বাতায়ন/হাপিত্যেশ/ধারাবাহিক/২য়
বর্ষ/৫ম সংখ্যা/৩২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪
হাপিত্যেশ | ধারাবাহিক গল্প
ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য
গন্ধ বদলে যায়
[২য় পর্ব]
পূর্বানুবৃত্তি তপন সুন্দরী অফিসকলিগ সুন্দরী মৌসুমীকে সঙ্গে নিয়ে একই বাসে
পাশাপাশি বসে বর্ধমান যাবে। মৌসুমী নিজে বলেছে গতকাল। মৌসুমীর সুন্দর মিষ্টি
পারফিউমের গন্ধে, কোমল শরীরের ছোঁওয়ার কথা ভেবেই রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে তপন। অফিস থেকে
বেরিয়ে সতর্কতার সঙ্গে বাসস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে যায় যাতে কেউ আন্দাজ করতে না
পারে। তারপর…
চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে তপন। এরপর আর কথা চলে না। মুখ খুললেই ছুটি নাকচ। দত্তবাবু বলে, "বুঝি রে তপন সব বুঝি। বেশ আজ না হয় আগেই যাবি। পারফিউমের ঘ্রাণ নাকে নিয়ে…"।
পাশের টেবিল থেকে দাসবাবু বলে "আপনিও যেমন কথা বলেন দত্তদা। হিসির বাসি গন্ধ শুঁকে তপনের জীবন গেলো। এই বয়সে সন্তান বোঝেন তো…"।
চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে তপন। এরপর আর কথা চলে না। মুখ খুললেই ছুটি নাকচ। দত্তবাবু বলে, "বুঝি রে তপন সব বুঝি। বেশ আজ না হয় আগেই যাবি। পারফিউমের ঘ্রাণ নাকে নিয়ে…"।
পাশের টেবিল থেকে দাসবাবু বলে "আপনিও যেমন কথা বলেন দত্তদা। হিসির বাসি গন্ধ শুঁকে তপনের জীবন গেলো। এই বয়সে সন্তান বোঝেন তো…"।
হাসতে হাসতে দত্তবাবু বলে, "সে কী আর বুঝি না ভাই। তপনের ঘরে বিকেলে ভোরের
ফুল।"
'বিকেলে ভোরের ফুল' কথাটা আগেও দত্তবাবুর মুখে শুনেছে তপন, অর্থ বোঝেনি। জিজ্ঞেস করেছিল চায়ের দোকানের রঘুকে। রঘু বলে তপনদা "বেশি বয়সে ছেলে…"।
রাগ হয় তপনের। আগে বন্ধুবান্ধবরা তপনকে নিয়ে তামাশা করত। এখন অফিসের লোকজন লোফালুফি খেলে। লতিকার জন্যই আজ এই অবস্থা। রাজি ছিল না তপন। লতিকা জোর করে রেখে দিল। বলে, "যে আসছে সংসারের মঙ্গলের জন্যই আসছে। এর থেকেই আমাদের সংসারের শ্রী ফিরবে দেখে নিও তুমি।"
ছেলে হবার পর থেকে সংসারের মঙ্গল-অমঙ্গল কিছুই বোঝেনি তপন। বরং খরচ বেড়েছে। ছুটি নিয়েছে লতিকার অবসর। সারাদিন পরিশ্রম। রাতে বিছানায় পিঠ ছোঁয়ালেই ঘুমিয়ে যায় লতিকা। নিজের মতো করে তখন বউকে আর কাছে পায় না তপন। ঘন অন্ধকারে রাতগুলো মুচকি হেসে চলে যায়। মাঝে মধ্যে নিঝুম রাতে হরপা বান আসে তপনের মনে। ইচ্ছে হয় লতিকাকে সঙ্গে নিয়ে বানভাসি হয়। লতিকার গায়ে হাত রাখে তপন। ঘুম চোখে লতিকা বলে, "বিরক্ত কোরো না, ঘুমোতে দাও। বুড়ো বয়সে ভীমরতি। মেয়েদের বিয়ের বয়স…"।
ভিতর থেকে কুঁকড়ে যায় তপন। কেমন একটা জমাট লজ্জা নিয়ে লতিকার পাশ থেকে সরে আসে। ঠিকই তো বড় মেয়েটা এই বছর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করল। ছোট মেয়ে ক্লাস টেন। ছেলে সবে আড়াই বছরে। বয়স যেন রেসের ঘোড়া! ছুটেই চলে সামনে। ঘরের পাতলা অন্ধকারে নানা কথা ভাবে তপন। ছেলেটা কাঁথা ভিজিয়ে শুয়ে থাকে। ভিজে কাঁথা সরিয়ে শুকনো কাঁথা পেতে দেয় তপন। সোঁদা গন্ধে নাসারন্ধ্র জ্বলে যায়। মৌসুমী ম্যাডামের পারফিউমের গন্ধটা চেতনায় আনার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়, বাকি রাতটা হিসির গন্ধে ডুবে থাকে তপন।
অফিসে বেশ সুন্দর সময় কাটে তপনের। আড়াল-আবডাল থেকে দেখে মৌসুমী ম্যাডামকে। ভারী মিষ্টি দেখতে। নরম গলায় হেসে হেসে কথা বলে। ঘাড়টা সামান্য হেলিয়ে দেয় কথা বলবার সময়। হাসলে গালে টোল পড়ে। একদম সিনেমার নায়িকার মতো লাগে মৌসুমীকে। আর কী পারফিউম মাখে কে জানে। গোটা অফিস ম-ম করে সেই সুগন্ধে। সাহাবাবু একদিন বলছিল, "এটা প্যারিসের জিনিস। নয়তো অফিস সুদ্ধু সবাই মাতাল হতো না।"
দাসবাবু বলে "ভাবুন আমাদের তপনদার কী সৌভাগ্য। সারাদিন পারফিউমের বোতলের মধ্যেই রয়েছে।" দাসবাবুর কথা শুনে আশেপাশের টেবিলে হাসির হিল্লোল ওঠে। ভয় পায় তপন। মৌসুমী ম্যাডাম শুনলে কী হবে!
দিন কয়েক আগে তপনকে সরিয়ে দিয়ে প্রয়োজনীয় ফাইল খুঁজছিল মৌসুমী নিজে। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তপন। অসীম মুগ্ধতায় বুঁদ হয়ে দেখছিল মৌসুমীকে। দত্তবাবু নিজের চেয়ার থেকে ডাক দেয় তপনকে। তপন কাছে এলে বলে, "চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছিস মেয়েটাকে। দেখে ফেললে জুতো পেটা করবে।" বলেই সেই কালচে দাঁতের হাসি ভাসিয়ে দেয়। তপন ভাবে গোটা অফিস তাকে নজরে বেঁধে রেখেছে। সাবধান করে নিজেকে। আড়ালে তপনকে শাসন করে তপন। তবুও দিনে দিনে একটা বেহায়া হ্যাংলামি লকলক করে তপনের মনে। তাড়িয়ে নিয়ে যায় মৌসুমীর দিকে। বাধ্য করে মৌসুমীর দিকে তাকিয়ে থাকতে। জোরে জোরে বাতাস টেনে সুগন্ধে মজিয়ে দিতে চায় নিজের ভিতরটাকে। ভিতরের সমস্ত দুর্গন্ধ ঢাকতে চায় মৌসুমীর পারফিউমের গন্ধে। মৌসুমী অফিসে থাকলে কাজ করতে ভাল লাগে তপনের। মনে হয় একাই সব কাজ করতে পারবে। দত্তবাবু একদিন তপনকে বলে ছিল "মিডিল এজ ক্রাইসিস।" কথাটার অর্থ বোঝেনি তপন।
"তপনদা আসুন।" এইবার একটু জোরেই ডাকে মৌসুমী।
মৌসুমীর ডাক না শোনার ভান করে তপন। আজ একই সঙ্গে ফিরবে। বাস আসবার আগে তো আর চলে যেতে পারবে না মৌসুমী । তাড়াহুড়ো না দেখানোই ভাল। বাস রাস্তার দিকে তাকায় তপন। দৃষ্টি ভাসিয়ে দেয় বহুদূরে। বাসের দেখা নেই। এই সময়ের বাসটা রোজ লেট করে। বুক পকেট থেকে সন্তর্পণে মোবাইল বের করে তপন। সময় দেখবে। বোতাম টেপা পুরানো ফোন। কীপ্যাডে গার্ডার দেওয়া। স্ক্রিনে ফাটা দাগ। ছেলেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এমন হাল করেছে। আড়াই বছরের বাচ্ছা। খাবার সময় বায়না করে। বড় মেয়ের মোবাইলে গান বাজিয়ে দেয় লতিকা। খেয়ে নেয় ছেলে। দিন কয়েক আগে মেয়েটার অনলাইন ক্লাস চলছে এদিকে ছেলেটা খাবে না কিছুতেই। কাঁদছে। সামলাতে না পেরে ছেলেটাকে দু ঘা ধরিয়ে দেয় লতিকা। সেদিন বাড়িতে ছিল তপন। মায়া লাগে ছেলের কান্না শুনে। নিজের ফোনটা ছেলের হাতে দেয় তপন। তপনের ফোন হাতে দিতেই ছুঁড়ে ফেলে দেয়। স্ক্রিনটা ফেটে যায়। কীপ্যাডে…।
পরদিন থেকে অফিসে সবার আড়ালে ফোন বের করে তপন। না-জানি তপনের ফোন নিয়ে আবার কোন কথা টেবিলে টেবিলে গড়াগড়ি খাবে।
'বিকেলে ভোরের ফুল' কথাটা আগেও দত্তবাবুর মুখে শুনেছে তপন, অর্থ বোঝেনি। জিজ্ঞেস করেছিল চায়ের দোকানের রঘুকে। রঘু বলে তপনদা "বেশি বয়সে ছেলে…"।
রাগ হয় তপনের। আগে বন্ধুবান্ধবরা তপনকে নিয়ে তামাশা করত। এখন অফিসের লোকজন লোফালুফি খেলে। লতিকার জন্যই আজ এই অবস্থা। রাজি ছিল না তপন। লতিকা জোর করে রেখে দিল। বলে, "যে আসছে সংসারের মঙ্গলের জন্যই আসছে। এর থেকেই আমাদের সংসারের শ্রী ফিরবে দেখে নিও তুমি।"
ছেলে হবার পর থেকে সংসারের মঙ্গল-অমঙ্গল কিছুই বোঝেনি তপন। বরং খরচ বেড়েছে। ছুটি নিয়েছে লতিকার অবসর। সারাদিন পরিশ্রম। রাতে বিছানায় পিঠ ছোঁয়ালেই ঘুমিয়ে যায় লতিকা। নিজের মতো করে তখন বউকে আর কাছে পায় না তপন। ঘন অন্ধকারে রাতগুলো মুচকি হেসে চলে যায়। মাঝে মধ্যে নিঝুম রাতে হরপা বান আসে তপনের মনে। ইচ্ছে হয় লতিকাকে সঙ্গে নিয়ে বানভাসি হয়। লতিকার গায়ে হাত রাখে তপন। ঘুম চোখে লতিকা বলে, "বিরক্ত কোরো না, ঘুমোতে দাও। বুড়ো বয়সে ভীমরতি। মেয়েদের বিয়ের বয়স…"।
ভিতর থেকে কুঁকড়ে যায় তপন। কেমন একটা জমাট লজ্জা নিয়ে লতিকার পাশ থেকে সরে আসে। ঠিকই তো বড় মেয়েটা এই বছর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করল। ছোট মেয়ে ক্লাস টেন। ছেলে সবে আড়াই বছরে। বয়স যেন রেসের ঘোড়া! ছুটেই চলে সামনে। ঘরের পাতলা অন্ধকারে নানা কথা ভাবে তপন। ছেলেটা কাঁথা ভিজিয়ে শুয়ে থাকে। ভিজে কাঁথা সরিয়ে শুকনো কাঁথা পেতে দেয় তপন। সোঁদা গন্ধে নাসারন্ধ্র জ্বলে যায়। মৌসুমী ম্যাডামের পারফিউমের গন্ধটা চেতনায় আনার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়, বাকি রাতটা হিসির গন্ধে ডুবে থাকে তপন।
অফিসে বেশ সুন্দর সময় কাটে তপনের। আড়াল-আবডাল থেকে দেখে মৌসুমী ম্যাডামকে। ভারী মিষ্টি দেখতে। নরম গলায় হেসে হেসে কথা বলে। ঘাড়টা সামান্য হেলিয়ে দেয় কথা বলবার সময়। হাসলে গালে টোল পড়ে। একদম সিনেমার নায়িকার মতো লাগে মৌসুমীকে। আর কী পারফিউম মাখে কে জানে। গোটা অফিস ম-ম করে সেই সুগন্ধে। সাহাবাবু একদিন বলছিল, "এটা প্যারিসের জিনিস। নয়তো অফিস সুদ্ধু সবাই মাতাল হতো না।"
দাসবাবু বলে "ভাবুন আমাদের তপনদার কী সৌভাগ্য। সারাদিন পারফিউমের বোতলের মধ্যেই রয়েছে।" দাসবাবুর কথা শুনে আশেপাশের টেবিলে হাসির হিল্লোল ওঠে। ভয় পায় তপন। মৌসুমী ম্যাডাম শুনলে কী হবে!
দিন কয়েক আগে তপনকে সরিয়ে দিয়ে প্রয়োজনীয় ফাইল খুঁজছিল মৌসুমী নিজে। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তপন। অসীম মুগ্ধতায় বুঁদ হয়ে দেখছিল মৌসুমীকে। দত্তবাবু নিজের চেয়ার থেকে ডাক দেয় তপনকে। তপন কাছে এলে বলে, "চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছিস মেয়েটাকে। দেখে ফেললে জুতো পেটা করবে।" বলেই সেই কালচে দাঁতের হাসি ভাসিয়ে দেয়। তপন ভাবে গোটা অফিস তাকে নজরে বেঁধে রেখেছে। সাবধান করে নিজেকে। আড়ালে তপনকে শাসন করে তপন। তবুও দিনে দিনে একটা বেহায়া হ্যাংলামি লকলক করে তপনের মনে। তাড়িয়ে নিয়ে যায় মৌসুমীর দিকে। বাধ্য করে মৌসুমীর দিকে তাকিয়ে থাকতে। জোরে জোরে বাতাস টেনে সুগন্ধে মজিয়ে দিতে চায় নিজের ভিতরটাকে। ভিতরের সমস্ত দুর্গন্ধ ঢাকতে চায় মৌসুমীর পারফিউমের গন্ধে। মৌসুমী অফিসে থাকলে কাজ করতে ভাল লাগে তপনের। মনে হয় একাই সব কাজ করতে পারবে। দত্তবাবু একদিন তপনকে বলে ছিল "মিডিল এজ ক্রাইসিস।" কথাটার অর্থ বোঝেনি তপন।
"তপনদা আসুন।" এইবার একটু জোরেই ডাকে মৌসুমী।
মৌসুমীর ডাক না শোনার ভান করে তপন। আজ একই সঙ্গে ফিরবে। বাস আসবার আগে তো আর চলে যেতে পারবে না মৌসুমী । তাড়াহুড়ো না দেখানোই ভাল। বাস রাস্তার দিকে তাকায় তপন। দৃষ্টি ভাসিয়ে দেয় বহুদূরে। বাসের দেখা নেই। এই সময়ের বাসটা রোজ লেট করে। বুক পকেট থেকে সন্তর্পণে মোবাইল বের করে তপন। সময় দেখবে। বোতাম টেপা পুরানো ফোন। কীপ্যাডে গার্ডার দেওয়া। স্ক্রিনে ফাটা দাগ। ছেলেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এমন হাল করেছে। আড়াই বছরের বাচ্ছা। খাবার সময় বায়না করে। বড় মেয়ের মোবাইলে গান বাজিয়ে দেয় লতিকা। খেয়ে নেয় ছেলে। দিন কয়েক আগে মেয়েটার অনলাইন ক্লাস চলছে এদিকে ছেলেটা খাবে না কিছুতেই। কাঁদছে। সামলাতে না পেরে ছেলেটাকে দু ঘা ধরিয়ে দেয় লতিকা। সেদিন বাড়িতে ছিল তপন। মায়া লাগে ছেলের কান্না শুনে। নিজের ফোনটা ছেলের হাতে দেয় তপন। তপনের ফোন হাতে দিতেই ছুঁড়ে ফেলে দেয়। স্ক্রিনটা ফেটে যায়। কীপ্যাডে…।
পরদিন থেকে অফিসে সবার আড়ালে ফোন বের করে তপন। না-জানি তপনের ফোন নিয়ে আবার কোন কথা টেবিলে টেবিলে গড়াগড়ি খাবে।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment