বাতায়ন/ঝড়/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩২
ঝড় | ধারাবাহিক গল্প
অভীক
মুখোপাধ্যায়
ঝড়
[১ম পর্ব]
"কিন্তু তাকে এমন নগদ পয়সায় কিনতে দেখে সে এমন ঘাবড়ে গেল যে টাকা ফেরত দেবার সময় ভুল করে পঞ্চাশ টাকা বেশি ফেরত দিয়ে ফেলল। বাদল খেয়াল না করলেও ভোলার হিসেব কিন্তু পাক্কা। গম্ভীরভাবে সে পঞ্চাশ টাকার নোটটা কাউন্টারে রেখে বলল..."
ভোলা সামন্তকে আশেপাশের অন্তত গোটা
পাঁচেক গ্রামের মানুষ একজন মহাকেপ্পন আর কুঁদুলে লোক বলে চেনে। কিন্তু ভোলার তাতে
কিছু এসে যায় না। এই বাজারে মিতব্যায়িতা কি খারাপ নাকি? আর ঝগড়াটে বলল তো বয়েই গেল তার। এই বাজারে নিজের
স্বার্থরক্ষার জন্য যদি একটার বদলে একশোটা কথা খরচা করতে হয়, তাতেও সে পিছপা নয়।
স্বাভাবিকভাবেই এই নীতিতে চলার ফলে ভোলার কাছে পয়সার অভাব নেই কিন্তু সেটা সে দেখাতে ভালোবাসে
না। অভাব যে নেই তা নয়, অভাব আছে, একটা পরিবারের। বিয়ে করে সংসার করলে অনেক ঝক্কিঝামেলা, খরচাও প্রচুর, তাই ভোলার আর বিয়েটা করে
ওঠা হয়নি। বাবা চোখ বুজেছে যখন সে ভালো করে হাঁটতে শেখেনি। শহরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা
করার খরচা অনেক, তাই বুড়ি মা-টা গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তারের হাতে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মরে
গেল তাও প্রায় বছরদশেক হয়ে গেল। আর তারপর থেকেই ভোলা একা। তার স্বভাবের জন্য প্রতিবেশীরাও খুব একটা ভালো চোখে
দেখে না আর সেও পাত্তা দেয় না তাদের। পৈতৃক ভিটে আরে তিন-চার বিঘে চাষ জমি আঁকড়ে দিন
কাটে ভোলার।
সাগর থেকে তাদের গ্রাম খুব বেশি দূরে নয়, গ্রামের পাশের ছোট্ট
নদীটা জোয়ারের সময় নোনা জলে ভরে ওঠে, নদীবাঁধ ভেঙে মাঝে মাঝেই সেই নোনা জল ঢুকে চাষের খেত নষ্ট করে।
অনেকে আবার নালা কেটে নোনা জল টেনে চিংড়ির চাষ শুরু করেছে ইদানীং। ভোলার জমি নদীর খুব কাছে। চিংড়ি ব্যবসার দালালরা খুব যাতায়াত শুরু করেছিল তার
কাছে, মোটা টাকার লোভও দেখিয়েছিল। গ্রামের সবাই ভেবেছিল টাকার লোভে ভোলা চিংড়ির চাষেই
মন দেবে নিশ্চিত। কিন্তু তারা ভোলাকে ভুল ভেবেছিল। ভোলা কেপ্পন হতে পারে
অর্থপিশাচ নয়। যে মাটি এতদিন তার অন্নসংস্থান করেছে সেই জমিকে সওদা করতে রাজি হয়নি ভোলা দুটো বাড়তি
পয়সার
বিনিময়ে।
দালালের দলের পেছনে যে রাজনৈতিক নেতারা আর তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা ছিল তাদের বিস্তর সাধাসাধি, হুমকিতেও ভোলা অনড়
থেকে গেছে নিজের মতে। আর তাতে যা হবার তাই হয়েছে, রাজনৈতিক নেতাদের কুনজরে বাস্তবিকভাবেই একঘরে
হয়ে গেছে সে। তাতে অবশ্য তার কিছু যায় আসে না খালি একটা ব্যাপারে সে বড্ড ফেঁসে গেছে।
নেতা বা দাদাদের কৃপাদৃষ্টি না থাকায় সরকারি আবাস যোজনার সুবিধেটা সে আর পেয়ে উঠছে না, স্থানীয় পঞ্চায়েত, বিডিও অফিস, কিছুই বাদ রাখেনি সে, কিন্তু তার ফাইল আগে
আর এগোয়নি।
তা এ হেন ভোলা, খুব খুশমেজাজে রয়েছে।
এতটাই খুশমেজাজে যে স্টেশান বাজারে গিয়ে মিষ্টির দোকান থেকে এক প্লেট কচুরি খেল সঙ্গে আবার দুটো জিলিপি। শুধু কী তাই! বাজারের সব থেকে বড়ো জামাকাপড়ের
দোকান সুবেশা থেকে একসেট নতুন ফতুয়া আর পাজামাও কিনে ফেলল নগদ টাকায়। এমনিতে সে অযথা জামাকাপড় কেনাকে বাহুল্য বলেই মনে
করে। প্রত্যেকবার পুজোর ঠিক আগে একবার করে উজিয়ে কোলকাতা গিয়ে কোন এক সূত্র থেকে পুরনো জামাকাপড় জোগাড়
করে আনে একদম ফ্রিতে। অবশ্য যাতায়াতের রাহা খরচাটা উশুল করতে পরের দিনদুয়েক প্রায় না
খেয়েই কাটিয়ে দেয়। সেই ভোলা দোকান থেকে নগদে নতুন জামাকাপড় কিনছে তাও আবার কোন কারণ ছাড়াই।
সকাল সকাল ভোলাকে ঢুকতে দেখেই সুবেশার মালিক বাদল মাইতির মেজাজটা গেছিল গরম হয়ে। বউনির সময়
কে আর ভোলার মতো খদ্দের চাইবে? কিন্তু তাকে এমন নগদ পয়সায় কিনতে দেখে সে এমন ঘাবড়ে গেল যে টাকা
ফেরত দেবার সময় ভুল করে পঞ্চাশ টাকা বেশি ফেরত দিয়ে ফেলল। বাদল খেয়াল না করলেও ভোলার হিসেব কিন্তু
পাক্কা। গম্ভীরভাবে সে পঞ্চাশ টাকার নোটটা কাউন্টারে রেখে বলল,
-কী হল আপনার বাদল বাবু? একটু দেখেশুনে হিসেব
করুন, না হলে তো ব্যবসায় লালবাতি জ্বলতে সময় লাগবে না।
বলতে বলতেই নতুন জামার
প্যাকেটটা নিয়ে সে হাঁটা লাগাল। বাদল মাইতি তখনও হাঁ করে বসে, কী উত্তর দেবে ভেবে
ওঠার আগেই ভোলা দোকানের বাইরে।
তা না হয় হল, কিন্তু ভোলার এই
অস্বাভাবিক ব্যবহারের কারণটা কী? বিয়েটিয়ে করছে নাকি? কথায় বলে না খবর নাকি হাওয়ার আগে ছোটে। আর হলও
তাই। বাজার থেকে ভোলা নিজের পাড়া পর্যন্ত এসে পৌঁছয়নি খবর এসে গেছে পাড়ার মোড়ের শ্যামল দাসের চায়ের দোকানে। পাড়ার যত ছেলেবুড়োদের
দিনভর আড্ডা সেই দোকানে। ভোলা পারতপক্ষে এই দোকান এড়িয়ে চলে। তাকে দেখলেই নানারকম
টীকাটিপ্পনী করে সবাই, বিরক্ত লাগে ভোলার। আরে বাবা ভোলা কী তোদের খায় না পরে? নিজেদের চরকায় তেল
দেগে না বাপু। আসলে ওরা সবাই ভোলাকে
হিংসে করে, ভোলা যে তোফা আছে তাতে ওদের গা জ্বলে। তা সেই চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে যেতে যেতে ভোলা আড় চোখে লক্ষ্য করল
যে সব কাজ থামিয়ে চায়ের দোকানের সবাই মায় শ্যামল পর্যন্ত ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে
আছে তার দিকে থুড়ি তার হাতের প্যাকেটটার দিকে। কেন রে? প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ দেখিসনি
কখনও? যা না নিজেদের চরকায় তেল দে না! অন্যদিন হলে দু-চারটে কথা শুনিয়েই দিত হয়তো, কিন্তু না, আজ নয়, এই সব ফালতু কাজে
একদম সময় নষ্ট নয়, মেলা কাজ করতে হবে এখন। নিজের মনেই একটু মুচকি হেসে বাড়ির দিকে
হাঁটা লাগায় ভোলা। ওদিকে চায়ের দোকানে সবাই যেন স্ট্যাচু হয়ে গেছে। শ্যামল সদ্য তৈরি
চা ঢালছিল ফ্লাস্কে, ফ্লাস্ক উপচে হাতে গরম চা পড়তেই চটকা ভাঙে। আর তার সঙ্গে আর সবার। সবাই এর-ওর মুখের দিকে
তাকায়। তারা ঠিক দেখল তো? সূর্য কোন দিকে উঠেছে আজ? শ্যামল দোকানের বাইরে উঁকি
মারে
আকাশের
দিকে। কিন্তু আকাশ তো ঘোর করে রয়েছে, সূর্যই তো ওঠেনি আজ। ঝড় আসছে, টিভি, রেডিয়োতে বলছে একটা ঘূর্ণিঝড়
আসছে, শুধু কী টিভি, রেডিয়ো? পঞ্চায়েত, পুলিশ সবাই উঠে পড়ে লেগেছে।
সাইক্লোন এই সাগরে নতুন নয়, কিন্তু গতবারের সুপার সাইক্লোনে তছনছ হয়ে গেছিল গ্রামের
পর গ্রাম। এবার তাই প্রশাসন খুব সতর্ক। পুলিশও গত কয়েকদিন থেকে মাইকিং করে যাচ্ছে
লাগাতার। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাষ অনুযায়ী রাত দেড়টা-দুটো নাগাদ ল্যান্ডফল হবে ঝড়ের, আর সেই জায়গাটা তাদের
গ্রাম থেকে খুব বেশি দূরে নয়। বৃষ্টিও শুরু হয়ে যাবে আগে থেকেই। আবহাওয়া
দপ্তরের ভবিষ্যৎবাণী সত্যি করে গতকাল দুপুর থেকেই আকাশের মুখ ভার। সকাল থেকে হাওয়ার
জোরও বাড়ছে। শ্যামল ঠিক করেছে, বিকেলবেলা আর খুলবে না দোকান আজ, যতটা সম্ভব জিনিসপত্র
গুছিয়ে নিয়ে চলে যাবে দোকান বন্ধের সময়, রিস্ক নিয়ে লাভ নেই, জায়গাটা বেশ নিচু, কী হয় তার ঠিক নেই। বিকেলবেলাতেই পুরো
পরিবার নিয়ে চলে যেতে হবে কাছের রেস্কিউ শেল্টারে, প্রশাসন চায় না ঝড়ে জীবনহানি হোক একটাও।
ক্রমশ…
No comments:
Post a Comment