বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/প্রবন্ধ/২য় বর্ষ/৩য়/বীথি চট্টোপাধ্যায় সংখ্যা/১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১
প্রবন্ধ
তন্ময় কবিরাজ
শৈশবের পাশে নেলি শ্যাক্স
নেলি শ্যাক্স। জন্ম জার্মানি। ১৯৬৬ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
ছোট বয়স থেকেই ছিল নাচের প্রতি গভীর আগ্রহ। কিন্তু রুগ্ন শরীর অন্তরায় হয়ে
দাঁড়িয়েছিল। পড়াশোনা সেই অর্থে বাড়িতেই। মুখচোরা স্বভাবের মানুষ নেলি শ্যাক্স।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে তিনি দেখেছেন, উপলব্ধি করেছেন যা তাঁর চিন্তা-জগতকে পরিণত
করেছে। তিনি বেরঙিন শৈশবকে তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়।
তিনি লিখেছিলেন, "যে
রাস্তায় শৈশব ছিনতাই হয় / নিভে যায় ভালবাসার আলো / পাশে নেই / চারপাশে খোলা
হাওয়া অসহায়।" কবি বিশ্বাস করতেন, "চাইল্ড ইজ এ ফাদার অফ এ
ম্যান"। অথচ দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি শিশু বিকাশে সহায়ক নয়। কবি থেকে বিচারক
সবাই তাই শিশু বিকাশের আদর্শ পরিবেশ গঠনের কথা বলছেন। ব্রিটিশ কবি উইলিয়াম
ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিখেছিলেন, "আওয়ার বার্থ ইস বাট এ স্লিপ এন্ড এ ফরগেটিং।"
আসলে জন্মই যেন মৃত্যুর প্রতিশব্দ, এক গভীর সত্যের সেতুতে বাঁধা পড়ে আছে। নেলি
তাই লেখেন, "যন্ত্রণার ভেতর সকাল হবে / রয়ে যাবে মৃত বাবা মা।" সময়
যেমন দেখিয়েছে, সময় যেমন শিখিয়েছে, সময়ের সাক্ষী হয়ে নেলি সে অনুভূতির
কাব্যরূপ প্রদান করেছেন। তিনি চার্লস্ ল্যাম্বের ড্রিম চিলড্রেনের হারানো শৈশবের
নস্টালজিয়াতে ডুবে থাকেননি, বরং ব্লেকের চিমনি সুইপারদের খবর রেখেছেন। কারণ
ব্লেকের মতো নেলিও জানেন, "জ্বলন্ত ওই চিমনিতে মৃত্যুর বাস।" তিনি শুনতে
পান শিল্প বিপ্লবের আড়ালে শিশুদের কান্না। সময়ের গভীর হার্ড টাইমসে দাঁড়িয়ে নেলি
তাই একোয়িং গ্রিন থেকে অনেক দূরে। প্রতিদিন অনাহারে ভুগছে শৈশব। কটাক্ষের সুরে
তিনি লেখেন, "ছাই হয়ে মিশে যায় বাতাসে / চারদিকে তারাদের নিমন্ত্রণ / সে
আলোও নিভে যাবে / ঘুমিয়ে যাবে সূর্যও।" রাজনীতি, যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদের
আগ্রাসী মনোভাবে অনেক শৈশব তার পরিবার হারিয়েছে, পরিচয়হীন হয়ে রাষ্ট্রের কাছে
জুটেছে উদ্বাস্তুর তকমা, নিজের বসতবাড়ি ছেড়ে রাতের অন্ধকারে হয়েছে পরিযায়ী।
ধনতন্ত্রের চাপে বাড়ছে শিশুশ্রম, বেগার খাটার দিনলিপি, কখনও বা অকাল জীবনের
ট্র্যাজেডি - সব জানেন নেলি। জীবন এত অসহায় তবু কেউ কাউকে বাঁচাতে আসে না। তিনি
লিখেছিলেন, "কোনো এক অনাথের বাবা / সেও তো আহত / আতঙ্কের ছায়া দেখে শরীরে / এবার
মৃত্যু আসবে রাতের ছদ্মবেশে।" এ যেন মহেশ গল্পের শেষাংশ যখন গফুর রাতের
অন্ধকারে মেয়ে আমিনার হাত ধরে ঘর ছাড়ে। সুখের অজুহাতে দেশ ভাঙছে, সুখের
নিরাপত্তায় গড়ে উঠছে কাঁটাতারের সীমান্ত, অথচ দেশভাগের পরে সে সুখের আর দেখা
নেই। সুখের আয়রনি যেন জীবনের দোসর। তিনি কবি ভানের মতো বিশ্বাস করতেন, "হ্যাপি
দোজ আর্লি ডেজ! হোয়েন আই / শাইন্ড ইন মাই এঞ্জেল ইনফ্যানসি"।
নেলি জানেন, শৈশবের দিনগুলো সহজ সরল, যুক্তিহীন। ইনোসেন্স আর এক্সপেরিয়েন্স-এর দ্বন্দ্ব যতই গভীর হয়েছে ততই নষ্ট হয়েছে শৈশব। মনের কোণে বাসা বাঁধতে থাকে ব্ল্যাক আর্ট, যে মেটাফরের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে বাস্তব জীবনের লোভ লালসা আর প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা। কবি লিখেছিলেন, "ভাঙা দেওয়াল / যেখানে ভাবনার বসতবাড়ি / শৈশবে আর স্নেহ নেই / সে মৃত্যুর সঙ্গে খেলা করে।" নেলি রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়েছেন। ফলে ইচ্ছা আর বাস্তবতার লড়াই তিনি জানেন। জীবন রূপকথাকে কল্পনা করলেও রূপকথা সুখের সান্টাক্লজ হতে পারবে না কোনোদিন। কে কোথায় হারিয়ে যাবে, সে কথা শুধু নিয়তিই জানে। তাই তিনি ব্রিটিশ কবি টমাস হার্ডির দোসর। শৈশবের মধ্যে তিনি নিয়তির প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। হতভাগ্য শৈশব মাঝেমধ্যে বড়ো একা। চলছে নিজের ইচ্ছাকে প্রতিনিয়ত হত্যা করার খেলা। যখন প্রকৃতির কোলে খেলে বাড়ানোর কথা, তখন তারা বাঁচার জন্য লড়াই করছে। ডারউইনের অস্তিত্বের জন্য লড়াই থিয়োরির মূর্ত প্রতীক হয়ে বিদ্রুপ করছে তথাকথিত উন্নয়নশীল বিশ্বকে। কবি লিখেছিলেন, "যারা অনাথ, পৃথিবী তাদের বিষণ্ণতার গল্প শোনে।" কবি অভিমানী। কবিতা তাই প্রশ্ন করে, কেন এ পৃথিবী শৈশবের জন্য নিরাপদ হতে পারবে না? তিনি সুন্দর আগামীর জন্য কবি সুকান্তের মতো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নাহলেও তিনি বারবার বিপন্ন হয়ে যাওয়া শৈশবের কারণগুলোকে তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন। কবি আশা করেন, কবিতার বাস্তবতায় সমাজ একদিন লজ্জা পাবে, সে নিজেই সমাধান করবে তখন। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিপূরক সাহিত্যভাবনা পোষণ করেন। নেলি ক্রমশ বাস্তববাদী হয়ে ওঠেন। তিনি লেখেন, "কেন মাকে পেলাম না? / কেন বাবা আদর করে বলল না / তুই আমার?" কবি তাই আশাহত, শুধু নিয়তির কাছে পরাজিত শৈশবের প্রতি তিনি সমব্যথী। সবাই শৈশবকে ব্যবহার করছে। শিশুর ভালবাসা দরকার, অমানবিক ব্যবহার নয়। কবি তাই প্রতিবাদ করেন। সমাজকে সতর্ক করে তিনি লেখেন, "তারা ফুল নয় / কোনো হিংস্র জন্তুর কামড় নয় / জ্বলন্ত চুল্লিতে পুড়ে যাওয়া খড় নয়।" কবি মনে করিয়ে দেন, শিশুও মানুষ, এ পৃথিবীতে তারও বাঁচার অধিকার আছে। নাইজেরিয়ার কবি বেন অক্রি তাঁর "আনডিজারভেদ সুইটনেস" কবিতায় লিখেছিলেন, "মনে পড়ে যায় মায়াবী অতীত / রাত জাগা শৈশবের পাশে / ম্যালেরিয়ার অসহ্য যন্ত্রণা।" সত্যের আবেদন তাই সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ভেঙে ভারত জার্মানি নাইজেরিয়াকে এক করে দেয়। এটা রাজনীতি নয়, কবিতা। সেই জন্যেই কবিতার গ্লোবাল পাওয়ার আজও এত কঠিন। নেলির অব্যক্তকে শেষ করেন কবি বেন অক্রি, "রাস্তার ধারে সস্তা দোকান / ভোরের আগেই নেমেছে নীরবতা / সবুজ গাছেও মৌনতার ছায়া /... একা ফুল, মৌমাছি নেই / বসন্তের দমকা হাওয়াতেও / নীরব পাতায় ক্ষয় ঝুলে আছে।" কবি নেলি শৈশবকে এলোমেলো পাথরের রূপকে তুলে ধরেছেন যেখানে রয়েছে মা-বাবার ভালবাসার দাবি। কবি জানেন, এ যন্ত্রণার কারণ হিসাবে নির্দিষ্ট কাউকে অভিযুক্ত করে লাভ নেই, এটা একটা সংঘবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা। এ দায় বোধহয় পৃথিবীর। তিনি লেখেন, "অনাথের অভিশাপ মুছে যাক / পৃথিবী, তুমিই দায়ী।"
নেলি জানেন, শৈশবের দিনগুলো সহজ সরল, যুক্তিহীন। ইনোসেন্স আর এক্সপেরিয়েন্স-এর দ্বন্দ্ব যতই গভীর হয়েছে ততই নষ্ট হয়েছে শৈশব। মনের কোণে বাসা বাঁধতে থাকে ব্ল্যাক আর্ট, যে মেটাফরের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে বাস্তব জীবনের লোভ লালসা আর প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা। কবি লিখেছিলেন, "ভাঙা দেওয়াল / যেখানে ভাবনার বসতবাড়ি / শৈশবে আর স্নেহ নেই / সে মৃত্যুর সঙ্গে খেলা করে।" নেলি রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়েছেন। ফলে ইচ্ছা আর বাস্তবতার লড়াই তিনি জানেন। জীবন রূপকথাকে কল্পনা করলেও রূপকথা সুখের সান্টাক্লজ হতে পারবে না কোনোদিন। কে কোথায় হারিয়ে যাবে, সে কথা শুধু নিয়তিই জানে। তাই তিনি ব্রিটিশ কবি টমাস হার্ডির দোসর। শৈশবের মধ্যে তিনি নিয়তির প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। হতভাগ্য শৈশব মাঝেমধ্যে বড়ো একা। চলছে নিজের ইচ্ছাকে প্রতিনিয়ত হত্যা করার খেলা। যখন প্রকৃতির কোলে খেলে বাড়ানোর কথা, তখন তারা বাঁচার জন্য লড়াই করছে। ডারউইনের অস্তিত্বের জন্য লড়াই থিয়োরির মূর্ত প্রতীক হয়ে বিদ্রুপ করছে তথাকথিত উন্নয়নশীল বিশ্বকে। কবি লিখেছিলেন, "যারা অনাথ, পৃথিবী তাদের বিষণ্ণতার গল্প শোনে।" কবি অভিমানী। কবিতা তাই প্রশ্ন করে, কেন এ পৃথিবী শৈশবের জন্য নিরাপদ হতে পারবে না? তিনি সুন্দর আগামীর জন্য কবি সুকান্তের মতো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নাহলেও তিনি বারবার বিপন্ন হয়ে যাওয়া শৈশবের কারণগুলোকে তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন। কবি আশা করেন, কবিতার বাস্তবতায় সমাজ একদিন লজ্জা পাবে, সে নিজেই সমাধান করবে তখন। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিপূরক সাহিত্যভাবনা পোষণ করেন। নেলি ক্রমশ বাস্তববাদী হয়ে ওঠেন। তিনি লেখেন, "কেন মাকে পেলাম না? / কেন বাবা আদর করে বলল না / তুই আমার?" কবি তাই আশাহত, শুধু নিয়তির কাছে পরাজিত শৈশবের প্রতি তিনি সমব্যথী। সবাই শৈশবকে ব্যবহার করছে। শিশুর ভালবাসা দরকার, অমানবিক ব্যবহার নয়। কবি তাই প্রতিবাদ করেন। সমাজকে সতর্ক করে তিনি লেখেন, "তারা ফুল নয় / কোনো হিংস্র জন্তুর কামড় নয় / জ্বলন্ত চুল্লিতে পুড়ে যাওয়া খড় নয়।" কবি মনে করিয়ে দেন, শিশুও মানুষ, এ পৃথিবীতে তারও বাঁচার অধিকার আছে। নাইজেরিয়ার কবি বেন অক্রি তাঁর "আনডিজারভেদ সুইটনেস" কবিতায় লিখেছিলেন, "মনে পড়ে যায় মায়াবী অতীত / রাত জাগা শৈশবের পাশে / ম্যালেরিয়ার অসহ্য যন্ত্রণা।" সত্যের আবেদন তাই সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ভেঙে ভারত জার্মানি নাইজেরিয়াকে এক করে দেয়। এটা রাজনীতি নয়, কবিতা। সেই জন্যেই কবিতার গ্লোবাল পাওয়ার আজও এত কঠিন। নেলির অব্যক্তকে শেষ করেন কবি বেন অক্রি, "রাস্তার ধারে সস্তা দোকান / ভোরের আগেই নেমেছে নীরবতা / সবুজ গাছেও মৌনতার ছায়া /... একা ফুল, মৌমাছি নেই / বসন্তের দমকা হাওয়াতেও / নীরব পাতায় ক্ষয় ঝুলে আছে।" কবি নেলি শৈশবকে এলোমেলো পাথরের রূপকে তুলে ধরেছেন যেখানে রয়েছে মা-বাবার ভালবাসার দাবি। কবি জানেন, এ যন্ত্রণার কারণ হিসাবে নির্দিষ্ট কাউকে অভিযুক্ত করে লাভ নেই, এটা একটা সংঘবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা। এ দায় বোধহয় পৃথিবীর। তিনি লেখেন, "অনাথের অভিশাপ মুছে যাক / পৃথিবী, তুমিই দায়ী।"
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment