বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/অন্য
চোখে/২য় বর্ষ/৩য়/বীথি চট্টোপাধ্যায় সংখ্যা/১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১
অন্য চোখে
সাথী মুখোপাধ্যায়
সারাংশ
অ্যালার্ম বাজতেই ধড়ফড
করে ঘুম থেকে ওঠা। দেরি হয়নি তো ঘুম ভাঙতে। ঘড়িটা চটপট দেখে নেওয়া। কোনদিন
পাঁচমিনিট লেট, কোনদিন দশমিনিট লেট। আবার কখনো একদম ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে উঠে পড়া।
তারপরে নিজের বেস্ট পারফরম্যান্স দেওয়ার ম্যাজিক শুরু। মাঝেমধ্যে পিঠচাপড়ানি,
প্রশংসাসূচক বাক্যবাণ এনার্জি টনিকের মতো কাজ করে। নিজেকে নিখুঁত প্রমাণ করতে কার
না ভাল লাগে? বরের অফিসের ভাত-টিফিন, ছেলেমেয়ের দেখভাল এককথায় জুতো সেলাই থেকে
চণ্ডীপাঠ সব জায়গায় বেস্ট গৃহিণীর পরিচয় দেওয়ার খেলায় মেতে থাকে মন। কখন সূর্য
ওঠে কখন অস্ত যায় ভাবার সময় কোথায়? এইভাবেই দিন যায় রাত যায় সুখী জীবনে আর কী
কিছু চাওয়ার থাকে!
ভেতরের 'আমি'টা কিন্তু
বেশ চটে থাকে। তারও দোষ নেই, সে ভাবে তাকে কেন সময় দেওয়া হচ্ছে না? সে তো তারও
সব সময়ের সঙ্গী। সে কী বানের জলে ভেসে এসেছে নাকি? মাঝেমধ্যে উঁকি দিয়ে জানান
দিতে আসে তার সাথে কেন দুয়োরানির মতো আচরণ করা হচ্ছে? কেন তাকে সারাদিনের রুটিনে
একটু জায়গা দেওয়া হচ্ছে না? লড়াই শুরু হয় মাঝেমধ্যেই এই অবাধ্য 'আমি'র সাথে।
তাকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা তো কম করে না সেই আদর্শ গৃহবধূ। তার যে কত
দায়দায়িত্বের বোঝা সেটা বুঝতেই চাই না মনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা বেয়াদপ 'আমি'টা।
না না, সাংসারিক
দায়িত্বের অবহেলা সে করতে পারবে না। পরিবারের মানুষগুলোর আন্তরিকতার কাছে টিকতেই
পারবে না 'আমি'র অবুঝ বায়না। একে প্রশ্রয় দিলে চলবে না। বুঝতেই হবে, যে কোন
উপায়ে হোক। প্রয়োজনে শাসন করতে হবে। 'আমি'র বায়না শোনার মতো অবকাশ যে তার নেই!
তারচেয়ে সংসারের মানুষগুলোকে সব কনসেনট্রেশন দিলে তারাও ভাল থাকবে আর সংসারের কর্ত্রীও
সুখে থাকবে। সকলের সুখে থাকাটাই যে তার একমাত্র কাম্য।
সাত-সতেরো ভাবতে ভাবতেই
ঘড়ির দিকে নজর পড়ল গৃহবধূর। বজ্জাত 'আমি'র চক্করে আজ দশ মিনিট লেট রান করছে
গৃহবধূ। সন্তানের বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে তাদের স্কুল-কলেজ থেকে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম
নিয়ে তারা আবার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করবে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। তাদের এই কর্মকাণ্ডে
সঙ্গ দিতে হবে 'মা' নামক সব্যসাচী মানুষটিকে। তাদের সফল জীবন দেখার জন্যই তো সে
মরিয়া। পাশাপাশি স্বামীর-পরিবারের সদস্যদের সেবাযত্ন করাটা যে তার গুরুদায়িত্ব সে-কথা
ভুললে চলবে কেন? তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ-সবল থাকতেই হবে। সে অসুস্থ হলে
সংসারের হাল কে ধরবে? সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তার যত্ন কে করবে? অতএব সবাইকে
ভাল রাখার জন্য তাকে সুস্থ থাকতেই হবে! আর সেই বোধটুকুও নেই আমি নামক অন্তরাত্মার!
ভুলেও কখনো-সখনো যদি ভাগ্যের ফেরে অসুস্থ হয়ে পড়লে কী অসহায় হয়ে পড়েছে সকলে
সেটা তো সুগৃহিণী চাক্ষুষ করেছে। বিশেষ করে স্বামী নামক দেবতার অস্থিরতা চোখে
পড়ার মতো। যতটা না গিন্নির স্বাস্থ্যের জন্য, তারচেয়ে ঢেরগুণ বেশি সংসার অকেজো
হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তায়। না না বাপু, তুমি দূরেই থাকো। তোমার সংস্রব আমার চাই
না খামখেয়ালি মনের সখী!
তবু নাছোড় 'আমি'
বারবার চেতনে কখনো অবচেতনে নাড়া দিতে চলে আসে। কোন বাধাই সে শোনে না। তারপর একদিন
সেই গৃহিণী একটু দুর্বল হলো 'আমি'র কাছে। দয়া হলো তাকে দেখে। ভাবল সবার খেয়াল
রাখার সাথেসাথে তারও নাহয় একটু খেয়াল রাখলে এমন কী ক্ষতি! শহর তখন গভীর নিদ্রায়
মগ্ন। তার আপন মানুষগুলোও সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্তপ্রাণ, তারাও নিশ্চিত
সুখনিদ্রায় মগ্ন। সুগৃহিণীর চোখে নেই ঘুমের আবেশ। তাকে চোখ বুজতে দিচ্ছেই না 'আমি’টা।
কী আর করা যায় একটা চেয়ার টেনে বসল ব্যালকনির কোণ ঘেঁষে। শাসন করে বলল নিজের
আমিকে, "শোনো, তোমাকে এই সময়টুকুই দিতে পারব। সারাদিন কাছে ঘেঁষবে না। তাতে
যদি রাজি থাকো তাহলে বসতে পার আমার মনের মাঝে বিছানো গালিচায়।"
'আমি' নামক সত্তা তো
বেজায় খুশি। সেও সম্মতি জানিয়ে বলল, "ঠিকই আছে, আমাকে তোমার উচ্ছিষ্ট
সময়টুকু দিয়ো তাতেই হবে। আমাকে পল্লবিত হওয়ার যে সুযোগ তুমি দিয়েছ তাতেই আমি
ধন্য।" এইভাবেই শুরু হলো সুগৃহিণীর নিজেকে নিয়ে কিছুটা সময়যাপনের পর্ব।
কাছে টেনে নিল ডায়েরি আর কিছু কালিকলম।
আস্তে আস্তে সময়যাপন শুধুমাত্র
অভ্যেসে সীমাবদ্ধ থাকল না। আত্মার সাথে তৈরি হলো নিবিড় সম্পর্ক। ডায়েরির পাতায়
জায়গা করে নিতে শুরু করল 'আমি' নামক অবাধ্য মনের কুঠুরিটি। সারাদিনের কাজের মধ্যে
নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার মধ্যেও অপেক্ষায় থাকতে শুরু করল ঘুমন্ত শহরের ব্যালকনির
একচিলতে কোণটা। ধীরে ধীরে ব্যালকনির কোণটা সারা বাড়ির মধ্যে প্রিয় হয়ে উঠতে
লাগল। সুগৃহিণীর কলম চলতে শুরু করল ব্যালকনির কোণ ছাড়িয়ে শহর-নগর-গ্রামের
আনাচেকানাচে। কলম যতই ডানা মেলতে শুরু করল সুগৃহিণীর আমি যাপনও শাখাপ্রশাখা
বিস্তার করে পল্লবিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। বেশ ভালই কাটছিল 'আমি'র সাথে
কিছু সময়যাপন।
এতে কিছুটা ছন্দপতন
হচ্ছিল তার রোজকারের রুটিন। কখনো অ্যালার্মের আওয়াজ পৌঁছোতে অস্বীকার করছিল
গৃহিণীর কর্ণগহ্বরে। যার ফলস্বরূপ মাঝেমধ্যেই সকালের বিছানা ছাড়তে বিলম্ব। তবু
যতটা সুচারুতার সাথে সম্ভব গৃহিণী কিন্তু তার সর্বোত্তম পরিসেবা দিতে অপারগ ছিল
না। সে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যদের সুবিধা অসুবিধাগুলোকে বুঝতে যত্নবান ছিল।
কিন্তু তাতে কী? সে কেন হঠাৎই 'আমিযাপন' নিয়ে মাতামাতি করবে? কীসের অভাব তার?
অর্থ-স্বাচ্ছন্দ্য কোনকিছুরই তো অভাব নেই তার! তাহলে? রোজকার রুটিনে কিছুটা হলেও
ঘাটতি রয়েছে তার পারফরম্যান্সে। না না, মাথা থেকে 'আমি' নামক কুটিল বুদ্ধিসম্পন্ন
সত্তাটিকে সরাতেই হবে। নইলে ছন্দপতন ঘটবে অলিখিত সুগৃহিণী হওয়ার প্রতিযোগিতায়
নিজেকে সবার শীর্ষে রাখার ইঁদুর দৌড়ে।
'সময়' সুগৃহিণীকে
চিনতে শেখাল তার আপনার জনের ভালবাসার স্বরূপ! লুকিয়ে থাকা 'আমিটা' বোঝাল সে এতদিন
এক মিথ্যের স্বর্গে বাস করছিল! 'কলম' জানান দিল স্বাধীনতার অর্থ কী! 'জীবন' এগিয়ে
এলো জমাখরচের হিসেব বোঝাতে! সুগৃহিণীর পায়ের তলার জমিটা নড়ে উঠল। বাঁচার সংজ্ঞা
বদলে গেল তার অভিধানে। "নীরবতার" মাঝে খুঁজে পেল জীবনের সারমর্ম।
(বি:দ্র: সকল সুগৃহিণীর
ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।)
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment