প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Saturday, August 15, 2026

চাবিওয়ালা [১ম পর্ব] | রানা জামান

বাতায়ন/নারী না পুরুষ/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
ধারাবাহিক গল্প
রানা জামান
চাবিওয়ালা
[১ম পর্ব]

"জহির জবাব দেয় না কখনো। ওর কমতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল; সে-কারণে ও স্ত্রীর সাথে কখনো লাগে না। ছাপড়ার বাইরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ঢুকল ভেতরে। রান্না এখনো শেষ হয়নি। ও বিছানায় উঠে বসতেই সন্তান দুটো ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।"

 
আজ সারাদিন কামাই না হলেও জহিরের মন খারাপ নেই। মাঝেমধ্যে ওর এমনটা হয়ে থাকে। নো ওয়র্ক, নো আর্নিং! ওই দিনে সারাদিন কাটায় ও মোবাইল ফোনে গান শুনে এবং ফেসবুক ঘাটাঘাটি করে। কামাই না হওয়ায় ইণ্টারনেট খরচাটা বাজে খরচা হিসেবে থাকে। ও সকাল সাড়ে দশটায় এসে কাজে বসে; ডেরায় ফিরে যায় সন্ধ্যার পরপরই।
জহির ডুপ্লিকেট চাবি বানায়। কারো চাবি হারিয়ে গেলে তালাও খুলে দেয়-যে কোনো তালা। ও মিরপুর-১-এর মুক্তবাংলা শপিং সেণ্টারের আন্ডারগ্রাউন্ডে বসে। ও একা না, দু সারিতে ত্রিশ জন; ও যখন প্রথম বসেছিল, তখন ছিল দশ জন। এই সংখ্যা আরো বাড়ার সম্ভাবনা আছে; কারণ দু দিকে এখনো অনেক জায়গা খালি পড়ে আছে। এটা মূলত বেসমেন্টে পার্কিং। কিন্তু গাড়ি না ঢুকিয়ে বিভিন্ন সেকশনে ভাগ করে অস্থায়ী হকারদের কাছে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। দৈনিক ভাড়া তিনশো টাকা; ভাড়া বাকি রাখার কোনো সুযোগ নেই!
জহির হাঁটছে। কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে। আজ কামাই না হওয়ায় ওর মন খারাপ নেই। জহির প্রত্যেকদিন হেঁটেই ছাপড়া থেকে কামে আসে এবং কর্মস্থল থেকে ছাপড়ায় যায়। ওর ছাপড়টা মিরপুর মাজারের দুটো গলির পরে ওয়াশার একটি ময়লা নিষ্কাশন খালে বাঁশের খুঁটির উপরে সারি ধরে অনেক ছাপড়ার একটা। এই ছাপড়ার গুদামে অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। পুলিশের তাড়া খেয়ে অনেক দাগী আসামী ও বড়ো মাপের রাজনেতারাও এখানে লুকিয়ে স্বস্তির দম ফেলে। মাদকদ্রব্য কেনা-বেচার আখড়া অনায়াসে বলা যায়, সেবনেরও। কপালে হাসির পাত্র ও লজ্জা পাওয়া নিশ্চিত থাকলে সহবাসের সময় মাচা ভেঙে খালের নোংরা জলে পড়ে নাকানিচোবানি!
জহির মাজার পেরিয়ে একটা গলিতে ঢুকল হালকা-পাতলা হলেও লোকজনের যাতায়াত চলছে। একটা লোক দ্রুত হেঁটে জহিরের পাশাপাশি এলো। জহির আড়চোখে লোকটাকে একবার দেখে হাঁটতে থাকল নিজের মতো।
লোকটা ফিশফিশ করে বলল,
-একটা চাবি বানায়া দিবেন জহির ভাই?
জহির দুই কান থেকে হেডফোন খুলে বলল,
-আমি চাবি বানাই আপনে জানলেন ক্যামনে? আমার নাম জানলেন ক্যামনে?
লোকটি বলল,
-আমি মুক্তবাংলা শপিং সেণ্টারের আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়েছিলাম। আমার তালাটা স্পেশাল। সবাই বানাতে পারবো না। সবার কাজ দেখে মনে হইলো আপনি এক্সপার্ট কী মেকার। আপনে অহনই চলেন আমার সাথে। অনেক টাকা দিবো।
-কই যাইতে অইবো?
-নিকুঞ্জ।
-রাইতে আমি এত দূরে যাইতাম না ভাইসাব।
-দুই হাজার টাকা দিমু জহির ভাই। আমার নাম রুবেল।
-পাঁচ হাজার দিলেও রাইতে অত দূর যাইতাম না। দিনে আহেন, সকাল দশটায়।
-দশটায় না, নয়টায়। এইখানে আমি আপনের জন্য অপেক্ষা করব
কিছু না বলে জহির দুই কানে হেডফোন ঢুকিয়ে রওয়ানা দিলো খালপাড় বস্তির দিকে। ওর হাঁটার ছন্দ দেখে যে কেউ বলবে, ও নির্ভার, দুশ্চিন্তার কোনো ব্যাপার নেই অন্তরে। বস্তির কাছাকাছি এসে একটি মুদি দোকানে দাঁড়াল একটা সিগারেট কিনে ধরিয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে টানতে থাকল সিগারেট টানা শেষ হলে দুই সন্তানের জন্য দুটো ললিপপ কিনে ফের রওয়ানা দিল ডেরার দিকে।
সন্তান দুটো ছাপড়ার বাইরে অপেক্ষা করছিল, হয়তো-বা বাবার জন্য। বড়োটা পাঁচ বছরের মেয়ে, নাম আছিয়া; ছোটটার বয়স তিন বছর, নাম জুয়েল। ওরা ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল বাম হাতে দুই সন্তানকে জড়িয়ে রেখে পকেট থেকে ললিপপ বের দুই সন্তানের হাতে দিল বাবাকে ছেড়ে দিয়ে দুই সন্তান ললিপপ চাটতে চাটতে ঢুকে গেল ছাপড়ার ভেতরে
জহির ছাপড়ার ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে আবেদা ওকে এক ঝলক দেখে বলল,
-আইজও তোমার কামাই হয় নাই। ঠিক কিনা?
কাঁধের ব্যাগটা বেড়ায় ঠেস দিয়ে রাখতে রাখতে ম্লান কণ্ঠে বলল জহির,
-হ।
-তোমারে কতবার কইছি চাবি বানানোর কাম বাদ দিয়া ঠেলায় শাকসবজি বেচলেও দৈনিক কয়ডা টাকা আসত হাতে। কিন্তু তুমি আমার কথা হুনবা না; কারণ, তোমারে বইসা থাকার ব্যারামে ধরসে! আমার কুনু বিশ্রাম নাই! সারাদিন মাইনসের বাড়িতে কাম করতে করতে শেষ হয়া যাইতাছি।
জহির জবাব দেয় না কখনো। ওর কমতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল; সে-কারণে ও স্ত্রীর সাথে কখনো লাগে না। ছাপড়ার বাইরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ঢুকল ভেতরে। রান্না এখনো শেষ হয়নি। ও বিছানায় উঠে বসতেই সন্তান দুটো ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তিনজন বিছানায় হাসতে হাসতে হুটোপুটি খেতে লাগল
ভাতের ফ্যান গেলে আবেদা বিছানার কাছে এসে বলল,
-আমি কী দোষ করলাম!
বলে আবেদা ঝাঁপিয়ে পড়ল তিনজনের উপরে। এবার চারজনের হুটোপুটি চলতে থাকল বিছানার এ মাথা থেকে ও মাথায়। এই পরিবারের প্রাণখোলা আনন্দ পুরনো চৌকিটা সইতে পারল না- হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়লে ওরা প্রথমে হতভম্ব হলেও ব্যাপার বুঝতে পেরে জহির ও আবেদা গলা ফাটিয়ে হাসতে থাকলেও দুই শিশু ভয় পেয়ে শুরু করল কান্না।
চৌকি ভেঙে পড়ার শব্দ, অট্টহাসি ও শিশুদের কান্না শুনে আশেপাশের ছাপড়া থেকে বয়স নির্বিশেষে নারী-পুরুষ ছুটে এলো এই ছাপড়ার সামনে। একেকজন নিজ নিজ ভাবনা অনুযায়ী প্রশ্ন করতে লাগল:
-কী হইলো আবেদা?
-কীসের শব্দ হুনলাম?
-খাট ভাঙল নাকি?
-নাকি ছাপড়া ভাঙল?
-রাইত না হইতেই শুরু কইরা দিছস জহির‍্যা?
-লাজ-শরমের মাথা খাইছস?
তখন জহির ও আবেদা দুই সন্তানকে কোলে নিয়ে বাইরে এলে চুপসে গেল সবাই। জহির ঘটনা বললে হতোদ্যম হয়ে একে একে চলে গেল সবাই।
পরদিন সকাল নটায় জহির ওই গলির মুখে এসে ফুকতে থাকল সিগারেট। দুই কানে আগের মতোই আছে হেডফোন।
পেছন থেকে রুবেল বলল,
-কী গান শুনতাছেন জহির ভাই?
হঠাৎ পেছনে কথা শুনে ভয় পেয়ে এক লাফ দিয়ে ঘুরে রুবেলকে দেখে নিজ বুকে একবার থুথু দিয়ে বলল,
-কেডা আফনে? ভূতের মতো পিছনে আইসা কথা কইলেন ক্যান?
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)