প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Saturday, March 16, 2024

সুনন্দিনী শুক্লা | বিস্মৃতবীর

বাতায়ন/ধারাবাহিক/১ম বর্ষ/৩১তম সংখ্যা/২রা চৈত্র, ১৪৩০

ধারাবাহিক গল্প

সুনন্দিনী শুক্লা

বিস্মৃতবীর

[১ম পর্ব]

শাল্লা! ভারী জমিদার বংশের ছেলে এসেছেন। আমার বাপঠাকুরদার জমিদারি ছিল! বারফট্টাই করো তুমি! এই ভাঙা বাড়ি তোমার মহল? আর তুমি বনগাঁর শিয়াল রাজা?
শেষে ছুটি কাটাতে তুই এই ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুরে নিয়ে এলি?
হাঁস শিকার করবি! হাঁস! কত কথা! একটা চড়ুই শিকার করার সুযোগ অব্দি পেলাম না।

অহীন্দ্রকে গালমন্দ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল মনোজিৎ আর স্বর্ণেন্দু। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র ওরা। গরমের ছুটি পড়ার অনেক আগে থেকে অহীন্দ্র ওদের কানের কাছে তমলুকের গ্রামের বাড়ির গল্প করে আসছিল।
- আরে চল চল! তোফা কটা দিন কাটিয়ে আসবি, আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি। আমাদের ওখানে জমিদার বাড়ি আছে। আমরা ওই তালুকের জমিদার ছিলাম! বুঝলি তো, সে এককালে এলাহি ব্যাপার! লাখ টাকার আতশবাজি পোড়ানো থেকে শুরু করে বিড়ালের বিয়েতে গোটা গ্রামকে খাওয়ানো। তা এখন অবস্থা পড়তিঝড়তি হলেও যা আছে মোর দ্যান এনাফ! আরে চল চল, তোরা কলকাত্তাইয়া ছেলে। এসব জন্মে দেখিসনি।

এসব নানা কথা বলে নিয়ে আসার পর 'প্রাসাদের' ভগ্নদশা, গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবন, রাজার ভোজনের বদলে ডাল, ভাত, সবজি, মাছ সাধারণ খাবার আর লন্ঠনের আলোতে সন্ধেবেলা চপ মুড়ি। মনোজিতের সাথে আনা এয়ারগানটায় মরচে পড়ার জোগাড়। রোজ এসে অহীন্দ্রকে তাড়া দেয়।

- অ্যাই কোথায় তোর সেই জলা? কোথায় বুনোহাঁস? এয়ারগানটা কি আমি এই ডাঁশ মশাগুলোকে মারতে এনেছি?

কাঁহাতক তিন বন্ধু গল্প করে, তাস খেলে কাটায়? 

সারাদিনের ক্ষোভ ও বিরক্তি সামাল দিতে অহীন্দ্র বিকেলে 'চল গ্রামটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে আনি' এই বলে তিনজনকে নিয়ে বেরিয়েছে। সেখানেও উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে দেখে সে মরিয়া হয়ে বলল,

- এই তোরা শান্ত হ তো। এত ছটফট করলে হয়? এই শ্যামল সবুজ ধরণি তল, এসব উপভোগ করতে হলে মন চাই রে মন!

এই বলে সবে কাব্য করতে যাবে, স্বর্ণেন্দু রামগাঁট্টা মেরে বলল,

- কাব্য তোমার ঘুচিয়ে দেবো! কলকাতা চলো! বিকেল পাঁচটা বাজতে চলল, এক কাপ চা পেলাম না! অহীন্দ্র দেড হাত জিভ কাটল। স্বর্ণেন্দু চায়ের পোকা। বৈকালিক চা না পেলে ওর মাথা খারাপ হয়ে যায়। খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বাঁকের মুখে একটা গুমটি চায়ের দোকান দেখে তিন বন্ধু ঢুকল। বেঞ্চে বসে হাঁক পাড়ল,
- কই কেউ আছেন নাকি?

মিনিট খানেক পর গুমটির ভেতর থেকে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন।

গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
- ক'জনের?

ভদ্রলোকের উপস্থিতি নজর কাড়ল তিনজনেরই। শুভ্র কেশ। শুভ্র গোঁফ দাড়ি। একদম সোজা চেহারা। গায়ের বর্ণ গমরঙা উজ্জ্বল। দৃষ্টি প্রখর। এক ঝলকেই তিনজনকে যেন মেপে নিলেন। মেটে রঙের ফতুয়া আর সাদা পায়জামা পরনে।

অহীন্দ্র গলা খাঁকরে বলল,

- ইয়ে তিনজনের। আর বিস্কুট কি আছে?
- ওই তো বয়ামে আছে, বেছে নাও।
ভদ্রলোক কাজে লেগে পড়েছেন। সাদা রংয়ের তিল দেওয়া তিনটে বিস্কুট দিতে বলে অহীন্দ্র বেঞ্চে গিয়ে বসল। মনোজিৎ বলল,
- দুটো হাঁস শিকার করলেও তো গিয়ে বলতে পারতাম কিছু করেছি! ছ্যা ছ্যা ছ্যা! সঙের মতো এয়ারগানটা নিয়ে এলাম।
এবার অহীন্দ্র খেপে উঠল।
- এই ভাবটা এমন করছিস, বিশাল বড় বন্দুকবাজ! হ্যাঁ! হাত তো কাঁপে ঠ্যারঠ্যার করে। একটা টার্গেট লাগাতে পারবি ঠিকঠাক?
মনোজিৎ বলল,
- রাখ, রাখ! সবজান্তা! শোন একবার হাতে বন্দুক আর সামনে টার্গেট আসতে দে, দেখে নিবি। কী এমন! ওই তো কনসেনট্রেট করে ট্রিগার টেপা। চলে আসে! বুঝলি তো!
খুব করে কাশির শব্দ পেয়ে মনোজিৎ চোখ সরালো। বৃদ্ধ ঠোটের কোণে বাঁকা হাসছেন। এমনিই সে রেগে ছিল। এবার খেপে উঠে বলল,
- আপনি হাসছেন যে? ভুল কিছু বলেছি আমি?
বৃদ্ধ ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে বললেন,
- বন্দুক চালাতে প্রশিক্ষণ লাগে ওটা গুলতি ছোঁড়া না।
মনোজিৎ আরও চটে উঠল।
- শুনুন আমি আগে বেশ কিছু ছোটখাট শিকার করেছি। আমাকে একেবারে নভিস ভাববেন না।
অহীন্দ্র হাসল মুখ টিপে। এসবের গল্প ওরা সবাই বহুদিন শুনে আসছে- বন মুরগি, খরগোশ ইত্যাদি।
বৃদ্ধ একই ভাবে বললেন,
- প্রকৃতই বন্দুক চালাতে সঠিক প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘ অভ্যাস লাগে। কপাল জোরে টিপ লেগে যাওয়া দু-একবার, ওটাকে বন্দুক চালানো বলে না।
- হ্যাঁ হ্যাঁ! চালান তো চায়ের দোকান। আপনি কী জানবেন বন্দুকের কথা!
বৃদ্ধ একটু স্থির হয়ে গেলেন। ভাঁড় তিনটে ঠক করে নামিয়ে রেখে বললেন,
- কারো অতীত সম্বন্ধে না জেনে তার বর্তমানটুকু দেখে কখনো মন্তব্য করবে না।
অহীন্দ্র পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এলো। বলল,
- জেঠু আমি ক্ষমা চাইছি। আসলে ও একটু রেগে আছে, আমার উপরেই। মুখ ফসকে বলে ফেলেছে। আপনি প্লিজ রাগ করবেন না।
বৃদ্ধ হাসলেন। বললেন,
- তোমরা নব্য যুবক। আমার বয়স তিয়াত্তর। তোমাদের সাথে রাগারাগি, ছেলেমানুষি পোষায়? এই নাও।
তিনজনে চায়ে চুমুক দিল।
আহ্‌! একটা তৃপ্তির শব্দ করল মনোজিৎ। ওর দিল খুশ হয়েছে চা পেয়ে। বিস্কুটে একটা কামড় বসিয়ে বলল,
- তা আপনি যে প্রশিক্ষণের কথা বলছিলেন, বলছি আপনি কখনো বন্দুক চালিয়েছেন? মানে জানলেন কী করে…
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন - সে চালিয়েছি। তাও আজ থেকে বছর পঞ্চাশেক আগে। অনেক দিনের কথা।
তিন বন্ধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। এটা ১৯৮০ সাল। পঞ্চাশ বছর আগে মানে ১৯৩০! ব্রিটিশ আমল!

ক্রমশ…

 

2 comments:

  1. দারুন হয়েছে।

    ReplyDelete
  2. খুব সুন্দর হয়েছে নন্দিনী, এগিয়ে চলুন।

    ReplyDelete

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)