বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/২য় সংখ্যা/৫ই বৈশাখ, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
অর্পিতা
চক্রবর্তী
রক্ষাকবচ
[২য় পর্ব]
"সেদিন ওই ঝড়জলের রাতে আমার সবটুকু কেড়ে নিয়েছিল ওই মহিলা। ওর চোখের দিকে তাকালেই আমি কেমন যেন হয়ে যেতাম। তারপর ও যা বলত আমি তাই করতাম। আমি এসব ইচ্ছা করে করিনি গো, করতেও চাইনি।"
পূর্বানুবৃত্তি বিয়ের পরে অফিস ট্যুরে অরিন্দম
আর সুমি দুজনে দুজায়গার যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মুড অফ। হঠাৎ আকাশ
কালো করে ভয়ংকর ঝড় উঠল। ড্রাইভার গাড়ি
সাইড করল। রাস্তার দুপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢাকা। গাড়ি
থেকে নামতে বারণ করল ড্রাইভার। তারপর…
ইতিমধ্যে ঘটনার তদন্তের স্বার্থে এবং সুমিকে খুঁজে পাওয়ার আশায় পুলিশকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে অরিন্দম। কারণ ঠিক ওই একই জায়গা থেকে চুরি গেছে ওর স্ত্রী সুমি মানে সুস্মিতা। অরিন্দম জানতে পারে গভীর রাতে নাকি কোন একজন মহিলার কন্ঠস্বর শোনা যায় ওই জঙ্গলে। সে এক অদ্ভুত ঘটনা। সেই মহিলা আবার বেশ সুর করে গান গায় আর সেই গান শুনে বেরিয়ে আসে বাড়ির মেয়ে বৌ আর বাচ্চারা। আশ্চর্য তো, কী এমন গান যা শুধু ওদেরকেই আকর্ষন করে? এরপর তারাও আবার নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। ঘটনার আঁচ ক্রমশ পৌঁছে গেছে পুলিশের উপর মহলে। চারিদিকে চলছে তল্লাশি। বিষয়টি দিনদিন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে।
সেদিন জঙ্গলের মধ্যে পুলিশ
ছড়িয়েছিটিয়ে গা ঢাকা দেয়। অরিন্দম পুলিশের নির্দেশে মহিলাদের মতো একটা কাপড়
জড়িয়ে ঘোমটা টেনে এগিয়ে যায়। হঠাৎ ঘোমটার আড়ালে থেকে ও দেখে ওর সুমিকে। সুমি
খানিকটা পাগলের মতো আলুথালু পোশাকে গান গাইতে গাইতে হাঁটছে। অরিন্দম নিজের আবেগকে
বহুকষ্টে সংযত করে নিজের মুখ আড়াল করে পুলিশের নির্দেশ মতো ওর পিছু পিছু চলতে
থাকে। পিছনে বেশ একটু দূরত্বে পুলিশ ফোর্স খুব সন্তর্পণে ওদের ফলো করে এগোতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত ওরা এসে পৌঁছায় একটা পুরোনো ভাঙাচোরা বাড়িতে। সেখানে অনেক মহিলা
আর বাচ্চা কিন্তু সবাই কেমন যেন ঝিমিয়ে আছে। পুলিশ বাহিনী চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে
জায়গাটিকে। ইতিমধ্যে সেই অদ্ভুত দর্শনধারী মহিলা বুঝতে পারেন বিপদ আসন্ন। উনি নিজেকে বাঁচাতে সুমিকে একটা ইট দিয়ে মাথায় সজোরে আঘাত
করে। সুমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। মহিলাটি অবশ্য পালাতে চেয়েও পালাতে পারেনি।
অরিন্দম ততক্ষণে পুলিশের সহায়তায় সুমিকে নিয়ে ছোটে
হাসপাতালে।
এরপর
প্রায় একমাস, সুমি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে
ওঠে। কিন্তু ওই ট্রমা থেকে বেরোতে ওর বেশ অনেকটা সময় লাগে। পুলিশের তৎপরতায় সব মহিলা
এবং বাচ্চারা যে যার ঘরে ফিরে যায়। ওই সাঙ্ঘাতিক মহিলাটিকে
ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে শেষ পর্যন্ত লকআপে ঢোকানো হয়। আপাতত উনি
যাবজ্জীবন জেলেই কাটাবেন।
এই ঘটনার পর প্রায় ছমাস
অতিক্রান্ত। সুমি এখন অনেকটা সুস্থ কিন্তু মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ নয়। ওর
কাউন্সিলিং এখনও চলছে। সেদিন সন্ধ্যায় আবার আকাশ কালো করে কালবৈশাখী ঝড় উঠল।
সুমি ঘরের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বলল,
-অরিন্দম আমাকে একবার সেই জায়গায় নিয়ে যাবে যেখান থেকে
আমার জীবনের সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল।
অরিন্দম কিন্তু এব্যাপারে
সম্পূর্ণ বিরুদ্ধাচারণ করেছিল কিন্তু ডাক্তারের নির্দেশ মতো এবং সুমিকে সুস্থ
জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য ওরা সেখানে রওনা দিল। সঙ্গে ডাক্তার এবং পুলিশ দুজনেই
ওদের ফলো করছিল। যদিও এসবের কিছুই জানত না সুমি। ও শত চেষ্টা করেও সেই রাতের কথা মনে
করতে পারত না।
কোন এক ঝড়জলের রাতে ঠিক সেই জায়গায় সুমি আর অরিন্দম গাড়ি থেকে নেমে হাঁটছে আর ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে
যাচ্ছে সুমি নিজেই। পিছনে পুলিশ ডাক্তার সবাই আছে কিন্তু আড়ালে। একটু দূরেই দেখা
যাচ্ছে সেই মন্দির। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢাকা চারপাশ। সুমি বলল,
-জানো এইখানে ঠিক এইখানেই ছিল ওই পিশাচিনী। ও
সেদিন আমাকে ডাকল, এখানে ঠিক এখানটাতে
বসাল আর আমার গায়ে জলের ছিটে দিল। তারপর থেকে আমি শুধু তাই করেছি যা ও বলেছে। আমি রোজ
রাতে পাগলের মতো ঘুরে ঘুরে গান গাইতাম। জানি না কী সেই গান, অমন গান আমি আগে কখনও গাইনি। আমার সেই অদ্ভুত
গান
শুনে আমাকে অনুসরণ করত ছোটোছোটো বাচ্চারা আর মেয়েরা। এরপর ওরা আমার পিছু পিছু সবাই মিলে ওই দূরের পোড়ো বাড়িটাতে চলে যেত।
অরিন্দম বলল,
-তারপর, তারপর তোমরা ওখানে কী করতে? আর ওই মহিলা ওদের দিয়ে ঠিক কী করাতো?
সুমি
বলল,
-জানি না। আমার কাজ ছিল শুধু এইটুকু। ওখানে ওদের পৌঁছে দিয়ে
আমি আবার সারাটা দিন কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ে থাকতাম। আমি বুঝতাম আমি যা করছি তা
অন্যায় কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারতাম না।
অরিন্দম
বলল,
-কিন্তু তুমি তো ভীষণ প্রতিবাদী মেয়ে তাও এমন কাজ করলে কী করে?
সুমি
বলল,
-জানি না গো, সেদিন ওই ঝড়জলের
রাতে আমার সবটুকু কেড়ে নিয়েছিল ওই মহিলা। ওর চোখের দিকে
তাকালেই আমি কেমন যেন হয়ে যেতাম। তারপর ও যা বলত আমি তাই করতাম। আমি এসব ইচ্ছা
করে করিনি গো, করতেও চাইনি। তুমি
বিশ্বাস করো।
বলতে
বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েছে সুমি। অরিন্দম ওকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। পুলিশ ডাক্তার
সবাই ততক্ষণে স্পটে হাজির হয়েছে।
পুলিশ
অফিসার নিয়োগীবাবু বললেন,
-চিন্তা করবেন না ম্যাডাম, ওই মহিলা আপাতত আমাদের হেফাজতে। আপনার জন্যই ওনার মতো অপরাধী ধরা পড়েছে। আপনাকে
অনেক অনেক ধন্যবাদ। ওর পেট থেকে কথা কী করে বার করতে হয় সেটা আমরা ভালো করেই
জানি।
অরিন্দম
বলল,
-এতগুলো দিন ধরে তুমি তো কিছু মনেই করতে পারছিলে না। তোমার
সাথে ঠিক কী কী হয়েছিল সেদিন তাও তুমি বলতে পারোনি। আজ তোমার
সব মনে পড়েছে। আসল অপরাধী ধরা পড়েছে। আমি আর কিছু চাই না।
এবার আমরা বাড়ি ফিরব। আমরা আর ওসব কথা মনেও রাখব না। আর এ বিষয়ে কোন কথা হবে না।
চলো এবার আমরা রওনা দিই।
সুমি
বলল,
-দাঁড়াও আরও একটা কাজ বাকি আছে।
সবাই
বলল,
-কী কাজ ম্যাডাম?
পুলিশ
অফিসার নিয়োগী বাবু বললেন,
-বলুন ম্যাডাম আর কী করতে হবে?
সুমি
বলল,
-সেদিন এই মন্দির থেকে ওই পিশাচিনী কিছু একটা নেওয়ার
চেষ্টা করেছিল কিন্তু পারেনি। আপনারা এই দেওয়ালটা ভাঙুন তো, আমার মন বলছে এখানে কিছু একটা আছে।
অরিন্দম
বলল,
-কেন, কেন তোমার এমন মনে
হচ্ছে সুমি?
সুমি
বলল,
-জানি না, তবু আমার মন বলছে
এখানে কেউ বন্দি অবস্থায় আছে।
ততক্ষণে
ঝড়বৃষ্টি থেমে গেছে। বাইরে আলো ফুটেছে। আশেপাশের গ্রাম থেকেও কিছু মানুষ এসে জড়ো
হয়েছে। বলতে বলতে সকলের প্রচেষ্টায় ভেঙে পড়ল সেই পাঁচিল। বেরিয়ে আসল শতাব্দী
প্রাচীন অষ্টধাতুর মা দূর্গার মূর্তি। যাকে সুরক্ষিত করে রেখেছিল একটি বিষধর সাপ।
যদিও গ্রামের মানুষ সেই মূর্তি ছাড়তে একেবারেই নারাজ কিন্তু আপাতত ওই মাতৃমূর্তি জমা থাকবে আর্কিয়োলজিকাল ডিপার্টমেন্টে।
কালবৈশাখী ঝড় থেমে গেছে। মা
স্বয়ং সুমির হাত ধরে মুক্ত হয়েছেন। যাকে রক্ষা করেন স্বয়ং মা দূর্গা তার ক্ষতি
করা কোন দানব বা মানবের কর্ম নয়। মা রয়েছেন সুমির অন্তর জুড়ে, ওর চেতনায় অধিষ্ঠান করেছেন স্বয়ং জগত জননী মা দূর্গা।
ওদের রক্ষাকবচ হয়ে।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment