ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
সামান্তার
অপেক্ষা
[৪র্থ পর্ব]
"সাহানুরের মা ছাই চাপা আগুনে সারা জীবনটায় পুড়লেন। একদিকে স্বামী, অন্যদিকে সন্তান। অনেকরাত পর্যন্ত মা ছেলেকে বুঝালেন। স্বামীর এহেন হঠকারী সিদ্ধান্তে যার পর নাই দুঃখ পেলেন তিনি।"
পূর্বানুবৃত্তি স্টেশনে সাহানুরের
সঙ্গে আলাপ হয় শাহানার। আলাপ থেকে সম্পর্ক্টা
প্রেমের পথে গড়ায়। অল্পদিনের মধ্যেই কাজী অফিসে গিয়ে দুজনে বিয়ে করে। শাহানার বাবা
বিয়ের খবর পেয়ে ভবিতব্য আল্লাহর হাতে সঁপে দিলেন। কিন্তু সাহানুরের বাবা একরোখা মানুষ তিনি
মেনে নিলেন না। তারপর…
আজিবর রহমান চৌধুরী বেশি কথার
লোক নন। রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে ছেলের দিকে কটাক্ষ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বললেন, এই যদি তোমার শেষ কথা হয় তবে আমার শেষ কথা শোন, আমার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থেকে তোমাকে বঞ্চিত
করলাম। আগামিকাল সকালে পরিহিত কাপড়েই আমার বাড়ি ত্যাগ করবে। তবে হ্যাঁ, পিতা-পুত্রের মধ্যে যে রক্তের সম্পর্ক বিদ্যমান সে
সম্পর্কের পূর্ণ অধিকার তোমার রইল।
সাহানুরের মা ছাই চাপা আগুনে
সারা জীবনটায় পুড়লেন। একদিকে স্বামী, অন্যদিকে সন্তান।
অনেকরাত পর্যন্ত মা ছেলেকে বুঝালেন। স্বামীর এহেন হঠকারী সিদ্ধান্তে যার পর নাই
দুঃখ পেলেন তিনি। পরদিন খুব ভোরে সাহানুর পিতৃআদেশ যথার্থভাবে পরিপোষণ করল। পিতৃ
আদেশের প্রতি ন্যূনতম
বীতরাগ কিংবা বীতশ্রদ্ধা না হয়ে মনেপ্রাণে মেনে নিয়ে সাহানার নিকট রওনা হলো।
এদিকে স্বামী কবে ফিরবে, শ্বশুরশাশুড়ির সিদ্ধান্ত কী? এসব সাত-পাঁচ ভেবে তীর্থের কাকের মতো প্রহর গুনে
চলেছে সাহানা। সামনে মাস্টার্স পরীক্ষা, পড়াশোনায় মন বসাতে পারছে না সে। গতকালই সাহানুর তার কাছ থেকে গেছে তবুও যেন
কয়েক বছর মনে হয়েছে সাহানার কাছে। প্রায় সন্ধ্যা, আবিররাঙা তেজহীন
সূর্যটি পশ্চিমাকাশে মেঘের আড়ালে এইমাত্র হারিয়ে যাবে। গতকাল থেকে শরীরটাও খারাপ
লাগছে তার। বই হাতে ছাদে পায়চারি করছে আর রাস্তার দিকে
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করছে। এমনই মাহেন্দ্রক্ষণে স্বামীর
আগমনে যেন সারা শরীর পুলকিত হয়ে উঠল তার। দূর হতে দেখা যাচ্ছে, রিকশা যোগে শাঁই-শাঁই করে আসছে। যতই নিকটে আসে ততই
সাহানুরের গোলাপি চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাহানা হাত নেড়ে
ইশারায় অভিবাদন জানিয়ে নীচে নামে। রিকশা বাসার গেটে এসে
থামে। সাহানুর রিকশা থেকে ধীর গতিতে নামে। সাহানা স্বামীর কাঁধে ঝুলানো ব্যাগটি নিতে গিয়ে তার
বিষণ্ন ভাবটি স্পষ্ট বুঝতে পারল।
রাতে শোবার পর সাহানা
শ্রদ্ধেয় শ্বশুরশাশুড়ির খবর নিল। তারপর তাদের কুশলাদি জানতে
চাইল। সাহানুর সব ঘটনা খুলে বলল। ঘটনা শোনার পর পিতা-পুত্রের মধ্যে ঘটে যাওয়া এহেন
অপ্রীতিকর ও অকল্পনীয় ঘটনার জন্য নিজেকে অপরাধী মনে করে। স্বামীর হাঁটুতে চিবুক
রেখে বলে,
-ওগো আমার জন্য তোমাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে, তাই না?
সাহানুর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে
বলল,
-না সাহানা ওটা কিছু না। শরীর খারাপ লাগছে তাই এমন মনে
হচ্ছে।
-আচ্ছা এখন কী করবে?
সাহানা বলল।
-ভাবছি ব্যবসা করব,
চাকুরি
করে আর কয় পয়সা পাব।
স্ত্রীর মাথার চুল বুলাতে
থাকে সাহানুর।
-তা কী ব্যবসা করবে?
-ঠিকাদারী ব্যবসা।
-ঠিকাদারী ব্যবসা করতে গেলে তো অনেক পয়সা লাগবে, পাবে কোথায়?
-দেখি কী করা যায়,
আল্লাহ্র উপর ভরসা
রাখো।
সাহানা
অনুরোধের সুরে বলল,
-আচ্ছা আমি একটা কথা বলব শুনবে?
-বলো কী কথা।
সাহানার মুখের
দিকে অসহায়ের মতো চেয়ে থাকে সাহানুর।
-আমার আব্বাকে যদি তোমার ব্যবসায়ের ব্যাপারে আলাপ করি তুমি
রাগ করবে না তো?
-দেখো যদি ভাল মনে কর,
তবে
হ্যাঁ নেহাত যদি উনি টাকা দিতেই চান ধার হিসেবে নিব। খয়রাত বা উপঢৌকন নেব না
বুঝলে?
-আচ্ছা আগামিকাল আমরা দু’জনে আমাদের বাড়িতে যাব।
এই বলে শুয়ে পড়ল এই নব
দম্পতি।
পরদিন বেলা দুটার সময় সাহানা
স্বামীসহ বাড়িতে পৌঁছাল। মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির শিশু থেকে
বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার মাঝে যেন ঈদের আনন্দের বন্যা বয়ে যেতে লাগল। শ্বশুর সরকার তমিজ
উদ্দিন জামাইয়ের কদমবুচিতে প্রীত হলেন। খুব সাদামাঠা মানুষ
তিনি। এদিকে মেয়েকে পেয়ে মা সাহেদা বেগম রান্নাঘরে গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসেছেন। হঠাৎ
মেয়ে-জামাই এসেছে, এই মুহূর্তে বাজার
করার উপায় নেই। পোষা মুরগি ও খাসি জবাই করে এবং বাড়ি সংলগ্ন পুকুর থেকে জাল দিয়ে
বড় বড় রুই, কাতলা উঠিয়ে উপস্থিত
যা হয় তা দিয়েই জামাই ভোজন করালেন। তারপর সাহানা একা বাবা-মাকে নিয়ে আলাপটি সেরে
ফেলল। বাবা-মা দু’জনে হৃষ্টচিত্তে রাজি হয়ে গেলেন।
শ্বশুরের ধার
দেওয়া অর্থে ব্যবসায় নেমে পড়ল সাহানুর, পাশাপাশি ঠিকাদারী। সাহানা মাস্টার্স শেষ করার পর একটি কলেজে যোগদান করে। দুজনের
কর্মস্পৃহা, ধৈর্য্য, আর সততার কারণে অল্প সময়ে সাহানুরের নামডাক অনেক দূর পর্যন্ত
ছড়িয়ে গেল। সেই থেকেই উত্থান। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
সেই বেদনাক্লিষ্ট
নস্টালজিয়া এখনও তাড়া করে বেড়ায় সাহানা চৌধুরীকে। চোখের লোনা
জলে শাড়ির আঁচল যেন সিক্ত হয়েছে সিংহভাগ। রান্নাঘরে মায়ের কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে
সামান্তা দ্রুতবেগে এসে দেখে চোখের কোটা ও নাকের অগ্রভাগটি কেমন রক্তবর্ণ হয়েছে।
সামান্তা বুঝতে পেরেছিল মায়ের কান্নার কারণ, তাই মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, মা তুমি আর কখনো
অতীতের ফেলে আসা স্মৃতি মনে করবে না। মেয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল, তোকে নিয়ে যে আমার বড় ভয় হয় মা। তোর বাবার
একটি ভুলের কারণে তোর দাদাজান কোনদিন তোর বাবাকে ক্ষমা
করেননি। তোর দাদার রক্তই তো তোর বাবার শরীরে বহমান; তাই যা করবি ভেবে চিন্তে করবি।
সামান্তা ভ্রূ কুঁচকে
বলল,
-মা প্রায় ত্রিশ বছর যাবত বাবার সঙ্গে সংসার করেও তাকে চিনলে
না? আমার বাবা দুনিয়ার সব মানুষের
চেয়ে প্রিয়। ন্যাড়া একবারই বেল তলায় যায়,
দ্বিতীয়বার
নয়। দাদাজান যে ভুলটি করেছিলেন,
বাবা
সেই ভুল কখনই করবেন না।
-আচ্ছা ভাল
হলেই ভাল, এখন চল খাবি। হ্যাঁ রে
খাতাগুলোর কোন খোঁজখবর করতে পারলি?
-না মা এখনো কোন খোঁজ পেলাম না।
-থানায় জিডি এন্ট্রি করিসনি?
-না তো? অবাক হয় হয় সামান্তা।
-দূর পাগলি মেয়ে, কোন কিছু হারিয়ে গেলে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করতে হয়।
-আচ্ছা, আগামিকাল স্কুলে
যাওয়ার পথে থানায় জিডি করব।
-আমার মন বলছে যদি কোন ভাল লোকের হাতে খাতাগুলো পড়ে তবে তুই
নিশ্চয়ই পাবি। তোর প্রিন্সিপাল ম্যাডামকে জানিয়েছিস?
-না মা এখনও জানানো হয়নি। আজকে কথাটি বলতে গিয়েও বলতে
পারিনি। দেখি কালকে জানানো যায় কিনা।
-সামান্তা তুই আমাকে একটি কথা বলবি মা?
-কী কথা মা বলো?
-আচ্ছা তুই কি কোন ছেলেকে পছন্দ করিস?
মায়ের কথাটি শুনে সামান্তা
প্রথমে একটু লজ্জাই পেয়েছিল, তারপর ফিক করে একটি
হাসি দিয়ে বলল,
-মা, সেরকম কেউ এখনও আসেনি। যদি কেউ এসে যায় তোমাকে সঙ্গে সঙ্গেই
জানাব।
-হ্যাঁ রে মা তোর বিসিএস পরীক্ষার কী খবর?
-এমাসেই বোধহয় আই কিউ পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবে। ইনশ্আল্লাহ
ফলাফল ভালই হবে আশা করি।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment