বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
আদিত্য ভৌমিক
মায়ের আগমনী
[১ম পর্ব]
ঢাকের শব্দ ধীরে ধীরে চারপাশের নীরবতা ভেঙে দিল। ধূপের ধোঁয়া উঠতে লাগল। শঙ্খধ্বনিতে চারদিক মুখর হয়ে উঠল। মায়ের মুখের আবরণ সরানোর মুহূর্ত এল। হঠাৎ পুরো মণ্ডপ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে দেবীর মুখের আবরণ সরানো হলো। মায়ের চোখ যেন সবার দিকে তাকিয়ে আছে।
শরতের
আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। নীল আকাশের বুক জুড়ে তুলোর মতো মেঘগুলো যেন আপন মনে ভেসে
বেড়াচ্ছে। কাশফুলের দোলায় চারপাশ হঠাৎ করেই নতুন রঙে সেজে উঠেছে। ভোরের বাতাসে
শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ, শিশিরভেজা ঘাসের ওপর
সূর্যের কোমল আলো আর দূরে কোথাও ভেসে আসা ঢাকের মৃদু আওয়াজ—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন
একটাই সংবাদ দিচ্ছে, মা আসছেন।
শহরের
এক ছোট্ট পাড়ার নাম শিউলিতলা। পাড়াটি খুব বড় নয়। অল্প কয়েকটি গলি, পুরোনো কিছু বাড়ি, মাঝখানে একটি ছোট মাঠ আর
মাঠের এক কোণে বহু বছরের পুরোনো একটি দুর্গামণ্ডপ। কিন্তু দুর্গাপূজার সময় এই
ছোট্ট পাড়াটিই যেন হয়ে উঠত এক বিশাল আনন্দের নগরী।
প্রতিবছর
পূজার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই পাড়ার মানুষের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যেত। কেউ বাঁশ আনত, কেউ মণ্ডপ সাজানোর কাজে
ব্যস্ত থাকত, কেউ প্রতিমা আনার
ব্যবস্থা করত। বাড়ির ছাদে ছাদে আলো লাগানো হতো। ছোটরা নতুন জামাকাপড় নিয়ে
গল্প করত। তরুণেরা রাত জেগে মণ্ডপ সাজাত। মহিলারা বাড়িতে নানা রকমের রান্নার
পরিকল্পনা করতেন। সন্ধ্যা নামলেই শিউলিতলার রাস্তায় শোনা যেত ঢাকের শব্দ। ধূপের
গন্ধে বাতাস ভরে উঠত। মণ্ডপের সামনে আলপনায় ফুটে উঠত পদ্ম, শঙ্খ,
ধানের শিষ
আর নানা শুভচিহ্ন।
কিন্তু
সেই বছর পরিস্থিতি ছিল অন্যরকম। পাড়ার সবচেয়ে পুরোনো দুর্গামণ্ডপটি দীর্ঘদিনের
অবহেলায় প্রায় ভেঙে পড়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছিল। ছাদের এক অংশে ফাটল ধরেছিল।
বাঁশগুলো ছিল দুর্বল। বৃষ্টির পানি ঢুকে দেয়ালের রং উঠে গিয়েছিল। সবচেয়ে বড় সমস্যা
ছিল অর্থের অভাব। পাড়ার কয়েকজন প্রবীণ মানুষ এক সন্ধ্যায় মণ্ডপের সামনে বসে আলোচনা
করছিলেন। একজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
-এভাবে তো আর পূজা করা সম্ভব
নয়।
আরেকজন
বললেন,
-মণ্ডপটা নতুন করে তৈরি করতে
অনেক টাকা লাগবে। এত টাকা কোথা থেকে আসবে?
তৃতীয়জন
ধীরে ধীরে বললেন,
-হয়তো এবার পূজাটা ছোট করেই
করতে হবে।
কথাগুলো
পাশেই দাঁড়িয়ে শুনছিল বারো বছরের ছেলে অয়ন। অয়ন ছোটবেলা থেকেই দুর্গাপূজাকে খুব
ভালবাসে। তার কাছে পূজা মানে শুধু নতুন জামা নয়, শুধু মণ্ডপের আলো নয়, শুধু আনন্দ আর ঘোরাঘুরি নয়। তার কাছে দুর্গাপূজা মানে মায়ের
সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের সম্পর্ক।
সেদিন
রাতে অয়ন বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার ঠাকুমা বিষয়টি বুঝতে পেরে
জিজ্ঞেস করলেন,
-কী হয়েছে রে অয়ন? আজ এত চুপচাপ কেন?
অয়ন একটু
ইতস্তত করে বলল,
-ঠাকুমা, টাকা না থাকলে কি মা দুর্গা
এবার আমাদের পাড়ায় আসবেন না?
ঠাকুমা
মৃদু হেসে অয়নের মাথায় হাত রাখলেন।
-মা কি কখনো টাকার কাছে আসেন
রে?
অয়ন
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ঠাকুমা বললেন,
-মা আসেন মানুষের ভালবাসায়।
যেখানে মানুষের মন এক হয়, যেখানে মানুষ একে
অপরের পাশে দাঁড়ায়, সেখানেই তো মায়ের
আসন।
অয়ন
কিছু বলল না। কিন্তু ঠাকুমার কথাগুলো তার ছোট্ট মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল। সেই রাতেই
সে একটা সিদ্ধান্ত নিল। পূজা বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না। পরদিন সকালেই অয়ন পাড়ার
কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। কারও বাড়িতে গিয়ে বলল,
-কাকু, মণ্ডপটা আমরা নিজেরাই বানাব। আপনি একটু সাহায্য করবেন?
কেউ
দিল বাঁশ। কেউ দিল দড়ি। কেউ দিল রং। কেউ দিল ফুল। কেউ দিল এক মুঠো চাল। কেউ দিল
নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য টাকা। আর কেউ টাকা দিতে না পারলেও বলল,
-আমার টাকা নেই বাবা, কিন্তু আমার হাত দুটো তো আছে।
কাজ করতে পারি।
এই
কথাটা শুনে অয়নের মুখে হাসি ফুটে উঠল। কয়েকদিন আগেও যে পাড়ার মানুষগুলো নিজেদের
ছোটখাটো অভিমান নিয়ে আলাদা হয়ে থাকত, তারা একে একে মণ্ডপের কাজে যোগ দিতে শুরু করল। পাড়ার এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি বহু বছর ধরে কারও সঙ্গে
তেমন কথা বলতেন না। একদিন তিনিও মণ্ডপের সামনে এসে দাঁড়ালেন। অয়ন তাঁকে দেখে অবাক
হয়ে বলল,
-কাকু, আপনিও এসেছেন?
লোকটি
মৃদু হেসে বললেন,
-মায়ের মণ্ডপ বানাতে কি অভিমান
করে ঘরে বসে থাকা যায়?
তারপর
তিনি বাঁশ কাঁধে তুলে কাজে লেগে গেলেন। অয়ন সেদিন প্রথমবার বুঝল কখনও কখনও একটি ছোট্ট
শিশুর বিশ্বাসও বড় মানুষদের হৃদয় বদলে দিতে পারে। পাড়ার এক ধনী মানুষও ছিলেন, যিনি সাধারণত এসব আয়োজন থেকে
দূরে থাকতেন। তিনিও খবর পেলেন যে অয়নদের উদ্যোগে মণ্ডপ তৈরি হচ্ছে। তিনি এসে বললেন,
-যে কাজ এত মানুষকে এক করতে
পারে, সেই কাজে আমারও অংশ
থাকা উচিত।
তিনি
প্রয়োজনীয় খরচের বড় একটি অংশ বহন করার দায়িত্ব নিলেন। তারপর যেন শিউলিতলায় এক নতুন
সকাল শুরু হলো। দিনের পর দিন সবাই মিলে কাজ করতে লাগল। কেউ মণ্ডপে বাঁশ বাঁধছে। কেউ
দেয়ালে রং করছে। কেউ আলপনা আঁকছে। কেউ ফুল দিয়ে সাজাচ্ছে। কেউ বিদ্যুতের আলো
লাগাচ্ছে। ছোটরা কাগজের ফুল বানাচ্ছে। বৃদ্ধরা বসে বসে পরামর্শ দিচ্ছেন। মহিলারা
কাজ করা মানুষদের জন্য পানি,
চা আর
খাবারের ব্যবস্থা করছেন।
অয়ন
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সবার সঙ্গে কাজ করে। কখনও রং হাতে নেয়, কখনও ফুল সাজায়, কখনও ছোটদের নিয়ে আলপনা আঁকে।
তার মনে তখন একটাই আনন্দ মা আসবেন। অবশেষে এল মহাষষ্ঠী। সন্ধ্যার সময় মণ্ডপে
মানুষের ভিড় জমতে শুরু করল। ঢাকের শব্দ ধীরে ধীরে চারপাশের নীরবতা ভেঙে দিল। ধূপের
ধোঁয়া উঠতে লাগল। শঙ্খধ্বনিতে চারদিক মুখর হয়ে উঠল। মায়ের মুখের আবরণ সরানোর
মুহূর্ত এল। হঠাৎ পুরো মণ্ডপ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে দেবীর মুখের আবরণ সরানো
হলো। মায়ের চোখ যেন সবার দিকে তাকিয়ে আছে। অয়ন অনেকক্ষণ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে
রইল। তার মনে হলো, মায়ের চোখে শুধু
আশীর্বাদ নেই আছে একটি প্রশ্নও। যেন মা বলছেন,
-তোমরা কি একে অপরের পাশে
থাকবে?
অয়নের
চোখ ভিজে উঠল। সে মনে মনে বলল,
-মা, আমরা থাকব।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment