প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Wednesday, June 12, 2024

হাপিত্যেশ | শিল্প-সংস্কৃতি | নাটক | রহস্যময়ী | রানা জামান

বাতায়ন/হাপিত্যেশ/শিল্প-সংস্কৃতি/২য় বর্ষ/৫ম সংখ্যা/৩২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১

হাপিত্যেশ | শিল্প-সংস্কৃতি | নাটক

রানা জামান

রহস্যময়ী


দৃশ্য- ১
 
একটি উপজেলা শহর। বিয়েবাড়ি। বাড়িটা রাস্তার পাশে এবং টিনের চৌচালা একটা ঘর। রাত। আলো ঝলমল। আলো-আঁধার অবস্থায় বাসরঘর। ফুলশয্যায় নববধূ সিমি লম্বা ঘোমটায় বসে থাকবে। সাজ্জাদ টোপর হাতে দরজা থেকে ফুলশয্যার দিকে এগিয়ে যাবে। বেডের পাশের টেবিলের ওপর টোপরটা রেখে নববধূর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসবে। তারপর একবার ঢোক গিলে টেবিলের ওপর রাখা পুরো গ্লাস পানি পান করে ফুলশয্যায় উঠে নববধূর মুখোমুখি বসবে। নববধূর ঘোমটায় হাত দেবার সাথে সাথে আলো নিভে যাবে। নববধূর ওপর সাজ্জাদ ঝুঁকে থেকে ঘূর্ণায়মান ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে ভ্রূ কুঁচকে অতীত মনে করবে।
 
ফ্ল্যাশ ব্যাক
 
[রাত। বাসর ঘরে আলো-আঁধার অবস্থা। সাজ্জাদ দরজার ছিটকিনি এঁটে ফুলশয্যায় বসে থাকা নববধূর দিকে তাকিয়ে থেকে এগিয়ে যাবে। খাটের নিকটে এসে মাথা থেকে টোপর খুলে টেবিলে রেখে খাটে উঠে নববধূর মুখোমুখি বসবে।]
 
সাজ্জাদ: (নববধূর ঘোমটার দিকে হাত বাড়িয়েও ফিরিয়ে এনে অনাবশ্যক একবার কেশে) দশ দিন তোমার সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলতে চেয়েছি, তুমি রাজিই হলে না। কেন?
নববধূ:  (লম্বা ঘোমটা কমিয়ে কপাল বরাবর এনে সাজ্জাদের দিকে তাকিয়ে) আমি অন্য সবার মতো না।
সাজ্জাদ: কথাটা শুনে ভালই লাগল। (দেয়াল ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে) রাত একটা বাজে। কথা বলে মূল্যবান রাতটা নষ্ট করা ঠিক না! কী বলো? (নববধূ মুচকি হাসতেই সাজ্জাদ বেড সুইচের দিকে হাত বাড়িয়ে বাতি নিভিয়ে দেবে)
 
[ফ্ল্যাশ ব্যাক শেষ। সাজ্জাদ মুচকি হেসে ডানে-বায়ে মাথা নেড়ে নববধূর ঘাড়ে মুখ ডুবাবে।]
 
 
দৃশ্য-২
 
(পরদিন সকাল। সূর্যের আলো জানালা গলে গায়ে লাগতেই সাজ্জাদ উঠে বসবে; কিন্তু ওকে দেখা যাবে পুকুরঘাটে কিছুটা বিমর্ষ মুখে বসে থাকতে। মুখোমুখি বসে থাকবে রাজীব, হুমায়ুন ও সমীর)
 
সাজ্জাদ: (সন্দেহপূর্ণ কণ্ঠে) আমার মনে হচ্ছে সিমির সাথে এর আগে সহবাস করেছি। আমি কী বলতে চাচ্ছি তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস তোরা?
(সাজ্জাদের কথা শুনে তিনবন্ধু গলা ফাটিয়ে হাসতে শুরু করবে। ওদের হাসি যেন থামতেই চায় না। সাজ্জাদ বেকুব যেন; মনে মনে বলবে: শালাদের বলে বোকামি করলাম না তো?)
সাজ্জাদ: (ওদের হাসি থামতেই) তোদের বলে ভুল করলাম রে! আমি আসলেই একটা বোকা!
রাজীব:  তোর সাথে ভাবির কি আগে পরিচয় ছিলো?
সাজ্জাদ: কী বলছিস তুই? ওকে সেদিন চৌরাস্তায় প্রথম দেখেই আমার হৃদয়টা ধক করে উঠল। তারপর বিয়ের প্রস্তাব দিতেই ওরা রাজি হয়ে গেলো। তারপর বিয়ে।
(ঘাটের পাশের রাস্তায় ক্যামেরা যাবে আস্তে আস্তে)
 
ফ্ল্যাশ ব্যাক
 
(দেখা যাবে নান্দাইল চৌরাস্তা। দুপুর। সাজ্জাদ বাস থেকে ফুটপাথ ধরে হাঁটবে। উল্টোদিক থেকে সালোয়ার কামিজ পড়া একটি মেয়েকে আসতে দেখে দাঁড়িয়ে অপলকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকবে। পরে মেয়েটির পিছু নেবে। মেয়েটি একটি রিকশায় উঠলে সেও একটি রিকশায় উঠে ওর পিছু নেবে। কিছুদূর গিয়ে বামের একটি সরু পাকা রাস্তায় ঢুকবে। কিছুদূর গিয়ে সামনের রিকশা একটা বাড়ির আঙিনায় ঢুকলে সাজ্জাদ রিকশা বাড়ি সংলগ্ন পুকুর ঘাটে দাঁড়াবে)
 
ফ্ল্যাশ ব্যাক শেষ
(পুকুর ঘাট)
রাজীব: তাহলে আজেবাজে চিন্তা বাদ দিয়ে হানিমুনে যা।
হুমায়ুন: অবশ্যই হানিমুনে যাবি! প্রথমটায় তো যেতে পারিস নাই। এটায় যা!
সাজ্জাদ: তোরা ঠিক কথাই বলেছিস। হানিমুনে যাবো। কোথায় যাওয়া যায় বল তো?
সমীর: যেখানে কেউ যায় না সেখানে যা। তাহলে নয়া বউ নিয়া আরামে থাকতে পারবি।
সাজ্জাদ: তোদের মাথায় সত্যই খুব ঘিলু রে! সুন্দর একটা বুদ্ধি দিয়ে দিলি। বল কোথায় হানিমুনে যাওয়া যায়?
সমীর: তোরা ঈশ্বরদী চলে যা।
সাজ্জাদ: ঈশ্বরদী? ওখানে গিয়ে কী করব? কী দেখব?
সমীর: তোরা কি ছুটি কাটাতে যাচ্ছিস যে বিখ্যাত জায়গা দেখতে হবে? হানিমুন মানে নববধূর সাথে নিরিবিলি একান্তে কিছুদিন কাটানো উপভোগ সহকারে। ঈশ্বরদীতে তেমন কিছুই দেখার নেই। তাই ভাবির সাথে তোর সময়টা খুব চমৎকার কাটবে।
সাজ্জাদ: থাকব কোথায়?
সমীর: পাকশি পেপার মিলের রেস্টহাউজে। ওটার ম্যানেজার আমার মামা। যদিও মিলটা এখন বন্ধ। তবে মামার ম্যানেজারি এখনো যায় নাই। আমি ফোন করে দিলেই হয়ে যাবে।
সাজ্জাদ: তোকে অসংখ্য ধন্যবাদ ফ্রেন্ড!
সমীর: ফর্মালিটি দেখালে ফোন করব না কিন্তু!
রাজীব: ফোন করিস না সমীর!
(হুমায়ুন কিছু না বলে হাত তালি দিয়ে উঠবে)
সাজ্জাদ: (দাঁড়িয়ে সমীরের ডান হাত দুই হাতে চেপে ধরে) মাপ করে দে দোস্ত! আর কোনদিন ফর্মালিটি দেখাব না! ফোনটা করে দিস। নইলে ঈশ্বরদী গিয়ে অকূল পাথারে পড়ে যাবো রে!
সমীর: ডোন্ট ওরি। তুই বাসায় গিয়ে যাবার প্রস্তুতি নে এবং হানিমুনে গিয়ে এনজয় কর।
রাজীব: আমিও তাড়াতাড়ি বিয়েটা করে ফেলব! আর হানিমুনে ঈশ্বরদী যাবো!
সাজ্জাদ: (বাড়ির দিকে হাটতে শুরু করে) আগে বিয়ে কর বেটা! বিয়ে করতে সাহস লাগে!
রাজীব: তা তো দেখছিই! আমরা এখনো একটা বিয়ে করতে পারলাম না, আর তুই দুইটা বিয়ে করে ফেললি!
(সাজ্জাদ কোন কথা না বলে ঘাড় বাকিয়ে ওদের দেখে মুচকি হেসে হাটতে থাকবে)
হুমায়ুন: (সাজ্জাদের দিকে তাকিয়ে থেকে কণ্ঠ উঁচিয়ে) শুধু সাহস হলেই হয় না। মালকড়িও লাগে। আমরা বেকার, বাবারও অঢেল সম্পত্তি নাই। তোর বাবা অঢেল সম্পত্তি রেখে গেছেন; তাই বেকার হওয়া সত্ত্বেও একের পর এক বিয়ে করতে পেরেছিস।
সাজ্জাদ: (চলা না থামিয়ে পেছনে ওদের দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে) অবজেকশন ফ্রেন্ডস্‌! আমি বেকার না! বাবার ব্যবসা দেখাশুনা করছি।
হুমায়ুন: তৈরি সালুনে নুন দেয়া খুব সহজ ভাই রে!
(ক্যামেরা সাজ্জাদের পেছনে বাড়িতে ঢুকবে)
 
 
দৃশ্য-৩
 
(ওইদিন। সাজ্জাদের বাড়ি। সাজ্জাদ মায়ের কক্ষে ঢুকবে। মনোয়ারা বেগম খাটের ওপর বসে পান সাজবেন। সাজ্জাদ খাটের ওপর মায়ের মুখোমুখি বসে একটা পান তুলে চুন মাখিয়ে সুপুরি নিয়ে মুখে পুড়ে চিবুতে থাকবে। মনোয়ারা বেগম হাতের পানে খয়ের ও চুন মিশিয়ে কয়েক টুকরা সুপুরি নিয়ে ছোট হামান দিস্তায় ফেলে হ্যামার মারতে চাইলে সাজ্জাদ মা’র হাত থেকে নিয়ে হ্যামার মেরে পান-সুপুরি ছেঁচতে থাকবে)
 
মনোয়ারা বেগম: (মুখমণ্ডলে মুচকি হাসি ধরে রেখে) নিশ্চয়ই কিছু বলতে এসেছিস? বউমা কোথায়?
সাজ্জাদ: (পান ছেঁচতে ছেঁচতে) জানি না মা।
মনোয়ারা বেগম: সে কি কথা! জানিস না মানে? কী বলছিস তুই?
সাজ্জাদ: আমি যখন বাইরে যাই তখন তোমার বউমা ঘুমে ছিলো।
মনোয়ারা বেগম: তাহলে এখনো ঘুম থেকে উঠে নাই। তুই কী বলতে এসেছিস বল।
সাজ্জাদ: আমি আগামীকাল হানিমুনে যাবো মা।
মনোয়ারা বেগম: হঠাৎ হানিমুন কেন?
সাজ্জাদ: হঠাৎ বলছ কেন মা? বিয়ের পরেই  হানিমুনে যেতে হয়!
মনোয়ারা বেগম: তাই বলে আগামীকালই কেন? সপ্তাহখানেক যাক। নতুন বউটা বাড়িঘরটা চিনুক। তারপর যা।
সাজ্জাদ: বন্ধুদের সাথে বসে সব ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছি মা। আগামীকালই যেতে হবে।
মনোয়ারা বেগম: ঠিক আছে যা। কোথায় যাবি?
সাজ্জাদ: ঈশ্বরদী।
মনোয়ারা বেগম: ঈশ্বরদী! ওখানে কী আছে?
সাজ্জাদ: ওখানে নিরিবিলি পরিবেশ আছে মা। নিরিবিলি জায়গায় হানিমুনে গেলে একে অপরকে ভাল করে জানা যাবে।
মনোয়ারা বেগম: নিশ্চয়ই এটা তোর বন্ধুদের বুদ্ধি?
সাজ্জাদ: জি মা।
মনোয়ারা বেগম: অদ্ভূত অদ্ভূত বুদ্ধির অধিকারী তোর বন্ধুরা! তা থ্রি মাস্কেটিয়ার্স কবে বিয়ে করবে রে?
সাজ্জাদ: বিয়ে করতে সাহস লাগে মা।
মনোয়ারা বেগম: তা তোকে দেখেই বুঝতে পারছি!
(তখন নতুন সুতির শাড়ি পড়ে মাথায় কপাল সমান শাড়ির আচল টেনে সিমি কক্ষে ঢুকবে। মনোয়ারা বেগম সিমির দিকে তাকাবে)
 
সিমি: আস্সালামু আলাইকুম মা। আপনার শরীর ভাল আছে তো মা?
মনোয়ারা বেগম: ওয়ালাইকুম সালাম। আমার শরীর ভাল আছে মা। তুমি আমার পাশে এসে বসো।
সাজ্জাদ: (সিমিকে একবার দেখে হামানদিস্তাটা মা’র দিকে বাড়িয়ে দিয়ে) তোমার পান-সুপুরি ছেঁচা হয়ে গেছে মা। নাও।
(মনোয়ার বেগম হামানদিস্তা কাছে নিয়ে ছেঁচা পান-সুপুরি তুলে মুখে পুড়ে চিবুতে থাকবেন)
সিমি: আপনার পানে বেশ সুগন্ধ মা। কোথাকার জর্দা মা?
মনোয়ারা বেগম: খাঁটি হাকিমপুরি জর্দা বউমা। খুব সুগন্ধ! সাজ্জাদ হানিমুনের ব্যাপারে কিছু বলেছে তোমাকে বউমা?
সিমি: (অবাক কণ্ঠে) না তো!
মনোয়ারা বেগম: ছেলেটা আগামীকাল হানিমুনে যেতে চাচ্ছে। তোমার কোনো আপত্তি নেই তো বউমা?
সিমি: না না! আপত্তি থাকবে কেন! বিয়ের দুই এক দিনের মধ্যেই হানিমুনে চলে যাওয়া ভাল মা। দেরি করলে ঝামেলা বাড়তে থাকে। (সাজ্জাদের দিকে তাকিয়ে) তা কোথায় আমরা হানিমুনে যাচ্ছি?
সাজ্জাদ: (সিমির দিকে তাকিয়ে) পাবনার ঈশ্বরদিতে। ওখানে যেতে তোমার আপত্তি নেই তো?
সিমি: আপত্তি থাকবে কেন! অন্যরা সি-বিচে যায় আর আমরা যাবো পদ্মার চরে! অসুবিধা কী! কিচেন রুমটা কোনদিকে মা? নাস্তা বানাতে হবে তো।
(সাজ্জাদও সিমির পিছু নেবে)
 
 
দৃশ্য-৪
 
(পরদিন। সকাল দশটা। সাজ্জাদের বাড়ি। তৈরি হয়ে সাজ্জাদ  সিমি একত্রে মনোয়ারা বেগমের ঘরে ঢুকবে। মনোয়ারা বেগম রকিং চেয়ারে দোল খেতে খেতে নন্দিনী পত্রিকা পড়তে থাকবেন। পুত্র ও পুত্রবধূকে কক্ষে ঢুকতে দেখে পত্রিকা বন্ধ করে ওদের দিকে তাকাবেন। প্রথমে সাজ্জাদ ও পরে সিমি মনোয়ারা বেগমকে কদমবুচি করে সোজা হয়ে দাঁড়াবে)
 
মনোয়ারা বেগম: তোরা যাচ্ছিস?
সাজ্জাদ: জি মা। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।
সিমি: বিশেষ করে আমার জন্য বেশি বেশি দোয়া করবেন মা। (ওর মুখমণ্ডল জুড়ে রহস্যময় হাসি খেলবে)
মনোয়ারা বেগম: (ওর মুখমণ্ডলেও রহস্যময় হাসি খেলেই মিলিয়ে যাবে) আমি তোমাদের দুজনের জন্যই দোয়া করব বউমা। তোমরা সুখী হও। আমার ছেলেটাকে সুখী করতে নতুন করে সচেষ্ট হও! আল্লাহ তোমাদের মঙ্গল করুন।
(সাজ্জাদ আগে  পেছনে সিমি মনোয়ারা বেগমের ঘর থেকে বেরিয়ে আসবে। বারান্দা থেকে দুটো ব্যাগ সাজ্জাদ দুহাতে তুলে নিয়ে হাঁটতে থাকবে। সিমি সাজ্জাদের পেছন পেছন হাঁটতে থাকবে। ওরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশ ধরে হাঁটতে থাকবে। আশেপাশে তাকিয়ে কোন রিকশা দেখতে না পেয়ে সামনের দিকে হাঁটতে থাকবে। কিছুদূর যেতেই গাছের আড়াল থেকে তিনবন্ধু লাফ দিয়ে বের হয়ে আসবে। সিমি ভয় পেয়ে দু কদম পিছিয়ে বুকে থুথু ছিটাবে)
সাজ্জাদ: (রেগে) এটা কেমন আগমন তোদের? সিমি ভয় পেয়ে গেছে। আর একটু হলে আমিও ভয় পেতাম।
সমীর: আমরা ভাবিকে ভয় পাওয়াবার জন্যই প্ল্যান করেছিলাম।
হুমায়ুন: আমরা সাকসেসফুল!
সাজ্জাদ: রাস্তায় একটাও রিকশা দেখছি না। স্টেশনে যাবো কীভাবে?
রাজীব: আমরা সব রিকশা আটকে থাকার ব্যবস্থা করেছি।
সাজ্জাদ: মানে?
সমীর: স্টেশনে যাবার জন্য তোদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছি।
সাজ্জাদ: কী সেটা? গরুর গাড়ি? গরুর গাড়িতে গিয়ে ট্রেন ধরতে পারব?
হুমায়ুন: পালকি।
সাজ্জাদ: পালকি? এটা তো গরুর গাড়ির চেয়েও অধম!
সিমি: পালকি! তাহলে খুব মজা হবে! আমার পালকিতে চড়ার খুব সখ! পালকিটা কোথায় ফ্রেণ্ডস?
সমীর: একটা সমস্যা হয়েছে।
সাজ্জাদ: আবার কী?
সমীর: কোন বেহারা পাওয়া যায় নাই।
সাজ্জাদ: তাহলে?
রাজীব: ভাবি পালকিতে বসবেন আর আমরা চারজন পালকি বয়ে নিয়ে যাবো।
সাজ্জাদ: আমি?
হুমায়ুন: তুমি বইতে রাজি না হলে বাড়ি ফিরে যাও! হানিমুনে যাওয়া হবে না তোমাদের! আমাদের কী!
সাজ্জাদ: তোরা সবসময় আমার সাথে উল্টাপাল্টা করিস!
সিমি: আমার বেশ মজা লাগবে।
সাজ্জাদ: লাগবেই তো! তুমি পালকিতে আরামে বসে থাকতে পারবে। (হাতঘড়ি দেখে) হাতে সময় খুব কম। পালকিটা কোথায়?
সমীর: গাছের আড়ালে। ভাবি, আপনি পালকিতে গিয়ে বসেন। উহুম না উহুম না বলে আমরা বয়ে নিয়ে যাবো স্টেশনে।
(সিমি ছুটে গাছের দিকে যেতে থাকবে। গাছের ওদিকে রাখা পালকিতে চড়ে বসবে। চার বন্ধু এসে পালকির চার কোণায় দাঁড়াবে)
সাজ্জাদ: (তিনজনের দিকে কটমট করে তাকিয়ে) পালকি ঘাড়ে তোল! হাতে সময় নাই।
সিমি: (পালকির ভেতর থেকে) ফেলে দিয়েন না যেন ফ্রেন্ডস্!
সমীর: আমরা থাকতে আপনার কোন ভরসা নাই ভাবি!
(চার বন্ধু পালকি ঘাড়ে তুলে হাটতে শুরু করবে। মুখে বলতে থাকবে উহুম না উহুম না...। পালকি ছোট রাস্তা ছেড়ে বড় রাস্তায় উঠে বাসস্ট্যাণ্ডের পাশ দিয়ে যেতে থাকবে)
 
 
দৃশ্য-৫
 
(সেদিন বিকেল। ঈশ্বরদী বাসস্ট্যাণ্ড। সাজ্জাদ  সিমি অন্যদের সাথে বাস থেমে নামবে। একটা রিকশা করে ওরা চলে আসবে বন্ধ হয়ে যাওয়া পাকসি পেপার মিলে। ভাড়া মিটিয়ে উইণ্ডো গেট দিয়ে ঢুকেই কেয়ারটেকারের মুখোমুখি হয়ে যাবে)
 
সাজ্জাদ: আমি সাজ্জাদুর রহমান। কিশোরগঞ্জ থেকে এসেছি। আমাদের জন্য রেস্টহাউজে একটা রুম বুক করা হয়েছে।
কেয়ারটেকার: আসসালামুআলাইকুম। আমি আপনাদেরই অপেক্ষা করছিলাম। আসেন আমার সাথে। সামনেই রেস্টহাউজ। একটা ব্যাগ আমাকে দেন।
(কেয়ারটেকার একটা ব্যাগ সাজ্জাদের হাত থেকে নিয়ে হাটতে থাকবে। দুজন ওর পিছু নেবে)
সাজ্জাদ: (চারদিকটা একবার দেখে) আচ্ছা কেয়ারটেকার ভাই, মিলটা বন্ধ হয়ে গেলো কেন? আমি এই পাকশি মিলের হোয়াইট পেপারটা খুব ইউজ করতাম। 
কেয়ারটেকার: এই মিলটা চলত আখের ছোবরায়। সুগারমিলগুলা একে একে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আখের ছোবরা সাপ্লাইও বন্ধ হয়ে গেলো। তাই পেপারমিলও বন্ধ!
সাজ্জাদ: বিকল্প কিছু দিয়ে চালানো যায় না?
কেয়ারটেকার: আমি জানি না।
সাজ্জাদ: ও। এখানে কোন অসুবিধা হবে না তো কেয়ারটেকার ভাই?
কেয়াটেকার: একটা অসুবিধা ছাড়া অন্যকোন অসুবিধা নাই।
(অসুবিধার কথা শুনে সিমি মুখমণ্ডলে প্রশ্নবোধক চিহৃ নিয়ে কেয়ারটেকারের দিকে তাকাবে)
সাজ্জাদ: কোনটা?
কেয়ারটেকার: ঈশ্বরদী বাজার থেকে আপনাদের খাবার খেয়ে আসতে হবে অথবা আনাতে হবে। আমাকে টাকা দিলে আমি নিয়ে আসব।
সাজ্জাদ: ওটা কোন সমস্যা না।
(কথাবার্তার মধ্যেই ওরা রেস্টহাউজের বারান্দায় উঠে আসবে। কেয়ারটেকার দুই শো এক নম্বর কক্ষের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকবে। ওরার ভেতরে ঢুকবে)
কেয়ারটেকার: (ব্যাগটা নামিয়ে রেখে) আপনারা কাপড়চোপড় পাল্টে রেস্ট নেন। কোন কিছু লাগলে কলিং বেল টিপলেই আমি চলে আসব)
(কেয়ারটেকার কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলে সাজ্জাদ দরজা আটকে দিয়ে হাতের ব্যাগটা পাশে রেখে সোফায় বসবে)
 
সিমি: (এগিয়ে গিয়ে একটা জানালা খুলে বাহিরটা দেখে ফের আটকে দিয়ে সাজ্জাদের দিকে ঘুরে) জায়গাটা একেবারে নীরব। মনে হয় বনবাসে চলে এলাম!
সাজ্জাদ: (একটা মশা মেরে) ডোন্ট থিঙ্ক লাইক দিস। সফল হানিমুনের জন্য এমন জায়গায়ই দরকার ডার্লিং। আমরা ঠিক জায়গায়ই এসেছি। নো চিন্তা, ডু ফুর্তি! খানিকক্ষণ রেস্ট নিয়ে রেডি হয়ে নাও। পাকশি রেলব্রিজ ও রোড ব্রিজটা দেখতে যাবো।
সিমি: (বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে) আমি খুব টায়ার্ড। কোথাও যেতে পারব না। তুমি যাও।
সাজ্জাদ: কী মুস্কিল! আমিও তো টায়ার্ড। একটু রেস্ট নিয়ে দুজন একসাথে যাবো।
সিমি: আজ আমাকে মাফ করে দাও। আগামীকাল থেকে তোমার সাথে সব জায়গায় যাবো। তুমি আজ চলে যাও। ফেরার সময় শহর থেকে রাতের খাবারটা নিয়ে এসো। লক্ষীটি!
সাজ্জাদ: দাঁড়িয়ে একবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে) ওকে!
(সিমির কাছে এসে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করলে সিমি মুখ সরিয়ে নেওয়ায় সাজ্জাদ থুতনি নেড়ে দিয়ে মুখভর্তি নিঃশব্দ হাসি নিয়ে বেরিয়ে আসবে রেস্ট হাউস থেকে। কোকিলের ডাক শুনে তাকাবে ওপরে। এখানে প্রচুর বড় বড় গাছ। পুরোপুরি গ্রাম ভাব।  মনে মনে বলবে: পুরোটা বাংলাদেশ যদি এমন গ্রাম গ্রাম ভাবে থাকত; তাহলে কত ভালই না লাগত; বুক ভরে তাজা নিঃশ্বাস নেওয়া যেত; কিন্তু তা কী আর হবার জো আছে! প্রতিদিন গ্রাম উজার হয়ে ইটের গাঁথুনি বাড়ছে। আমরা অবশেষে ইটের ভেতরে মানুষ কীট হয়ে যাব! এখন এখানে শুনসান নীরবতা। অথচ একদিন এখানে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, মেশিনের শব্দ ছিল, হাজার মানুষের পদচারণা ছিল। মিলটা বন্ধ হয়ে গেল। এভাবে সরকারি মিলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, অব্যাহত লোকসান। অথচ বেসরকারি হাতে গেলেই লাভের মুখ দেখতে থাকে। রহস্যটা কী?)
(সাজ্জাদ গেট দিয়ে বাইরে এসে দেখে কেযারটেয়ার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে)
সাজ্জাদ: আমি বাইরে যাচ্ছি। আমার ওয়াইফ রেস্টহাইজে। ওর দিকে খেয়াল রেখো। ডাক দিলে যেয়ো।
কেয়ারটেকার: জি স্যার। কোন চিন্তা করবেন না স্যার। আর আপনি আসার সময় রাতের খাবারটা শহরের কোন হোটেল থেকে নিয়ে আসবেন।
সাজ্জাদ: আচ্ছা।
(ক্যামেরা রাস্তায় ফোকাস হবে)
 
 
দৃশ্য-৬
 
 
(ওইদিনই। পাকশি মিল এলাকা। সাজ্জাদ হাঁটতে থাকবে। মিল বন্ধ থাকায় এদিকে রিকশা আসে না।  হেঁটেই চলে আসবে রেল-লাইনের ওপর। সামনেই পাকশি রেলব্রিজ। সামনে-পিছনে তাকিয়ে দেখবে কোন ট্রেন আসছে না। সে রেলের স্লিপার ধরে হাঁটতে থাকবে। বেশ বড় ব্রিজ। রেল লাইনের মাঝে ও উভয়দিকে স্টিলের সিট দেওয়ায় হাঁটতে কোন অসুবিধা হবে না। ব্রিজ পার হবার পরপরই ট্রেনের হুইসেলের শব্দ শোনা যাবে দক্ষিণ দিক থেকেই। দেখতে দেখতে ট্রেনটা চলে আসবে-খুলনা-নীলফামারি ইন্টারসিটি। রেল থেকে বেশ নীচে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাতাসের ঝাপটাটা ভালভাবেই লাগবে সাজ্জাদের  গায়ে। ট্রেনটা চলে গেলে সে হেঁটে রোড ব্রিজের রাস্তায় চলে আসবে। এখানে রাস্তার দুপাশে বেশ দোকান-পাট। সে একটা চায়ের দোকানে বসে চা পান করবে। চা পান শেষে হাঁটতে থাকবে। হেঁটে রোডব্রিজ পার হয়ে টেম্পোতে চড়ে চলে আসবে শহরে। বেশ কিছু কেনাকাটা আছে। ঈশ্বরদী সুপার মার্কেটে ঢুকে দোতলায় উঠে একেবারে মুখোমুখি হয়ে যাবে সিমির। সাজ্জাদ অবাক আর সিমি থতমত খেলেও তা সাজ্জাদকে বুঝতে না দিয়ে সামলে নিয়ে মুচকি হাসবে)
সাজ্জাদ: তুমি হঠাৎ মার্কেটে? তখন আমার সাথে বেরোতে চাইলে না!
সিমি: (বোকার মতো হেসে) তুমি চলে আসার পরও ভালই ছিলাম! হঠাৎ মাথা ব্যথা শুরু হলো! তখন কেয়ারটেকারকে না পেয়ে আমাকেই আসতে হলো!
সাজ্জাদ: (সিমির ডান হাত ধরে) ভালই হয়েছে। দুজনে মিলে কেনাকাটা সেরে একেবারে রাতের খাবার খেয়ে রেস্টহাউসে চলে যাবো।
(সিমি কিছু না বলে মুচকি হাসবে)
সাজ্জাদ: (সিমির হাত আরোপ শক্ত করে ধরে) তোমার হাতটা বেশ নরম ও গরম লাগছে এখন। মনে হচ্ছে এর আগে এই হাত ধরিনি! তা কী হয় কখনো?
সিমি: (আলগোছে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে) কী যে বলছ না তুমি! কিছুই বুঝতে পারছি না! চলো মার্কেটিং শুরু করি।
সাজ্জাদ: চলো।
(দুজন পুরোটা সুপার মার্কেট ঘুরে এটাসেটা কিনবে। ব্যাগগুলো সাজ্জাদের হাতে থাকবে) নীচতলায় নেমে দুজন গেটের কাছে দাঁড়াবে)
সাজ্জাদ: তোমার মাথা ব্যথার ট্যাবলেট তো কেনা হলো না! তোমার মাথা ব্যথা কি সেরে গেছে!
সিমি: নাহ্‌! তুমি দাঁড়াও, আমি চট করে কিনে নিয়ে আসছি!
(সাজ্জাদকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সিমি ওর চোখের আড়ালে চলে যাবে। সাজ্জাদ মুচকি হাসবে শুধু। দশ মিনিট পার হবার পরও সিমি না আসায় সাজ্জাদ হাতঘড়ি দেখে মনে মনে বলবে: নতুন জায়গায় সিমি পথ হারিয়ে ফেলেনি তো? সাজ্জাদ ফের ভেতরে ঢুকবে। প্রত্যেক তলায় প্রত্যেক দোকানে, বাথরুমে তন্নতন্ন করে খুঁজেও সিমিকে না পেয়ে সাজ্জাদ রিকশা করে ফিরতে থাকবে রেস্টহাউজের দিকে। মনে মনে ভাববে: নিশ্চয়ই সিমি রেস্টহাউজে চলে গেছে ওকে হারিয়ে। রেস্টহাউজে এসে দেখবে সিমি বসে আছে রেস্টহাউজের বারান্দায়)
সাজ্জাদ: (রেস্টহাউজের বারান্দায় উঠে সিমির সামনে এসে) আমি তোমার জন্য মার্কেটের গেটের সামনে ওয়েট করছি, আর কোনদিক দিয়ে তুমি চলে এলে?
সিমি: (সাজ্জাদের কথায় চমকে উঠলেও ওকে বুঝতে না দিয়ে সামলে নিয়ে) আমি পথ হারিয়ে তোমাকে খুঁজে না পেয়ে রেস্টহাউজে চলে এসেছি!
সাজ্জাদ: ভাল করেছ। আমি জিনিসগুলো ভেতরে রেখে একটা চেয়ার নিয়ে আসছি।
(সাজ্জাদ কক্ষের দরজার দিকে যেতে থাকবে)
সিমি: রাতের খাবার এনেছ তো?
সাজ্জাদ: এত সকালে রাতের খাবার নিয়ে এলে ঠান্ডা বরফ হয়ে যাবে। রাত আটটার দিকে কেয়ারটেকারকে আনিয়ে নিলেই হবে।
সিমি: তা ঠিক।
(সাজ্জাদ কলবেল টিপলে কেয়ারটেকার ভেতরে ঢুকবে। টাকা নিয়ে সে বেরিয়ে যাবে। সে হাঁটতে হাঁটতে রেললাইন ধরে প্লাটফর্মে উঠে আসবে)
 
 
দৃশ্য-৭
 
(ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন। সকাল দশটা। কিশোরগঞ্জ থেকে আগত ঈশা খাঁ আন্তনগর আস্তে আস্তে প্ল্যাটফর্মে এসে থামবে। যাত্রীরা নামতে থাকবে। একটি শোভন কামরা থেকে ব্যাগ হাতে সাজ্জাদ নামবে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে সোজা হাঁটতে থাকবে গেটের দিকে। প্ল্যাটফর্মের বাইরে এসে একটা সিএনজিতে উঠে বসবে। সিনজি অটো চলতে শুরু করবে। প্রথমে ইস্টার্ণ মার্কেটে যাবে এবং সেখান থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় অবস্থিত কম্পিউটার মার্কেটে যাবে। ব্যবসার কাজ সেরে সরাসরি চলে আসবে বসুন্ধরা সিটি। উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরবে একতলা থেকে আরেক তলায়-কখনো লিফটে, কখনো এসকালেটরে কখনো বা সিঁড়ি মাড়িয়ে। ফুডকোর্টে এসে হাঁটতে হাঁটতে সিমিকে দেখে চমকে উঠবে ভীষণ এবং থমকে দাঁড়াবে। মনে মনে বলবে: সিমি ঢাকায়? হঠাৎ? আমার সাথে এলেই তো পারত?)
সাজ্জাদ: (সিমির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে) তুমি ঢাকায়? কখন এলে? আমাকে বলোনি কেন? তাহলে আমরা একসাথে আসতাম।
সিমি: (চমকালেও সাজ্জাদকে বুঝতে না দিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে) তুমি বের হবার পরপরই মনে পড়ল আমার এক বান্ধবী আজ কোর্ট ম্যারেজ করছে! কিছুদিন আগে আমাকে চিঠিতে জানিয়েছিল এবং আমাকেও আসতে বলেছিল! আমার কোন মোবাইল না থাকায় তোমাকে জানাতে পারিনি!
সাজ্জাদ: এবার তোমাকে একটা মোবাইল কিনে দিতেই হবে ডার্লিং।
সিমি: দরকার নেই! এভাবেই চলে যাবে! মোবাইল ফোনটা আমার তেমন পছন্দ না!
সাজ্জাদ: তা বিয়েটা কী বসুন্ধরা মার্কেটে হয়েছে নাকি?
সিমি: তা হবে কেনো! কোর্ট ম্যারেজটা হবার পরই এখানে এলাম টুকটাক কেনাকাটা করার জন্য!
সাজ্জাদ: কী কী কিনতে হবে?
সিমি: তোমার সাথে দেখা হয়ে গেল, তাই এখন আর কিছু কিনব না! এখানে কফি খেয়ে চলে যাই।
(দুজন মুখোমুখি টেবিলে বসে দুই কাপ কফির আদেশ দেবে)
সাজ্জাদ: (কফি পান করতে করতে) আজ তো যাওয়া যাবে না। হোটেলে থাকতে হবে।
সিমি: (আঁতকে উঠে) হোটেলে! আমি হোটেলে থাকা পছন্দ করি না! তাছাড়া আমাকে নিয়ে কোন হোটেলে উঠলে লোকজন ভাববে আমি খারাপ মেয়ে! তা কি তুমি চাও?
সাজ্জাদ: তা চাইব কেন!
সিমি: তাহলে আজ রাতটা আন্টির বাসায় কাটিয়ে দেব; যদিও আন্টির বাসাটা ছোট! সেজন্যে আমাদের আলাদা থাকবে হবে! তোমার অসুবিধা হবে না তো সাজ্জাদ?
সাজ্জাদ: নাহ্‌! (হাতঘড়ি দেখে) মাত্র দুটো বাজে। রাত হতে এখনো অনেক বাকি। আমরা কী এখনই আন্টির বাসায় চলে যাবো?
সিমি: (চমকে উঠে) যেতে যেতে কী আর বিকেল থাকবে! ঢাকায় যা যানজট এখন! এখান থেকে বারিধারা যেতে দুই ঘন্টা লেগে যাবে!
সাজ্জাদ: (ডান হাতের আঙুলের গিঁট গুণে) তখন বিকেল চারটা বাজবে। ডিজিটাল টাইমে এখন সন্ধ্যা নামছে সাতটায়। আর শহরে মানুষ ঘুমুতে যায় রাত এগারোটায়। অর্থাৎ হাতে সময় কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা। এই ছয় ঘণ্টা কোথায়ও ঘুরাফেরা করা যায় না ডার্লিং?
সিমি: তোমার সময়ের হিসাব ঠিক আছে; তবে ভাবনায় কিছুটা ত্রুটি আছে।
সাজ্জাদ: কী রকম?
সিমি: ঢাকায় সন্ধ্যার পর স্কুটারে বা ট্যাক্সিতে ঘুরাফেরা করা একেবারেই নিরাপদ নয়। তাই সাতটার মধ্যেই আমাদের বাসায় পৌঁছতে হবে।
সাজ্জাদ: তোমার কথা ঠিক। তাহলেও আমাদের হাতে সময় থাকে তিন ঘণ্টা। এই তিনঘন্টা কোথাও ঘুরা যেতে পারে।
সিমি: কোথাও না গিয়ে সিনেপ্লেক্সে ফিল্ম দেখতে কেমন হয়?
সাজ্জাদ: কী ফিল্ম চলছে সিনেপ্লেক্সে?
সিমি: স্লামডগ মিলিওনিয়ার। তাও আবার বাংলা ডাব করা।
সাজ্জাদ: (কিছুটা উৎফুল্ল কণ্ঠে) তাহলে তো দেখতেই হয়!
সিমি: (কফির কাপে চুমুক দিয়ে) একটা কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলেই গেলাম।
সাজ্জাদ: কী কথা?
সিমি: তোমার ঢাকার কাজ হয়েছে?
সাজ্জাদ: হুঁ। কিছু মোবাইল সেট  কম্পিউটার পার্টসের অর্ডার দিয়ে গেলাম।
সিমি: (নিঃশেষ কফির কাপ টেবিলে নামিয়ে) চল এবার। দেরি হলে টিকিট পাওয়া যাবে না।
সাজ্জাদ: (কাপে শেষ চুমুক দিয়ে) চল।
(ওরা কফি পান শেষ করে বিল মিটিয়ে সিনেপ্লেক্সের দিকে হাটতে থাকবে। লিফটে টপ ফ্লোরে এসে টিকিট কেটে ঢুকে যাবে ভেতরে)
 
 
দৃশ্য-৮
 
(রাত। সাজ্জাদের বাড়ি। সাজ্জাদের শয়নকক্ষ। দুজন পাশাপাশি শুয়ে থাকবে। ঘরে মৃদু আলো জ্বলবে। দুজনই ঘুর্ণায়মান পাখার দিকে তাকিয়ে থাকবে)
 
সিমি: আমাদের বিয়ের দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। অথচ আমাদের কোন বাচ্চা হলো না।
সাজ্জাদ: কয়েকবার ডাক্তারের কাছে পরীক্ষা করালাম। ডাক্তার বলল সবকিছু ঠিক আছে। যেকোন সময় তুমি কনসিভ করতে পারো।
সিমি: কিন্তু তারপরও আমি কনসিভ করছি না! রহস্যটা কী!
সাজ্জাদ: আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না। আর কয়েকটা মাস দেখব। তারপরও তুমি কনসভি না করলে ঢাকা যাবো।
সিমি: সে পরে হবে। এখন চলো, আমরা একটা শিশু দত্তক নেই।
সাজ্জাদ: (বিস্মিত কণ্ঠে) দত্তক? আমরা কি অক্ষম যে দত্তক নেবো?
সিমি: ঠিক তা না! মা নাতির জন্য পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছেন; আমিও একটা শিশু চাচ্ছি। তুমি অফিসে চলে গেলে বাসায় একা একা সময় কাটতে চায় না!
সাজ্জাদ: তোমার কথামতো একটা শিশু দত্তক নিলাম। তারপর আমাদের বাচ্চা হলো। তখন? তখন কী হবে? তখন কি আর দত্তক নেয়া শিশুটিকে নিজের শিশুর মতো আদর করতে পারবে?
সিমি: তখন দত্তক নেয়া শিশুটিকে ফিরিয়ে দেবো!
সাজ্জাদ: সে কি! হা…। এটা করা যায়। তোমার সন্ধানে কোন শিশু আছে নাকি?
সিমি: (অত্যন্ত খুশি হয়ে সাজ্জাদকে আদর করে) আছে! আগামীকালই ওকে নিয়ে আসতে বলব।
সাজ্জাদ: বলো।
(ক্যামেরা ঘর থেকে জানালা গলিয়ে বারান্দায় যাবে)
 
দৃশ্য-৯
 
(পরদিন। দুপুর একটা। সাজ্জাদের বাড়ি। বাড়িতে ঢুকে বারান্দায় মা’র কোলে শিশুটিকে দেখে চমকে উঠবে সাজ্জাদ। মনে মনে বলবে: এ যে ওর তালাক দেয়া প্রথম স্ত্রী আরিফার সন্তান! আরিফা সন্তানের মায়াত্যাগ করে দত্তক দিয়ে দিলো? সিমি মা’র পাশে বসে হাসিমুখে দুই বছর বয়সি রোহনের সাথে কথা বলবে। সাজ্জাদকে দেখে দুজনই ওর দিকে তাকাবে)
 
সাজ্জাদ: একে কোথায় পেলে তুমি?
সিমি: (খুশিতে গদগদ কণ্ঠে) মা-ই ওকে দত্তক নেবার পরামর্শ দিলেন।
মনোয়ারা বেগম: (শিশুকে কোলে দোল দিতে দিতে) হ্যাঁরে খোকা। আমিই বউমাকে বললাম দত্তক নিতে হলে আরিফার সন্তানকেই নেয়া ভাল! আমাদের বংশ আমাদের কাছে চলে আসবে!
সাজ্জাদ: আরিফা একে দিয়ে দিলো? এই শিশুর পাঁচ বছর লালন-পালনের জন্য আমাকে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হয়েছে তালাকের সময়।
মনোয়ারা বেগম: আমি কথাটা বলতেই আরিফা রাজি হয়ে গেলো। (বলে সিমির দিকে তাকাবেন; চোখে রহস্যের হাসি। পরে সাজ্জাদের দিকে তাকিয়ে) ওরা বলেছে ভরণপোষণের ওই টাকা তোকে ফেরত দেবে।
সাজ্জাদ: তাই?
মনোয়ারা বেগম: তাই তো বলল আরিফা! আগামীকালই টাকাটা পাঠিয়ে দেবে।
(ফের রহস্যভরা চোখে মনোয়ারা বেগম সিমির দিকে তাকাবেন। সিমিও চোখে রহস্যের হাসি নিয়ে প্রথমে মাকে ও পরে সাজ্জাদের দিকে তাকাবে। সাজ্জাদ কিছু না বলে রোহনকে একবার দেখে ঘরের ভেতরে চলে যাবে। ওর ভ্রূ দুটো কুঁচকানো থাকবে: সে ঘরের জানালা খুলে বাইরে তাকিয়ে ভাবতে থাকবে: কিছুই বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে কোথাও একটা রহস্য আছে। কিন্তু রহস্যটা কী তা ধরতে পারছি না। রোহনকে দত্তক নিয়ে আসা কোন কাকতালীয় ঘটনা না রহস্যেরই অংশ? সাজ্জাদ জানালা দিয়ে সামনের রাস্তায় তাকাবে)
 
দৃশ্য-১০
 
কিছুদিন পর একদিন সকাল এগারোটা। সাজ্জাদ নান্দাইল চৌরাস্তায় বাস থেকে নেমে সিমিকে রাস্তায় দেখে চমকে উঠবে। মনে মনে বলবে: সিমি চৌরাস্তায় কী করছে? বেশ স্লিম লাগছে না? কয়েক ঘন্টায় এত স্বাস্থ্য কমালো কীভাবে সে? তাছাড়া যে সালোযার-কামিজটা পড়ে আছে, সেটা এর আগে সিমি কখনো পড়েনি এবং আমিও দেখিনি। কোনো রহস্য? সাজ্জাদ আড়াল থেকে সিমির কাছাকাছি গিয়ে মোবাইল ফোনসেট বের করে রিং করে কানে ঠেকাবে। ওদিক থেকে সিমির গলার আওয়াজ শুনতে পাবে: হ্যালো? সাজ্জাদ আরোপ চমকে ভ্রূ কুঁচকে মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দিয়ে মনে মনে বলবে: তাহলে এ কোন সিমি? সিমির কোন যমজ না কী সিমির মতো অন্য কেউ? সিমির যমজ আছে বলে তো আমি জানি না। অন্য কোন রহস্য? জানতে হলে এই সিমিকে জানতে হবে আগে। সাজ্জাদ নিজেকে আড়ালে রেখে পিছু নিলো দ্বিতীয় সিমির। এ সিমি রিকশায় আগে এবং ও পেছনে। সিমিকে ওর শ্বশুরবাড়ির দিকে যেতে দেখে ভ্রূ কুঁচকে ফের মনে মনে বলবে: ব্যাপারটা কী? এই সিমি তো আমার শ্বশুরবাড়ির দিকে অর্থাৎ ওই সিমির বাবার বাড়ির দিকে যাচ্ছে? এটা কি আমার শ্বশুরবাড়ি, না এই সিমির বাবার বাড়ি? তাহলে ওই সিমির বাবার বাড়ি কোনটা? রহস্যটা কী? তাহলে কি বাসররাতের সন্দেহটাই ঠিক? তবে কী কোন ষড়যন্ত্র? আরিফার চেহারাটা ভাসবে চোখের সামনে। তারপর সিমির। মনে মনে ফের বলবে সাজ্জাদ: আরিফার চেহারায় সিমির চেহারা? কসমেটিক সার্জারি? এ জন্যই কি ওই সিমি কৌশলে বাচ্চা না নিয়ে নিজ সন্তানকেই দত্তক নেবার অছিলায় কাছে নিয়ে এসেছে? এটা হয়ে থাকলে এ যে ভয়াবহ রকমের ষড়যন্ত্র হয়েছে আমার বিরুদ্ধে! মা-সহ সবাই কি সামিল এ ষড়যন্ত্রের সাথে? সাজ্জাদ জ্ঞান হারিয়ে রিকশা থেকে নেতিয়ে রাস্তায় পড়ে যাবে।
 

যবনিকা

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)