
বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/২য় সংখ্যা/৫ই বৈশাখ, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
অভীক
মুখোপাধ্যায়
ঝড়
[২য় পর্ব]
"সাইক্লোন শেষ মুহূর্তে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেছে উড়িষ্যার দিকে। কোনরকম কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই। শুধু ভোলার নড়বড়ে বাড়ি সহ্য করতে পারেনি বৃষ্টির অভিঘাত। ধ্বসে যাওয়া বাড়ির কাদায় মাখামাখি উঠোনে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে ভোলা। ঝড় এসেছিল, শুধু তার বাড়ির ওপর দিয়ে।"
পূর্বানুবৃত্তি হাড়কিপটে ভোলা নিজের জামাকাপড়ের পিছনেও টাকা খরচ করতে রাজি না। খরচ না করার কারণে
গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তারের হাতে প্রায় বিনা চিকিৎসায়। নিজে বিয়ে করেনি খরচের কারণেই।
সাগরের কাছে তাদের কুঁড়ে। সেই ভোলা হঠাৎ খোশমেজাজে একসেট জামাকাপড় কিনে ফেলল। তারপর…
এদিকে বাড়িতে ঢুকে ভোলাও গোছগাছ
শুরু করে দিয়েছে। তাজ্জব ব্যাপার! গত ঝড়ে যখন তছনছ হয়ে গেছিল তাদের সারা গ্রাম, তখনো এই ভিটে আঁকড়ে পড়েছিল যে ভোলা, সে কিনা আগে থেকে
গোছগাছ করছে? এও কি সম্ভব? তাও না হয় মানা গেল, কিন্তু তার গোছগাছ করার মতো আছেটা কী? আছে আছে, ঘরের চালের বাঁশের ফাঁকে প্লাস্টিকে
মোড়া, খাটিয়ার ওপর পাতা কম্বলের ভাঁজে, মুড়ির টিনে বান্ডিল করে রাখা। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ, টাকা, নগদ টাকা। তিল তিল করে জমানো টাকা, তা কিছু নাহক কমপক্ষে
হাজার পনেরো তো হবেই, বেশি হলেও অবাকের কিছুই নেই। সব কিছু তো গুছিয়ে নিতে হবে, ফেলে গেলে যদি কিছু হয়ে যায়! ভোলার তো
এতে খুশি হবার কথা নয়, রেস্কিউ শেল্টারে যদি সবাই জেনে যায় তার টাকার কথা, রিস্ক তো প্রচুর। কিন্তু ভোলা তো বেজায় খুশমেজাজে। কারণটা কী?
আসল ব্যাপারটা অন্য। গত কয়েক বছর
ধরেই ভোলা চেষ্টায় আছে আবাস যোজনার টাকায় একটা নতুন বাড়ির, কিন্তু পলিটিকাল নেতাদের ষড়যন্ত্রে
কিছুতেই হচ্ছিল না সেটা। কিন্তু এই ঝড় তার সামনে একটা অভাবনীয় সুযোগ এনে দিয়েছে। এই ঝড়ে কিছু
এদিক-ওদিক হলেই, ত্রাণের টাকায় সরকারি খরচে নতুন বাড়ি। এক্কেবারে পড়ে পাওয়া চোদ্দোআনা। ঝড়ের খবরটা পাওয়ার
পরেই
মাথায়
খেলে গেছে বুদ্ধিটা, এদিক-ওদিক বাঁশের ঠেকনাগুলো একটু একটু করে আলগা করে দিয়েছে ভোলা
রাতারাতি। ঝড় এলে আর দেখতে হবে না। আর ঝড় চলে গেলেই...। নতুন বাড়ি, উফফফ... ভাবতেই পারে
না ভোলা, তার এতদিনের স্বপ্ন... বিনা খরচায় নতুন বাড়ি।
বেলা বাড়তে না বাড়তেই আকাশের মুখ
আরও ভার, হাওয়ার বেগও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। গ্রামের সকলের মুখেই প্রবল উদ্বেগের ছায়া। যে যার মতো জরুরি
জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত, দিনের আলো থাকতে থাকতেই পৌঁছে যেতে হবে স্থানীয় ইস্কুলের
অস্থায়ী শেল্টারে। গোরু ছাগল মুরগিও নিয়ে যেতে হবে, পশুগুলোকেও তো ফেলে
যাওয়া যায় না।
বেলা একটা নাগাদ, ডিসাস্টার
ম্যানেজমেন্টের জওয়ানরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঘর খালি করানো শুরু করল। ভোলার বাড়িও বাদ গেল না। কিন্তু
কোথায় ভোলা? তার নড়বড়ে ঘরের আরো নড়বড়ে দরজায় এত্তবড় তালা ঝুলছে। সবার আগে সে পৌঁছে গেছে স্কুলবাড়ির রেস্কিউ শেল্টারে।
দেখতে দেখতে সন্ধে হয়ে গেল, শেল্টার উপচে পড়ছে ভিড়ে, বড়ো বড়ো
ক্লাসরুমগুলোতে মানুষ আর পশুর সহাবস্থান। প্রথমে আসার সুবাদে, ভোলা দোতলার একদম এক
কোণে বেশ ভালো একটা জায়গা দখল করেছে। আশেপাশে যারা আছে তারা ভোলাকে চেনে ভালো করেই, তাই তাকে ঘাঁটায়ওনি
কেউ। ফলে তোফা আছে সে। দাতব্য সমাজসেবী সংস্থার দেওয়া ফ্রি শুকনো খাবারের প্যাকেটের সদব্যবহার করতে করতে সে
অপেক্ষায় আছে সাইক্লোনের। উৎকর্ণ হয়ে আছে ঝড়ের সেই শোঁ শোঁ
শব্দের জন্য। সন্ধে গড়িয়ে রাত এল। বৃষ্টির তোড় বেড়েছে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে
হাওয়ার বেগ। দমকা হাওয়ায় মাঝে মাঝেই কেঁপে উঠছে ক্লাসঘরের জানলাগুলো। ঘরের ভেতরে মানুষগুলো আতঙ্কে শিউরে উঠছে
প্রতিবার। খালি ভোলার মুখে আবছা হাসি ফুটে উঠছে প্রতিবার। আসছে আসছে ঝড়ের পিঠে চেপে তার নতুন বাড়ি আসছে। নতুন
বাড়ির স্বপ্ন দেখতে দেখতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ল ভোলা।
একদম ভোরের দিকে ঘুমটা ভাঙতেই
ধড়মড় করে উঠে বসে ভোলা। একদম শান্ত বাইরেটা, ঝড়ের শব্দ নেই, বৃষ্টিরও না।
আশেপাশের সব্বাইকে টপকে এক লাফে বাইরে আসে সে। দিনের আলো ফুটে গেছে, নীচের তলা থেকে লোকজন বেরিয়ে যাচ্ছে এক এক করে। অবাক লাগে ভোলার, ঝড় থামল কখন? এক ছুটে নীচে আসে সে, সামনেই এনডিআরএফ-এর এক জওয়ান, তাকেই জিজ্ঞেস করে যা শুনল
তাতে পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল ভোলার। এত বড়ো ধোঁকা খেল সে? টাকার ব্যাগটা আঁকড়ে
ধরে সোজা ছুট লাগায় বাড়ির দিকে।
অনেকক্ষণ পরে সারা পাড়ায় সবাই ঘরে
ফিরে আসে, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সাইক্লোন শেষ মুহূর্তে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেছে উড়িষ্যার
দিকে। কোনরকম কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই। শুধু ভোলার নড়বড়ে বাড়ি সহ্য করতে পারেনি বৃষ্টির
অভিঘাত। ধ্বসে যাওয়া বাড়ির কাদায় মাখামাখি উঠোনে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে ভোলা। ঝড় এসেছিল, শুধু তার বাড়ির ওপর
দিয়ে।
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment