেল, গোটা গ্রাম তছনছ হয়ে গেছে।
কারো ঘর ভেঙে পড়েছে, কারো ফসলের ক্ষতি
হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, রতনের ঘর অক্ষত! আরও বড়ো আশ্চর্যের ব্যাপার, গত রাতে যখন সবাই
ধ্বংসের আতঙ্কে ছিল, তখন রতনের ঘরে নতুন
এক জীবন জন্ম নিয়েছে। মিনতি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছে। মা হাসতে হাসতে বললেন,
-জানিস ঝড়
ধ্বংস করে, আবার নতুন কিছু গড়েও
তোলে। যেমন আজ মিনতির সন্তানের জন্ম হলো— নতুন জীবনের আলো!
রতন স্তব্ধ হয়ে রইল। সত্যিই
তো! ঝড় মানেই কী কেবল ভয় আর ধ্বংস? নাকি ঝড় আসলে আমাদের
পরীক্ষা করে, শেখায় কীভাবে
নতুনভাবে শুরু করতে হয়?
মিনতি আর তার সন্তান রতনের
ঘরেই রয়ে গেল কিছুদিন। গ্রামের মানুষের সহায়তায় সে নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজতে
লাগল। অন্যদিকে, রতন ভাবতে লাগল, এই জীবনযুদ্ধ কী কেবল তার একার? একদিন রাতে, মা রতনকে ডেকে বললেন,
-বাবার কথা মনে পড়ে রে?
রতন চুপচাপ মাথা ঝুঁকাল। মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে
বললেন,
-তোর বাবা যদি সেদিন ওই বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য না করত, তাহলে কী সে বেঁচে যেত?
রতন কিছু বলল না। মা আবার বললেন,
-ঝড় শুধু ধ্বংস করে না রে, অনেক সময় আমাদের চোখ খুলে দেয়। আজ যদি তুই মিনতিকে সাহায্য না করতি, সে হয়তো বেঁচে থাকত না। তার সন্তানের জন্ম হতো না। তাই ঝড়
মানেই কেবল শেষ না, ঝড় মানে নতুন শুরু।
রতন গভীরভাবে ভাবতে লাগল।
সত্যিই তো! ঝড় মানেই কী কেবল ভয় আর ধ্বংস? নাকি ঝড় আসলে আমাদের পরীক্ষা করে,
শেখায় কীভাবে
নতুনভাবে শুরু করতে হয়?
সমাপ্ত

বাঃ! ভাল লাগল।
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো
ReplyDelete