প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Monday, September 15, 2025

আগমনি | বীথিকা ঘোষ

বাতায়ন/শারদ/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/২২তম সংখ্যা/১লা আশ্বিন, ১৪৩২
শারদ | ছোটগল্প
বীথিকা ঘোষ
 
আগমনি

"একটি দীর্ঘাঙ্গী কালো সাঁওতাল মেয়ে হাত ঘুরিয়েদেহ বেঁকিয়ে নানা ভঙ্গিতে বিষাক্ত নাগিনীর মতো নাচছে। সেটা ছিল মন্দিরার অভিনয় আর ওর মৃত্যুও হলো বিষাক্ত সাপের কামড়ে। ও তো সারা জীবনের জন্য চলে গেলআমাদের জন্য রেখে গেল বিষাদ সংসার।"


আনন্দি তখনও বিছানায় শুয়ে শুয়েই ভাবছিল, তখনই শুনতে পেল কাদের বাড়ির রেডিওতে "মহিষাসুরমর্দিনী" গান বাজছে। মন্দিরা মহালয়ার গানগুলো খুব ভাল গাইত, "বাজলবাজল তোমার আলোর বেনু।" মহালয়ার গানগুলোও খুব সুন্দর। ও গাইতও খুব ভাল শুধু মহালয়ার গানই নয় অন্যান্য রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল গীতি, রজনীকান্তের গান আরও কতরকম গান, ভজন আসলে ওদের বাড়িতে সবাই গান জানে, লোকে বলত গানের চাষ-ওয়ালা বাড়ি।


মন্দিরাদের বাড়ির শিউলি ফুল গাছটায় প্রচুর ফুল ফুটেছে। প্রতিবার দুর্গাপুজোর সময় আমরা তিন জন একসঙ্গে ফুল তুলতে বেরোতাম। শিলু, আমি আর মন্দিরা তিন জন এক জায়গায় থাকি, একসঙ্গে বড় হয়েছি। ওই যে বলে না গলায় গলায় ভাব, আমাদের তিন জনের তাই ছিল। মন্দিরা অনেক গুণের অধিকারী, নাচ, গান, থিয়েটার, গল্পও লিখত। স্কুলের টিচাররা তো ওকে খুব ভালবাসতেন। ওর মুখে সবসময় হাসি লেগেই থাকত, স্কুলের প্রত্যকটা অনুষ্ঠানে মন্দিরার অবদান থাকত। ওকে ছাড়া কোন অনুষ্ঠান হতোই না, আর একটি অদ্ভুত ব্যাপার ছিল ও কোন কিছুকেই ভয় পেত না। একবার স্কুলে বিজ্ঞান মেলা হবে, সবাই নানারকম প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করছে হঠাৎ হেডটিচার এসে দাঁড়ালেন। মন্দিরা ফিফি করে বল, দেখ হেডমাস্টারমশাইয়ের কানে কত চুল। বলেই হাসতে লাগল, আমরা জানতে চাইলাম চুল থাকলে কী হয়? ও কিছুই বলে না শুধু হাসে, ইতিমধ্যে টিচারদের নজর পড়েছে আমাদের দিকে। ওনারা জানতে চাইছেন,
-অ্যাই তোরা কী নিয়ে কথা বলছিস রে, আমাদের বল। আমরাও শুনি তোরা বিজ্ঞানের কোন দিগন্ত নিয়ে আলোচনা করছিস?
 
আমরা তো কেউ মুখ খুলছি না, টিচাররাও আমাদের থেকে কথা বের করবেনই। হঠাৎ হেডমাস্টামমশাই এগিয়ে এসে মন্দিরার কাছেই জানতে চাইলেন,
-কী ব্যাপার মন্দিরা?
মন্দিরা ফট্ করে বলে বসল,
-আমার কাকিমা বলেছে, যাদের কানে চুল থাকে তাদের চরিত্র ভাল হয় না, আর যাদের হাতের পাতায় তিল থাকে, তাদের কপালে অনেক দুঃখ লেখা আছে। আর যাদের পায়ের পাতায়
-ব্যস ব্যস আর কিছু বলতে হবে না, বুঝতে পেরেছি দুষ্টু মেয়ে জ্যোতিষ চর্চা হচ্ছে! এবার মন দিয়ে ক্লাসের কাজগুলো কর! কাল সন্ধ্যাবেলার প্রোগ্রাম ঠিক মতো তৈরি হয়েছে তো? অনেকে নিমন্ত্রিত আছে, প্রোগ্রাম যেন খুব ভাল হয় সেটা মন দিয়ে দেখ! তা না হলে আমিই তোর কান মলে দেব, বুঝতে পারলি?
বলতে বলতে হেডমাস্টারমশাই মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে বের হয়ে গেলেন। আমরা তো হেডমাস্টারমশাইকে কোন দিন হাসতে দেখিনি, কী গম্ভীর দেখলেই ভয় করে। মন্দিরা কিন্তু কাউকেই ভয় পেত না বলত,
-ভয় পাস কেন? আমরা কি কোন অন্যায় করেছি? অন্যায় করলে নিশ্চয়ই ভয় পাব।
স্কুলের প্রোগ্রাম কিন্তু সত্যিই ভাল হয়েছিল। সেই মন্দিরা আমাদের ছেড়ে চলে গেল কেমন অদ্ভুত ভাবে। গতবছর মাঠে খেলা হচ্ছে ক্রিকেট, সবাই এটা সেটা নিয়ে এসে বসেছে। আমরা তিন জন বসেছিলাম একটি বড় পাথরের উপর। আমাদের মধ্যে টুকটাক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথাও হচ্ছিল, হাসাহাসিও চলছিল। এ ও আসছে যাচ্ছে, কেউ কথা বলছে আবার কেউ সঙ্গে এসে দাঁড়িয়ে থেকে চলেও যাচ্ছে। আমরা আচার, চানাচুর, মুড়ি, লজেন্স নিয়ে এসেছিলাম, খাব আর খেলা দেখব। তাই চলছিল। আমি মুড়ি দিয়ে চানাচুর মাখার পর তিন জনেই খাচ্ছিলাম, সঙ্গে গল্পও চলছিল হঠাৎ মন্দিরা লুটিয়ে পড়ল মাঠের ওপরে। হঠাৎ কী হলো, আমরা কত ডাকাডাকি করলাম ও কোন সাড়া দিল না। নিমেষে ভিড় জমে গেল, খেলা বন্ধ হয়ে গেল। বাড়ির সবাই চলে এল, মন্দিরার দাদা ডাক্তার নিয়ে এল, উনি পরীক্ষা করে বললেন মারা গেছে অনেকক্ষ। মন্দিরার হাতের কবজি তুলে ধরে দেখালেন, সাপের ছোবলের দাগ।
 
সেই ঘটনার পর থেকে সবারই মন খারাপ, এক সঙ্গে জড়ো হই সবাই কিন্তু গল্পের আসর জমে না। ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠ কানে ভেসে আসছে, কিন্তু উঠে যেতে ইচ্ছে করছে না, শিলুও আসেনি। আমার চোখ দিয়ে কোথা থেকে ঝলক ঝলক জল নেমে এল। ঈশ্বরকে অনুযোগ করতে লাগলাম, "কেন মন্দিরাকে এত তাড়াতাড়ি নিয়ে গেলেন?" এই যে পুজো আরম্ভ হয়ে গেল, ও থাকলে কত আনন্দ হত। কীভাবে সাজব, কী শাড়ি বা কোন জামা পড়ব, কোথায় কোথায় ঠাকুর দেখতে যাব। এবার কোন আলোচনাই নেই, সেই আনন্দও নেই। এবার থিয়েটারও হচ্ছে না৷
 
গেলবার হয়েছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা "কালিন্দী" উপন্যাস অবলম্বনে থিয়েটার। মন্দিরা অভিনয় করেছিল সাঁওতাল কন্যা সারির ভূমিকায়। কী দারুণ সুন্দর অভিনয় যে করেছিল, সবাই তো মুগ্ধ। ওই যে কালিন্দী নদীর চরের ধারের জায়গাটা নিয়ে জমিদার ও কল-মালিকদের মামলা-মোকদ্দমার শেষে কল-মালিকরাই জিতে গেল। সেই উপলক্ষে সবাই উৎসবে মেতে উঠলে। অন্ধকার যখন গাঢ় হয়ে এল, দূরের চরের ওপর আলো জ্বলছে। আলোর ঘটা আজ অনেক বেশি, কালিন্দীর শুষ্ক গর্ভে  আলোর সমারোহ, মশালের আলোর মতো আরও দু-তিনটে আলো জ্বলছে যেন রক্তাভ আলো! আলোর চারপাশে ক্ষুদ্র একটি জনতার মধ্যস্থলে একটি দীর্ঘাঙ্গী কালো সাঁওতাল মেয়ে হাত ঘুরিয়ে, দেহ বেঁকিয়ে নানা ভঙ্গিতে বিষাক্ত নাগিনীর মতো নাচছে। সেটা ছিল মন্দিরার অভিনয় আর ওর মৃত্যুও হলো বিষাক্ত সাপের কামড়ে। ও তো সারা জীবনের জন্য চলে গেল, আমাদের জন্য রেখে গেল বিষাদ সংসার। জানি না আমরা আর কোনদিন পুজোর আনন্দ করতে পারব কি না?
 
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)