বাতায়ন/নারী না পুরুষ/প্রবন্ধ/৪র্থ
বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
প্রবন্ধ
এম.এম. সাইফুল ইসলাম
ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে কিছু ভ্রান্ত ধারণা
নারী না পুরুষ
প্রবন্ধ
এম.এম. সাইফুল ইসলাম
ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে কিছু ভ্রান্ত ধারণা
"যার যুক্তি যত চটকদার, যার বক্তৃতা যত আকর্ষণীয়, তার অনুসারী তত বেশি। ফলে ধীরে ধীরে সত্যের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে জনপ্রিয়তা, অথচ ইসলামে সত্যের মাপকাঠি হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর নির্দেশনা।"
রাজনীতি যদি ইসলামের জন্যই হয়, যদি উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর দীনকে প্রতিষ্ঠা করা, তাহলে একটি প্রশ্ন বারবার আমার হৃদয়কে নাড়া দেয়—ইসলামের রাজনীতি কি কখনো ইসলামবিরোধী কোনো কাজকে সমর্থন করতে পারে? রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে হারামকে হালাল, অন্যায়কে ন্যায় কিংবা আপসকে কৌশল বলে চালিয়ে দেওয়া কি আদৌ ইসলামি আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
আমরা এমন এক মানসিকতার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে আল্লাহর বিধান যদি আমাদের পছন্দের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে আমরা সেটাকে বরণ করি। কিন্তু যখন সেই বিধান আমাদের প্রবৃত্তি, রাজনৈতিক স্বার্থ বা ব্যক্তিগত সুবিধার বিরুদ্ধে যায়, তখন আমরা ব্যাখ্যার আশ্রয় খুঁজি। কখনো আধুনিকতার দোহাই দিই, কখনো বাস্তবতার কথা বলি, কখনো রাজনৈতিক প্রয়োজনের কথা বলি। অথচ একজন মুমিনের প্রথম পরিচয় হলো—সে আল্লাহর আদেশের কাছে আত্মসমর্পণকারী।
নেতারা ভুল করতেই পারেন। মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ইসলামও এমন দাবি করে না। কিন্তু ভুল হয়ে যাওয়ার পর তা স্বীকার করা এবং সংশোধন করা এক জিনিস, আর জেনেশুনে সেই ভুলকে রক্ষা করা আরেক জিনিস। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা অনেক সময় ব্যক্তিকে সত্যের ওপরে স্থান দিই। আমার নেতা, আমার দল, আমার সংগঠন—এই পরিচয়গুলো এত বড়ো হয়ে যায় যে সত্যকেও তার পেছনে দাঁড়াতে হয়।
একজন মুসলিমের দায়িত্ব সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, ব্যক্তি বা দলের পক্ষে নয়। কারণ কিয়ামতের ময়দানে আমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে না আমরা কোন দলের ছিলাম; জিজ্ঞাসা করা হবে আমরা সত্যের সঙ্গে ছিলাম কি না।
যখন কোনো ইসলামবিরোধী কাজের সমালোচনা ওঠে, তখন অনেকেই সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা কিংবা আন্তর্জাতিক চাপকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। বাস্তবতা অবশ্যই আছে, সীমাবদ্ধতাও আছে। কিন্তু সীমাবদ্ধতা কখনো হারামকে হালাল বানিয়ে দেয় না। দুর্বলতা স্বীকার করা আর অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া এক বিষয় নয়।
আমি যখন রাসূলুল্লাহ-এর জীবন অধ্যয়ন করি, তখন নিজের দিকে তাকাতে লজ্জা লাগে। তিনি এমন এক সমাজে এসেছিলেন, যেখানে মূর্তিপূজা ছিল, সুদ ছিল, জুলুম ছিল, নারী নির্যাতন ছিল, নৈতিক অবক্ষয় ছিল। কিন্তু তিনি কি কখনো কুরাইশদের আদর্শকে গ্রহণ করে ইসলাম প্রচার করেছেন? তিনি কি কখনো বলেছেন, “এখন পরিস্থিতি খারাপ, তাই কিছু বিষয়ে আপস করি?” ইতিহাস সাক্ষী, তিনি কখনো তা করেননি।
তিনি সত্যকে সত্য হিসেবেই তুলে ধরেছেন। মানুষ প্রথমে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছে, কষ্ট দিয়েছে, নির্যাতন করেছে। কিন্তু তিনি নীতির সঙ্গে আপস করেননি। কারণ তিনি জানতেন, সাময়িক সফলতার জন্য আদর্শ বিসর্জন দিলে শেষ পর্যন্ত আদর্শও হারায়, সফলতাও হারায়।
আজ আমরা মানুষের দ্বারে দ্বারে যাই। কিন্তু আমাদের আলোচনার বড়ো অংশ জুড়ে থাকে নির্বাচন, ক্ষমতা, জোট, কৌশল এবং রাজনৈতিক হিসাব। অথচ রাসূল মানুষের কাছে গিয়েছেন আল্লাহর পরিচয় নিয়ে, আখিরাতের বার্তা নিয়ে, ঈমানের আহ্বান নিয়ে। তিনি মানুষকে আগে আল্লাহর বান্দা বানিয়েছেন, পরে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর নেতৃত্ব গ্রহণ করেছে।
সম্ভবত এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড়ো ঘাটতি। আমরা অনেক সময় রাষ্ট্র পরিবর্তনের কথা বলি, কিন্তু মানুষ পরিবর্তনের কথা ভুলে যাই। অথচ রাষ্ট্র মানুষের সমষ্টি। মানুষ বদলালে সমাজ বদলায়, সমাজ বদলালে রাষ্ট্রও বদলায়।
আজ বড়ো আপশোশ হয় যখন দেখি, আমরা নিজেদের সুবিধামতো ইসলামকে ব্যাখ্যা করি। যেটা আমার স্বার্থের পক্ষে যায়, সেটাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা বলে মনে হয়। আর যা বিপক্ষে যায়, সেটাকে আমরা মতভেদ, ইখতিলাফ বা ব্যাখ্যার আড়ালে লুকিয়ে ফেলি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। কয়েকটি ভিডিও, কয়েকটি পোস্ট বা কিছু বক্তব্য শুনেই আমরা নিজেকে চূড়ান্ত বিচারক মনে করতে শুরু করি।
ইসলাম আবেগের ধর্ম নয়, আবার অন্ধ অনুসরণের ধর্মও নয়। ইসলাম হলো দলিল, ইলম, তাকওয়া ও আত্মসমর্পণের ধর্ম। তাই ইসলামকে বুঝতে হলে আলেমদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জ্ঞান, কুরআন ও সুন্নাহর আলো এবং সালাফে সালিহীনের পথ অনুসরণ করতে হবে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, আমরা যদি ক্ষমতার মোহ কিছুটা হলেও ত্যাগ করতে পারি, যদি দশ-বিশ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে মানুষের হৃদয়ে ঈমানের আলো পৌঁছে দেওয়ার কাজে আত্মনিয়োগ করি, তাহলে একদিন পরিবর্তন নিজেই আমাদের দরজায় এসে কড়া নাড়বে। তখন মানুষকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে হবে না; মানুষ নিজেই ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় খুঁজবে।
আমাদের মনে রাখা উচিত, ইসলামকে আমাদের ছাঁচে গড়ে তোলার জন্য আল্লাহ পাঠাননি। বরং আমাদেরই ইসলামের ছাঁচে গড়ে উঠতে হবে। ইসলামকে আধুনিকতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই; বরং আধুনিক মানুষকেই ইসলামের সৌন্দর্য ও পূর্ণতার কাছে ফিরে আসতে হবে।
এই কথাগুলো লিখতে গিয়ে বুক হালকা হয় না, বরং আরও ভারী হয়ে ওঠে। কারণ সমস্যাগুলো কেবল সমাজের নয়, আমাদের নিজেদেরও। তবু লিখলাম। কারণ সত্য জেনেও নীরব থাকা কখনো কখনো মিথ্যার সহযোগী হয়ে যাওয়ার নামান্তর। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্যকে সত্য হিসেবে চেনার, তা গ্রহণ করার এবং তার ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
~~000~~

No comments:
Post a Comment