বাতায়ন/চৈতি
হাওয়া—নববর্ষ/শিল্প-সংস্কৃতি/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা
বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | শিল্প-সংস্কৃতি
অমিত আভা
চৈতি
হাওয়া ও নববর্ষের বার্ষিক নাটক
"চৈতি হাওয়া এসব দেখে একটু মজা পায়। কারণ সে জানে, মানুষ পৃথিবীর একমাত্র প্রাণী যে প্রতি বছর নতুন করে প্রতিজ্ঞা করে—আর পুরোনো অভ্যাসগুলোকে খুব যত্ন করে আগের জায়গাতেই রেখে দেয়।"
চৈতি হাওয়া বড় ভদ্র বাতাস
নয়। সে শীতের মতো চুপচাপ আসে না, বরং একেবারে মাইক
হাতে নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। জানালার কপাট কাঁপিয়ে, শুকনো পাতা তাড়িয়ে,
মানুষের
চুল এলোমেলো করে দিয়ে যেন ঘোষণা করে—
-সাবধান! পুরোনো বছর শেষ হয়ে যাচ্ছে। যার যত প্রতিজ্ঞা বাকি
আছে, তাড়াতাড়ি গুছিয়ে ফেলুন!
এই ঘোষণার পরে মানুষের মধ্যে
হালকা তৎপরতা শুরু হয়। যারা সারা বছর খাতা-কলমের কাছেও যায় না, তারা হঠাৎ নতুন ডায়েরি কিনে ফেলে। প্রথম পাতায় বড় বড়
অক্ষরে লেখে—
-এই বছরটা অন্যরকম হবে।
বাক্যটা এত পুরোনো যে মনে হয়
নববর্ষের সঙ্গে এর এক ধরনের চুক্তি আছে। বছর বদলাবে, ক্যালেন্ডার বদলাবে, কিন্তু এই বাক্য
বদলাবে না। চৈতি হাওয়া এসব দেখে একটু মজা পায়। কারণ সে জানে, মানুষ পৃথিবীর একমাত্র প্রাণী যে প্রতি বছর নতুন করে
প্রতিজ্ঞা করে—আর পুরোনো অভ্যাসগুলোকে খুব যত্ন করে আগের জায়গাতেই রেখে দেয়। পাড়ার
চায়ের দোকান এই সময় বিশেষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেখানে দাঁড়িয়ে কয়েকজন বিশ্লেষক
এমন ভঙ্গিতে আলোচনা করেন যেন নববর্ষের ভবিষ্যৎ তাদের হাতেই নির্ধারিত হবে। একজন
চায়ের কাপ হাতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
-এই বছরটা একেবারে গেল।
আরেকজন চা নেড়ে দৃঢ় গলায়
বললেন—
-না না, আগামী বছরটা কিন্তু
দারুণ হবে।
এই কথাটা শুনে পাশে ফুটতে
থাকা কেটলি একটু বেশি শব্দ করে উঠল। কারণ সে জানে, গত বছরও এই একই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল।
আসলে নববর্ষ বড় অদ্ভুত এক
অতিথি। সে আসে, কিন্তু কোনো জাদু দেখায় না। সে
কারও বেতন বাড়ায় না, কারও ঋণ মেটায় না, কারও আলস্য কমায় না। তবু মানুষ তাকে নিয়ে এত আনন্দ করে
কেন? কারণ নববর্ষ মানুষের মনে একটা
ছোট্ট জানালা খুলে দেয়— আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার জানালা। এই জানালাটা খুব বড়
নয়। একটা ক্যালেন্ডারের পাতার মতোই ছোট। তবু মানুষ সেই ছোট্ট জানালা দিয়ে বিশাল
আকাশ দেখতে চায়।
চৈতি হাওয়া তখন গাছের ডাল
ঝাঁকিয়ে পুরোনো পাতা ঝরিয়ে দেয়। যেন একটু ঠাট্টা করে বলছে—
-দেখো, প্রকৃতি কিন্তু
সত্যিই নতুন করে শুরু করছে। শুধু তোমরাই এখনও পরিকল্পনার খাতা লিখে যাচ্ছ।
তারপর ধীরে ধীরে রাত নামে। ক্যালেন্ডারের
পাতা উলটে যায়। মানুষ একে অপরকে হাসিমুখে বলে—
-শুভ নববর্ষ।
চৈতি হাওয়া তখন একটু দূরে
সরে যেতে যেতে শেষবারের মতো ফিরে তাকায়। তারপর হালকা হাসি হেসে বলে—
-তোমরা মানুষ বড় আশ্চর্য। একটা ক্যালেন্ডারের পাতা বদলালেই
মনে করো জীবন বদলে যাবে। তবু এই বিশ্বাসটা থাকুক। কারণ মানুষ যদি আশা করা বন্ধ করে
দেয়, তাহলে পৃথিবীতে শুধু বছর
বদলাবে— মানুষ আর বদলাবে না।
~~000~~

No comments:
Post a Comment