বাতায়ন/ঝড়/প্রবন্ধ/৩য় বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩২
ঝড়
| প্রবন্ধ
পারমিতা
চ্যাটার্জি
আমরা
নারী
"আজকের যুগের আধুনিকতার সাথে নারীদের এই ইতিহাসগুলো জানাও বিশেষ প্রয়োজন। শুধু শিক্ষা দীক্ষা বা পোশাকে আধুনিক হলেই তাকে আধুনিক বলা চলে না, আধুনিক একজন তখন হবে যখন সে নিজের মনটাকে সম্পূর্ণ সংস্কারমুক্ত করে।"
পড়েছিলাম এক অন্ধকার গহ্বরের অন্তরালে, নারীর কোন অস্তিত্ব তদানীন্তন সমাজকর্তাদের কাছে ছিল এক অবান্তর কথা। নারী তো নারী, তার আবার অস্তিত্ব কী! ভাবতেই তারা অবাক হতেন।
যদি বা রামমোহনের প্রচেষ্টায় সতীদাহ প্রথা বন্ধ হল, তাও-তো থেকে গেল
বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহের
মতন জঘন্য প্রথাগুলি। ছ বছরের শিশুকে বিবাহ দেওয়া হত হয়তো তার পিতা বা দাদুর বয়সি কোন লোকের সাথে, এবার সে বিধবা হলে তার ওপর আরোপ করা হত বিধবার কঠোর
নিয়মকানুন। একটি শিশুকে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপে একফোঁটা জল পর্যন্ত খেতে না দিয়ে তাকে
মৃত্যুমুখে ফেলে দেওয়ার উদাহরণ বহু আছে। একবার একটি
তিন বছরের বিধবা শিশুকে তার পিতা তালা বন্ধ করে ঘরে বন্দি করে রাখেন,
পাছে জননী তার মুখে জল দিয়ে দেন, পরদিন তালা খোলার পর দেখা যায়
শিশুটির প্রাণহীন দেহ নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে ঘরের মেঝেতে।
বহুবিবাহ
ছিল আরও নারকীয়, কুলীন
ব্রাহ্মণদের একটি পেশাই ছিল বিয়ে করে বেড়ানো, একেকজনের তিনশো বা তার থেকেও বেশি
বিবাহর উল্লেখ পাওয়া যায়,
তারা বিয়ে করে কন্যার পিতার কৌলীন্য রক্ষা করত। দরদস্তুর করে
দানসামগ্রী নিয়ে একজায়গায় বিয়ে করে একরাত কাটিয়ে আবার পরবর্তী নম্বর শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হতেন। একটি ফুলের মতন কিশোরীকে হয়তো রাত কাটাতে হত এক
অতি বৃদ্ধের সাথে,
কখন যে মেয়েটি বিধবা হয়ে যায় সে জানতেও পারে না, হয়তো তার স্বামী বা বিবাহের কিছু
মনেও নেই, কিন্তু
তাকে সারাজীবন পালন করে যেতে হত কঠোর বৈধব্য। খাওয়াপরার কোন সংস্থান থাকত না। এর-ওর বাড়িতে ঘুরে বোঝাতে
হত, শিক্ষা তো দূরের কথা, বই হাত লাগলেই তাদের বহু লাঞ্ছনা ও
অপমানে জর্জরিত করা হত। বারান্দা, উঠোন, বা ছাদে ওঠা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
নারীদের এই
অবস্থা থেকে বার করে আনার জন্য প্রথম পদক্ষেপ নেন বিদ্যাসাগর। তখনকার হিন্দু
সমাজপতিদের বিরুদ্ধে গিয়ে এই যুদ্ধ চালানো বড়ো সহজ কথা ছিল না। কিন্তু বিদ্যাসাগর
তার অদম্য পরিশ্রম ও যুক্তি দিয়ে নারীদের আলোর দিশা দেখিয়ে ছিলেন, তাঁর
প্রচেষ্টার ফলে বিধবাবিবাহ প্রচলন, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব
হয়েছিল। নারীদের শিক্ষার প্রসার দিকেদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। কলকাতায় প্রথম
প্রতিষ্ঠিত হল বেথুন স্কুল। গ্রামে গ্রামে কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা বিদ্যাসাগর
স্থাপন করেছিলেন বহু বালিকা বিদ্যালয়।
কিন্তু
বিদ্যাসাগরের এই শ্রম ও প্রচেষ্টা হয়তো তার মৃত্যুর পর থেমে যেত যদি-না ব্রাহ্ম সমাজের কিছু সমাজ যোদ্ধা এবং পরবর্তীকালে ঠাকুর পরিবারের কিছু
মহীয়সী নারী এগিয়ে এসে এর হাল ধরতেন।
এই সামাজিক
যোদ্ধার এক অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন দূর্গামোহন দাস, তার দুই কন্যা অবলা বসু এবং সরলা
রায়।
আজ আমি
দূর্গামোহন দাস সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করব। বিশেষ করে আমরা নারীরা যাঁদের শ্রম ও
অদম্য প্রয়াসের দ্বারা প্রবল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের হাত থেকে বেরিয়ে এসে ক্রমশ
স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে গেছি তাঁদের সম্পর্কে জানার বিশেষ প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
হিন্দু সমাজের প্রবল সংস্কারের মধ্যে থেকে এ লড়াই চালিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব বলে
এসময়ে অনেকে ব্রাহ্ম সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়ে নারী স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেন।
এঁদের মধ্যে দূর্গামোহন দাস ও তাঁর দুই কন্যার নাম বিশেষ প্রসিদ্ধ, কিন্তু
দূর্গামোহনের নামটির সাথে এখন অনেকেই অপরিচিত, তাই আজ আমি এই মহান ব্যক্তির জীবন
পর্যালোচনা করার চেষ্টা করছি।
সমাজ
সংস্কারক হিসেবে দূর্গামোহন দাস নামটি অনেকেরই কাছে বেশ অপরিচিত। তাঁর বাবার নাম
কাশীশ্বর দাস, বরিশালের
সরকারি উকিল ছিলেন। তাঁর অপর দুই ভাইয়ের নাম কালীমোহন দাস এবং ভুবন মোহন দাস। ভুবন মোহন দাসের পুত্র
ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস।
দূর্গামোহন
দাস জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪১ খৃষ্টাব্দে। তিনি মূলত ব্রাহ্ম সমাজের একজন স্বনামধন্য
নেতা ও ততকালীন সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একজন সামাজিক যোদ্ধা হিসেবে
পরিচিতি লাভ করেন। তিনি বিধবাবিবাহের একজন অন্যতম কর্ণধার
ছিলেন। তাঁর নিজের দ্বিতীয়া স্ত্রী একজন বিধবা ছিলেন হেমন্তশশী সেন। যাঁর পুত্র ছিলেন বিখ্যাত গীতিকার অতুল প্রসাদ সেন।
তাঁর প্রথমা
স্ত্রীর নাম ব্রহ্মময়ী দেবী যিনি তিন পুত্র
এবং তিন কন্যা সন্তানের জননী ছিলেন। তাঁদের দ্বিতীয়া কন্যা লেডি অবলা বসু বিখ্যাত
বৈজ্ঞানিক জগদীশ চন্দ্র বসুর স্ত্রী ছিলেন। আর
তৃতীয়া কন্যা ছিলেন সরলা রায়। এঁরা বহু বিধবাকে পুনঃবিবাহ দেবার জন্য অগ্রণী
ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং স্ত্রী স্বাধীনতা, নারী শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে
উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন।
দূর্গামোহন
খুব অল্প বয়েসেই মাতৃহারা হন। তিনি প্রথমে তাঁর পিতার কর্মস্থলে একটি ইংরেজি
মাধ্যম স্কুলে বরিশালে পড়াশোনা আরম্ভ করেন। তারপর স্কলারশিপ নিয়ে কলকাতায় হিন্দু
কলেজে পড়তে আরম্ভ করেন। এরপর সিনিয়র স্কলারশিপ নিয়ে ঢাকায় যান প্রেসিডেন্সি কলেজে।
এই প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়বার সময় তিনি ইতিহাসের প্রফেসর এডওয়ার্ড কাওলি এবং খৃষ্ট
ধর্মের প্রতি গভীর আসক্ত হয়ে পড়েন। এইসময় স্ত্রী ব্রহ্মময়ী দেবী ও তাঁদের
সন্তানদের নিয়ে আসেন এবং তাদের সম্মতিতে খৃষ্টধর্ম দীক্ষিত হন। ফলস্বরূপ
তিনি তাঁর বাবার বাড়ি থেকে বহিস্কৃত হন। সেইসময় ল পাশ করে কলকাতার কোর্টে
প্র্যাকটিস আরম্ভ করেন। কিন্তু কলকাতায় থেকে খরচ কুলোতে না পেরে আবার বরিশালে ফিরে
যাবার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময় তাঁর বড়োভাই কালীমোহন দাস বরিশাল কোর্টে প্র্যাকটিস
করতেন যিনি পরবর্তী সময় কলকাতা হাইকোর্টে এক বিখ্যাত উকিল হিসেবে পরিচিতি লাভ
করেন।
বরিশালে
দূর্গামোহন সপরিবারে আসার পর বড়ো ভাই কালীমোহন দাস তাঁদের আশ্রয় দেন। সেইসময়
কালীমোহন দাসের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ব্রাহ্ম
সমাজের সাথে একাত্ম হয়ে যুক্ত হন। তিনি এবং
তাঁর কয়েকজন বন্ধু মিলে বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজ গড়ে তোলেন।
কলকাতা থেকে
বেশ কিছু ব্রাহ্ম সমাজের উদীয়মান এবং আধুনিক মনস্ক মানুষকে নিয়ে আসেন বরিশালে, যাঁদের
সমৃদ্ধ বক্তৃতায় বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজের প্রভাবে পড়ে। বেশির ভাগ বক্তব্যের মধ্যে ততকালীন নারীদের আলোকিত করার কথা থাকে, নারী শিক্ষা, নারী
স্বাধীনতা, বাল্যবিবাহ
রোধ, বহুবিবাহ
ও কৌলীন্য প্রথা রোধ এবং বিধবাবিবাহের প্রচলন করার কথা থাকে। প্রথম
স্ত্রী বিয়োগের পর তিনি নিজেও হেমন্তশশী সেনকে বিবাহ করেন
পুত্র অতুল প্রসাদ সেনকে সমেত।
নারীদের
শিক্ষাই ছিল মূল লক্ষ্য। শিক্ষার আলোকে নারী
জাগরণের ক্ষেত্রে বরিশাল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। তিনি নিজেও বিভিন্ন সভা
সমিতি ও উত্সবের মধ্য দিয়ে শীঘ্রই বরিশালকে ব্রাহ্ম সমাজের কেন্দ্র করে তোলেন।
বিদ্যাসাগর প্রথম
মানুষ যিনি নারীদের এই অন্ধকার জীবন নিয়ে ততকালীন সমাজের সমাজপতিদের সম্পূর্ণ
বিরুদ্ধে গিয়ে নারী শিক্ষা প্রসার করেন, ড্রিংক ওয়াটার বেথুনের সাহায্যে
বেথুন স্কুল স্থাপন করেন এবং গ্রামে গ্রামে গিয়ে নারীদের শিক্ষার জন্য বহু মডেল
স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁরই একক প্রচেষ্টায় বিধবাবিবাহের প্রচলন, বহুবিবাহ ও
বাল্যবিবাহ রোধ করেন। পরবর্তীকালে ব্রাহ্ম সমাজ ও ঠাকুর পরিবারের কয়েকজন অসামান্য
মহিলার হাত ধরে নারীরা ক্রমশ প্রগতির পথে এগিয়ে চলে।
কিন্তু
ততকালীন প্রখর সংস্কারে আবদ্ধ সমাজে এই বিধবাবিবাহ প্রচলন করা কি এতোই সহজ ছিল? তা তো নয়
তাঁকেও প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তবুও তিনি দমে না গিয়ে সিদ্ধান্তে
অটল থেকে সমাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গিয়েছেন। বিদ্যাসাগরের পরে দূর্গামোহন একজন
ব্যক্তি যিনি সমাজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুক্তি ও তর্কে জর্জরিত হয়ে এই লড়াই চালিয়ে
গিয়েছিলেন। তিনি এবং তাঁর কয়েকজন বন্ধু মিলে নিজস্ব অর্থ দিয়ে বিধবাবিবাহে ইচ্ছুক
যারা ছিলেন তাদের বিবাহ দেন। এমনকি তিনি তাঁর নিজের অত্যন্ত অল্পবয়সী সৎমাকেও তাঁর বন্ধুর সাথে
বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেন। এরপর তিনি সম্পূর্ণ ভাবে সমাজচ্যুত হন। তাঁর
রোজগারও প্রায় বন্ধ হবার মুখে কারণ মানুষ তাঁকে ত্যাগ করেছিল। বিদ্যাসাগরের পর
খুব কম মানুষকেই বিধবাবিবাহ নিয়ে দূর্গামোহনের মতন এমন সোচ্চার হতে দেখা যায়। সেইসময়
দূর্গামোহন দাস বরিশাল থেকে কলকাতায় আসেন কারণ বরিশালে তিনি সমাজচ্যুত হন ফলে
রোজগার করা আর সম্ভব হচ্ছিল না। কলকাতায় ঠিক সেইসময় জমিদার রাজচন্দ্র রায় ব্রাহ্ম
সমাজে যোগ দিয়ে আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তোলেন। সেইসময় সম্ভ্রান্ত পরিবারের
মহিলারা বাইরে বেরতেন না। তাঁরা নারীদের এই পর্দানশিন প্রথার একদম বিপক্ষে ছিলেন।
তাই তাঁরা তাঁদের স্ত্রীদের নিয়ে ইংরেজ কমিশনার বাড়িতে যান, ফলস্বরূপ যা
হয়, সমাজে
প্রচণ্ড আলোড়নের
সৃষ্টি হয়। সব কিছুকে উপেক্ষা করে তাঁদের স্ত্রীদের নিয়ে তাঁরা বাইরে বেরোতে আরম্ভ
করেন।
দূর্গামোহন
দাস এইসময় বরিশাল থেকে কলকাতা হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করতে আরম্ভ করেন, একই সময়
দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি যিনি আর একজন নারীমুক্তি আন্দোলনকারীর এক অন্যতম যোদ্ধা ছিলেন, তিনি ঢাকা থেকে
কলকাতায় আসেন তাঁর প্রকাশিত সংবাদপত্র অবলাবান্ধবকে সাথে করে। রাজানাথ রায়ের মতন
কিছু নব্য সদস্য মহিলাদের পর্দানশিন করার বিপক্ষে জোরদার আন্দোলন শুরু করেন কিন্তু
তখনও তাঁরা এই প্রথায় সফলতা লাভ করতে পারেননি। মহিলাদের সেই চিকের
আড়ালেই বসতে হত। এরপর তাঁরা তাঁদের স্ত্রীদের নিয়ে নিয়মিত বাইরে বেড়িয়ে এই প্রথাকে
লঙ্ঘন করতে থাকেন, অবশেষে
তাঁরা সফল হন, ব্রাহ্ম
মহিলারা বাইরে বেরোবার অনুমতি পান।
মিস
অ্যানেটি একরয়েড নামে এক বিদেশি মহিলা কলকাতায়
মেয়েদের জন্য একটি বোর্ডিং স্কুল খোলার জন্যে চেষ্টা করেন, তখন
দূর্গামোহন দাস তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে বোর্ডিং স্কুল স্থাপন করার জন্য
সার্বিকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। পরবর্তীকালে বেথুন স্কুলের সাথে সংযুক্ত
হয়ে যায়। দূর্গামোনের কন্যা সম্ভবত প্রথম ব্যাচেই এই স্কুল থেকে পাশ করে
উচ্চশিক্ষার দিকে অগ্রসর হন। প্রচন্ড
আধুনিক ও প্রগতিশীল মনোভাবের মানুষ দূর্গামোহনের দূরত্ব বাড়তে থাকে ব্রাহ্ম সমাজের
পুরানো পন্থিদের সাথে।
এসময় মানে
১৮৭৮ সালে তিনি নিজের অর্থে গড়ে তোলেন সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ। এই
সমাজের সভাপতি হয়ে সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৮৮৮ সালে তিনি ইংল্যান্ড যান এবং ফিরে আসেন অসুস্থ শরীরে। তখন তিনি বড়োই একা হয়ে
পরলেন। তাঁর তিন পুত্র তখন সফল ব্যারিস্টার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত আর দুই কন্যা
বিবাহিত। এই একাকী জীবনে তিনি বিবাহ করেন ঢাকার বিখ্যাত সমাজ সংস্কারক এবং
প্রগতিশীল পরিবারের কালীনারায়ণ গুপ্তের বিধবা কন্যা হেমন্তশশী সেনকে যিনি প্রখ্যাত
গীতিকার অতুল প্রসাদ সেনের মা ছিলেন।
এরপর বার্ধক্য জনিত কারণে ১৮৯৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
বিদ্যাসুন্দরের
নারী স্বাধীনতার জন্য প্রবল সংগ্রাম এবং নারীকে অন্ধকার কূপ থেকে বার করে এনে
শিক্ষা ও আধুনিকতার আলোকে উদ্ভাসিত করার সমস্ত
সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে যে যুদ্ধ তিনি করেছিলেন তা হয়তো বিফল হয়ে যেত যদি না
দূর্গামোহনের মতন এমন প্রগতিশীল ও আধুনিক মনস্কের কিছু মানুষ ব্রাহ্ম সমাজে
থাকতেন। পূর্ববাংলা তথা ঢাকা, বরিশাল এইসব জায়গায় নারীশিক্ষার উন্মেষ ও স্বাধীনতার দরজা
খুলে দেওয়ার জন্য দূর্গামোহন দাসের নামই আসে। অবশ্যই তাঁর সাথে অনেক উন্নত মনস্কের
মানুষ নিশ্চয়ই আছেন কিন্তু দূর্গামোহনের নিরলস প্রচেষ্টা
অনস্বীকার্য।
তাঁর
বংশধরদের মধ্যে যাঁরা বাংলাদেশকে মহিমান্বিত করেছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রথমেই নাম
করতে হয় তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ভুবনময় দাসের পুত্র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের। তাঁর
সন্তানদের মধ্যে যাঁরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন তাঁরা
হলেন সতীশ রঞ্জন দাস, অবলা বসু যিনি বৈজ্ঞানিক জগদীশ চন্দ্র বসুর পত্নী ছিলেন এবং
সরলা রায়। অবলা বসু অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। তিনিই সম্ভবতঃ প্রথম দিকে বেথুন
স্কুল থেকে স্কলারশিপ নিয়ে পাশ করেন। মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার সুযোগ পাননি, মহিলা বলে তাঁকে এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। তাই তিনি চলে যান চেন্নাইতে, সেখানকার
মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা আরম্ভ করেন। মেডিকেল পরীক্ষা দিয়েই তাঁকে অসুস্থতার কারণে
ফিরে আসতে হয়। তিনি অত্যন্ত নারীবাদী ছিলেন এবং শিক্ষা প্রসারের জন্য বহু স্কুল
প্রতিষ্ঠা করেন, বিধবাবিবাহের
ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাঁর অপর বোন ছিলেন সরলা রায়, যিনি
মহিলাদের নৃত্য, সঙ্গীত
প্রভৃতি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যাপারে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর উৎসাহেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মায়ার খেলা নৃত্যনাট্য রচনা করেন। এই নৃত্যনাট্যটি
প্রথম বেথুন স্কুলের স্টেজে অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি গোখলে
মেমোরিয়াল স্কুল এবং কলেজের প্রতিষ্ঠাত্রী ছিলেন। বিদ্যাসাগরের পর বাংলার মেয়েদের
আধুনিকতার পথপ্রদর্শক হিসাবে দূর্গামোহন দাস
এবং তাঁর কন্যাদের নাম অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। সেই সাথে
ব্রাহ্মসমাজ ও ঠাকুর পরিবারের অবদানও কম নয়। আজকের নারীরা যে স্বাধীনতা উপভোগ
করছেন তাঁর পেছনে অনেক ইতিহাস আছে, আছে অনেকের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও
পরিশ্রম।
প্রচণ্ড একগুঁয়ে হিন্দু সমাজপতিদের হাত থেকে মেয়েদের নিদারুণ কষ্ট ও অন্ধকার জীবন
থেকে আলোর জগতে নিয়ে আসার জন্য বিদ্যাসাগর তো প্রথম দিশারি বটেই তার পরবর্তীকালে
ব্রাহ্ম সমাজের কিছু একনিষ্ঠ সমাজ সংস্কারককে অনেক কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল।
আজকের যুগের
আধুনিকতার সাথে নারীদের এই ইতিহাসগুলো জানাও বিশেষ প্রয়োজন। শুধু শিক্ষা দীক্ষা বা
পোশাকে আধুনিক হলেই তাকে আধুনিক বলা চলে না, আধুনিক একজন তখন হবে যখন সে নিজের
মনটাকে সম্পূর্ণ সংস্কারমুক্ত করে। এখনও
গ্রামেগঞ্জে মেয়েরা অনেক মেয়েকেই এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। এখনও
অনেক বাবা-মা মনে করেন মেয়ের পড়াশোনার জন্য বেশি খরচ করার কী প্রয়োজন! তাদের তো বিয়ে দিতে হবে, কিন্তু
মেয়েদের পায়ের তলায় মাটি শক্ত না করে তাদের বিয়ের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেবার ফলে
নারীরা কোথাও কোথাও এখনও অত্যাচারিতা, লাঞ্ছিতা হয়ে যাচ্ছে। তাই সমাজসংস্কারকে
থামিয়ে দিলে চলবে না,
নিঃস্বার্থভাবে এখন কজন সংস্কারককে খুঁজে পাওয়া যাবে, জানি না! মানুষের
মূল্যবোধই নষ্ট হয়ে গেছে সংস্কৃতির নামে এখন চলছে অপসংস্কৃতি। তাই এখন যেন সমাজ
থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে, প্রতিবাদের ভাষাও হারিয়ে ফেলেছে, কিন্তু
সত্যি সমাজ যে দিকে যাচ্ছে তারজন্য অনেক নিঃস্বার্থ সমাজ সংস্কারকদের প্রয়োজন, কিন্তু যুগ
বদলে গেছে, নষ্ট
হয়ে গেছে সততা আর বিশ্বাস। এই ভয়ঙ্কর সামাজিক অবস্থার মধ্যে দিয়েই আমাদের এগিয়ে
যেতে হবে।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment