বাতায়ন/মাসিক/ধারাবাহিক
গল্প/৩য় বর্ষ/২০তম সংখ্যা/২০শে ভাদ্র,
১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
শ্রাবণের
ধারার মতন পড়ুক ঝরে
[২য় পর্ব]
"উদিশা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল, সেও যে বৃষ্টি খুব ভালবাসে। উদিশা পাশে দাঁড়াতে রঙ্গন তার কাঁধে একটা হাত দিয়ে আলতো করে নিজের দিকে আকর্ষণ করল। উদিশার সমস্ত শরীর ভাল লাগায় কেঁপে উঠল।"
পূর্বানুবৃত্তি রঙ্গন আর তৃষা একসঙ্গে রিসার্চ করতে করতে বিদেশে সুযোগ পেয়ে রঙ্গনের ভালবাসাকে ফেলে চলে গেল। ভেঙে পড়ল রঙ্গন। তারপর...
রঙ্গন ঘরে ঢুকেই নববিবাহিতা স্ত্রীর দিকে তাকাল। একে তো রূপসী তারপর তাকে এত স্নিগ্ধভাবে সাজানো হয়েছে যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। হাল্কা গোলাপি রংয়ের তাঁতের শাড়ি, সোনার গয়নার ভার কমিয়ে পুরো সাদা বেল আর জুঁই ফুলের গয়না দিয়ে সাজানো হয়েছে। মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। হঠাৎ রঙ্গনের অনেকদিন আগের এরকম একটা কালো মেঘে ঢাকা আকাশের কথা মনে এলো। তাকেও বলেছিল,
-ভালই তো হয়
বৃষ্টি এলে, একটু ভিজব দুজনে।
তৃষার এত
রূপ ছিল না, খুবই সাধারণ চেহারা ছিল। তবু সেই সাধারণ মেয়েটাই তার জীবনটা ওলট-পালট করে
দিয়েছিল। উফ্ আজকের দিনে কেন আবার সে সব কথা মনে আসছে? সে গিয়ে
জানলাটা খুলে দিল বাইরে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ। কিছুক্ষণ সেই বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল উদাস হয়ে। তারপর মনে
হল, সে এ কী করছে? একজন কত আশা
নিয়ে তার কাছে এসেছে আর সে পুরনোদিনের কথা ভাবছে। উদিশার দিকে
তাকিয়ে বলল,
-কী সুন্দর বৃষ্টি পড়ছে একবার এসো এই জানলার কাছে।
উদিশা পায়ে
পায়ে এগিয়ে গেল, সেও যে বৃষ্টি খুব ভালবাসে। উদিশা পাশে
দাঁড়াতে রঙ্গন তার কাঁধে একটা হাত দিয়ে আলতো করে নিজের দিকে আকর্ষণ করল। উদিশার সমস্ত শরীর ভাল লাগায় কেঁপে উঠল। কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল,
-এরকম
বৃষ্টি দেখলেই আমার ভিজতে ইচ্ছে করে।
রঙ্গন
রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল তার কথা শুনে। মনে হল, এই
তো সে মনের মানুষ পেয়ে গেছে। সে আরও গভীরভাবে তাকে কাছে টেনে
নিয়ে বলল,
-তারপর কাল
যদি জ্বর আসে?
-তার জন্য
ওষুধ আছে।
-ওষুধটা কি
আমি?
উদিশা তার
মাথাটা রঙ্গনের কাঁধে এলিয়ে দিয়ে লজ্জিত হেসে বলল,
-হ্যাঁ।
-তারপর কাল
আমি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে পড়ি আর কী? সবাই বলবে
একরাত্রেই বউকে এত আদর করলি যে জ্বর এসে গেল।
উদিশা
লজ্জায় মাথাটা নামিয়ে নিয়ে বলল,
-যাহ্।
রঙ্গন ওকে
দুই বাহু দিয়ে তুলে এনে খাটে বসিয়ে দিয়ে বলল,
-আজ কিন্তু
আমায় একটা গান শোনাতে হবে।
নিজেও তার
পাশে বসল ঘন হয়ে কাছে টেনে নিয়ে বলল,
-এবার গাও।
-এরকম করে
ধরে রাখলে গাইব কী করে?
-তা আমি জানি
না মন। তোমায় আমি মন বলে ডাকব, তোমার আপত্তি
নেই তো?
-সবার সামনে
ডেকো না, তাহলে আমার খুব লজ্জা করবে।
-আমি অত
লুকিয়ে কিছু করতে পারি না।
বলেই মনে হল
জীবনের একটা বিরাট সত্য তো এই সহজ-সরল ভালবাসার
মানুষটার কাছে লুকিয়ে যাচ্ছি। নাহ্
এভাবে আর টানাপোড়েন পাচ্ছি না এবার বলেই দেব। ততক্ষণে উদিশা
গান আরম্ভ করে দিয়েছে— আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালবাসায়
ভোলাব। আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলব না গো গান দিয়ে দ্বার খোলাব…
গান শুনতে-শুনতে রঙ্গন যেন এক অন্য জগতে চলে গিয়েছিল। বিড়বিড় করে বলল,
-সত্যি-সত্যি ভালবাসায় ভরিয়ে রাখবে তো? কোনদিন ফেলে চলে যাবে না তো?
উদিশা ওকে
ঠেলে বলল,
-কী হয়েছে তোমার? কেন এরকম ভাবে বলছ? ছেড়ে চলে যাবার প্রশ্ন উঠছে কেন?
রঙ্গন উঠে
বসে ওর দুটো হাত জড়িয়ে ধরে বলল,
-মন তুমি
আমায় শুধু খুব ভালবেসো আর আমি কিছু চাই না। তোমার সব স্বপ্ন আমি
পূরণ করব। তুমি অসাধারণ গান গাও। আমি
ডুবে গিয়েছিলাম তোমার সুরে। এমফিল নিশ্চয়ই করবে কিন্তু
গানটাও তোমায় চালিয়ে যেতে হবে।
-এত কিছু
করলে আমি সংসারটা কখন করব আর এই অগোছালো মানুষটাকে দেখবই বা কখন?
-তা আমি জানি
না। সংসারে আমার মনে হয় না তোমায় বিশেষ কিছু করতে হবে। সেরকম হলে আমি লোক রেখে দেব কিন্তু গানটা চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে তাহলেই এই
অগোছালো মানুষটাকে তোমার দেখা হয়ে যাবে।
মন আমি
তোমায় কেন জানি না প্রথম দেখেই খুব ভালবেসে ফেলেছিলাম, তাই আমার জীবনের একটা সত্য কথা তোমায় বলব-বলব করেও
বলে উঠতে পারিনি। আমার মনে হয়েছিল এই সত্যটা শোনার পর যদি
তুমি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে
যাকে আমি এত ভালবসি, আর যে আমাকে একদিনের মধ্যেই এত আপন করে
কাছে টেনে নিল, তার কাছ থেকে কোনও কিছু
লুকিয়ে রাখাটা অন্যায়। এতবড় অবিশ্বাসের কাজ তোমার সাথে আমি
করতে পারব না। কিন্তু আমায় কথা দাও সব কিছু শোনার পর আমায়
তুমি কোন ভুল বুঝবে না?
-না বল তোমার
কোন কথায় আমি তোমায় ফেলে চলে যাব না। আমিও যে নিজের
সবটুকু দিয়ে তোমায় ভালবেসেছি। আর যার ভালবাসা এত খাঁটি, কোনও সত্য যে নিজের ভালবাসার মানুষকে লুকিয়ে রাখতে
পারে না, তাকে ফেলে রেখে চলে যাওয়া কি এতই সহজ?
-তুমি আমায়
বাঁচালে মন।
রঙ্গন তার
অতীতের সব কথা বলে গেল তার মনের কাছে। তারপর বলল,
-উফ্
এতক্ষণে আমার ভারমুক্ত হল।
-শুধু আমায় একটা কথা বল, তোমার মনে কি এখনও তার জন্য
ভালবাসা আছে?
-না মন না
তার কোনও অস্তিত্বই আমার কাছে নেই। না আছে
ভালবাসা না আছে ঘৃণা।
-ঠিকই ঘৃণা
থাকলেও বুঝতাম একটু হলেও ভালবাসা এখনও বেঁচে আছে, তা যখন নেই
তাহলে সে তো অতীত। আমরা এখন শুধু ভবিষ্যৎ-এর হাত ধরে এগিয়ে যাব, অতীত নিয়ে আর ভাবব না।
-উফ্ মন তুমি আমার সব গ্লানি মুছে দিলে। সত্যি তো
আমরা এগিয়ে যাব ভবিষ্যৎ-এর পথ ধরে,
তোমার-আমার ভালবাসায় এ সংসারে আসবে নতুন অতিথি।
উদিশা রঙ্গনের বুকে একটা ছোট কিল মারল,
-খালি এই না…
এবার রঙ্গন
তার মনকে বুকে জড়িয়ে ধরে হারিয়ে গেল শ্রাবণের এক নতুন বৃষ্টি ধারায়।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment