প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Tuesday, May 5, 2026

জোড়া তালগাছের আতঙ্ক | অরূপ কুমার দেব

বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
অরূপ কুমার দেব
 
জোড়া তালগাছের আতঙ্ক

"হঠাৎ করে ঘরের জানালার বাইরে অদ্ভুত এক ছায়া দেখতে পান। মনে হয় কেউ দাঁড়িয়ে আছেকিন্তু পরক্ষণেই মিলিয়ে যায়। তার কানে আসতে থাকে ফিফি করা কণ্ঠস্বর, ‘আমি আসছি...।’ অঞ্জন প্রচণ্ড ভয়ে উঠে বসেন। কপাল বেয়ে ঠান্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ে।"

 
অন্দরমানিক গ্রামের প্রধান বৈচিত্র হল সেখানে রাত যত গভীর হতে থাকে, পরিবেশ ততই ভারী হয়ে ওঠে। বাতাসের বয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, আশপাশের সব শব্দ যেন হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে যায়।
সেই গ্রামের এক কৃষক অঞ্জন সূত্রধর এক বিশেষ কাজে ক্ষেতের মাঠে জল সেচ দিতে গিয়েছিলেন। শুষ্ক মৌসুম, সারাদিন জল না পাওয়ায় বাধ্য হয়েই তিনি অমাবস্যার রাতে বেরিয়ে পড়েন। মাথায় টুপি, কাঁধে গামছা জড়ানো, হাতে কোদাল নিয়ে জমিতে ছোট ছোট ড্রেন তৈরি করছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই চারপাশের পরিবেশ বদলে যেতে থাকে।
ঝমঝম ঝমঝম শব্দ আসতে থাকে দূর থেকে। প্রথমে তিনি পাত্তা দেননি, ভেবেছেন হয়তো বাতাসের সঙ্গে বাঁশের ডগা ঠোকা খাচ্ছে। কিন্তু আশেপাশের গাছগুলো তো একদম স্থির! আর কোনো বাতাসও তো বইছে না!
কিছুক্ষণ পরই কানে আসে বিড়ালের কর্কশ ডাক। গভীর রাতে বিড়ালের ডাক সাধারণ ব্যাপার নয়, কিন্তু অঞ্জন এটাকে উড়িয়ে দেন। এমন সময় তার নাকে প্রচণ্ড পচা পাঁঠার গন্ধ আসে। তার ধানের জমি যেন সেই গন্ধে একাকার হয়ে ওঠে। গন্ধের উৎস খুঁজতে আশেপাশে তাকান তিনি, কিন্তু কোথাও কোনো পাঁঠা নেই। এত রাতে গ্রামের কেউ কি পাঁঠা ছেড়ে দিতে পারে? মনে মনে প্রশ্ন জাগে, কিন্তু উত্তর পান না।
বিস্ময় কাটাতে তিনি একটি বিড়ি বের করেন। আগুন ধরাতেই চারপাশ আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। যেন কিছুই হয়নি। অঞ্জন খানিকটা স্বস্তি পান এবং আবার কাজে মনোযোগী হন। কিন্তু হঠাৎই কানে আসে কান্নার শব্দ। গভীর রাতের কৃষিজমির মাঝে কার কান্না আসতে পারে? তিনি খেয়াল করেন, জোড়া তালগাছের নীচে কেউ একজন বসে কাঁদছে।
তিনি একটু এগিয়ে যান। ধীরে ধীরে কান্নার শব্দ বাড়তে থাকে, সাথে এক অজানা ভয়ের শীতল স্রোত তার শরীর বেয়ে নামে। গলা শুকিয়ে আসে, কিন্তু সাহস করে ডাক দেন, ‘কে ওখানে?’
কোনো সাড়া নেই। আবারও তিনি ডাক দেন, ‘কে বসে আছিস? এত রাতে এখানে কী করছিস?’
তবুও কোনো উত্তর নেই। তিনি আরও কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখতে চেষ্টা করেন। কেউ একজন বসে আছে, মাথা নীচু করে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে। দেখতে যেন কোনো নারী। তিনি এবার একটু জোরেই বলেন, ‘এই শুনছ? কে তুমি?’
কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তার শরীর কাঁপতে শুরু করে, কিন্তু কৌতূহল তাকে আরও কাছে টেনে নিয়ে যায়। তৃতীয়বার ডাক দিতেই সেই বসে থাকা মানুষটি হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু কী আশ্চর্য! সে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার ছায়াটা এক লাফে তালগাছের ডগা পর্যন্ত উঠে যায়! আর এক মুহূর্তের মধ্যেই সে তালগাছের গোড়ায় গিয়ে মিলিয়ে যায়!
অঞ্জনের শরীরের রক্ত হিম হয়ে যায়। গা ছমছম করতে থাকে। দ্রুত পকেট থেকে আর কটি বিড়ি বের করে কাঁপা হাতে ধরান। কিছুক্ষণ পর যেন চারপাশ স্বাভাবিক হয়ে আসে। কোনো শব্দ নেই, বাতাসের গুঞ্জন পর্যন্ত নেই। তিনি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াননি। কোদাল ফেলে ছুটতে ছুটতে বাড়ির দিকে রওনা হন।
বাড়িতে পৌঁছানোর পর শরীরটা বেশ অসুস্থ বোধ করে। গা প্রচণ্ড ঠান্ডা হয়ে যায়, অথচ গরম আবহাওয়া! তিনি বিছানায় শুয়ে পড়েন, কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই সেই ছায়ার ভয়ঙ্কর দৃশ্য মনে পড়ে যায়।
হঠাৎ করে ঘরের জানালার বাইরে অদ্ভুত এক ছায়া দেখতে পান। মনে হয় কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু পরক্ষণেই মিলিয়ে যায়। তার কানে আসতে থাকে ফিফি করা কণ্ঠস্বর, ‘আমি আসছি...।’
অঞ্জন প্রচণ্ড ভয়ে উঠে বসেন। কপাল বেয়ে ঠান্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ে। দরজার দিকে তাকাতেই দেখেন, ঘরের কোণে কেউ একজন দাঁড়িয়ে! মুখ দেখা যায় না, শুধু অস্পষ্ট কালো অবয়ব!
তিনি চিৎকার করতে যান, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। শরীরটাও যেন অবশ হয়ে আসে। সেই ছায়াটি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। অঞ্জন বাড়ির সদর দরজা খুলে এক দৌড়ে সেখান থেকে চলে যান। তারপর তার সাথে সেই রাতে কী ঘটেছিল, অঞ্জন নিজেও জানেন না।
সকালে পরিবারের লোকজন তাকে জ্ঞানহীন অবস্থায় মাঠের একদিকে জঙ্গলের ধারে খুঁজে পা। তার শরীর প্রচণ্ড ঠান্ডা, জ্বরজ্বর অনুভূতি। এরপর থেকে তার জীবনে একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে থাকে। রাতে দরজা-জানালা বন্ধ করেও তিনি অনুভব করেন, কেউ যেন তার আশেপাশে হাঁটছে। দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।
এই ঘটনার কয়েকদিন পর অঞ্জনের বাল্যবন্ধু রঘু শুক্লবৈদ্য তার খবর পেয়ে শহর থেকে ছুটে আসেন। রঘু আগে এই গ্রামেই থাকতেন, কিন্তু তার পরিবারের সাথে এক দুর্ঘটনার পর তিনি অন্দরমানিক গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যান। আজ অনেক বছর পরে তিনি অঞ্জনের বাড়িতে গেলেন আর তার সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন।
 
এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে অঞ্জন বললেন, ‘বন্ধু, আমার একমাত্র ছোট ভাইয়ের সঙ্গেও তোমার মতই অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছিল সেই জোড়া তালগাছের নীচে। এরপর মারাত্মক অসুখে কয়েকদিনের মধ্যেই সে মারা যায়। পরে জানতে পারি কয়েকমাস আগে এমনই এক অমাবস্যার রাতে পাশের গ্রামের এক গৃহবধূকে সেই জোড়া তালগাছের নীচে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। শহরের পুলিশ এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারে যে তার স্বামী যৌতুকের জন্য তার সদ্য বিবাহিতা বউকে হত্যা করে রাতের অন্ধকারে ওখানে ফেলে রাখে। ভেবেছিল পাশের জঙ্গলের হিংস্র প্রাণী কেউ দেখার আগে এর নিষ্পত্তি করবে। কিন্তু তার আগেই পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌছে তার স্বামীকে আটক করে। এরপর থেকে অমাবস্যার রাতে সেখানে কিছু না কিছু অঘটন ঘটতে থাকে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাই আমরা ভয়ে, দুঃখে এই গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাই, আর ফিরে আসি না। শহরের এক মহাত্মার কাছ থেকে তোমার এর প্রতিকারের জন্য একটা তাবিজ এনেছি। আশা করি মন্ত্র পড়ে সেটা ডান হাতে ধারণ করলে তোমার সব বিপদ কেটে যাবে।’ রঘুর কথা মতো অঞ্জন তাবিজটা তার ডান হাতে পরে আর কয়েকদিনের মধ্যেই এর প্রভাব লক্ষ্য করলেন। তার জীবনে সবকিছুই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে।
 
গ্রামের মানুষজন বলাবলি করতে থাকেন, ‘ওই জোড়া তালগাছ ভালো কিছু নয়, অমাবস্যার রাতের বেলা ওখানে গেলে কেউ আর আগের মতো থাকেন না।’
পরের বছর বৈশাখ মাসের প্রবল ঝড়ে সেই জোড়া তালগাছটি মাটি সুদ্ধ উপড়ে পাশের জঙ্গলে গিয়ে পড়ে যায়। অন্দরমানিক গ্রামে অমাবস্যা রাতে জোড়া তালগাছের আতঙ্কটা এরপর থেকে অনেকটাই কেটে যায়।
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)