বাতায়ন/হলদে খাম/২য়
বর্ষ/সৈয়দ হাসমত জালাল সংখ্যা/২১শে বৈশাখ, ১৪৩১
হলদে খাম
শাশ্বত চক্রবর্তী
কবিতার সরণি বেয়ে
[ইন্দ্রজিৎ রায়কে লেখা
এক পত্রের অংশ এক সন্ধ্যার কিছু মুহূর্ত এবং কবিতার সরণি বেয়ে ফিরে আসার কথা।]
আজকে বছরের প্রথম দিন।
আলোয় আলোয় সেজে উঠেছে আমার শহর। আমার কোথাও যাবার নেই, মন খারাপের আলোময় ঘরে আমি
চা খাচ্ছি। এমন সময় প্রত্যেক সন্ধ্যায় যে মানুষটির কথা মনে পরে, তাঁর কথা মনে পড়ল।
আমার আঁকার মাস্টারমশাই। আঁকার বিষয়ে কতটুকু জানতে পেরেছি তা জানা নেই, কিন্তু
৮×১১ ইঞ্চির পৃষ্ঠার বাইরে রং তুলি দিয়ে বহু যুগ থেকে যে শক্তি এখনো এঁকে চলেছেন
শুধু এই অভিপ্রায়ে আমরা দেখব বলে তাঁর বিষয়ে কিঞ্চিৎ জানতে পেরেছি। "খোকা কেন
আসলে বল তো এই পৃথিবীতে?" আমার
উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজেই বলেছিলেন
"দেখতে এসেছ দেখতে" মানুষটি কত সময় ব্যয় করে, নিপুণ কারুকার্যের নিদর্শন
দিয়েছেন মাছের গায়ে, কত রকম ভাবে এঁকে গেছেন এঁকে চলেছেন "শুধু দেখো আর তাঁকে
ধন্যবাদ দাও" এসব আমার কথা নয়, শীতের নিঝুম রাত ভেদ করে আমার আমি যে মানুষটির
সঙ্গ লাভ করতে বেরোয় সেই মানুষটির কথা। আমার আঁকার মাস্টারমশাইয়ের। সন্ধে প্রায় ৮-টা
এমন সময় স্যারের সঙ্গে দেখা হলো। কিছু দিন ধরে কবিতা এবং নানান কবি বিষয়ে আমাদের
কথোপকথন চলছিল। আগের দিন স্যারের কাছে কিছু কবির নাম পেয়েছিলাম পূর্ণেন্দু পত্রী, নীরেন্দ্রনাথ
চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশ। আমি তাঁদের কিছু কবিতা পড়েছিলাম সেটা স্যারকে জানালাম।
কিছুক্ষণ পরে অনেক খোঁজার পর রবিবাসরীয় পত্রিকায় জয় গোস্বামীর একটা লেখা স্যার
আমাকে পড়তে বললেন। এই প্রসঙ্গে স্যার বললেন রবি ঠাকুরের কাব্য সম্ভার না ছুঁয়ে
আসলে কোনো কবির জীবন সার্থক হয় না। আমি লেখাটা পড়লাম, তাতে বিশ্বকবির নানান বইয়ে
কত ভাবে তিনি আধুনিকতার প্রমাণ রেখে গেছেন যা আজকে পুরাতন নতুনের ভেদের অনেক ঊর্ধ্বে
সেই কথা লেখক বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছেন। এই লেখা আমার মনকে রবিকাব্যমুখী করে তুলল।
এই প্রসঙ্গে কথা হতে হতে স্যার আমাকে আরো একজন কবির নাম বললেন, খুব অল্প বয়েসে
তিনি দেহ রেখেছিলেন। কিন্তু অল্প সময়ে লেখা প্রত্যেকটি কবিতা স্থান করে নিয়েছিল
শ্রেষ্ঠ কবিতাসমগ্রে। কবির নাম ভাস্কর চক্রবর্তী। প্রথমে তাঁর লেখা "শীত কবে
আসবে সুপর্ণা" পড়লাম। খুব সহজ ভাষায় ভাব প্রকাশ করেছেন কবি। তারপর একের পর এক
তাঁর লেখা পড়লাম আমরা দুজনে। যেন হই হুল্লোড়ের রাত থমকে গেছে। অভিজ্ঞতার বলিরেখার ভাঁজে
পরে থাকা স্যারের কিছু কবিতার লাইন বেরিয়ে এলো। যেমন "কোনোদিন টিউলিপ ফুলের
বনে হারিয়ে যাবো", "খামখেয়ালি মা জন্ম দিয়ে ভুলে গেছে",
"অবনিরা কি এখনো বেঁচে আছো"। রাত ৯:১৫ মিনিটে মনোনাথকে টিউলিপ বনে ছেড়ে দিয়ে চা খুঁজতে বের হই। সব
শেষে একটি দোকানে চা ও বিস্কুট মিলল। স্যারের মুখে শুনলাম এখানে আগে আড্ডা হতো।
নতুন বছরে সেই আড্ডার অনেক মানুষ আর নেই। শীতের রাতের সব রব কেড়ে নিয়ে নীরবতা
উপহার দিয়ে গেছে তাঁরা। সুনীল, শক্তি, শঙ্খ আরো কবিরা যারা অপ্রকাশিত হয়ে রইলেন, তাঁদের কথা নিয়ে কবিতার সরণি
বেয়ে আমরা ফিরে এলাম।
— শাশ্বত চক্রবর্তী

মনোরম লিখেছেন 🙏
ReplyDelete