বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
সঙ্ঘমিত্রা
দাস
কাগজ
পাতায় বন্দি
"নাগরিকত্বের লিষ্টে নাম না থাকায় কয়েকদিন খুব চিন্তায় ছিল। ভয়ে ভয়ে কাটছিল দিন। বের হতে চাইত না। আশেপাশে লোকজন ভয় দেখাচ্ছিল ওদের এবার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেবে বা দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে।"
অলোকার আজও স্কুলে পৌঁছতে দেরি হয়ে গেল।
প্রথম ক্লাসটা ছিল না তাই রক্ষে,
নইলে
বড়দি ঠিক ডেকে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিতেন। ঘরের কাছে স্কুলে চাকরি, লেট করা একেবারেই মানায় না। কত দূর থেকে বাকি টিচাররা এসে
গেল আর সে কিনা পৌঁছল প্রার্থনা সংগীত শেষ হবার দশ মিনিট পরে। ওই সুলেমানের জন্য
যত ঝামেলা। ক'দিন ধরে কামাই করে বসে আছে।
গত পাঁচ-ছ বছর ধরে ওর টোটো চড়ে আলোকা রোজ স্কুলে আসে। ঠিক দশটা বাজতে পারে না
বাড়ির গেটে সুলেমানের টোটো হর্ণ দেয়। একেবারে এলার্ম সেট করা। বাকি হাতের কাজ
ঝটপট সেরে ব্যাগে টিফিন ঢোকাতে ঢোকাতে বেরিয়ে এসে টোটোয় চড়ে বসে রোজ। ব্যাস, পনেরো মিনিটেই স্কুলে ঢুকে যায়। এতদিনের অভ্যেস। এই ক'দিন সেই সুখেই ভাটা পড়েছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে রিকশা
স্ট্যান্ড পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে রিকশায় স্কুলে পৌঁছতে হচ্ছে।
সকালে সংসারে কাজের ফাঁকে ঘড়ি দেখার সময়টুকুও পাওয়া যায় না। বরের অফিস, মেয়ের স্কুল, শ্বাশুড়ির নাওয়া-খাওয়ার আয়োজনের মধ্যে সময় তখন দৌড়য়। সুলেমানের গাড়ির হর্ণটা বাজলেই
বুঝতে পারত দশটা বাজল, বাকি কাজ ফেলে ছুটত
স্কুলে। ফেরার সময় আবার আনতে যেত সুলেমান। ফিরেই ডুব দিত সংসারে। কতদিন কত
কলিগকেও স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে ওই টোটোতে। বৃষ্টি বাদল, রিকশা নেই তো সুলেমানই ভরসা। কখনও না করেনি দিদির
আজ্ঞায়। এমন অভ্যেসের বাইরে লেট তো হবেই। কিন্তু কাকে বোঝায় সে কথা?
সেই কত বছর আগের কথা, একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় ভীষণ বৃষ্টি, কোন রিকশা-অটো কিছু নেই। চায়ের দোকানের টিনের চালার নীচে অনেক্ষকণ দাঁড়িয়ে অলোকা। বৃষ্টি আর হাওয়ায় শাড়ি ভিজে যাচ্ছে। তখনই টোটো
নিয়ে সামনে হাজির হয়েছিল সুলেমান। সেই থেকে দিদিমণির যাতায়াতের দায়িত্ব ওর।
শুধু স্কুলে যাওয়া-আসা ছাড়াও, কাছেপিঠে দোকান-বাজার যাওয়া, হঠাৎ করে কিছু দরকারে কিনে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া, এমন নানা কাজে সুলেমান যেন অভ্যেসে পরিণত হয়েছিল।
একটা ফোন শুধু, ব্যাস সে হাজির।
গেটের সামনে এসেই হর্ণ বাজিয়ে গলা ছেড়ে একটা ডাক দিত, ‘দিদিমণি, আইয়ে গেসি’। একটা সপ্তাহ না আসায় চিন্তা বাড়ল
অলোকার। কোন বিপদ-আপদ হল না তো? একদিন ওদের টোটো চালক এক বন্ধু বলেছিল শরীর খারাপ তাই আসছে
না, কিন্তু এতদিন হয়ে গেল? তবে কি বাড়াবাড়ি কিছু? ফোন করেছে কয়েকবার কেউ ধরছে না। এভাবে দশদিন কেটে গেছে। সুলেমানের কোন খোঁজ
নেই। অলোকা ঠিক করল আজ স্কুল থেকে ফিরে ফোন করবে ওকে। যতক্ষণ না ধরছে রিং করতে
থাকবে। কেউ তো একবার অন্তত ধরবে ফোনটা। বাড়িটা চেনা নেই, নইলে চলে যেত একদিন।
ওর মুখে শুনেছে ঘরে বউ আর মেয়ে
আছে। শ্বশুরবাড়িতে থাকে
তবে
আলাদা ঘর করে। ওর তিন কুলে কেউ নেই,
নিজের
বাপ-মায়ের পরিচয়ও জানে না,
এক ফকির
বাবার কাছে মানুষ। তিনি তাঁরই পরিচিত একজনের মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে সংসারে বেঁধে
দিয়েছেন। সেই পরিবারই ওর পরিচয়। সালমা ওর বউয়ের নাম। বড়ো লোকের
বেটি। বড়ো দেমাক তার। শ্বশুরের দয়াতেই চলে, টোটোটাও সেই কিনে দিয়েছে। তাই ওদের দয়ার নীচেই চাপা পড়ে আছে সে। একদিন দুঃখ করে বলেছিল, ‘দিদিমণি
মেয়েটার মায়ায় জড়িয়ে আছি,
আব্বু
বলে কচি হাতে গলাটা যখন জড়িয়ে ধরে মনটা ভরে যায়। নইলে এই দয়ার জীবনে কোন সুখ
নেই।’
বারবার ফোন করেও কাউকে পাওয়া
গেল না। অলোকা রাতের রান্নাবান্নায় মন দিল। মনের ভিতরে হালকা একটা উদ্বেগ কাজ
করছে। সবাই শুনলে হয়তো বাড়াবাড়ি ভাববে তাই চুপ করে রইল। রাত প্রায় সাড়ে আটটা
তখন ফোনটা বেজে উঠল, সুলেমানের নম্বর থেকে
কল। হ্যালো বলতেই ওপাশে একজন মেয়ের গলা। ‘সালমা বলছিলাম, আপনি তো দিদিমণি?
ফোন
করেছিলেন যখন বাইরে ছিলাম তাই ধরতে পারিনি।’ ওর গলাটা কেমন ধরা লাগছে। কথা বুজে আসছে।
সুলেমানের খবর জানতে চাইল অলোকা।
সব শুনে যেন আকাশ থেকে পড়ল ও। সালমার গলায় আকুলতা। সব অহংকার কোথায় হারিয়ে ফেলেছে। বড় সংশয়ে আছে
মেয়েটা, ভয় পেয়েছে বেশ। ওর
নিরুপায় অসহায় অবস্থা ফোনের এপ্রান্ত থেকেও অনুভব করা যাচ্ছে।
সুলেমান বিষ খেয়ে আত্মহত্যার
চেষ্টা করে হাসপাতালে ভর্তি এখন। প্রথমে এলাকার পৌর হাসপাতালে ছিল, অবস্থা আরোও খারাপ হওয়ায় কোলকাতার বড়ো হাসপাতালে
ভর্তি করতে হয়েছে। ডাক্তার এখনো কোন আশার কথা শোনাননি। বলতে বলতে কেঁদে ফেলল
সালমা। নাগরিকত্বের লিষ্টে নাম না থাকায় কয়েকদিন খুব চিন্তায় ছিল। ভয়ে ভয়ে
কাটছিল দিন। বের হতে চাইত না। আশেপাশে লোকজন ভয় দেখাচ্ছিল ওদের এবার ক্যাম্পে
পাঠিয়ে দেবে বা দেশ ছেড়ে চলে
যেতে হবে। সেই আশঙ্কায় সারাদিন ঘরে থাকত। বাড়ি থেকে বেরোলেই যদি পুলিশ তুলে
নিয়ে যায়? এদিকে বাড়ির সবার নাম আছে
শুধু ওর নামটাই বাদ। কাগজপত্রে শ্বশুরের নাম থাকায় সেগুলো কার্যকর হয়নি।
শুনানিতে ওর কোন কথাই শোনেনি। খুব ভেঙে পড়েছিল সুলেমান। প্রথমদিকে অনেক
চেষ্টাচরিত্র করলেও ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব নিয়েই কেমন সন্দিহান হয়ে
পড়েছিল। সব অধিকার যেন কাগজের পাতায় বন্দি। চারদিকে
অন্ধকার ছেয়ে গেছিল ওর, ভয় পেতে পেতে নিজেকে
গুটিয়ে নিয়েছিল ক্রমশ। দিন দিন হারিয়ে যেতে থাকে ওর পরিচয়। যার শুধু একটা নাম
আছে কিন্তু যে জমিতে সে জন্মেছে সেই মাটিতে তার কোন অধিকার নেই। অস্তিত্ব নেই ওর
মানুষ পরিচয়ের। তাই হয়তো নিজেকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিল এভাবেই।
রাজনৈতিক ফায়দা, দলীয় কোন্দল, আইনের অপব্যবহারে
সাধারণ নাগরিক কীভাবে অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে আজ। নিজের দেশে, নিজের কাছে অপরিচিত হয়ে আছে। ভয়টা তাই স্বাভাবিক। যারা
নিজেদের নাম লিস্টে আছে দেখে নিশ্চিন্ত হয়েছে ধারনাও করতে পারবে না ওই মানুষগুলোর
সংকট। মানসিক যন্ত্রণা। দেশ যখন নাগরিকের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে পরিচয়হীন আখ্যা
দেয় তখন নিরুপায় ওরা ভয়ে এমন একটা পথ তো বেছে নেবেই। এ দায় কার? এই ভয়ঙ্কর আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য কোন প্রতিরোধ গড়ে উঠবে না?
ভাবতে থাকে এক শিক্ষিকার মন।
উত্তর হাতরে মরে সে।
~~000~~
No comments:
Post a Comment