প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Wednesday, May 22, 2024

বিস্মৃতবীর | সুনন্দিনী শুক্লা

বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/৩য়/বীথি চট্টোপাধ্যায় সংখ্যা/১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১

ধারাবাহিক গল্প

সুনন্দিনী শুক্লা

বিস্মৃতবীর

[৬ষ্ঠ পর্ব]

পূর্বানুবৃত্তি মাস্টারদার সংশয় সুভাষচন্দ্রের বক্তৃতায় কেটে গেল। সশস্ত্র অভ্যুত্থানে অর্থের প্রয়োজন মেটানোর জন্য বিভিন্ন রকমের ডাকাতি করে অর্থ জোগানের ব্যবস্থা করতে হল। ইতিমধ্যে ঘটে গেল বিপ্লবের সবচেয়ে ট্র্যাজিক অংশ। আগুন ধরাতে গিয়ে হিমাংশু অগ্নিদগ্ধ হল। মাস্টারদা ঠিক করলেন শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেরিলা পদ্ধতি নেবেন। তারপর...
 
জালালাবাদ পাহাড়ের উপকণ্ঠে এসে পৌঁছোলাম বাইশে এপ্রিল ভোরে। খবর পেলাম চর মারফত, ইংরেজ বাহিনী আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। দ্রুত মাস্টারদা আমাদেরকে আট ভাগে ভাগ করে দিলেন। দলের দ্বিতীয় ভাগে বিনোদবিহারী, কৃষ্ণ চৌধুরী, সরোজ, কালীকিঙ্কর, মধুসূদন, ননী আর আমি। বিকেল চারটে নাগাদ ঝরঝরিয়া বটতলা মসজিদের পাশে থামল একটা ট্রেন। ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস ও সুরমা ভ্যালি লাইট ইনফ্যান্ট্রির সশস্ত্র সেনাবাহিনীর দল নেমে এল। আমরা লক্ষ্য করলাম জালালাবাদ পাহাড়ের দক্ষিণ পূর্ব কোণে আর উত্তর পূর্ব কোণে দুটি মেশিনগান
বসানো হয়েছে, আর পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সেনারা উঠে আসছে অর্ধচন্দ্রাকারে। জালালাবাদ পাহাড় ছিল প্রায় ন্যাড়া পাহাড়। ঝোপঝাড় আশেপাশে কোথাও দেখতে পাচ্ছিলাম না। মাটির মধ্যে যেন প্রায় মিশে গেলাম আমরা। শুয়ে পড়ো শুয়ে পড়ো সবাই - নির্দেশ দিলেন লোকনাথ‌- গুলি করো! নিখুঁত নিশানায় শেষ করে দাও শত্রুদের। কিছুটা যুদ্ধ এগিয়েছে, সামান্য একটু উঁচু হয়ে পাশের একটা নাতিউচ্চ ঝোপের আড়ালে যেতে গেল টেগরা, মুহূর্তে একটা বুলেট ঢুকে গেল তার বুকে। চিৎকার করে বলল,
- সোনাভাই চললাম আমি। তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাও।
মাস্টারদা লোকনাথ আমি সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলাম। পরক্ষণে মাস্টারদা হাত রাখলেন নির্মলবাবুর হাতের উপর,
- ফায়ার নির্মল!
সন্ধ্যা নামা অব্দি যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলাম আমরা, যে ক'জন পেরেছিলাম। পিছু হটতে হটতে সামান্য ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে আত্মগোপন করেছিলাম। আড়াল থেকেই দেখলাম আমাদের সঙ্গীসাথীদের দেহগুলো পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দিল ওরা। সেনাবাহিনী সরে যাওয়ার পরও আমরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। গুঁড়ি মেরে মাস্টারদা এগিয়ে গেলেন। সবার বুকে কান পেতে পেতে শোনার চেষ্টা করলেন, কেউ কী বেঁচে আছে? তারপর উঠে দাঁড়ালেন ক্লান্ত লাগছিল ওকে। ভারাক্রান্ত গলায় বললেন- চলো সবাই! এগোও!
গৈরালা গ্রামের গোপন আশ্রয়ে একদিন নির্মল সেন হাজির হলেন এক তরুণীকে নিয়ে। মাস্টারদার পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করল সে। সবাই কেমন আছে জানতে চেয়ে একটা চেয়ার টেনে বসল। তারপর দুম করে প্রশ্ন করল -আচ্ছা মাস্টারদা মেয়েদের কি দেশসেবার অধিকার নেই? হকচকিয়ে গেলেন মাস্টারদা। আলোচনাটা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য বললেন তুমি তো অনেকবার‌ রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করেছ, সে কিছু বলেনি আমাদের সম্পর্কে?
হাসিমুখে সে বলল - সব বলেছে। এত কথা বলেছে যে মনে হয় লক্ষ লোকের মাঝেও আপনাদের চিনে নিতে পারব।
- তাহলে তুমি কেন এই ছন্নছাড়া জীবন বেছে নিতে চাইছ রাণী? বাপ-মা-ভাই-বোন সবাইকে দুঃখ দিয়ে কেন এই পথে আসতে চাইছ? তুমি মেধাবী ছাত্রী।
একটু চুপ করে থেকে রাণী বলল - অনেকবার ভেবেছি দাদা। বিপ্লবী ভাইদের জীবনেও একই প্রশ্ন এসেছিল। ওরা পারলে, আমি, আমরা কেন পারব না? আমি পরিবারকে ভালবাসি কিন্তু দেশকেও ভালবাসি। একটা ভালবাসা আরেকটা ভালবাসার পথে কি কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে? বলুন!
মেয়েটি চলে যেতে নির্মলের মুখের দিকে তাকালেন মাস্টারদা- এসব কী?
নির্মল সেন একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন।
- সূর্য তুমি বুদ্ধিমান এবং যতদূর জানি খোলা মনের মানুষ। সেই পুরনো প্রবাদটা তোমার মনে পড়ে? একপক্ষে কখনো পক্ষী উড়িতে পারে না। যে স্বাধীনতা আমরা আনতে চাইছি কাদের জন্য বল তো? তাতে কী অধিকার শুধু আমার আর তোমার? আমাদের মা, আমাদের স্ত্রী, আমাদের বোনেদের কোন অধিকার নেই তাতে? কোন যোগদান নেই? তারা শুধু আমাদের দুবেলা দুটি ভাত রেঁধে দেবেন? তাতেই তাদের কর্তব্য শেষ! ভারতমাতা আমাদের ক্ষমা করবেন? আমাদের 'ফিমেল অ্যাকশন' চাই সূর্য।
সূর্যদা খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল- আমার কোন আপত্তি নেই নির্মল। যদি ওরা পারে তাহলে স্বাগত। কিন্তু সমাজ...
- সমাজ বদলাতে হয় সূর্য। সমাজ নিজে নিজে বদলায় না। উদ্যোগ নিতে হয়। সেই উদ্যোগটাই নাও না।
পূর্ণেন্দু এগিয়ে এলো। বলল, - মাস্টারদা, আরেকটি মেয়ে আছে, কল্পনা দত্ত। রায়বাহাদুর নাতনি।
একদিন সত্যিই ঝড় জলের রাতে ভেজা কাপড়চোপড়ে কল্পনা হাজির হলো। চোখে মুখে এতটুকু ক্লান্তি নেই মাস্টারদার সাথে দেখা হবে, কথা বলবে, এই আনন্দেই সে বিভোর। কথাবার্তা বলার পর ওই মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে গেল সে। মাস্টারদা বুঝলেন এই মেয়ের মনের জোর সাংঘাতিক। একদম যোগ্য বিপ্লবী। কল্পনা আসার পর আবার এলো রাণী। রাণীকে বোধহয় তোমরা সবাই চেনো। ওর ভাল নাম প্রীতিলতা।
- প্রীতিলতা? শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার?
তিনজন একসাথে বলে উঠল।
- হ্যাঁ। যেদিন সন্ধেবেলা আসবে বলেছিল মাস্টারদা উৎকণ্ঠায় ঘরবার করছিলেন। তৎকালীন সমাজে‌ মেয়েরা তো স্বাধীন ছিল না। অন্য কোথাও যাচ্ছি বলে ফাঁকি দিয়ে আসতে হতো। রাণী ঢুকল রাত দশটার পরে। হাতে একটা বড় ব্যাগ। মাস্টারদাকে প্রণাম করে বলল- বলুন দাদা। কী করব।
মাস্টারদার চোখে মুখে অদ্ভুত আনন্দ দেখছিলাম। বললেন- খেয়ে নাও‌। বিশ্রাম করো। কী করতে হবে কাল সকালে তোমায় বলব।
পরদিন সকালে স্নান-টান করে নতুন শাড়ি পরে রাণী এসে বসল মাস্টারদার সামনে। একটা বই তুলে নিলেন মাস্টারদা- my fight for Irish freedom. - পড়েছ? জিজ্ঞেস করেন মাস্টারদা,
মাথা নাড়ে রাণী - না।
- শোনো। পড়তে থাকেন মাস্টারদা।
Are we to be called slaves? Are we to be trampled underfoot? They shall never trample me at least I say, they trample me but it will be my dead body they will trample upon. Not the living man. Thought, courage, patience will prevail. We shall not fail! We shall not fail!
রাণীর সময় বেশিরভাগ কাটতে লাগল নির্মলবাবুর ঘরে। নির্মলবাবু ওকে অস্ত্র চালনা শেখালেন। কীভাবে কাপড়ের মধ্যে অস্ত্র লুকোতে হয়। কীভাবে বের করতে হয়। কীভাবে এইম করতে হয়, এসব শিখিয়ে দিতে লাগলেন একে একে। লাঠিখেলার কিছু চাল শিখিয়ে দিলেন।
ধলঘাটে সাবিত্রীদেবীর বাড়িতে কিছু গোপন বৈঠকের জন্য যাচ্ছিলেন মাস্টারদা আর নির্মল সেন। দুজনে ঠিক করলেন প্রীতিকেও নিয়ে যাবেন সাথে করে। দ্বিপ্রাহরিক ভোজনে সবাই বসেছেন। বাইরে কুকুরগুলো হঠাৎ চিৎকার করতে লাগল। রাণী দ্রুতগতিতে উঠে জানালার পর্দাটা সরিয়ে দেখল। তারপর আতঙ্কিত মুখে ঘরের দিকে তাকিয়ে বলল - পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। সবাই নিজের নিজের পকেট থেকে রিভলবার বার করে পজিশন নিলেন। ক্রমাগত গুলি বিনিময় হচ্ছে। বাড়ির মহিলারা শিশুদের নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। একসময় নির্মলবাবুর বুকে গুলি লাগল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোলো।
মাস্টারদা ছুটে গিয়ে নির্মলকে তুলে ধরলেন - নির্মল, ওঠো, চলো পিছনের দরজা দিয়ে পালাতে হবে‌‌। আমাকে ধরো।
প্রীতি তাড়াতাড়ি আরেকটা হাত ধরল নির্মলদার।
 
 

ক্রমশ…

 

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)