প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Friday, October 31, 2025

সামান্তার অপেক্ষা [৩য় পর্ব] | মমিনুল পথিক

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৩০তম সংখ্যা/২৮শে কার্ত্তিক, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
 
সামান্তার অপেক্ষা
[৩য় পর্ব]

"বিধির অমোঘ নীতি কে খন্ডাবেকাজী অফিসে গিয়ে দুজনে বিয়ে করল। পরদিন উভয়েই তাদের নিজ নিজ বাড়িতে খবর দিল। শাহানার বাবা মেয়ের বিয়ের খবর পেয়ে মেয়ের ভাগ্য আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে কদিন কেঁদেকেটে মেনে নিয়েছিলেন।"

 
পূর্বানুবৃত্তি স্কুলের নাম দেখে পোস্ট অফিস থেকে স্কুলের ঠিকানা নিয়ে প্রিন্সিপাল ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করে সামান্তা ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করার কথা জানান। কিন্তু সামান্তা শারীরিক অসুস্থতার কারণে ছুটিতে থাকায় দেখা হয় না। প্রিন্সিপাল ম্যাডামকে অনেক রিকোয়েস্ট করে সামান্তার মোবাইল নম্বর জোগাড় করেন। তারপর…
 
সাহানুর বাথরুম থেকে ফিরে এসেই একটি বড় ধরনের ধন্যবাদ দিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলল, আপনার নাম কী? কী করেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। মেয়েটি জানাল যে, তার নাম শাহানা। সেও একই বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিষয়ে পড়ে। কথাবার্তার মাঝেই শাঁ শাঁ করে ট্রেন চলে এল। দু’জন একে-অপরের লাগেজগুলো ট্রেনে উঠিয়ে পাশাপাশি সিটে বসে পড়ল। সেই থেকেই পরিচয় তাদের। তারপর মন দেয়া-নেয়া, ভাব বিনিময়, এককথায় যাকে বলে প্রেম বা ভালবাসা।
 
কালের ব্যবধানে সাহানুরের মাস্টার্স শেষ এবং শাহানার অনার্স তৃতীয় বর্ষ শেষ। তবুও প্রেমিকা শাহানার টানে সেখানেই থেকে যায় প্রেমিক সাহানুর। একদিন হল ছেড়ে মেসে ওঠে সে; চলার মতো পার্ট টাইম একটি চাকুরি ও দু-একটি টিউশনি জোগাড় করে নেয়। তারপর একদিন বাবাকে চিঠি লিখে বিয়ের কথা জানিয়ে দেয়।
 
চিঠি পেয়ে বাবার মনে প্রথমে খটকা লেগে যায় এবং পরে পোড়া মনে সন্ধেহের দানা বেঁধে ওঠে। পিতৃ হৃদয়ে দুঃখের সাগর উথলে ওঠে। মনে মনে ভাবেন, একমাত্র পুত্র আমার, কী অভাব তার; কেন তাকে টিউশনি ও চাকুরি করতে হবে?
 
এদিকে শাহানার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। বাড়ি থেকে খবর এসেছে একটি ভাল পাত্র পাওয়া গেছে, আগামি দু-এক দিনের মধ্যেই তাকে যেতে হবে। চিঠি পেয়ে চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল সে। সঙ্গে সঙ্গে সাহানুরের মেসে গেল। তাকে না পেয়ে রুমমেট সাগরকে একটি চিঠি দিয়ে চলে আসে শাহানা।
 
টিউশনি থেকে ফিরে এসে শাহানার চিঠি পড়ে যেন আকাশ থেকে পড়ল সাহানুর। নিজের কাছে জমানো যে টাকাটুকু ছিল নিয়ে মেস মেট দু-এক জনের নিকট থেকে কিছু টাকা সংগ্রহ করে বিকেল পাঁচটার মধ্যে টিএসসি চত্বরে গেল। কিছুক্ষণ পর শাহানা শোঁ শোঁ বেগে রিকশা নিয়ে আসল। রিকশা থামিয়ে শুধু সাহানুরকে বলল, রিকশায় ওঠো। সাহানুর বোকার মতো প্রশ্ন করল, কোথায়? শাহানা বিনয়ের সাথে বলল, কাজী অফিসে। সাহানুর হতভম্ব হয়ে পুনরায় প্রশ্ন করল, কেন? শাহানা বলল, এখন প্রশ্ন করার সময় নয়। মাথায় বাজ পড়ল সাহানুরের। মনে পড়ল বাবার কথা, তিনি যে রাগী ও একরোখা মানুষ; ব্যাপারটি যে কীভাবে মেনে নেবেন। এদিকে শাহানার পীড়াপিড়ি। উভয় সংকটে পড়ল সাহানুর। আবার মনে মনে ভাবল আশার কথা, শাহানা যদি অন্যত্র বিয়ে করে তাহলে তো সারা জীবনের জন্যে তাকে হারাতে হবে। কিন্তু বাবাকে যেভাবেই হোক সে বুঝিয়ে রাজি করে নিবেই। আর কোন কিছু না ভেবে অজানা রাতে গা ভাসিয়ে সাহানার রিকশায়ই উঠল।
 
বিধির অমোঘ নীতি কে খন্ডাবে? কাজী অফিসে গিয়ে দুজনে বিয়ে করল। পরদিন উভয়েই তাদের নিজ নিজ বাড়িতে খবর দিল। শাহানার বাবা মেয়ের বিয়ের খবর পেয়ে মেয়ের ভাগ্য আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে কদিন কেঁদেকেটে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু অপরপক্ষে সাহানুরের বাবা আজিবর রহমান চৌধুরী খুব একরোখা মানুষ। তাকে বশে আনা সহজ কাজ নয়। তার কথার অন্যথা হলে তিনি কাউকেই ক্ষমা করেন না। তার কাছে পারিবারিক ঐতিহ্যই বড়, প্রেম-ভালবাসা তাঁর কাছে তুচ্ছ। তার মতে, এগুলো অপরিপক্ক দুজন ছেলেমেয়ের আবেগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। একদিন গোমস্তা ফাইজুদ্দিনকে ডেকে বললেন যে, আগামি কালকের মধ্যেই সাহানুরের নিকট টেলিগ্রাম পাঠাও যেন টেলিগ্রাম পাওয়া মাত্রই সে চলে আসে।
 
বাবার জরুরি টেলিগ্রাম পেয়ে পাদুটো যেন ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল সাহানুরের। বুকটা কেমন দুরুদুরু করতে লাগল। মাঝে মাঝে মনে হয় চোখ দিয়ে রিষার ফুল দেখতে পায় সে। বাবা কী এত জরুরি প্রয়োজনে যেতে বললেন? হয়তো নতুন বউমাকে ঘরে উঠাবেন। আবার ভাবেন, যে রক্তগরম মানুষ তিনি আশার মুখে ছাই পড়বে না তো? সব বুদ্ধি গোলায়ে যায় তার, কোনটা মেলে না। নানা সাত-পাঁচ ভাবতে থাকে সে।
 
পরদিন সকাল দশটার ট্রেনে উঠে বিকাল পাঁচটার দিকে বাড়িতে পৌঁছে সাহানুর। অনেকদিন পর ছেলে আসবে শুনে মা নানারকম খাবার তৈরিতে ব্যস্ত রান্নাঘরে। ছেলের কণ্ঠ শুনে মায়ের দরদী মন উথলে উঠল। বেরিয়ে এসে বুকের মানিককে জড়িয়ে ধরে আঁচল দিয়ে ঘর্মাক্ত ছেলের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, হ্যাঁ-রে খোকা এতদিন পর বুঝি এই দুঃখীনি মায়ের কথা মনে পড়ল বাপ? বলতে বলতে দুচোখ বেয়ে টলটল করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল মেহনাজ চৌধুরীর। নাড়িছেঁড়া ধন সাহানুর নরম হাতে মায়ের চোখ মুছতে মুছতে বলল, মা, পড়ালেখার ব্যস্ততার জন্যে আসা হয়ে ওঠেনি। মা এবার ডানে বামে উঁকিঝুঁকি মেরে বললেন, কী রে খোকা বউমাকে দেখছি না যে, বউমা কোথায়? বউমাকে আনিসনি?
-না মা, তোমার বউমাকে আনিনি।
-কেন?
আগ্রহ ভরে মায়ের প্রশ্ন
-বাবা জরুরিভাবে টেলিগ্রাম করায় ওকে আনার সুযোগ হল না, পরে সময় করে আনব মা।
ছেলে জবাব দেয়।
-আর পরে! এ জীবনেই হয়তো একমাত্র বউমার মুখ দেখতে পাব কি না তা আল্লাহ্ই মালুম।
মায়ের মুখ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
-কেন মা কী হয়েছে?
বিষণ্ন মনে মাকে প্রশ্ন করে সাহানুর।
-তোর বাবা আসুক, সব জানতে পারবি।
 
রাতের খাবার সেরে বাবার ঘরে ডাক পড়ল সাহানুরের। ধুকপুকুনি বুকে বাবার নিকট হাজির হয় সে। মনে হয় বিচারকের সামনে কাঠগড়ায় আসামি। জমিদারি রক্ত বহমান আজিবর রহমান চৌধুরীর শরীরে। রাগে চোখ দুটো অগ্নিমুর্তি ধার করেছেন তিনি। একমাত্র পুত্র কোন্ অজ্ঞাতকুলশীল মেয়েকে বিয়ে করল, তবুও তাকে না জানিয়ে? এই অপমান তাঁর নিকট অমার্জনীয় ও গর্হিত কাজ মনে হয়েছে। তাই বংশের মুখে চুনকালি পড়ার আগেই তিনি চারাগাছটিকে সমূলে উৎপাটন করেত চান। ছেলের কাঁধে হাত রেখে বললেন, বাবা সাহানুর আবেগের বশবর্তী হয়ে যে ভুলটি তুমি করেছ সেটি শোধরাও, মেয়েটিকে পরিত্যাগ কর। আমি তোমাকে নতুন করে বিয়ে দেব।
 
ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)