বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই
কার্ত্তিক,
১৪৩৩
দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা | ছোটগল্প
সৌমেন সরকার
সে
ইশ্, তাহলে আপনাকে বড়ই বিব্রত করলাম আজকে এই দুর্যোগে আর এই বৃষ্টির মধ্যে! -না না, তাতে কী হয়েছে। আপনি বৃষ্টিতে বাইরে ভিজবেন তা কী করে হয়। বৃষ্টি থামলে তারপর নাহয় যাবেন।
বিকেলের
শেষের দিকে যখন হোটেল থেকে বার হলাম তখনও আবহাওয়া ভাল ছিল। বৃষ্টির এতটুকু আভাসও
পাইনি। তাই হাঁটতে হাঁটতে কখন যে অনেকটা দূরে চলে এসেছি তা বুঝতে পারিনি। চারিদিকের
পরিবেশ অসামান্য সুন্দর। সম্মুখে সুউচ্চ দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে
পাহাড়। তার গায়ে সাদা কুয়াশা আর মেঘ যেন তাকে ভালবেসে বেষ্টন করে আছে। সারা দেহে
সবুজের শামিয়ানার মাঝে সাদা পেঁজা তুলোর মতো, যেন কেউ তাকে মহাদেব ভেবে দুধ দিয়ে স্নান করিয়ে দিয়েছে।
পাহাড়ি
সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে গেছিলাম। কিন্তু বুঝে উঠতেই উল্টোমুখে রওনা দিলাম। বেলা পড়ে
এসে এবার সন্ধ্যা নামবে। আঁধার হবার আগেই আমাকে হোটেলে ফিরতে হবে। তখন অর্ধেক পথ
বোধহয় এসেছিলাম। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হল। আমি দিশা না পেয়ে রাস্তার বাম দিকে থাকা
দুটো বাড়ির একটার বাইরের একটু ছাউনির মতো অংশ ছিল, সেখানেই গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম দুটো বাড়ির রংই লাল। ইটের তৈরি
মজবুত বাড়ি, কিন্তু টালির চাল আর
ছাউনিটুকু টিন দিয়ে তৈরি। বেশ ছিমছাম। হঠাৎ বারান্দায় আলো জ্বলে উঠল। তারপর একজন ভদ্রমহিলা
এসে দরজা খুললেন। বয়স চব্বিশ কি পঁচিশ হবে, কিন্তু তার রূপ লাবণ্য বর্ণনা করা আমার সাধ্যের বাইরে। কোনও
কবি হলে দারুণ বর্ণনা করতে পারতেন। তিনি কিছু বলার আগে আমিই কৃতাঞ্জলিপুটে বলে
উঠলাম,
-ক্ষমা
করবেন ম্যাডাম। হঠাৎ বৃষ্টি আসায় এভাবে দাঁড়াতে হয়েছে। আপনাদের বিব্রত করব না কথা
দিচ্ছি। বৃষ্টি থামলেই...
আমার
কথা কেড়ে নিয়ে হেসে বললেন,
-আমি
আপনাকে ভিতরে এসে এককাপ গরম কফি খাবার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি মহাশয়।
আমি
নমস্কার জানিয়ে বললাম,
-আমি
সুব্রত রায়।
-আমি মৃণালিনী সেন।
তার
আহ্বান এড়াতে পারলাম না। তার অসীম আকর্ষণ, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও গভীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আমাকে সম্মোহিত করে
ফেলল। আমি আচ্ছন্নের মতো তার পিছু পিছু চললাম। বসার ঘরে বসলাম। কফি, মিষ্টি আর প্রচুর জলখাবার চলে
এল মিনিট পনেরো-ষোলোর
মধ্যে। দুজনের জন্য খাবার এসেছে। আমি লজ্জা না পেয়ে খেতে খেতে বললাম,
-দার্জিলিং-এ আগেও এসেছি ম্যাডাম, কিন্তু এরকম দুর্ভোগে কখনও পড়তে
হয়নি। কী অবস্থা বলুন তো।
-তা হঠাৎ করে বৃষ্টি হওয়াটা
আজকাল নতুন কিছু নয়। আপনি লজ্জা করবেন না, খেয়ে নিন।
তিনিও
খেতে খেতে বললেন।
-আর কাউকে দেখছি না, আপনি কি একাই থাকেন?
-হ্যাঁ। আমার স্বামী আর্মিতে
আছেন। সংসারে আমি আর দুজন কাজের লোক। আজ ওদের বিকেলে ছুটি দিয়েছিলাম।
-ইশ্, তাহলে আপনাকে বড়ই বিব্রত করলাম আজকে এই দুর্যোগে আর এই
বৃষ্টির মধ্যে!
-না না, তাতে কী হয়েছে। আপনি বৃষ্টিতে
বাইরে ভিজবেন তা কী করে হয়। বৃষ্টি থামলে তারপর নাহয় যাবেন।
ঘন্টাখানেক
ছিলাম সেখানে। তারপর তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে আসি। তিনি একটা ছাতা দিয়েছিলেন
আমাকে। আমি হোটেলে এসে সে-রাতে আর বাইরে বার হইনি।
কিন্তু
শকটা পেলাম পরদিন সকালে। ছাতাটা ফেরত দেব বলে সেটা বার করতে গিয়ে কোথাও খুঁজে
পেলাম না। অবাক কাণ্ড। ছুটলাম মৃণালিনী সেনের লাল বাড়ির উদ্দেশ্যে। আরও অবাক হয়ে
দেখি রাস্তার উল্টোদিকের টালির চালওয়ালা হলুদ বাড়িটা ঠিকই আছে, কিন্তু সেই লাল ইটের
টালিওয়ালা দুটো বাড়ির মধ্যে একটি থাকলেও অন্যটি অর্থাৎ মৃণালিনী সেনের বাড়ির
স্থানে একটা লাল ভগ্নস্তূপ পড়ে আছে। হলুদ বাড়িতে ঢুকে জিজ্ঞেস করলে মালিক শম্ভু-বাবু বললেন,
-বছর দশেক
আগে ও বাড়িতে থাকতেন একজন আর্মি অফিসার ও তার স্ত্রী। অফিসার জঙ্গি হামলায় নিহত
হলে তিনিও আত্মহত্যা করেন।
আমি
তখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। তাহলে গতকাল রাতে আমার সাথে যার আলাপ হল সে কে
ছিল?
টুবলুকে
বেশ ভুগতে হয়েছিল তার পরেও বেশ কদিন। একা শুতে পারত না, একা ঘুমোতে পারত না, একা থাকতে ভয় পেত। আমি এখনও ভাবি, আসলে কী হয়েছিল সেদিন? যদি তেমন কিছু হয়েই থাকে তবে সকলে দেখলেও আমি কেন দেখতে
পেলাম না। তবে ওরা সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পর একদিন ঠাকুমার মুখে শুনলাম,
-তোরা
সেদিন বুলুদের বাঁশবাগানের ওদিকে খেলতে না গেলেই পারতিস দাদা!
আমি
বললাম,
-কেন? কী হয়েছে?
আসলে
তখনও এইসব প্যারানর্মাল অতিপ্রাকৃত বিষয়ে আমাদের জ্ঞান হয়নি। ভূত-পেতনি সম্পর্কে একটু
জেনেছি কেবল। ঠাকুমা বললেন,
-আসলে
ওদিন ছিল শনিবার আর ভরা অমাবস্যা। ভূত-পেতনিদের জন্য প্রশস্ত তিথি।
ব্যাস, আর কিছু শুনতে পাইনি। তখন
আমার মনে কেবল একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছিল, আমি যখন ওরা ভূত দেখা সত্ত্বেও ইনভেস্টিগেশন করতে
বাঁশবাগানে ঢুকেছিলাম তখন যদি সত্যি সত্যিই পুলিশ ভূত এসে আমার ঘাড় মটকাতে তবে কী
হত!
~~000~~

No comments:
Post a Comment