বাতায়ন/নাসির ওয়াদেন
সংখ্যা/হলদে খাম/৪র্থ বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/২রা আষাঢ়, ১৪৩৩
নাসির ওয়াদেন সংখ্যা
| হলদে খাম
মানালী হোড়
প্রিয় কবিকে
অজানা বসন্ত
"জানো কবি এখন আর কোন প্রেমিক তার প্রেমিকাকে "অনন্ত প্রেম'' পাঠ করে শোনায় না। কিন্তু আমার শৈশব যে তোমাকে ঘিরেই ছিল।"
প্রিয় কবি,
জানি না কেমন আছ, হয়তো ভালই আছ। তুমি সমাজকে ভাল রাখার জন্য বহু কাজ করেছ।
কিন্তু সবই আজ কেমন ফিকে হয়ে গেছে। হয়তো কেউ ভাল নেই। জানি না কেন, তবে অনেক প্রশ্ন আছে আমার মনে। তুমি হয়তো উত্তর দেবে না।
কিন্তু তুমি যে চেয়েছিলে এক অনন্য সমাজ গড়ে তুলতে। শিক্ষা ও সংস্কৃতির মিলন
ঘটাতে চেয়েছিলে, গ্রাম বাংলায়
শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে তুমি নানা পদক্ষেপ নিয়েছ। কিন্তু এখন সবই কেমন হারিয়ে
যাচ্ছে। কোন উৎসাহ নেই কারোর মনে। নতুন করে সমাজ গড়ার তাগিদ নেই কারোর। সবাই বড়
স্বার্থপর হয়ে গেছে। শান্তিনিকেতনে এখন আর শান্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। পলাশ
ফুলগুলো কেমন শুকিয়ে গেছে। কিছু মানুষ আজ নিজের স্বার্থচারিতার জন্য পলাশ ফুলের
গাছগুলোকে কেটে দিচ্ছে। তুমি তো এখন এগুলোর প্রতিবাদ করো না। রবি, তোমার নামে তো সূর্যের ছোঁয়া আছে। রবীন্দ্রনাথ নামের মানে
তো সূর্য অধিপতি। ঠিক যেমন ১৮৬১ সালের পর থেকে তুমি নতুন সূর্যোদয় করেছিলে, ঠিক তেমন সূর্যোদয় এখন আর কেউ করে না। ১৯৪১ সালের পর সেই
সূর্য যেন ধীরে ধীরে অস্তগামী হয়ে গেল। আজ তোমার কাছে বড্ড অভিমান নিয়ে এসেছি
কবি। অনেক কষ্ট থেকে জানাতে এসেছি যে এখন আর কোন শিশু গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে
যাওয়ার সময় তোমার কবিতা বিড়বিড় করে না। শুকিয়ে যাওয়া নদী দেখে কেউ বলে না
"আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে''। আরো খারাপ লাগার বিষয় এখন আর পঁচিশে বৈশাখে কেউ
"এসো হে বৈশাখ'' বলে গেয়ে ওঠে না।
জানো কবি এখন আর কোন প্রেমিক তার প্রেমিকাকে "অনন্ত প্রেম'' পাঠ করে শোনায় না। কিন্তু আমার শৈশব যে তোমাকে ঘিরেই ছিল। আমি এখনো সেই শৈশবকে নিজের
উজ্জ্বল স্মৃতির পাতায় লিখে রেখেছি। আজও ভুলতে পারিনি সেই সমস্ত কবিতা, গান, নাটক সবকিছু। এখনো
মনে পড়ে সেই দিনের কথা, যেই দিনে কাগজের নৌকা
বানিয়ে নদীতে ভাসাতে ভাসাতে তোমার "কাগজের নৌকা'' কবিতাটা আমরা পাঠ করতাম। আজও মনে পড়ে তোমার গানে নাচ করার
কথা। নাচ করার সময় তোমার গান ছাড়া অন্য কিছু মাথায় আসত না। কিন্তু আজ সব কেমন
হারিয়ে গেছে। ভুলতে বসেছে সবাই রবীন্দ্র সংগীত, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, রবীন্দ্রনাথের গীতি
নাট্য। তোমায় কখনো চোখে দেখিনি, বড্ড ইচ্ছা তোমাকে
একবারের জন্য চোখে দেখার। হয়তো কোনদিনও তোমাকে চোখে দেখার ইচ্ছে পূরণ হবে না। আজও
তোমার প্রতিটা সাহিত্যে প্রতিটা গল্পে তোমাকে অনুভব করি। এ এক অদ্ভুত অনুভূতি
তোমাকে বলে প্রকাশ করতে পারব না। জানো কবি আজও তোমার "জীবন স্মৃতি'' পড়লে ইচ্ছে হয় তোমার সাথে বড় হয়ে ওঠার। সেই সমস্ত কিছু
তোমার শৈশবে খুঁজে পেতে ইচ্ছা করে, যা আজ আমি তোমার চোখে
খুঁজে পাই তোমার কবিতার মাধ্যমে, তোমার গানের মাধ্যমে।
ছোটবেলার যখন স্কুলের ২৫ শে বৈশাখের অনুষ্ঠানে "চিত্রাঙ্গদা'' দেখেছিলাম তখন বুঝিনি তুমি কোন দৃষ্টিতে
"চিত্রাঙ্গদা'' রচনা করেছিলেন।
কিন্তু আজ বুঝতে পারি কোন দৃষ্টিতে তুমি দেখতে নারীদের, কোন দৃষ্টিতে তুমি বুঝেছিলে সমাজের আসল রূপ। এছাড়াও তোমার
“একলা চলো রে” আজও আমাদের সাহস দেয়, যখন চারপাশে অন্ধকার
নেমে আসে। তোমার প্রকৃতিপ্রেম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই পৃথিবী শুধু ভোগ করার জন্য নয়, ভালবাসার জন্যও। আজ যদি তুমি আমাদের মাঝে থাকতে, তাহলে হয়তো তুমি নতুন করে আমাদের শেখাতে—কীভাবে মানুষ হয়ে
বাঁচতে হয়, কীভাবে ভালবাসতে হয়, আর কীভাবে নিজের ভেতরের আলোকে জ্বালিয়ে রাখতে হয়। তোমার
সৃষ্টি আমাদের পথ দেখাক, আমাদের হৃদয়কে আরও
সংবেদনশীল ও মানবিক করে তুলুক—এই কামনাই করি। সবার মনে বিশ্বকবির জন্য এক অমলিন
স্থান তৈরি হোক। যা তৈরি হবে শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা দিয়ে। যা দিয়ে তুমি আগাগোড়া
সমাজ গড়তে চেয়েছিলে, তা যেন ভেঙে না পড়ে।
এই সমাজে মেরুদণ্ড যেন চিরকাল তোমার মতোই সোজা থাকে। আশীর্বাদ করো হে বিশ্বকবি। আমার
চিন্তায় এবং চেতনায় তুমি আজীবন জীবন্ত।
ইতি—
অজানা বসন্ত
খুব ভাল লাগল।
ReplyDeleteদারুন দারুন এককথায় অসাধারণ 👏🏻
ReplyDeleteBahhhhh
ReplyDelete