বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/৭ম সংখ্যা/৯ই আষাঢ়, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
নবনীতা রায়
ক্ষণিকের
অতিথি
[২য় পর্ব]
"আমি মেনে নিয়েছিলাম যে তুই আর কোনদিন ফিরবি না, তোকে আমি হারিয়ে ফেলেছি কিন্তু কোন অপরাধে আমার এই দণ্ডপ্রাপ্তি হল তা আমাকে জানানো হল না।"
পূর্বানুবৃত্তি নন্দিনী বুঝতে
পারে ওর এতদিনের তৈরি করা দেওয়াল ভেঙে দেওয়ার জন্য আজ
উঠেপড়ে লেগেছে শতদ্রু, তাই ভাঙন আটকাতে
নন্দিনী বলে, ‘আমি কারোর সাথে যোগাযোগ বন্ধ করিনি সবার সাথে
যোগাযোগ আছে আমার, শুধু কথা বলার পরিমাণ
কমিয়ে দিয়েছি’। তারপর…
শতদ্রু উত্তর দেয়, ‘তোর মনে পরে শেষ তিন বছরে আমার জন্মদিন ছাড়া আর কবে তুই আমাকে মেসেজ
করেছিস বা দেখা করেছিস’, একটু চুপ করে থেকে
নন্দিনী উত্তর দেয়, ‘না মানে তেমন কোনো প্রয়োজন হয়নি তাই আর
তাছাড়া এত কজের চাপ যে সময় পাই না’। খানিক বিরতি নিয়ে শতদ্রু
বলে, ‘আচ্ছা তবে আমাদের বন্ধুত্বটা
কেবল প্রয়োজনের খাতিরে তৈরি হয়েছিল দেখ আমাকে অনুভব সবটা
বলেছে, এবার আমার কাছে তো ওর মুখের
কথা ছাড়া অন্য প্রমাণ নেই, এখন তুই যদি অনুভবের
বলা কথাগুলো অস্বীকার করিস তাহলেও আমার কিছু করার নেই’। খানিকটা ভয়
পেয়ে আর অবাক হয়েই নন্দিনী জিজ্ঞেস করে, ‘অনুভব কী বলেছে তোকে?’ শতদ্রু বলে, ‘অনুভবের কোন দোষ নেই, তোর খবর আর কেউ না জানলেও অনুভব যে সবটা জানবে এ বিশ্বাস
আমার ছিল, আমার প্রথম খটকা লাগে সেবার
কালী পুজোতে, সেবার আমি কানপুরে ফেরার সময় তুই একবারও বলিসনি সাবধানে যাস
বা পৌঁছে জানাস, আমার প্রথম সন্দেহ হয়
তখন তারপর তুই যখন কথা বলা বন্ধ করে দিলি,
ফোন করা
বন্ধ করলি, এমনকি আমি কলকাতায় গেলেও আর
দেখা করার কথা বলতিস না তখন আমার সন্দেহ যে ঠিক তা আন্দাজ করতে পারি আমি, বুঝতে পারি যে তুই পাল্টে যাচ্ছিস। প্রথমে তোকে জিজ্ঞাসা
করেছিলাম তুই উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেছিলি, অনুভবকেও জিজ্ঞাসা করেছিলাম ও তোর মতোই এড়িয়ে গেছিল যতই হোক তোর প্রিয় বন্ধু
বলে কথা। তারপর আমি মেনে নিয়েছিলাম যে তুই আর কোনদিন ফিরবি না, তোকে আমি হারিয়ে ফেলেছি কিন্তু কোন অপরাধে আমার এই
দণ্ডপ্রাপ্তি হল তা আমাকে জানানো হল না। বছর খানেক আগে অনুভবের সাথে আমার হঠাৎ
দেখা হয়, টুকটাক কথা বলার পর আমি
জিজ্ঞাসা করি তোর কথা, আমার করুণ অবস্থা দেখেই
মনে হয় অনুভব খানিকটা নরম হলো,
আমাকে
বলেছিল আমাকে ভালবাসেছিলিস তুই কিন্তু আমার দিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়েই বোধহয়
একটু একটু করে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলিস তুই। আমার শুধু একটাই প্রশ্ন এই কথাগুলো অনুভবকে
বলতে পারলি তুই কিন্তু সাহস করে একবার আমাকে জানাতে পারলি না’। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে থাকে তারপর নন্দিনী শান্ত স্বরে বলে, ‘আমি ভেবেছিলাম তোকে এসব বললে তুই বিরক্ত হবি হয়তো
কথা বলাও বন্ধ করে দিবি তাই নিজেকে সরিয়ে নেওয়াটাই উচিত বলে মনে হয়েছিল আমার, আর অনুভবকে সবটা না বলে কোনো উপায় ছিল না আমার, আমি না বললেও অনুভব বুঝতে পারত, তুই তো জানিস অনুভব আমার ছোটবেলার বন্ধু আমার চোখ-মুখ দেখে ও
বলে দিতে পারবে আমার কী হয়েছে কাজেই ওর কাছ থেকে লুকাতে
পারিনি। আর আমি জানি তোর সাথে অনুভবের দেখা হয়েছিল যদিও তোদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল তা আমার জানা ছিল না। আমি তোকে ভালবেসেছিলাম একথা সত্যি, তোর প্রতি আমার আমার দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল এটাও সত্যি, আমি এটাও স্বীকার করছি তোকে জানানোর সাহস হয়নি কিন্তু তুই
আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দে তুই কানপুর যাওয়ার পর আমি তোকে প্রায়ই মেসেজ করতাম
তুই কখনো উত্তর দিতিস কখনো দিতিস না,
তুই যখন
কলকাতায় আসতিস তখন অন্য সবার সাথে তুই দেখা করার সময় পেতিস শুধু আমার জন্য তোর
কোনও সময় ছিল না, তুই একটা কথা বল তুই
কানপুর যাওয়ার পর ঠিক কতগুলো দিন তুই নিজে থেকে মেসেজ করেছিলি আমাকে, বলতে পারিস ঠিক কতদিন একটা মানুষ একতরফা এই কাজগুলো করে
যেতে পারে, হ্যাঁ আমি জানি তোর প্রচণ্ড
কাজের চাপ থাকত তা সত্ত্বেও সপ্তাহে একদিন তোর সময় হতো না আমার সাথে কথা বলার এটা
বিশ্বাস করতে আমার অসুবিধা আছে’।
এবার শতদ্রু চুপ করে থাকে
সত্যি নন্দিনীর কথার কোন উত্তর নেই শতদ্রুর কাছে, আসলে নন্দিনীর যে ওর প্রতি দুর্বলতা আছে তা খানিকটা বুঝতে পেরেছিল শতদ্রু। ওর মনে
হয়েছিল নন্দিনী হয়তো থেকে যাবে হয়তো
বুঝতে পারবে, কিন্তু নন্দিনী যে
এতটা কষ্ট পেয়েছে তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি শতদ্রু। সবটা ঘেঁটে যায় শতদ্রুর, নন্দিনী যেন আজ সপাটে সত্যি কথাগুলো বলে ফেলল, আচ্ছা ওর কি নন্দিনীর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত, যে ভুল ও করেছে তার ক্ষমা কি আদৌ হয়। এইসব
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে নন্দিনীর দিকে তাকায় শতদ্রু, নন্দিনী তখন হাতে ধরা ফেলুদার বইটার ওপর কিছু রেখে তাতে কী যেন লিখছে, শতদ্রু খানিক অবাকই হয় এখন আবার কী লিখছে
নন্দিনী, তবে খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা
করতে হয় না শতদ্রুকে, মিনিট খানেকের মধ্যেই
নন্দিনী একটা খাম বাড়িয়ে দেয় শতদ্রুর দিকে হাতে নেওয়ার পর বুঝতে পারে সেটা একটা
বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র, খামের ওপর শতদ্রুর
নাম লেখা শতদ্রু বোস, তবে কি নন্দিনী বিয়ে
করছে? চিন্তাটা মাথায় আসতেই দ্রুত
হাতে কার্ডটা বের করে শতদ্রু সেখানে লেখা নন্দিনী সেন ওয়েডস সৌভিক ব্যানার্জি।
হতভম্ব হয়ে নন্দিনীর দিকে তাকায় শতদ্রু,
নন্দিনী
আবারো শান্ত স্বরে বলে ওঠে, ‘তোর ভাগ্য ভাল আসলে কয়েকটা কার্ড নিয়ে
এসেছিলাম এই সেমিনারে বেশ কয়েকজন ব্যাচমেটের আসার কথা ছিল সেখান থেকেই একটা
এক্সট্রা কার্ড থেকে গেছিল ভাবলাম, দেখা যখন হয়েই গেল তখন
নিমন্ত্রণটা সেরেই ফেলি’। ‘তুই বিয়ে
করছিস’ জিজ্ঞেস করে শতদ্রু, ‘হ্যাঁ’ সংক্ষেপে উত্তর দেয় নন্দিনী। ‘দেখ জীবন তো কারোর জন্য থেমে থাকে না তোর প্রতি
আমার ভালবাসাটা মিথ্যে ছিল না কিন্তু কী জানিস তো যে গাছে
রোজ ফুল ফোটে প্রতিনিয়ত তার পরিচর্যা না করলে একদিন সে ফুল দেওয়া বন্ধ করে দেয়। আসলে
বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমি বুঝতে পেরেছি যে আমি যাকে ভালবাসি সে আমার কাছে আছে কিনা
তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ যে আমাকে ভালবাসে সে আমার কাছে আছে কিনা। সৌভিক আমাকে ভীষণ
ভালবাসে আর তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ও আমাকে সম্মান করে। আমি তোর কথা জানিয়েছি ওকে, এই দু বছরের সম্পর্কে বেশ কয়েকবার ওর সাথে আমার মতের অমিল
হয়েছে, মনোমালিন্য হয়েছে কিন্তু
কোনোদিন ও আমার তোর প্রতি সেই অনুভূতি আমাদের মধ্যে টেনে আনেনি। আমি জানি সৌভিক
কোনোদিন আমাকে অবহেলা করবে না, তুই ভাল থাকিস শতদ্রু, তোর প্রতি ভালবাসা না থাকলেও তোর বন্ধুত্ব আমি কোনদিনই
অস্বীকার করব না এইটুকু কথা আমি দিতে পারি তোকে আর হ্যাঁ বিয়েতে অবশ্যই আসিস আমার
খুব ভাল লাগবে’।
ট্রেন কানপুর ঢুকেছে নামতে
হবে শতদ্রুকে, ব্যাগ আর কার্ডটা নিয়ে এগিয়ে
যায় ও, নামতে হবে শতদ্রুকে, ট্রেন থেকে নামার বেশ কিছুক্ষণ পর ট্রেনটা ছেড়ে দেয় শতদ্রু
তাকিয়ে থাকে সেদিকে, আস্তে আস্তে ওর
দৃষ্টির আড়ালে চলে যায় ট্রেনটা সাথে নিয়ে যায় শতদ্রুর জীবনের শেষ না হওয়া এক অধ্যায়কে। স্টেশনের
বাইরে যাওয়ার জন্য এগিয়ে যায় শতদ্রু,
নন্দিনীর
মতো ওকেও তো এগিয়ে যেতে হবে। আসলে কিছু ভুল মনে হয় কোনোদিন শোধরানো যায় না। শতদ্রু
বুঝতে পারে ও আর কোনোদিনই নন্দিনীর জীবনে স্থায়ী অতিথি হয়ে উঠতে পারবে না চিরকাল
শতদ্রুকে নন্দিনীর জীবনে ক্ষণিকের অতিথি হয়েই থাকতে হবে সেটাই বোধহয় নিয়তি।
~~000~~
Ei golpo tar prothrom porber link ta khuje pachchi na ektu jodi share koren tobe khub bhalo hoy
ReplyDelete