বাতায়ন/নারী না পুরুষ/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ
বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে
[১ম পর্ব]
নারী না পুরুষ
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে
[১ম পর্ব]
"এ আকাশ সে আকাশে এখন আগুন খোঁজে কামতাপুরী ভাওয়াইয়া গানের সুর! এমন সুন্দর একখানি মধুময় ভূমিখণ্ডের সাথেই তো জন্ম-জন্মান্তরের ঋণে জড়িয়ে যাওয়া যায়! গলায় এক আঁজলা অঞ্জলি জড়িয়ে গেয়ে ওঠা যায়, 'এই অরণ্য, নদী, পর্বত, নুড়ি-পাথরে ভরা এই ভূখণ্ড, আমার দেশ! আমার একার দেশ! মোর দেশ, মোর স্বর্গ!'"
এ আকাশ সে আকাশে এখন আগুন খোঁজে কামতাপুরী ভাওয়াইয়া গানের সুর! এমন সুন্দর একখানি মধুময় ভূমিখণ্ডের সাথেই তো জন্ম-জন্মান্তরের ঋণে জড়িয়ে যাওয়া যায়! গলায় এক আঁজলা অঞ্জলি জড়িয়ে গেয়ে ওঠা যায়, “এই অরণ্য, নদী, পর্বত, নুড়ি-পাথরে ভরা এই ভূখণ্ড, আমার দেশ! আমার একার দেশ! মোর দেশ, মোর স্বর্গ!”
কাল রাতে চা-বাগানে চিতা বেরিয়েছিল। আজ সকালে এ বাড়ির গোয়ালঘরের সামনে চিতার পায়ের ছাপ দেখেছে পার্বতী বর্মন। পার্বতী এ বাড়ির বড়ো বউ। সকালবেলায় গোয়ালে ধবলী গরুর দুধ দোয়াতে গিয়ে আধমরা রক্তাক্ত অবস্থায় গরুটাকে পড়ে থাকতে দেখে সে। দুদিনের বাছুরটাকে মুখে করে তুলে নিয়ে গেছে বাঘটা। সেই নিয়ে চিৎকার করে সে বাড়ি মাথায় করেছে। তার ত্রাহি চিৎকার শুনে আশপাশের ঘর থেকে লোকজন ছুটে এসে ছোটোখাটো একটা ভিড় জমিয়ে ফেলেছে ওদের উঠোনে।
হিংস্র শ্বাপদের গবাদি পশু শিকার এই জঙ্গলে হয়তো খুব সাধারণ একটা ঘটনা! আকছার ঘটে! তবু যে এই ঝুপড়িটার চারপাশে এই যে এত উদ্বেলতা, বিচলিত গুঞ্জন, বিষয়বস্তুর বিষণ্ণতা ব্যতিরেকে ভাঙা-ভাঙা কিছু রাজবংশী শব্দের স্থানিক বিস্ফোরণ এবং এই স্বভাবসুন্দর মায়াবী প্রকৃতি আর তার গা-সওয়া নিষ্ঠুরতার প্রশ্নে বেশ স্বস্তিদায়ক মধ্যবর্তী নিজস্ব একটা বলয় তৈরি করে নিতে চাওয়া—এগুলোকে শুধুই রহস্যময়ী এই অরণ্যের মাঝে ওঁত পেতে থাকা তামাম বিপদসংকুলতাকে এদের নিজেদের যূথবদ্ধতার বর্ম দিয়ে আটকে দেবার একটা মরিয়া প্রচেষ্টা বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারত। এই রহস্যময়ী অরণ্যের প্রাচীন সুর, স্বর আর শীতল আলস্যের গায়ে অনুচ্চারে লেগে থাকা বেদনার পারম্পরিক দ্বন্দ্বের আখ্যানে, ট্র্যাজিক উপাদান হিসেবে হয়তো তাকে আরও ভালো মানাত।
কিন্তু যারা জানার, তারাই শুধু জানে, এই লঘু জীবনে শুধু বয়ে যাওয়া কিছু মুহূর্তের কাছে কোলাহলপ্রিয় এই জটলাটা ঠিক কতটা আরামদায়ক এবং কিছু ক্ষেত্রে কতকটা মুখরোচকও! সেখানে শোক কিংবা ভীতি প্রদর্শন আর প্রাধান্য পায় না; বরং নিরাপত্তাহীনতা, সংশয় কিংবা উদ্বেগ—এসবের মাঝেই প্রকৃতির স্থিতিশীল নির্জনতা আর নির্বিকার খাদ্যশৃঙ্খলের মাঝে পড়ে, নিজেদের আব্রুহীন জীবনে সে যেন এক অবান্তর উদ্যাপন হয়ে ওঠে! সীমিত সাধ্যের এইসব জীবনগুলোয় ঘটে যাওয়া এরকম অধিকাংশ ঘটনায় যখন নিজেদেরই কোনো হাত থাকে না, তখন এইসব গল্প করে বা গল্প শুনে তবু তো মানবিক অনুভূতিগুলো সজাগ থাকে পূর্ণমাত্রায়!
কাল জঙ্গলে কাঠ কাটতে যাবার সময় পার্বতী হাতির পালের মুখে পড়েছিল। সে কথা হাত-পা নেড়ে এরই মধ্যে সে সকলকে বলতে শুরু করেছে। হাতি প্রায়ই এখানে জঙ্গল ছাড়িয়ে বসতির কিনারায় এসে পড়ে। সরু পাথুরে রাস্তায় এসে এমনভাবে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন সাক্ষাৎ মাশান দেব! মৃত্যুর ঠিক আগের রূপকের খোঁজে, মিছিল করে জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে ফেরার পথ ভুলেছে।
আসলে এই হিরণ্ময় উন্মুক্ত অরণ্যের মাঝে এদের আসা-যাওয়া তো এমনই! জঙ্গল যেন শুধু এদেরই! এই চরাচর জুড়ে খেলা করে বেড়ানো বালিহাঁস, ডাহুক, চোখগেল, পাপিয়া, দলছুট হাতিদের দল—এরাই তো জঙ্গলের গর্ভকাল নির্ধারণ করে। ডুয়ার্সের এই জঙ্গলটা বারবার যেন এই আদিম বন্যতাকে জন্ম দেয়, সযত্নে বড়ো করে তোলে, শারীরবৃত্তীয় শৃঙ্খলে বেঁধে পথভোলাদের ঘরে ফেরায়। আবার এদের গর্ভেই হয়তো সংক্রামিত প্রেম আর ভালোবাসার অনর্গল সঙ্গমে নতুন করে জন্ম নেয় এই মোহক বনাঞ্চল! এদেরই পাপহীন দেহে বিমর্ষ শিশুটির মতো ঘুমিয়ে থাকার ভান করে মুখ গুঁজে, চোখ বুজে পড়ে থাকে।
চন্দ্রাহত জ্যোৎস্নায় প্লাবিত এ জগৎ-সংসারে, রাতচোরা হুতোমের ধূসর চোখে জঙ্গলের সেই ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে-চেয়ে, কমলা জেগে থাকে সারারাত। তার ঝুপড়ির কয়েক কিলোমিটারের ভেতর কলকল কলাকৌশল আর স্রোতস্বিনী জাদুটোনার হাত ধরে তখন এক আচ্ছন্ন ঘুমের আবেশ তৈরি হয়। স্মৃতির নক্ষত্রেরা শিশিরভেজা জলছবি আঁকে তার ভাবনার ভিতর, নিদ্রাবিহীন স্বপ্নের ভিতর।
ঘরে তার প্রায় ডজনখানেক ছেলেমেয়ে। সাতটি ছেলে, পাঁচটি মেয়ে। শেষেরটির বয়স এখন কুড়ি দিন। নেহাতই দুধের শিশু! তবে তাতে ওর স্বামী হীরেন ঠিক যেন নিশ্চিন্ত হতে পারে না! আসলে এরা শুধু তো সন্তান নয়, ওদের কাছে বরং এরা এই বর্মন দম্পতির জন্য এদেশে ক্রমশ বাড়তে থাকা মৌলিক অস্তিত্বের শিকড়! এই বনাঞ্চল, পায়ের নিচের পাতালকক্ষ, মাথার উপরে অনন্ত সীমাহীন নক্ষত্রবীথি, পরিব্যাপ্ত মহাকাশ—এসবের মাঝে প্রতিস্থাপন করা একটা নিজস্ব ‘আমি’কে স্থায়ী নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করার অলংকার!
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment