প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Thursday, May 23, 2024

আইনি বিচার | পারমিতা চ্যাটার্জি

বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/৩য়/বীথি চট্টোপাধ্যায় সংখ্যা/১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১

ছোটগল্প

পারমিতা চ্যাটার্জি

আইনি বিচার


হঠাৎ অনুরাধাকে সুটকেস নিয়ে বাড়ি আসতে দেখে অমলবাবু তো অবাক হয়ে গেলেন,
- তুই একা এভাবে?  জামাই কোথায়?
- আমি চলে এলাম বাবা—
অনুরাধার অসহায় মুখ বাপের মনে একটুও দয়ার সঞ্চার করল না, বরং ওর ক্লান্ত মুখটা তার ধৈর্যের বাঁধ আরও ভেঙে দিচ্ছে,
- চলে এলাম? চলে এলাম মানেটা কী?
গলার শব্দে ভেতর থেকে অমলবাবুর সাধ্বী স্ত্রী আর ছেলে অনির্বাণ বেরিয়ে এলো। আধুনিক ছেলে অনির্বাণ বোনের হাতটা ধরে বলল,
- আয় ভেতরে আয়।
- ভেতরে আয় মানে? ওকে এক্ষুনি হাতে পায়ে ধরে আবার শ্বশুরবাড়ি রেখে আয়। এত বড় সাহস সুটকেস হাতে করে বেরিয়ে এসেছিস! আর তোকে ওরা ঘরে নেবে?
অনির্বাণ বাবাকে ধমক দিয়ে বলল,
- তুমি একটু চুপ করবে? শুধু শুধু বেরিয়ে আসার মেয়ে ও নয়। আগে আমাকে দেখতে হবে কী কারণে ও বেরিয়ে আসতে বাধ্য হল?
মনোরমাদেবীও মেয়ের চোখ মুখের অবস্থা দেখে মিনমিন করে বলতে গেলেন,
- মেয়েটাকে একটু জিরোতে দাও, জল খেতে দাও, তারপর না হয়—
- এই তুমি চুপ করবে? মেয়েমানুষের অত কথা বলা আমি পছন্দ করি না, জানো না?
- হ্যাঁ জানি। নিজের ক্ষেত্রে তা মেনেও এসেছি, মরেও বেঁচে আছি, কিন্তু সন্তানের বেলায় তা পারব না।
- পারবে না?
- না
- খুব সাহস হয়েছে তাই না?
- হ্যাঁ শুধু বসে বসে মার খেয়ে তোমার এই অন্ধবিচার আমি দেখতে পারব না। দরকার হলে মেয়ের হাত ধরে আমি যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাব।
অনুরাধার চোখে ধারা শ্রাবণ। ওর দাদা মাথায় হাত রেখে বলল,
- কী হয়েছে রে? বল তো আমাকে?
অনুরাধা তখন পিঠের আঁচলটা সরিয়ে দাদাকে দেখাল, চমকে উঠল অনির্বাণ—
- এ কী রে! সমস্ত পিঠে লাল দাগ মোটা হয়ে কেটে কেটে বসেছে।
- হ্যাঁ দাদা এরপর ওখানে থাকলে ওরা আমাকে মেরেই ফেলত।
অমলবাবু মেয়ের কথা শুনে রাগে ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন,
- তা এভাবে শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে এসে আমার মুখ না পুড়িয়ে - মরে গেলেই তো পারতে।
মনোরমাদেবী বললেন।
- তুমি কী মানুষ!
- এই অশিক্ষিত মেয়েমানুষ তুমি চুপ করে থাকো, এটাই নিয়ম বাপেরবাড়ি এসে ওঠার থেকে শ্বশুরবাড়িতে মরে যাওয়া সম্মানের।
অনির্বাণ ওর হাত ধরে বলল,
- আয় আমার সাথে।
অনুরাধা ভয়ে ভয়ে বলল,
- কোথায়? তুই কি আমাকে দিয়ে আসতে যাচ্ছিস? তোর পায়ে পড়ি দাদা…
অনির্বাণ ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল,
- তোর দাদা অত কসাই নয় যে তোকে মরবার জন্য ও বাড়িতে রেখে আসবে, আমি বাবার হোটেলেও খাই না যে পিতৃবাক্যকে শিরোধার্য করে নেব। আমি থানায় যাচ্ছি। তুই জানিস না তোর দাদা একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল— ওদের সবকটাকে জেলের ঘানি না খাটাই তো আমার নামও অনির্বাণ নয়।
অমলবাবু চিৎকার করে বলে উঠলেন,
- অনি সাবধান। তুমি লায়েক হয়েছ জানি - তবে তুমি আমার ওপর দিয়ে যেতে পারো না- আমার বিচার বলে শত কষ্ট সহ্য করেও মেয়েদের শ্বশুরবাড়িতেই থাকতে হয় - তাতে যদি মরেও যায় সবাই বলবে - মেয়েটা এত অত্যাচার সহ্য করেও মুখে রা কাটেনি- ওর সতী নামটাও বজায় থাকে।
- বাবা আমার বোনকে সতী হতে হবে না- একটা সুন্দর জীবন নিয়ে বাঁচার অধিকার ওর আছে- তোমরা ওর কাছ থেকে তা কেড়ে নিতে পারো না।
- তুমি থানাপুলিশ করলে ওকে আর ওরা ঘরে তুলবে কোনদিন?
- ওরা কী তুলবে? আমি আর পাঠাব না জীবনে ওখানে - তোমার চিরকালীন অন্ধবিচার নিয়ে তুমি থাকো - আমি আইনের বিচার চাই।
এর চারবছর পরে দেখা যায় অনুরাধা ওর মাকে নিয়ে একটা সুন্দর কোয়ার্টারে আছে। ও এখন সরকারি চাকরি করে, দাদা ওর জীবনের মোড়টাকে সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিয়েছে। ওর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মামলায় হেরে গিয়ে প্রচুর টাকার জরিমানা দিয়েছে আর স্বামী দুবছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিল নারী নির্যাতনের অভিযোগে। অনুরাধার বাবা একা ঘরে এখনও বিড়বিড় করে বলে যায় এরা আমার মুখটা পুড়িয়ে দিল একেবারে,
- কী করতে যে একটা মেয়ে জন্মেছিল!
 

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)