বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
জনা বন্দ্যোপাধ্যায়
বিশ্বাস
"কষ্টের ধারাপাত বহু বছর ধরে শুধু জীবনকে জর্জরিত করেনি, বিষময় করেছে। দাম্পত্যের বন্ধন ছেদ করতে তাই আর কোনো কষ্ট অনুভূত হয়নি। তবে মৃত সোমনাথ রায়কে দেখে নিজের বাঁধ ভাঙা কান্না সামলাতে পারেননি শোভনাদেবী।"
শোভনাদেবীর বড় মেয়ে বারো বছর বয়সে দীঘার সমুদ্রে খেলতে খেলতে জলে তলিয়ে গেছিল, সেই থেকে শোভনাদেবী সমুদ্রের ধারে বেড়াতে যান না। সোমনাথ রায়কে শোভনাদেবী ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে নানান কারণে অশান্তি লেগেই থাকত। তার ওপর বড় মেয়ের মৃত্যুর ঘটনা স্তব্ধ করে দেয় তাঁকে, সাত বছরের ছেলে পুলককে নিয়ে আলাদা বাড়ি ভাড়া করে থাকতে শুরু করেন শোভনাদেবী। তাঁর শাশুড়ি তন্ত্রমন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। একজন তান্ত্রিক গুরুদেব এসে প্রায়ই বাড়িতে হোমযজ্ঞ করতেন। শোভনাদেবীর খাওয়াদাওয়া, স্বাধীনতায় শাশুড়ি হস্তক্ষেপ করতে শুরু করেছিলেন। অশান্তি চরমে ওঠে যখন সোমনাথ রায়ও মাকে সমর্থন করতে শুরু করেন। শোভনাদেবীর প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়ায় তাঁর শাশুড়ি খুশি ছিলেন না। তবু শোভনাদেবী সব রকম প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে প্রস্তুত ছিলেন। শাশুড়ি একদিন রেগে গিয়ে বলেন, "তোমার মেয়ে মেয়ে করে আদিখ্যেতা করা ঘুচে যাবে!" শোভনাদেবীর চোখের জলের গুরুত্ব সোমনাথ রায় দিতেন না। একদিন তান্ত্রিক গুরু শোভনাদেবীকে বলেন, "আগুন, জল, বায়ু এই তিনটি প্রাকৃতিক শক্তি থেকে তোমাদের সাবধানে থাকতে হবে, নইলে পরিবারের বিপদ আছে!"
শোভনাদেবীর তখন অল্প বয়স, ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘুরতে যাবার শখ। শাশুড়ি তান্ত্রিক গুরুর সাবধান বাণী বার বার স্মরণ করিয়ে দিলেও শোভনাদেবীর জেদ দীঘা যাবেন। অবশেষে সোমনাথ রায় টিকিট কেটে নিয়ে এলেন। দীঘায় চারদিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে শোভনাদেবীর আনন্দে কাটে, শৈশবের উচ্ছল দিনগুলো যেন ফিরে পান। হঠাৎই ঘটে যায় দুর্ঘটনা। মেয়ে শোভনাদেবীর হাত ছাড়িয়ে খানিকটা এগিয়ে গেলে উত্তাল এক ঢেউ ভাসিয়ে নেয় মেয়েকে।
বাড়ি ফিরে এলে উঠতে বসতে শোভনাদেবীকে দোষারোপ করেন শাশুড়ি। সোমনাথ রায় শুধু বধিরের মতো শুনতেন। শেষে শোভনাদেবী একটি বিউটি পার্লারে কাজ নিয়ে বাড়ি ছাড়েন। পুলককে মায়ের সঙ্গে যেতে দিতে চাননি সোমনাথ রায়, কিন্তু পুলক মাকে ছাড়ে না। ডিভোর্স না হলেও সেপারেশনে থেকে শোভনাদেবী স্বস্তি পান। পুলকের ভবিষ্যৎ পড়ে আছে, তবু ছেলের দায়িত্বভার নিয়ে শোভনাদেবী আলাদা হন। নিজের ভাগ্যকেই দোষ দেন তিনি। একলা চলার অদম্য জেদ পেয়ে বসে তাঁকে।
শ্বশুরবাড়িতে হঠাৎ করে আগুন লেগে দুর্ঘটনা ঘটায় শোভনাদেবীর স্বামী ও শাশুড়ি হাসপাতালে ভর্তি। কয়েক মাস পর এরকম এক সংবাদ পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান শোভানাদেবী, কিন্তু সোমনাথ রায়কে জীবিত দেখতে পাননি। জল, আগুন, বায়ুর সাবধান বাণী স্মরণ করে শিউরে ওঠেন শোভনাদেবী। মনে আতঙ্ক জাগে!
নানান ঘটনার টানাপোড়েনে কেটে যায় অনেকগুলো বছর। শ্বশুরবাড়ির দলিলে শোভনদেবীর শাশুড়ি বৌমা বা নাতিকে কোনো সম্পত্তি লিখে দেননি! পুলক পড়াশোনা শিখে নিজের চেষ্টায় সরকারি চাকরি পাওয়ার পর মাকে আর পার্লারের কাজ করতে দেয় না। আকাশের উড়ন্ত ঘুড়ির দিকে তাকিয়ে শোভনাদেবী ভাবেন সকলেরই ভাগ্য ওই ঘুড়ির সুতোর মতো। যতক্ষণ ওড়ে, ততক্ষণই জীবন! পুলক মাকে আগলে রাখে, ঝকঝকে চেহারা, ছাব্বিশ বছরের দায়িত্ববান ছেলে। এতদিন ভাড়া বাড়িতে ছিলেন মা ও ছেলে। এখন পুলক হোমলোন নিয়ে বাড়ি বানাতে চায়। শোভনাদেবী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারেন না, বয়সের তুলনায় বৃদ্ধত্ব অনেক আগেই তাঁকে গ্রাস করেছে।
বাবার বাড়ির অবস্থা কোনোদিনই ভালো ছিল না শোভনাদেবীর। তাঁরা ছিলেন তিন বোন। তাঁর বাবার মিল হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেলে সংসারে অভাব দেখা দেয়। তবু গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত পড়া ছাড়েননি শোভনাদেবী। বিয়ের আগে ট্রেনের কামরায় কামরায় ঘুরে পেন, পেন্সিল, ছোটদের লেখার বোর্ড, লাট্টু, ছোটদের ছোট ছোট ব্যাটবল বিক্রি করতে হত তাঁকে, সে সময় সোমনাথ রায়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। শ্যামলা হলেও চেহারায় লাবণ্য ছিল শোভনাদেবীর। সোমনাথ রায় তখন চুঁচুড়া জেলা শহরে মুহুরির কাজ করতেন। তাঁদের বিয়ে রেজিস্ট্রি করেই হয়। শাশুড়ি প্রথম দর্শনেই শোভনাদেবীকে গায়ের রঙের খোঁটা দেয়, পরে এসব গা সওয়া হয়ে যায় শোভনাদেবীর। কষ্টের ধারাপাত বহু বছর ধরে শুধু জীবনকে জর্জরিত করেনি, বিষময় করেছে। দাম্পত্যের বন্ধন ছেদ করতে তাই আর কোনো কষ্ট অনুভূত হয়নি। তবে মৃত সোমনাথ রায়কে দেখে নিজের বাঁধ ভাঙা কান্না সামলাতে পারেননি শোভনাদেবী। স্বামীর প্রতি দীর্ঘদিন জমে থাকা অভিমান, ক্ষোভ ধুয়ে মুছে গেছিল কিছুক্ষণের জন্য।
কয়েক দিন ধরে সরকারি ঘোষণা শোনা যাচ্ছে বিধ্বংসী ঝড় আসবে, চারিদিকে সতর্কবার্তা প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু ওইদিন অফিসে রাত ডিউটি আছে পুলকের--এ কথা শোনার পর থেকে শোভনাদেবী এক অজানা আতঙ্কে কাঁপছেন। কাউকে কিছু মন খুলে বলতে পারছেন না। সাগরের ভয়াবহতা ও আগুনের দুর্ঘটনায় তাঁর মেয়ে ও স্বামী আজ নেই। তান্ত্রিক গুরুর কথা অনুযায়ী বায়ুও সাংঘাতিক আঘাত হানতে পারে তাঁর পরিবারে। পুলক ছাড়া শোভনাদেবীর পরিবার বলতে আজ আর কেউ নেই। তিনি পুলককে আঁকড়ে ধরে বলেন, "ওইদিন তুই ছুটি নে।"
"ইয়ার এন্ডিং, আর এখন অফিসে যা চাপ, ছুটি নিতে পারব না। ছেলেমানুষি কোরো-না মা, আমার কিছু হবে না!"
পুলক যতই আশ্বাস দিক, শোভনাদেবীর মন মানে না। পুলক মাকে অনেক বুঝিয়ে সেই দুর্যোগের দিন সন্ধের মুখে বেরিয়ে যায়। সন্ধে থেকে শুরু হয় বৃষ্টি। রাত যত বাড়ে দমকা হাওয়া ও বজ্র বিদ্যুৎ চলতে থাকে। শোভনাদেবী ব্যালকনিতে উঁকি মেরে দেখেন ঝড়ের তান্ডব দৃশ্য। তাঁর মন আশঙ্কায় ছেয়ে যায়। দুর্যোগের ভয় ও পুলকের জন্য চিন্তা থেকে শুরু হয় বুকে ব্যথা। তুমুল দুর্যোগে ফোনও কাজ করে না যে পুলককে কিছু বলবেন। বুকের যন্ত্রণায় ছটফট করেন।
পরদিন সকালে পুলক এলে শোভনাদেবী আর দরজা খোলেন না। বিষাদের ছায়ায় ঢেকে যায় পৃথিবী। গতকাল রাতে চারিদিকের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে পেরে মানুষজন হাহাকার করে। পুলকের মাতৃহারা হৃদয় বিশ্বাস করতে পারে না শোভনাদেবীর মৃত্যু। জল, আগুন ও বায়ু থেকে সাবধান থাকার বাণীতে বিশ্বাস না করলেও এই তিনটি প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাব তাদের পরিবারে যে বার বার পড়েছে এটা তাৎক্ষণিক ভাবে সত্যি এ কথা পুলক জানে! আসলে বিশ্বাসে মিলায়ে বস্তু, তর্কে বহুদূর!
~~000~~
No comments:
Post a Comment