বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
কামাল কাদের
কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না
[১ম পর্ব]
সিরাজ ঘরে ঢুকেই চমকিয়ে উঠল, যা ভেবেছিল তাই হোলো, এ তো শাহনাজ! মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে। এক কালে তার অতি প্রিয় মানুষ। ছাত্রজীবনে সে ছিল তার ধ্যানধারণা। কত নিশিদিন কাটিয়েছে তারই তপস্যায়।
ওয়েলস
দেশটি যুক্তরাজ্যের একটি অঙ্গরাজ্য। রেক্সহাম শহরটি
রাজধানীর কার্ডিফ শহরের তুলনায় অনেক ছোট।
শহরটি
রাজধানী থেকে বেশ কিছু দূরে। ডাক্তার সিরাজুল ইসলাম যখন চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট চিঠিখানা
পেল তখন ভাবল এই ডাক্তারির ‘গ্রুপ প্র্যাক্টিসের’ চাকরিটা নিবে কিনা। আজকাল বিদেশি ডাক্তারদের যা অবস্থা সে কথা ভেবে
চাকরিটা গ্রহণ করবে বলে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিল। একদিন সময়মতো তল্পিতল্পা নিয়ে রেক্সামে হাজির হলো। আশেপাশের
প্রাকৃতিক পরিবেশ, পরিষ্কার-পরিছন্ন রাস্তাঘাট সব
মিলিয়ে ডাক্তার সিরাজের কাছে শহরটিকে ভালই লাগল।
আসার
আগে যতটা নিরুৎসাহ বোধ করছিল ততটা আর মনে হলো না। শহরের মাঝখানে একটা চত্বর রয়েছে
যেখানে স্থানীয় লোকদের শপিং সেন্টার। সেখানে বুটস, টেস্কো,
সেন্সবারী, ব্যাংক পোস্টঅফিস প্রভৃতি
নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকান রয়েছে। বড় বড় সুপার মার্কেটগুলোতে বাজার করতে
চাইলে ড্রাইভিং করে অনায়াসে কার্ডিভে এসে তা করা যায়। শহর থেকে কিছু দূরে একটা
টেকনিকেল কলেজ এবং একটা জেনারেল হাসপাতালও রয়েছে। শহরের হেলথ সেন্টারের ভিতরে রোগী
দেখার চেম্বার। এ দেশে এই ব্যবস্থাকে ‘সার্জারি রুম’ বলে থাকে। সকাল-সন্ধ্যায় রোগী দেখা, আর ‘কল’ থাকলে রোগীর বাড়িতে গিয়ে
রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা করা, এই হলো ডাক্তার সিরাজের কাজ। কিছুদিনের মধ্যেই ডাক্তার সিরাজ লক্ষ্য করল যে, সে এই ছোট্ট শহরে বেশ জনপ্রিয়
হয়ে পড়েছে। যদিও সে বাদামি রঙের মানুষ তবুও এখানকার জনগণ তাকে যেভাবে গ্রহণ করেছে
তা দেখে সে রীতিমতো অভিভূত হয়ে পড়েছে। দোকানে, বাজারে,
রাস্তাঘাটে, কেউ না কেউ বলছে— গুড মর্নিং ডক্টর, হাউ আর ইউ ডক্টর? আজকের দিনটি খুব সুন্দর, তাই না ডক্টর? ইত্যাদি।
একদিন
স্থানীয় পার্কে একটা বেঞ্চিতে ডক্টর সিরাজ বসে ছিল। হঠাৎ করে একটা ছোট্ট মেয়ে তার
মা’র হাত থেকে মুক্ত হয়ে
সিরাজকে জড়িয়ে ধরে তার মা’কে চিৎকার করে বলছে, "মামী, মামী লুক মাই ডক্টর।"
প্রায়ই এরকম ঘটনা ঘটার ফলে সিরাজ মাঝে মাঝে ভাবে চাকরিটা নিয়ে সে ভালই করেছে।
অন্তত কালো-সাদার বিভেদটা লন্ডনের মতো
এখানে এতটা প্রকট না।
শনিবার
দিন। অন্যান্য দিনের মতো ‘সার্জারি’ শেষ করে সিরাজ ঘরে ঢুকতেই ল্যান্ড লাইনের টেলিফোনটা বেজে
উঠল। একান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও
সে রিসিভারটা ওঠাল।
-ডক্টর ইসলাম স্পিকিং।
সিরাজ
বলল। অপর প্রান্ত থেকে
একটা বাচ্চা মেয়ের কান্নার শব্দ ভেসে এলো।
-ডক্টর ইসলাম হিয়ার।
সিরাজ
আবার বলল। সেই একই ধরণের কান্না
আর কান্না। কচি কণ্ঠ। সিরাজ অবস্থাটা সিরিয়াস মনে করে সান্ত্বনার সুরে বলল,
-ডু নট ক্রাই, টেল মি ইওর প্রব্লেম প্লিজ।
মেয়েটি
আশ্বস্ত হয়ে ইংরেজিতে বলল।
-আমার নাম রোজি হক, আমার মা একনাগাড়ে অনেকগুলো
ওষুধের বড়ি খেয়েছে এখন সে অজ্ঞান অবস্থায় রয়েছে। আপনি কি দয়া করে আমাদের বাসায়
আমার মা’কে
একটু দেখতে আসবেন?
মেয়েটি
যথারীতি নিজেকে সংযত করে কথাগুলো বলে গেল।
-নিশ্চয়ই আমি আসব, তুমি কি তোমাদের বাড়ির ঠিকানাটা
বলতে পার?
সিরাজ
রোজিকে জিজ্ঞাসা করল। বাড়ীর ঠিকানাটা নিয়ে সিরাজ অনিতিবিলম্বে রওনা হয়ে পড়ল। দরজার কলিং বেল টেপার
কয়েক মিনিটের মধ্যে দরজাটি খুলে গেল। সে দেখল,
দরজার
পাশে কিশোরী রোজি বিষণ্ণ চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে। রোজিকে দেখা মাত্রই সিরাজের চোখের
সামনে পুরানো একটা মুখ ভেসে উঠল। সেই একই মুখ, সেই মায়াবী চোখ, সেই টোল খাওয়া চিবুক।
এ কেমন করে হয়? সে নিজেকে নিজে বোঝার
চেষ্টা করে,
এটা তার মনের দুর্বলতা ছাড়া আর কিছুই নয় তো!
-হাউ ডু ইউ ডু ডক্টর?
রোজির
প্রশ্নে সিরাজের চেতনা হয়। সিরাজ রোজির পেছনে পেছনে গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরের তলায় উঠল। রোজি একটা ঘর দেখিয়ে
বলল,
-মা ওই ঘরে আছে।
সিরাজ
ঘরে ঢুকেই চমকিয়ে উঠল, যা ভেবেছিল তাই হোলো, এ তো শাহনাজ! মাটিতে অজ্ঞান
হয়ে পড়ে রয়েছে। এক কালে তার অতি প্রিয় মানুষ। ছাত্রজীবনে সে ছিল তার ধ্যানধারণা। কত
নিশিদিন কাটিয়েছে তারই তপস্যায়। আর আজ কিনা তাকে দেখবে এ অবস্থায়, এ যেন কল্পনার বাইরে। এ
মুহূর্তে সে একজন ডাক্তার,
আর
শাহানাজ একজন রোগী। নাড়ি পরীক্ষা করতেই দেখে নাড়ি নিবু নিবু। পাশে কয়েকটি ‘ভালিউম’ ওষুধের শূন্য
স্ট্রাইপ পড়ে আছে। সিরাজ তখনই হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে ফোন করল,
-আমি ডাক্তার সিরাজ এখনই একটা
রোগীকে ভরতি করতে হবে, সাস্পেক্ট ওভারডোজ। অ্যাম্বুলেন্সের
দরকার হবে না, সময় খুবই অল্প তাই
আমি নিজেই আমার গাড়িতে করে নিয়ে আসছি।
সিরাজ
রোজিকে জিজ্ঞাসা করল,
-রোজি তোমার আব্বা
কোথায়?
-সকালবেলায় মা’র সাথে ঝগড়া করে বাড়ি
থেকে বেরিয়ে পড়েছে যাবার সময় বলে গেছে আব্বা আর নাকি বাসায় ফিরবে না।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment