প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Saturday, May 18, 2024

বিস্মৃতবীর | সুনন্দিনী শুক্লা

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/৩য় সংখ্যা/৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১

ধারাবাহিক গল্প

সুনন্দিনী শুক্লা

বিস্মৃতবীর

[৫ম পর্ব]

পূর্বানুবৃত্তি মাস্টারদাকে মেদিনীপুরের জেল থেকে নিয়ে যাওয়া হল মহারাষ্ট্রের রত্নগিরি জেলে। সেখানেই বাড়ি থেকে বৌদির জরুরি চিঠি পেয়ে জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে বাড়ি ফিরে দেখলেন স্ত্রী মৃত্যুশয্যায়। স্ত্রী মারা গেলেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মাস্টারদা টাইফয়েডে আক্রান্ত হলেন। সুস্থ হয়ে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করলেন। ইতিমধ্যে সুভাষচন্দ্র বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বাহিনী গড়ে বাহিনীর মধ্যে যেন ক্ষাত্রতেজ সঞ্চারিত করেছিলেন। মাস্টারদা তাঁর সঙ্গে হাত মেলালেন। তারপর…
 
মাস্টারদার মনে যেটুকু সংশয় ছিল সুভাষচন্দ্রের বক্তৃতায় তা সম্পূর্ণ কেটে গেল। মাস্টারদাকে সভাপতি করে অম্বিকা চক্রবর্তী, নির্মল সেন, অনন্ত সিংহ ও গণেশ ঘোষকে সদস্য করে গঠিত হলো ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, চট্টগ্রাম শাখা।

তার এক ক্ষুদ্র সদস্য নির্বাচিত হলাম আমিও। রচিত হলো program of death সামনে আদর্শ:
There is not to make reply
There is not to reason why
There is but to do and die
সশস্ত্র অভ্যুত্থানের দিন ঠিক হলো ১৮ই এপ্রিল, ১৯৩০।
অর্থ চাই। এদিক সেদিক ছোট ছোট ডাকাতি করতে শুরু করলাম দলের কর্মীরা। কিন্তু ও পথে অনেক রিস্ক আছে। একজনও পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেলে সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। তাই ত্যাগ করতে হলে ও‌ পথ। এ সময় আমাদের দলের নাবালক সদস্যরা বীরবিক্রমে এগিয়ে এলো। তারা যে কী অদ্ভুত অদ্ভুত পদ্ধতিতে টাকা জোগাড় করতে লাগল ভাবতে পারবে না।
দলের কর্মী, শ্রীপতি চৌধুরী, জমিদার পুত্র। খবর এলো কক্সবাজার থেকে কয়েক হাজার টাকা নিয়ে আসছে তাদের এক কর্মচারী। স্টিমার ঘাটে কর্মচারীর হাত থেকে টাকার থলি ছিনিয়ে নিয়ে হাজির হলো দলের আস্তানায়।
মহেন্দ্র চৌধুরী। বাড়ি ভর্তি আত্মীয়স্বজনের চোখ এড়িয়ে দাদার টাকার বাক্স তুলে নিয়ে হাজির হলো সে। ১৭০০ টাকা তুলে দিল সংগঠনের তহবিলে।
জীবন ঘোষাল বাবার সই নকল করে পাঁচ হাজার টাকার চেক জমা দিল ইম্পিরিয়াল ব্যাংকে। টাকার বান্ডিল সামনে রেখে ব্যাংকের ক্যাশিয়ার হাতে ফোন তুলে নিলেন। ওইটুকু ছেলে, টাকা নিতে হাজির হয়েছে। নিশ্চয়ই সন্দেহ করেছেন। বাবাকে ফোন করছেন। ছোঁ মেরে সামনের বান্ডিল থেকে কিছু টাকা তুলে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল জীবন। জমা দিল দলের তহবিলে।
হরিপদ মহাজন। লৌহ ব্যবসায়ী ছিল তার বাবা। বাবার বিশ্বস্ত পুরনো কর্মচারীর বুকে রিভলবার ধরে ৭০০ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে এলো হরিপদ। তুলে দিল নেতাদের হাতে।
বীরেন। বাবা ছিল দিনমজুর। কিছু দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তার হতদরিদ্র মায়ের শেষ সম্বল ক’গাছা রুপোর চুড়ি নিয়ে এলো দলের আস্তানায়। কাঁদো কাঁদো মুখে সে বলল,
- মাস্টারদা আমার কাছে তো আর কিছু নেই! আমাকে তোমরা যুদ্ধ করতে দেবে তো?
মাস্টারদা আবেগে আর কিছু বলতে পারলেন না। চুড়ি দুটি আবার পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে তার মাথায় চুমু খেয়ে বললেন,
 - তুই যে যোগ দিচ্ছিস এটাই আমাদের কাছে অনেক। তোকে কিছু দিতে হবে না।
প্ল্যান হয়েছিল ছয় ভাগে। পুলিশ অস্ত্রাগার দখল করা। নেতৃত্বে থাকবেন অনন্ত সিংহ এবং গণেশ ঘোষ। অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগার দখল করা। নেতৃত্বে নির্মল সেন ও লোকনাথ বল। টেলিফোন টেলিগ্রাফ ভবন ধ্বংস করা। নেতৃত্ব দেবেন অম্বিকা চক্রবর্তী। ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ। নেতৃত্বে নরেশ রায়। চট্টগ্রামের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা। নেতৃত্ব দেবেন উপেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য এবং লালমোহন সেন। বিদ্রোহের সংবাদ প্রচারের ব্যবস্থা করা। এর জন্য মনোনীত হলেন পাঁচ জন। শৈলেশ্বর, অর্ধেন্দু, সুখেন্দু, দীনেশ, হরলাল।
- আপনি কোন দলে ছিলেন?- জিজ্ঞেস করল স্বর্ণেন্দু।
- আমি ছিলাম অম্বিকা চক্রবর্তীর সাথে। টেলিফোন ভবন আক্রমণের দলে।
- তারপর?
- চট্টগ্রাম শহরের টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস ছিল একটা টিলার উপর। নির্দিষ্ট সময়ে অম্বিকা চক্রবর্তীর নেতৃত্বে আমরা আক্রমণ করলাম এই অফিস। আমাদের সাথে ছিল কিটস ব্যাগ, রবারের বড় দস্তানা, কুড়ুল, দুখানা কাঁচি, পেট্রোলের টিন, বড় বড় হাতুড়ি। টেলিফোনের তার কাঁচি দিয়ে কেটে দিলাম। হাতুড়ির ঘায়ে ভেঙে দিলাম টেলিফোনের যন্ত্র। টেলিগ্রাফ অফিস ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে কর্মীরা, আঘাতের পর আঘাত করে দরজা ভেঙে ফেললাম। টেলিগ্রাফের যন্ত্রগুলি হাতুড়ি দিয়ে ভাঙলাম। তারপর টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ ভবনে আগুন ধরিয়ে দিলাম। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সেখান থেকে বেরিয়ে খানিক দূরে আত্মগোপন করে থাকা ত্রিশ জন বিপ্লবীদের সাথে আমরা যোগ দিলাম। পরবর্তী গন্তব্য অস্ত্রাগার। অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে হাতে তুলে নিলাম রাইফেল আর কার্তুজ।
ইউনিয়ন জ্যাক পুড়িয়ে ফেলার হুকুম দিলেন মাস্টারদা। সমস্বরে আওয়াজ উঠল -সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক! বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক! বন্দেমাতরম!
অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগার আক্রমণ করে আমরা পেলাম খালি রাইফেল, কিন্তু কোন কার্তুজ পেলাম না। এটা আমাদের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণও ব্যর্থ হল। গুড ফ্রাইডে। ক্লাব বন্ধ। কেউ আসেনি। পুলিশ লাইনের কাছে মিউনিসিপ্যালিটির একটা বড় জল কল ছিল। তার সামনে সব বিপ্লবীদের জড়ো করলেন মাস্টারদা। চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করলেন:
As president of the Republican army of India Chittagong branch I hereby proclaim it to be the free National revolutionary government… This provisional government expects that each young man and woman will swear allegiance and extend full support to it.
ইতিমধ্যে ঘটে গেল এক দুর্ঘটনা। বিপ্লবের সবচেয়ে ট্র্যাজিক অংশ। আগুন ধরাতে গিয়ে হিমাংশু অগ্নিদগ্ধ হল, আর ওকে বাঁচাতে গাড়ি নিয়ে শহরে রওনা দিল অনন্তদা, গণেশ, জীবন আর আনন্দ। যাওয়ার সময় মাস্টারদার অনুমতিও নিল না। ভাবল হিমাংশুকে রেখে তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে গেল ওদের আর দেখা নেই। সমস্ত পরিকল্পনা পাল্টে ফেলতে হলো। শহর আক্রমণ করা, ইম্পেরিয়াল ব্যাংক দখল করা, জেলখানা দখল করা, বন্দিদের মুক্তি দেওয়া, সব।
অম্বিকা ও নির্মল সেনের সাথে আলোচনা করে মাস্টারদা ঠিক করলেন শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেরিলা পদ্ধতি নেবেন। পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নেবেন। অমরেন্দ্র আর দীপ্তিমেধাকে শহরে পাঠিয়ে দিলেন মাস্টারদা। বললেন- অনন্তদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে। মাঝপথে পুলিশের খপ্পরে পড়ে দুজনেই আত্মবলিদানের পথ বেছে নিল। আমাদের সম্বল তখন নাগরখানা পাহাড়ের কচি আম আর তেঁতুল পাতা। একসময় বিপ্লবীদের মধ্যে কয়েকজন বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করল আমাদের কর্মসূচি তো মৃত্যুর কর্মসূচি। জানি তো মরব। সেইজন্যই তো ঘর থেকে বেরিয়েছি। তাহলে বনে জঙ্গলে কেন লুকিয়ে আছি? কেন শহরে ফিরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতেই মারা যাই না? তরুণ কর্মীদের আকুতি বুঝতে দেরি হলো না মাস্টারদার। ঠিক হল চট্টগ্রাম শহর আক্রমণ করা হবে।
 

ক্রমশ…

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)