বাতায়ন/নাসির ওয়াদেন
সংখ্যা/গদ্য/৪র্থ বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/২রা আষাঢ়, ১৪৩৩
নাসির ওয়াদেন সংখ্যা
| গদ্য
ঈষিকা
সূত্রধর
অকাল-বসন্তের
রিক্ত অর্ঘ্য
"সত্তর ক্রোশব্যাপী সেই দুর্গম যাত্রার অবসাদে যখন কায়া ও মন অবসন্ন, যখন শরীরের প্রতিটি শিরায় ক্লান্তির তীব্র দহন—তখন কিঞ্চিৎ আশ্রয়ের তরে কড়া নেড়েছিলাম একদা প্রিয় সেই স্বজনের দ্বারে।"
জীবনের রূঢ় পটে দারিদ্র্য
যেখানে নিত্যকার সঙ্গী, সেখানে সম্পর্কের
সমীকরণগুলো বড় অদ্ভুত। ললাটের ঘাম মুছে যে অন্ন জোগান আমার জন্মদাতা, সেই শ্রমের পবিত্রতা আধুনিকতার চড়া মেকআপে ঢাকা পড়া
স্বজনদের চোখে ধরা পড়ে না। সেদিন রাজপথের জনঅরণ্যে যখন রক্তের বাঁধন তথা 'অগ্রজা'র সঙ্গে দৃষ্টি
বিনিময় হলো, মায়ার পরিবর্তে সেখানে
প্রতিফলিত হলো এক হিমশীতল দূরত্ব। পরিধেয় বস্ত্রের পারিপাট্য না থাকায় স্বজনত্বের
সেই প্রাচীন দাবি মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল;
সম্পর্কের
ওপরে জয়ী হলো রেশমি সুতোর জৌলুস।
অভিজ্ঞতার এই দহন চরম সীমায়
পৌঁছাল ফাল্গুনের এক মাহেন্দ্রক্ষণে, যখন আমার জীবনযুদ্ধের
এক কঠিন পরীক্ষা সমাগত। সত্তর ক্রোশব্যাপী সেই দুর্গম যাত্রার অবসাদে যখন কায়া ও
মন অবসন্ন, যখন শরীরের প্রতিটি শিরায়
ক্লান্তির তীব্র দহন—তখন কিঞ্চিৎ আশ্রয়ের তরে কড়া নেড়েছিলাম একদা প্রিয় সেই
স্বজনের দ্বারে। কিন্তু হায়! যে প্রদীপ আশার আলো দেখিয়েছিল, সন্ধি-মুহূর্তে তা নিভে গেল মিথ্যার কুয়াশায়। "আগমন
বার্তা অজ্ঞাত"—এমন এক নিপুণ ছলনার আবরণে ঢাকা পড়ল তাঁদের ঔদাসীন্য। আধঘণ্টার
সেই প্রতীক্ষা যেন সহস্র বছরের অবমাননা। বুঝলাম, আধুনিক এই মেকি সমাজে মানুষের সত্তার চেয়ে তার বিত্তের ওজনই অধিক গুরুত্ববহ।
শারীরিক অসুস্থতার প্রাবল্যে
যখন চেতনার প্রদীপ ম্লানপ্রায়, বমির বিস্বাদ আর
ক্লান্তিতে যখন নিমীলিত আঁখি—ঠিক তখনই কলম ধরলাম পরীক্ষার শুভ্র পত্রে। সেই পাতায়
সাফল্যের অক্ষরেখা অঙ্কিত হবে কি না জানি না,
কিন্তু
ললাটে যে জেদের তিলক পরেছি, তা কোনো বিত্তবান
স্বজনের অবজ্ঞায় মুছে যাওয়ার নয়। দারিদ্র্য হয়তো গৃহের ছাদ কাড়তে পারে, কিন্তু আত্মার ঋজুতাকে স্পর্শ করার স্পর্ধা তার নেই। আজ
যারা আমার মলিন বেশ দেখে পলায়নপর, কাল এই কণ্টকাকীর্ণ
পথ পেরিয়ে যখন সাফল্যের শিখরে পৌঁছাব,
সেদিন
আমার এই অবহেলিত অতীতই হবে তাঁদের ললাটে এক অদৃশ্য দহন।
~~000~~
No comments:
Post a Comment