বাতায়ন/নারী না পুরুষ/ধারাবাহিক
গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
ধারাবাহিক গল্প
রাখী সরদার
মাইনকা বেদের মাদুলি
[১ম পর্ব]
নারী না পুরুষ
ধারাবাহিক গল্প
রাখী সরদার
মাইনকা বেদের মাদুলি
[১ম পর্ব]
"এই বেদেরা একেবারেই ভালো নয়। কত কিছু ঝাড়ফুঁক জানে! সুযোগ পেলেই নাকি বাচ্চা চুরি করে। সুধা সে কারণে খামারে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। বাড়িতে বুড়ি শাশুড়ি আছে। কিন্তু তার ভরসায় বিভুকে রেখে আসতে পারল না।"
“বিভু, মুড়ি খেয়ে নে।”
“ওকেনে বসি বসি তাইলে কী করিস?”
এবার রমেশ ছেলের উদ্দেশ্যে বলে,
রমেশ আর সুধার নয়নের মণি বিভু। রমেশের নিজের কাটা দশেক জমি আছে। সেই জমিটুকু সে চাষ করে কোনোক্রমে পেট চালায়। মাটির ঘর। কাঠের দরজা নেই। বাঁশের আগড় দিয়ে দরজা। এই ধান ঝাড়ার মরশুমে সেই আগড় খুলে ধান ঝাড়ে। এই কাজে খুব কষ্ট, তবু তারা আনন্দেই কাজ করে। রমেশের একটাই চিন্তা, ছেলেকে মানুষ করতে হবে। ছেলেটি বেশ কিছুদিন জ্বরে ভুগছে। এত ডাক্তার দেখাচ্ছে, তবু অসুখে ভুগছে। সুধা খামারবাড়িতে ছেলেকে সঙ্গেই নিয়ে এসেছে।
এদিকে সুধার মনে আর এক ভয়। পূবের বিলপাড়ে একদল বেদে কিছুদিন হল আস্তানা গেড়েছে। সে ছোটো থেকেই শুনে এসেছে, এই বেদেরা একেবারেই ভালো নয়। কত কিছু ঝাড়ফুঁক জানে! সুযোগ পেলেই নাকি বাচ্চা চুরি করে। সুধা সে কারণে খামারে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। বাড়িতে বুড়ি শাশুড়ি আছে। কিন্তু তার ভরসায় বিভুকে রেখে আসতে পারল না। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে তো সেদিন বিভুও বেদের আস্তানায় চলে গিয়েছিল! সেই থেকে সুধা ছেলেকে চোখে চোখে রাখে।
বেদে সরদার মাইনকা বেদের মন ক’দিন খুবই অস্থির। কত জায়গায় তো তারা আস্তানা গেড়েছে। কত মানুষের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়েছে। কত ছেলেপিলে তাদের সাপ খেলা দেখার জন্য পিছে পিছে এসেছে। কত ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেদিন বিলপাড়ে দেখা বাচ্চাটার মুখ কিছুতেই ভুলতে পারে না।
“মা বিষহরি, তুমি আর কত খেলা দেকাইবেন! এমনই এক শীতের মরশুমে মোর প্রাণভোমরা, মোর একমাত্র ব্যাটা সুবলাকে তুমি কেড়ে লিলে! উ ছেলেটাকে ইকেবারে মোর বাছার মতো দেকতে! সব তো ভুলে ছিলম, মা। আজ ক্যানে মনে করালেন!”
মাইনকা বেদে তাঁবুতে বসে বসে তার মরে যাওয়া ছেলেটার কথা ভাবছিল। বউ সুন্দরী হাঁকডাক দিতে দিতে তাঁবুতে ঢোকে—
“সদ্দার, তু একুনো বসি আচিস! সুবাই যে বেইরে পড়ল। একুন চাষিদের ঘরে ঘরে ধান উটতিচে! মা বিষহরির গান গেয়ে গেয়ে ঘুরলিও কিচু চাল, খুদ পাব। চল, চল, সেজ্জে গুজ্জে লে।”
“সুন্দরী, তু যা। মোক বুলিস লাই। মোর মন ভালো লাই।”
সুন্দরী মাইনকা বেদের পাশে ধপ করে বসে পড়ে। বেদের মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে,
কথাগুলো বলতে বলতে সুন্দরী বেদেনি আকুল নয়নে কাঁদতে থাকে। তাকে কাঁদতে দেখে মাইনকা সুন্দরীকে সান্ত্বনা দেয়,
সুন্দরী উঠে কাপড়ের ঝুলিটা গোছগাছ করতে থাকে। মাইনকা শূকরের পালকে তেড়ে কচুবনে নামাতে থাকে। সুন্দরীদের দলে আরও চারজন বেদেনি আছে। প্রত্যেকের কাঁধে ঝোলা। তারা গ্রামের রাস্তা ধরে। হঠাৎ তাদের পিছন থেকে মাইনকা বেদের কণ্ঠস্বর শোনা যায়—
“সুন্দরী, একটুকুন দাঁড়া। মুই যাব।”
সুন্দরীদের দল দাঁড়িয়ে পড়ে। দলের সব থেকে কম বয়সি মেয়েটা ফিক করে হেসে ফ্যালে,
মাইনকা বেদে হাঁপাতে হাঁপাতে সুন্দরীদের সামনে এসে পড়ে। এখন আর তার গায়ে তেমন শক্তি নেই। একটুতেই হাঁফ ধরে যায়। বয়স হচ্ছে তো। সুন্দরী মাইনকা বেদেকে দেখে হতবাক! এর মধ্যে কখন সে তাঁবুতে গিয়ে চকরাবকরা হলুদ জামা পরেচে! উলুপি নাগের ঝাঁপিটাও নিয়েছে যে!
“তুই ইকেনে! মোর শুয়োরের পাল কুতা! তু কি সাপ খেলা দেকাইবি! একন লোকের সুময় কুতা! সব যে ধান ঝাড়তিচে! কে দেকবে তুর সাপ খেলা?”
“উরা কি পয়সা দিবে!”
“উরা ঘর থিকে চাল, আলু আনি দিবেকন।”
“তুই তবে গাঁয়ের দকিন পারে যা, সাপ খেলা দেকাতি। উদিকে একটা খেলার মাঠ আছেক। অনেক ছেলেপিলে পেয়ে যাবিক। মুরা গাঁয়ের ভেতরপানে যাই। বিষহরির গান শুনাইলে কিচু পাব বউঝিয়েদের কাচ থেকেন।”
মাইনকা বেদে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে হেঁটে যায়,
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment