প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Saturday, March 16, 2024

জয়িতা ঘোষ হালদার | [অশ্রুলেখার চিঠি] | শান্তি কোথায়

বাতায়ন/ধারাবাহিক/১ম বর্ষ/৩১তম সংখ্যা/২রা চৈত্র, ১৪৩০

ধারাবাহিক গল্প

জয়িতা ঘোষ হালদার
[অশ্রুলেখার চিঠি]

শান্তি কোথায়

[১ম পর্ব]

সকালের রোদ তখনো ছোঁয়নি ছাদের পাঁচিল। একলা লাগে আজকাল বড় বেশি। তার প্রিয় বান্ধবী শিল্পীর বদলি হয়ে গেছে মুম্বাইতে। আর মেয়ে তৃষার আজকাল বড় বেশি ব্যস্ততা। স্বামী অতনুর ব্যবসাটা বড় হতে হতে আজ সে কোটিপতির সম্মানে। ফলে, সংসার তার দূরত্ব নিয়ে পড়ে আছে তার জীবন থেকে।

একলা শুধু রইল বাকি মনামী। তার ভালবাসার মানুষ এখন ফোনে কথা বলতেও সময় পায় না। কী যে করে মনামী। কাঁহাতক ফোনে ফেসবুক, ইনস্টাগ্ৰাম আর টুইটারের বন্ধুদের ছবি দেখা যায়! নিদেনপক্ষে ইউটিউব আর বেশ কিছু অ্যাপে সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ দেখা যায়। কিন্তু, একটা মানুষের জন্য আর একটা মানুষ লাগে— একটু কথা বলতে লাগে। অনেকেই বলে বই আমার প্রিয় বন্ধু। মনামীর আবার অক্ষরে অ্যালার্জি। বই পড়তে কোনকালেই ভাল লাগে না তার। কোনমতে টেনেটুনে টুয়েলভ পাশ করতেই বিয়ের সম্বন্ধটা এসে গিয়েছিল, তাই রক্ষে।

বেশ বড়লোক বাপের ছেলে। একটি মাত্র ছেলে বলে কখনো টাকার অভাব নেই। বিশাল বড় প্রাসাদের মতো বাড়ি। চারটে কাজের লোক। একটি বাগানের মালি, আর বাজার-দোকান করারও আলাদা লোক আছে। গাড়িও আছে তিনটে। যার যখন খুশি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায়। একজন ড্রাইভার পাকাপাকি ভাবে থাকে। এই বাড়ির কোনো সূত্রে জ্ঞাতি-আত্মীয়।

মনামীর সেদিন আর কিছুতেই বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু, গাড়ি নিয়ে বেরোতেও ইচ্ছে করছে না। অতএব, সে সামান্য একটু প্রসাধন সেরে বেরিয়ে এলো সদর দরজার দিকে। গেটের কাছে দেখা তাদের বাড়ির কেয়ারটেকার সুধাময়ের সঙ্গে।

বউদিমণি, বেরোচ্ছেন বুঝি? নীলেশকে ফোন করব?
না না, আমি এই কাছেই যাব। গাড়ি লাগবে না কাকা।
আচ্ছা বেশ। সাবধানে যাবেন ‘খন।
— হ্যাঁ হ্যাঁ। চিন্তা করো না।

রাস্তায় চলতে শুরু করেই হঠাৎ ভীষণ স্বাধীন মনে হচ্ছে নিজেকে। তার খোঁজ আর কেউ পাবে না। যদি সে না যোগাযোগ করে। এতগুলো বছর ধরে বাড়ি থেকে বেরোলেই গাড়িতেই বেরোতে হবে এমন নিয়মই চলেছে। বুড়ো শ্বশুরবাবার আদেশ ছিল— এ বাড়ির মেয়ে-বউ কখনো রাস্তায় হেঁটে চলাচল করবে না। বংশ পরম্পরায় এ নিয়ম চলে আসছে। এবার প্রথম তার স্বামীর অনুপস্থিতিতে মনামী নিয়ম ভাঙার সাহস দেখাল।

জানি না অতনু জানলে খুব রেগে যেতে পারে হয়তো! কিংবা, হয়তো সে কিছুই বলবে না তাকে এ বিষয়ে। কারণ, সে তার বউকে অসম্ভব বিশ্বাস করে, ভরসা করে। প্রায় পঁচিশ বছর হতে চলল তাদের বিবাহিত জীবন।

মনামী আনমনে নিজের কথাই ভেবে চলেছে। কখন যে অনেকটা পথ পেরিয়ে সে রেল স্টেশনে পৌঁছে গেছে খেয়ালই নেই। বহুকাল সে লোকাল ট্রেনে ওঠে না। লোকাল ট্রেন তো দূরের কথা, কোনো এক্সপ্রেস ট্রেনের জার্নিও তাকে করতে হয় না। যখনই কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয় তখন ফ্লাইটেই যাওয়া-আসা।

খুব ইচ্ছে করছে তার একবার ট্রেনে করে কোথাও একটু ঘুরে আসতে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল টিকিট কাউন্টারে। অ্যানাউন্সমেন্ট চলছিল ৩১৬১৯ আপ শিয়ালদা-রানাঘাট লোকাল ১ নং প্ল্যাটফর্মে আসছে। সে বলে ফেলল— একটা রানাঘাট যাওয়ার টিকিট দেবেন। চুড়িদার পরা টিকিট কাউন্টারে ভদ্রমহিলাটি ৫০০টাকার নোট দেখে বললেন, খুচরো দিন ম্যাডাম। মনামী বেশ ভাল জানে তার কাছে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া পাঁচশো টাকার নোটই আছে আরো অনেকগুলো। গম্ভীর গলায় উত্তর দিল— খুচরো নেই।

তখন ভিতর থেকে ভদ্রমহিলা মুখ নামিয়ে জালের এপারে দাঁড়িয়ে থাকা তার মুখটা দেখে বলে উঠলেন— আরে, মনামী না!

লাইনে মনামীর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন খুব বিরক্তি নিয়ে বলতে শুরু করলেন— ও ম্যাডাম, ট্রেন ধরব তো। আপনি সাইডে যান। গল্প পরে করুন। আমাদের ছেড়ে দিন আগে।

সত্যি, মনামী বেশ আশ্চর্য হয়ে সরেই দাঁড়ালো লাইন থেকে। পিছনের প্রায় জনা দশেক লোক টিকিট কাটার পর সে এগিয়ে গিয়ে আবার মুখ বাড়ালো কাউন্টারে। ভেতর থেকে যিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে তার নাম ধরে ডাকছিলেন— আমি সুরশ্রী রে। চিনতে পারলি? তুই একেবারে একই রকম আছিস তো।

মনামীর চোখটা আনন্দে ঝলমল করে উঠল। হ্যাঁ রে, সুরশ্রী। আমার মনে পড়েছে। আমাকে একটা টিকিট দে না প্লিজ। আমি ট্রেন ধরব।

— তার আগে তোর ফোন নং বল।
— হ্যাঁ লেখ। ৩২৫৬৮২৯৪৩৬ ফোন করিস কিন্তু।

মনামী বেশ তাড়াতাড়ি বেশ ভিড় হয়ে যাওয়া প্ল্যাটফর্মে উঠে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল। ট্রেনে লেডিজ কম্পার্টমেন্ট থাকে না? তাদের বাড়িতে যে মালি সপ্তাহে একদিন আসে, তার কাছে শুনেছিল— লেডিজ কম্পার্টমেন্টে তার বউকে নিয়ে একদিন সে এসেছিল। হঠাৎই চোখ পড়ল প্ল্যাটফর্মের ডানদিকের বোর্ডে— লেডিজ কামরা। চেষ্টা করল ওইদিকে যেতে, তার আগেই ট্রেন ঢুকে পড়ল আর তার সামনে যে কামরাটা পড়ল মোটামুটি ফাঁকাই। সে উঠে পড়ল ট্রেনে।

ট্রেন চলতে শুরু করার আগেই একটা সিট পেয়ে বসে পড়ল সে।

পাশে বসে থাকা বয়স্ক মহিলা ঘুমিয়ে পড়েছেন। মাঝে মাঝে ট্রেনের দুলুনিতে ওর গায়ে পড়ছেন তিনি। বেশ অস্বস্তি লাগছে তার।

উল্টোদিকের সিটে এক মা তার ছোট তিন-চার বছরের বাচ্চাকে কমলালেবু ছাড়িয়ে খাইয়ে দিচ্ছে। বাচ্চাটা যত না খাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি গায়ে রস ফেলছে। মনামীর চোখ পড়তেই গা-টা কেমন করে উঠল। ইশ, কী অবস্থা। সারা জামাকাপড় রসের ফোঁটায় ভিজছে। আর একটা-দুটো মাছি এসে বসছে ওই জামায় তারপর তাদের সকলের গায়ে। মনামীর একবার মনে হলো বলে, তুমি শান্ত হয়ে বসে খাও তো…

নাহ্‌, এরকম বলাটা ঠিক নয়। সবাই তো দেখছে। কেউই কিছু বলছে না তো।

পাশের সিটগুলোর একেবারে ধারে এক মহিলা একটা বড় অ্যালুমিনিয়ামের বাটি অর্ধেকটা ঢাকা দিয়ে তার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে এক দলা করে ভাত মুখে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে বাঁ হাতে ধরে থাকা কাঁচা লঙ্কাতে কামড় বসাচ্ছে। এতদূরে বসেও তার নাকে পান্তাভাতের টক গন্ধ আসছে। অথচ, বউটার মুখটা তৃপ্তিতে ভরা। মাঝে মাঝে পাশের মহিলার সঙ্গে কথা বলছে— মুখপোড়া মরেছে ঠিক কতা। কিন্তু, আগের পক্ষের বউটা সব টাকাপয়সা নিয়ে নেছে। আমি ছোট ছোট চারটে ছেলেমেয়ে নে, হিমশিম। দেখতাছিস তো তোরা। আর আমাগো কপালে এডাই হয়। এখন মাগ-ছেলের খোঁজ করার কেউ নি। বাপের ভিটের ভায়েরা মোরে ঘাড় দে নামায়ে থুইয়েই খালাস। এড্ডা দিনের তরে খোঁজ নিই কো। হালার আপদ। কত্তই যত্ন করতাম ওদ্দের ছেলেবেলায়…।

ক্রমশ…

 

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)