প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Friday, October 31, 2025

সামান্তার অপেক্ষা [২য় পর্ব] | মমিনুল পথিক

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/২ সংখ্যা/২১শে কার্ত্তিক, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
 
সামান্তার অপেক্ষা
[২য় পর্ব]

"এদিকে তলপেটের অবস্থা অন্যরকম। লজ্জার মাথা খেয়েই বললএই যে ম্যাডামআমার লাগেজগুলো একটু দেখবেনআমি যাব আর আসব।"

 
পূর্বানুবৃত্তি তাড়াহুড়োতে অফিস যাওয়ার সময় গলির মোড়ে একটা রিকশা ধপাস করে কিছু একটা পড়ে যাবার শব্দ শোনে মাসউদ। তিনি সেটি নিয়ে রিকশার আরোহীকে ডেকেও লাভ হয় না। কাজের ব্যস্ততায় দুদিন পরে অফিসে ব্যাগটি খুলে দেখতে পান স্কুলের পরীক্ষার খাতা। তারপর…
 
পরের দিন অফিসে এসে কিছু কাজকর্ম সেরে স্যারের নিকট হতে অনুমতি নিয়ে স্থানীয় ডাকঘরে গেলেন মাসউদ। সেখানকার এক ডাকপিয়োনকে স্কুলটির অবস্থান জানতে চাইলে সে জানাল যে, প্রফেসর পাড়ার মধ্যে বড় মসজিদটির ঠিক উলটোদিকে রাস্তা ধরে কিছুদুর গেলেই স্কুলটি পাওয়া যাবে। রিকশা নিয়ে ডাকপিয়োনের কথা মতো গিয়েই স্কুলটি পেলেন তিনি।
 
সুন্দর সাজানোগোছানো পরিপাটি স্কুল। চত্বরের ভেতরে প্রবেশ করো আরো অবাক মাসউদ! ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে স্কুলের আঙিনা। বাচ্চাদের খেলাধুলার জন্যে দোলনা, স্লিপার, বসার আসন, সিমেন্টের বানানো কিছু পশুপাখি, বাগানের মাঝখানে বাংলাদেশের দেশের মানচিত্র। মোটকথা, বাচ্চাদের শিক্ষা ও বিনোদনের জন্য চমৎকার একটি পরিবেশ। মাসউদ সরাসরি প্রিন্সিপাল ম্যডামের রুমে গিয়ে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলেন। তারপর কুশল বিনিময় করে নিজের পরিচয় দিলেন। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম কলিংবেল টিপে পিয়োনকে ডেকে চা দেয়ার কথা বললেন। চা পান করতে করতে মাসউদ বললেন, তিনি সামান্তা ম্যাডামের সাথে জরুরি প্রয়োজনে দেখা করতে চান। মার্জিত ও রুচিশীল স্বভাবের প্রিন্সিপাল ম্যাডাম খুবই ভদ্রতার সাথে বললেন, দেখেন ভাই উনি কিছুক্ষণ আগেই শারীরিক অসুস্থতা জনিত কারণে ছুটি নিয়ে বাসায় গেছেন। মাসউদের বুকের ভেতরটি যেন মুচড়ে উঠল। কারণ তার মধ্যে একটি দায়বদ্ধতা কাজ করছিল সবসময়। প্রিন্সিপালকে বিনয়ের সাথে বললেন,
-ম্যাডাম যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটি কথা বলব?
প্রিন্সিপাল ম্যাডাম অভয় দিয়ে বললেন,
-নিশ্চ, আপনি বলতে পারেন; বলেন কী কথা?
-দয়া করে কি সামান্তা ম্যাডামের মোবাইল নাম্বারটি দেয়া যাবে?
-দেখুন ভাই, আমি আপনাকে চিনিনা জানিনা, তাছাড়া একজন অবিবাহিতা মহিলার মোবাইল নাম্বার দেয়াটা কি শোভনীয় হবে?
-দেখুন ম্যাডাম, আমি একজন সরকারি কর্মচারি। তাছাড়া মোবাইল নাম্বারটি চাচ্ছি শুধু তার উপকারের জন্যেই।
-আপনার সাথে তাঁর কতদিনের পরিচয়?
-আমার সাথে তাঁর কোনই পরিচয় নেই, শুধু তাঁর ব্যাক্তিগত স্বার্থেই আমি মোবাইল নাম্বার চাচ্ছি।
-আমাকে কি বলা যাবে?
-সরি ম্যাডাম, আমি বলতে পারবনা; কিন্তু আপনি তাহলে কিছুই জানেন না?
-না। কী ব্যাপার বলুন তো? আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি যেহেতু এত করে বলছেন নাম্বারটি লিখে নেন।
বলে তাঁর মোবাইল থেকে সামান্তার নাম্বারটি বের করে দিলেন; মাসুদ নাম্বারটি লিখে নিলেন।
 
মাসউদ সবুজকানন স্কুল থেকে সোজা অফিসে গিয়ে আবার কাজে মনোযোগ দিলেন। ভাবলেন, কিছুক্ষণ পর দুপুরের খাবার সময় হবে, খাবার খেয়ে না হয় মোবাইল করা যাবে। কিন্তু ওই সময় যদি উনি ঘুমিয়ে থাকেন? যদি ওনার ঘুমের অসুবিধা হয়? এরকম সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে জোহরের আজান পড়ে গেল। মাসউদ নামাজ ও খাবারের জন্যে অফিস ত্যাগ করলেন।
 
স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে এসে মনটি ভাল নেই সামান্তার; কেমন যেন ছটফট লাগছে। খাটের সাথে বালিশ লাগিয়ে হেলান দিয়ে মন মরা হয়ে বসে আছেন। মা সাহানা চৌধুরী রান্নার কাজে ব্যস্ত। কী ভাবছে সামান্তা? বাবা সাহানুর রহমান চৌধুরী বড় ব্যবসায়ী। তাছাড়া এই শহরের নাম করা প্রথম শ্রেণির একজন ঠিকাদার। সবসময় ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন তিনি। মেয়ের যৌবনাকাশে যে মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে; টেরই পাননি। আসলে পিতা-মাতার কাছে সন্তানরা সবসময় ছোটই থাকে। সাহানা চৌধুরী স্বামীকে মেয়ের বিয়ের ব্যাপার নিয়ে দু-একবার কানে তুলেছেন। কিন্তু তিনি গা করেননি। সারাজীবন টাকাপয়সার পেছনেই ছুটেছেন। তাঁর কথা, ছেলেমেয়ের কত টাকা লাগবে দেব, বাকি দায়িত্বটা তোমার। ভাগ্যিস! ছেলেমেয়ে দু’টো বইয়ের পোকা, নইলে কী দশা যে হত। তাদের হাতেখড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ানোর জন্যে সাহানা চৌধুরীর অবদান সবচেয়ে বেশি। তিনি নিজে একটি কলেজে শিক্ষকতা করতেন, তখন স্বামী সবেমাত্র ব্যবসা ও ঠিকাদারি শুরু করেছিলেন। সংসারে খুব দৈন্যদশা ছিল। দৈন্য বললে ভুল হবে কারণ সামান্তার দাদা আজিবর রহমান চৌধুরী খুব জোতদার ছিলেন। তাঁকে চেনেন না এমন লোক খুব কমই ছিল ওই তল্লাটে। তাঁর কথায় বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খেত। তিনি ছিলেন খুব দয়ালু হিতাকাঙক্ষী। তিনি গরিব ও ভূমিহীনদের অনেক জায়গা দান করেছেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নদী শিকস্তি, উদ্বাস্তু, যাযাবর, ও গৃহহারা লোকদের জমি দান করতেন বাড়ি করার জন্যে। তারপর কালের ব্যবধানে কদমতলা গ্রামের উত্তর অংশের সেই বিরান ফাঁকা মাঠটি এখন চৌধুরীপাড়া। কিন্তু এত দানশীল ও দয়ালু মানুষটির অভ্যন্তরে বিরাজ করছিল পাথরের মতো শক্ত একটি মন। কারণ নীতিবিবর্জিত কোন কাজকে তিনি কখনোই বরদাস্ত করতেন না। সেই নীতিবান পিতার কাছে পুত্রের একটি অন্যায় সারা জীবনের কাল হয়েছিল।
 
সেই অনেক আগের কথা। সাহানুর রহমান চৌধুরী ও সাহানা চৌধুরী একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। কিন্তু কেউ কাউকে চিনত না। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ধরনের গণ্ডগোল হওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্যে ক্লা বন্ধ হয়ে গেল। অগত্যা হল ত্যাগ করে স্টেশনে এসে সাহানুর লাগেজ প্লাটফরমে রেখে পায়চারি করছে। ট্রেন আসা হয়তো অনেক দেরি ছিল তাই সেখানে চা-বিস্কুট, বার ভাজা, খেতে খেতে গতর অভ্যন্তরে পানির ট্যাংকি উপচে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু এতগুলো লাগেজ কার ভরসায় রেখে জরুরত সারবে? পাশে একজন মেয়ে ট্রেনের অপেক্ষায় পায়চারি করছে আর প্রহর গুনছে। ভাবগতি দেখে মনে হল সেও ছাত্রী হবে। ডাকতেও সাহস হচ্ছে না, যদি কিছু মনে করেন? এদিকে তলপেটের অবস্থা অন্যরকম। লজ্জার মাথা খেয়েই বলল, এই যে ম্যাডাম, আমার লাগেজগুলো একটু দেখবেন? আমি যাব আর আসব। অজানা পুরুষটির অঙ্গভঙ্গিতে মেয়েটি হয়তো বুঝেছিল যে তাকে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হবে। তবুও না জানার ভান করে বলল, “কোথায় যাবেন? পেটটি চেপে ধরে কোঁকড়া হয়ে বলল এই সামনে। বলে, ক্যাঙারুর মতো বাথরুমের দিকে গেল।
 
ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)