বাতায়ন/নারী না পুরুষ/ধারাবাহিক
গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
ইজ্জত আলীর কষ্ট
[১ম পর্ব]
"এমন এক সময়ে ইজ্জত আলীকে কাজে লাগানো হয়েছিল যে সময়ে করিমা বেগমকে কেউ একটি পয়সা দিয়েও সাহায্য করেনি। এই ইব্রাহিম মোল্লাই প্রথম সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন। তাৎক্ষণিক মূহূর্তে করিমা বেগমের চিকিৎসা-সেবা, ইজ্জত আলীকে কাজে লাগানো এবং নগদ অর্থ দিয়েছিলেন তিনি।"
খুব
ভোরে উঠে রওনা দিতে হয় ইজ্জত আলীকে। বাড়ি থেকে কারখানা প্রায় কুড়ি কিলোমিটার। তিন-চার কিলোমিটার হাঁটা
পথ। বাকিটা অটো কিংবা ইজি বাইকে করে শহরে পৌঁছাতে হয়। সকালে কিছু খাবার জুটলে খেয়ে
দুপুরের খাবারটি সাথে নেয়। শহরে সে একটি লেদ কারখানায় কাজ করে। বয়স বারো-তেরো হবে হয়তো। এই
বয়সে কাজ করে মা’কে দেখা কম কথা নয়। যে বয়সে স্কুলের বারান্দায় সহপাঠীদের সাথে হই
হুল্লোর করার কথা; যে বয়সে তাকে ডাক্তার
কিংবা প্রকৌশলী হওয়ার রচনা লেখার কথা, সে বয়সে তাকে পেটের দায়ে সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
বাবার
আদর কাকে বলে ইজ্জত আলী কখনোই অনুভব করেনি। তার জন্মের পরই বাবা-মা ছাড়া ছাড়ি হয়।
সেই থেকেই বাবা নিরুদ্দেশ। মা’ই তাকে বড়ো করেছে। বাবার হয়তো মনেই নেই। মানুষের
বাড়িতে কাজ করে মা-ছেলে কোন মতে খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করে। কিন্তু বছর
দু’য়েক হলো কাজ করে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় করিমা বেগমের একটি পা ভেঙে যায়। আর
চলা-ফেরা করতে পারেনা না। অগত্যা ইজ্জত আলীকে কারখানায় কাজে লাগিয়ে দেন।
আজ
সময়ের আগেই এসেছে ইজ্জত আলী। অনেক কাজের অর্ডার আছে। কাজগুলো শেষ করতে হবে। মহাজন খুব
তাগাদা দিয়েছেন। এমনি তো গরমের দিন, তার উপর কাজের চাপ। মেটাল কাটিং টুলের সাহায্যে সুনির্দিষ্ট আকৃতি ও মাপের কাজ
করছে। গরমে শরীর থেকে দরদর করে নোনা ঘাম ঝরিয়ে পড়ছে। চা খাওয়ারও ফুরসত নেই। সে লেদ
কারখানায় গত দু বছরে ইতোমধ্যে অনেক কাজ রপ্ত করেছে। টার্নিং, ফেসিং, ড্রিলিং, থ্রেডিং, নালিং, টেপার টার্নিং, বোরিং ইত্যাদি।
শুরুতেই
ইজ্জত আলীর মাসিক মজুরি ছিল ছ হাজার টাকা। গত মাস থেকে বেতন দু হাজার বাড়িয়ে আট
হাজার টাকা করা হয়েছে। লেদ মালিকরা সচরাচর ভালো হন না। কিন্তু ইব্রাহিম মোল্লা অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ, ধার্মিক। ইজ্জত আলী কাজে
যোগদানের পর থেকেই তাঁকে অনেক ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। কিছু কিছু মানবাধিকার
সংস্থা শ্রম আইনের কথা বলেছে। তারা বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, শ্রম আইনে শিশু শ্রম বেআইনি ও দন্ডনীয় অপরাধ। ইব্রাহিম
মোল্লা আইনকে শ্রদ্ধা করেন। কিন্তু করিমা বেগমের আকুতি ও ইজ্জত আলীর মলিন চেহারার
দিকে তাকিয়ে তিনি আর না করতে পারেননি। পেট তো আইন বোঝে না। এটা ইজ্জত আলীর
ক্ষেত্রে আইনসিদ্ধ ছিল। তাইতো ইজ্জত আলীর পক্ষ নিয়ে জোরাল প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন
সেদিন।
এমন এক
সময়ে ইজ্জত আলীকে কাজে লাগানো হয়েছিল যে সময়ে করিমা বেগমকে কেউ একটি পয়সা দিয়েও
সাহায্য করেনি। এই ইব্রাহিম মোল্লাই প্রথম সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন। তাৎক্ষণিক
মূহূর্তে করিমা বেগমের চিকিৎসা-সেবা, ইজ্জত আলীকে কাজে লাগানো এবং নগদ অর্থ দিয়েছিলেন তিনি। সমাজে এখনো কিছু
নিন্দুক আছে যারা কোন সাহায্য দিবেন না বরং আইন ও হালাল-হারাম নিয়ে অনেক ফাঁকা
বুলি দিবেন। আবেগ ও বাস্তবতা রাত আর দিনের মতো পার্থক্য।
আজ
মাসের প্রথম সপ্তাহ। বেতন পেয়েছে ইজ্জত আলী। মহাজনের নিকট একদিন ছুটিও নিয়েছে
মা’কে ডাক্তার দেখাবে বলে। তাড়াতাড়ি যেতে হবে আজকে তাকে। এদিকে কাজের চাপও বেশি।
মন একদিকে পড়ে আছে অসুস্থ মায়ের কাছে। অন্যদিকে কাজ শেষ করতে হবে। কাজের প্রতি তার
অত্যন্ত শ্রদ্ধাবোধ। সে বুঝত,
যে বয়সে
কাজ করলে দুটো পয়সা কামাই হবে সে বয়সটুকু নষ্ট করতে নেই।
আজকাল
উপজেলা শহরেও মোটামুটি ভালো ডাক্তার বসেন। তবে হাড়ের ডাক্তার অত ভালো পাওয়া যায় না।
প্রথমত গ্রামের হাতুড়ি কবিরাজ দেখানোর কারণে পায়ের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছিল।
তবে এখন অনেকটা ভালো। শুরুতেই হাড়ের ডাক্তার দেখানো হলে অত সমস্যা হত না। তারপরও ডাক্তারের
সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সেরে উঠতে সময় লাগবে হয়তো। জেলা শহরে নিয়ে গেলে
আরো ভালো ডাক্তার মিলত। কিন্তু পয়সা সংকুলান হবে না। বড় শহরে ডাক্তারের যত ভিজিট, তার উপর বিভিন্ন ধরণের
পরীক্ষা-নিরীক্ষা তো আছেই। তিন মাসের অগ্রীম বেতনেও কুলাবে না।
মা
ছাড়া ইজ্জত আলীর কেউ নেই। উপরে আল্লাহ, নিচে মা। এইটুকু বয়সেও মায়ের প্রতি এত ভালোবাসা, এত দরদ। কারখানার পাশে একটি মুদি দোকানে বিভিন্ন ওয়াজ বাজত কাজের
মধ্যেও কানে ভেসে আসা ওয়াজ শুনত। একদিন মায়ের ওয়াজ শুনে তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে
পড়েছিল। ওয়াজে শুনেছে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত। শুধু কি তাই, সন্তানের চামড়া দিয়ে মায়ের
জন্য জুতা বানিয়ে দিলেও নাকি এক ফোঁটা দুধের দাম পরিশোধ হবে না। এই ওয়াজটি শোনার
পর থেকে মায়ের উপর তার ভালোবাসা আরো বেড়ে গিয়েছিল।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment