বাতায়ন/হাপিত্যেশ/ধারাবাহিক/২য়
বর্ষ/৫ম সংখ্যা/৩২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১
হাপিত্যেশ | ধারাবাহিক গল্প
সুনন্দিনী শুক্লা
বিস্মৃতবীর
[৮ম পর্ব]
পূর্বানুবৃত্তি প্রীতিকে
নিয়ে টানতে টানতে বেরিয়ে গেলেন পিছনের দরজা দিয়ে। রাণীর জন্য একটা উপযুক্ত
আশ্রয় কেন্দ্র খুঁজতে হবে। যেখানে সেখানে ওকে রাখা চলে না। পরৈকড়ার রমণী
চক্রবর্তীর বাড়িতে রাণী আশ্রয় নিল। মাস্টারদার নির্দেশে পূর্ণরূপে গৃহত্যাগ
করেছে সে। প্রীতিলতা তথা রাণী মাস্টারদাকে বলল, একজনকে তো জীবন দিয়ে শুরু করতে
হবে দাদা। লোকে ভাবে মেয়েরা দুর্বল, মেয়েরা অক্ষম। এই ভুল আমি ভাঙব। বাঘাযতীনের
শেষ কথাটা মনে করুন - we shall die to awaken the nation. আমি মেয়েদেরকে জাগানোর
জন্য মরব। দেশের জন্য প্রাণ দেব। না করবেন না, দাদা, অনুমতি দিন! তারপর…
২৪শে সেপ্টেম্বর
প্রীতির নেতৃত্বে রাত ১১টায় ইউরোপিয়ান শহরতলির ক্লাবে হামলা হয়। সফলভাবে অভিযান
চালানোর পর ছুটতে ছুটতে হঠাৎ পড়ে যায় প্রীতি। পুলিশ প্রায় ওদের ঘাড়ের কাছে। বীরেন
ছুটে আসে,
- কী হলো?
প্রীতি বলে- কিছু না, এগিয়ে যা তোরা।
- কী হলো?
প্রীতি বলে- কিছু না, এগিয়ে যা তোরা।
বীরেন বলে- কী সব বলছ!
ওঠো শিগগির। পারবে এইটুকু যেতে?
প্রীতি শুষ্ক মুখে হাসে। হাতের মুঠোটা খুলে দেখিয়ে দেয়। কাগজের পুরিয়া। পটাশিয়াম সায়ানাইড। বীরেনের কিছু বুঝতে বাকি থাকে না। প্রীতি শুধু বলে,
- যা যা! দেরি করিস না! পালা!
পরদিন খবরের কাগজে লেখা হয় -"শহরতলি ক্লাবের অদূরে পুরুষের পোশাকে সজ্জিত এক নারীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। তার মৃতদেহ ক্লাব হইতে কিছু দূরে পড়িয়া ছিল। স্ত্রীলোকটিকে কুমারী প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার বলিয়া শনাক্ত করা হইয়াছে। সে নাকি চট্টগ্রাম শহরের শ্রীযুক্ত জগতবন্ধু ওয়াদেদ্দারের কন্যা। তাহার পকেটে রিভলবার ও রাইফেলের কতকগুলি কার্তুজ পাওয়া গিয়াছে।"
সেদিন সন্ধেবেলায় মাস্টারদা মাকে লেখা রাণীর চিঠিটা আবার পড়েন,
"মাগো, তুমি অমন করে কেঁদো না! আমি যে সত্যের জন্য স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করবে মা? দেশ যে পরাধীন। দেশবাসী যে বিদেশীর অত্যাচারে জর্জরিতা। দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভারে অবনতা লাঞ্ছিতা অপমানিতা। তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উৎসর্গ করতে পারবে না? তুমি কী কেবলই কাঁদবে!'
চিঠিটি বুকে জড়িয়ে ধরে মাস্টারদা নীরবে কাঁদতে থাকেন।
কল্পনা সম্পূর্ণরূপে গৃহত্যাগ করে দলে যোগ দিয়েছে। তাকে ডেকে মাস্টারদা বলেন- অনেকেই প্রীতির আত্মবলিদানের পর কথা তুলছে, এই অনর্থক আত্মহত্যা কীসের জন্য? দেশের বোনেদের কাছে নতুন বার্তা পৌঁছোনোর জন্য আত্মবলিদান দিয়েছিল প্রীতি, আত্মহত্যা নয়। যারা এসব বলছে তারা বলিদান ও হত্যার মধ্যে পার্থক্য কিছু বোঝে না। প্রীতি ইতিহাস তৈরি করেছে। দিদিভাই তোমাকেও কিন্তু করতে হবে।
কল্পনা-সহ দলের বাকি সদস্যরা চলে আসেন গৈরালা গ্রামে। মাস্টারদা বুঝতে পারেন গোপন এই আস্তানা আর গোপন নেই। আশেপাশে পুলিশের চর গ্রামবাসীর বেশে ঘোরাফেরা করছে। নিকটবর্তী নির্ভরযোগ্য আস্তানা হাবিলাস দ্বীপ। তারকেশ্বর ও কালীকিঙ্কর সেখানে আত্মগোপন করে আছে। সব মিলিয়ে একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন মাস্টারদা। ওখানে কল্পনার উপযুক্ত আশ্রয় কেন্দ্র পাবেন কিনা। গ্রামের সংগঠক ব্রজেনের সাথে আলাপ-আলোচনার পর বুঝতে পারেন এখানে অপেক্ষা করা আত্মহত্যার সামিল। তাই সবাইকে নির্দেশ দেন- গুছিয়ে নাও। বইপত্র দলিল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তৈরি হও। ব্রজেনের দিকে তাকিয়ে বলেন - পৌঁছে দেওয়ার ভার তোমাকে নিতে হবে টুনু। প্রস্তুত থেকো।
মাঘ মাসের সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকারে সবাই একে একে বেরিয়ে এলাম। মাস্টারদা কল্পনা ব্রজেন শান্তি মনিলাল সুশীল আমি। পুবদিকের রাস্তা ধরে খানিকক্ষণ এগোনোর পর বাজখাঁই গলায় আওয়াজ এল - হল্ট! বুঝতে পারলেন মাস্টারদা, পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা পশ্চিম দিকে হাঁটতে লাগলেন। বাঁশবাগান আছে ওদিকে। নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকারে শুকনো বাঁশপাতায় পা পড়তেই বুঝতে পারলেন নিঃশব্দে এলাকা পার হওয়া অসম্ভব। কিন্তু তখন অন্য পথ ধরার উপায় নেই। তাই এগিয়ে চললেন সামনের দিকে।
বাঁশের বেড়ার বাধা অতিক্রম করতে গিয়ে আওয়াজ করে ফেললেন সুশীল। সাথে সাথে গুলি এসে লাগল। সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন তিনি। কল্পনার দাঁড়ানোর সময় নেই। সে হামাগুড়ি দিয়ে এগোচ্ছে সামনের দিকে। একটু এগোতেই দেখল ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছেন মাস্টারদা। কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন - পথঘাট তোর অচেনা তাই অপেক্ষা করছিলাম। চোখ ফেটে জল এলো কল্পনার। এ ভালবাসার কোন তুলনা আছে কি? সে তো দাঁড়ায়নি সুশীলের জন্য। মাস্টারদাকে অনুসরণ করে খানিকটা এগিয়ে যেতেই পানাভর্তি পুকুরের জলে পড়ে গেল সে। মনিলাল টেনে তুলল তাকে। কল্পনার পরনে পুরুষদের মতো মালকোঁচা মারা ধুতি, ভিজে সপসপে, সর্বাঙ্গ কাদায় ভর্তি, খোলা রিভলবার হাতে। দলের এক সদস্যের বাড়ি গ্রামের শেষ প্রান্তে, সেই বাড়ির ধানের গোলায় আশ্রয় নিল কল্পনা আর মনিলাল। শান্তি আর আমি শত্রুর বেড়াজাল ভেদ করে এগিয়ে যেতে সক্ষম হলাম হাবিলাস দ্বীপের দিকে। রমণী চৌধুরীর বাড়ি আশ্রয় নিলাম। সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিল সুশীল। চেতনা ফিরতে মাঘ মাসের শীতে কাঁপতে কাঁপতে সেও রওনা দিল হাবিলাস দ্বীপের দিকে। পৌঁছোতে পেরেছিল। ধরা পড়ে গেল মাস্টারদা আর ব্রজেন। হাত-পা বেঁধে প্রবল শীতের রাতে মাটিতে ফেলে রাখা হলো ওদের। সেদিন ছিল ১৯৩৩ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি, রাত দুটো।
হাবিলাস দ্বীপের গোপন
আস্তানায় বসে আমরা শুনলাম মাস্টারদার চরম লাঞ্ছনার কথা। গৈরালা থেকে পটিয়া
ক্যাম্প পর্যন্ত চষা জমির উপর দিয়ে ওরা মাস্টারদাকে হাঁটিয়ে নিয়ে গেছে। অবসন্ন
হয়ে একবার বসে পড়লে মহোল্লাসে ইংরেজ নরপশুরা তাকে অনেক দূরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে
গেছে, রক্তাক্ত করেছে তাকে। ক্যাম্পে পৌঁছে প্রখর রোদে খাঁচার মধ্যে মাস্টারদাকে
বন্ধ করে রেখেছিল ওরা। সারাদিন দাঁড় করিয়ে রেখে অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছিল।
এমনকি…
- এমনকি? ধীরে ধীরে প্রশ্ন করে অহীন্দ্র।
মাস্টারদাকে লজ্জিত করতে একবার বিবস্ত্র করে দেয় ওরা - চোখ ভরা জল নিয়ে বলেন বৃদ্ধ।
তিন বন্ধু অধোবদন হয় ব্যথিত মুখে।
মাস্টারদার গ্রেপ্তারের পর সংগঠনের দায়িত্ব পড়ল তারকেশ্বরের উপর। কল্পনা তারকেশ্বর মনোরঞ্জন সুধীন আর আমি চলে এলাম গহিরা গ্রামের পূর্ণ তালুকদারের বাড়ি। পরিচয় গোপন করলাম না। জানালাম আমরা স্বদেশী। কিন্তু পূর্ণবাবু অনড়। স্বদেশী হোক আর যাই হোক অতিথিকে তিনি ফেরাবেন না। সবাই ঘুমোচ্ছে ভোরের দিকে। আধো ঘুম অবস্থায় রান্নাঘরের দাওয়ায় উঠতে গিয়ে কল্পনার চোখে পড়ল একজন সৈন্য রাইফেল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। এই সময় মনোরঞ্জন বলল - পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। পালাবার কোন সুযোগ নেই। দিনের আলো সুস্পষ্ট। ঠিক করলাম আশ্রয়কর্তাকে বাঁচানোর জন্য আমরা আত্মসমর্পণ করব। হঠাৎ গুলিবর্ষণ শুরু হল। আমি বললাম- কুইক, বেরিয়ে এসো সবাই। বেরিয়ে আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। পূর্ণ তালুকদারকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে ফেলেছে ব্রিটিশরা। চারপাশে নিশ্চল মূর্তির মতো তার স্ত্রী পুত্র। কল্পনার হাত একটি পাগড়ির কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলল পুলিশ। আমাদেরকে পিছমোড়া করে হাতকড়া লাগিয়ে দিল।
আমাদের সবার নামে যা যা মামলা আছে তার বিচার চলতে লাগল। সবার কারাদণ্ড হল বিভিন্ন মেয়াদের। মাস্টারদার পাশের সেলেই তারকেশ্বরকে রাখা হলো। বিচারের নামে হল কত প্রহসন! আদালতে দাঁড়িয়ে সওয়াল জবাব চলতে লাগল। সবাই জানে ফাঁসি দিতে ব্রিটিশ সরকার বদ্ধপরিকর, তাও এই বিচারের ভণিতা। মাস্টারদা আর তারকেশ্বরের ফাঁসির অর্ডার হল।
প্রীতি শুষ্ক মুখে হাসে। হাতের মুঠোটা খুলে দেখিয়ে দেয়। কাগজের পুরিয়া। পটাশিয়াম সায়ানাইড। বীরেনের কিছু বুঝতে বাকি থাকে না। প্রীতি শুধু বলে,
- যা যা! দেরি করিস না! পালা!
পরদিন খবরের কাগজে লেখা হয় -"শহরতলি ক্লাবের অদূরে পুরুষের পোশাকে সজ্জিত এক নারীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। তার মৃতদেহ ক্লাব হইতে কিছু দূরে পড়িয়া ছিল। স্ত্রীলোকটিকে কুমারী প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার বলিয়া শনাক্ত করা হইয়াছে। সে নাকি চট্টগ্রাম শহরের শ্রীযুক্ত জগতবন্ধু ওয়াদেদ্দারের কন্যা। তাহার পকেটে রিভলবার ও রাইফেলের কতকগুলি কার্তুজ পাওয়া গিয়াছে।"
সেদিন সন্ধেবেলায় মাস্টারদা মাকে লেখা রাণীর চিঠিটা আবার পড়েন,
"মাগো, তুমি অমন করে কেঁদো না! আমি যে সত্যের জন্য স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করবে মা? দেশ যে পরাধীন। দেশবাসী যে বিদেশীর অত্যাচারে জর্জরিতা। দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভারে অবনতা লাঞ্ছিতা অপমানিতা। তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উৎসর্গ করতে পারবে না? তুমি কী কেবলই কাঁদবে!'
চিঠিটি বুকে জড়িয়ে ধরে মাস্টারদা নীরবে কাঁদতে থাকেন।
কল্পনা সম্পূর্ণরূপে গৃহত্যাগ করে দলে যোগ দিয়েছে। তাকে ডেকে মাস্টারদা বলেন- অনেকেই প্রীতির আত্মবলিদানের পর কথা তুলছে, এই অনর্থক আত্মহত্যা কীসের জন্য? দেশের বোনেদের কাছে নতুন বার্তা পৌঁছোনোর জন্য আত্মবলিদান দিয়েছিল প্রীতি, আত্মহত্যা নয়। যারা এসব বলছে তারা বলিদান ও হত্যার মধ্যে পার্থক্য কিছু বোঝে না। প্রীতি ইতিহাস তৈরি করেছে। দিদিভাই তোমাকেও কিন্তু করতে হবে।
কল্পনা-সহ দলের বাকি সদস্যরা চলে আসেন গৈরালা গ্রামে। মাস্টারদা বুঝতে পারেন গোপন এই আস্তানা আর গোপন নেই। আশেপাশে পুলিশের চর গ্রামবাসীর বেশে ঘোরাফেরা করছে। নিকটবর্তী নির্ভরযোগ্য আস্তানা হাবিলাস দ্বীপ। তারকেশ্বর ও কালীকিঙ্কর সেখানে আত্মগোপন করে আছে। সব মিলিয়ে একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন মাস্টারদা। ওখানে কল্পনার উপযুক্ত আশ্রয় কেন্দ্র পাবেন কিনা। গ্রামের সংগঠক ব্রজেনের সাথে আলাপ-আলোচনার পর বুঝতে পারেন এখানে অপেক্ষা করা আত্মহত্যার সামিল। তাই সবাইকে নির্দেশ দেন- গুছিয়ে নাও। বইপত্র দলিল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তৈরি হও। ব্রজেনের দিকে তাকিয়ে বলেন - পৌঁছে দেওয়ার ভার তোমাকে নিতে হবে টুনু। প্রস্তুত থেকো।
মাঘ মাসের সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকারে সবাই একে একে বেরিয়ে এলাম। মাস্টারদা কল্পনা ব্রজেন শান্তি মনিলাল সুশীল আমি। পুবদিকের রাস্তা ধরে খানিকক্ষণ এগোনোর পর বাজখাঁই গলায় আওয়াজ এল - হল্ট! বুঝতে পারলেন মাস্টারদা, পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা পশ্চিম দিকে হাঁটতে লাগলেন। বাঁশবাগান আছে ওদিকে। নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকারে শুকনো বাঁশপাতায় পা পড়তেই বুঝতে পারলেন নিঃশব্দে এলাকা পার হওয়া অসম্ভব। কিন্তু তখন অন্য পথ ধরার উপায় নেই। তাই এগিয়ে চললেন সামনের দিকে।
বাঁশের বেড়ার বাধা অতিক্রম করতে গিয়ে আওয়াজ করে ফেললেন সুশীল। সাথে সাথে গুলি এসে লাগল। সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন তিনি। কল্পনার দাঁড়ানোর সময় নেই। সে হামাগুড়ি দিয়ে এগোচ্ছে সামনের দিকে। একটু এগোতেই দেখল ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছেন মাস্টারদা। কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন - পথঘাট তোর অচেনা তাই অপেক্ষা করছিলাম। চোখ ফেটে জল এলো কল্পনার। এ ভালবাসার কোন তুলনা আছে কি? সে তো দাঁড়ায়নি সুশীলের জন্য। মাস্টারদাকে অনুসরণ করে খানিকটা এগিয়ে যেতেই পানাভর্তি পুকুরের জলে পড়ে গেল সে। মনিলাল টেনে তুলল তাকে। কল্পনার পরনে পুরুষদের মতো মালকোঁচা মারা ধুতি, ভিজে সপসপে, সর্বাঙ্গ কাদায় ভর্তি, খোলা রিভলবার হাতে। দলের এক সদস্যের বাড়ি গ্রামের শেষ প্রান্তে, সেই বাড়ির ধানের গোলায় আশ্রয় নিল কল্পনা আর মনিলাল। শান্তি আর আমি শত্রুর বেড়াজাল ভেদ করে এগিয়ে যেতে সক্ষম হলাম হাবিলাস দ্বীপের দিকে। রমণী চৌধুরীর বাড়ি আশ্রয় নিলাম। সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিল সুশীল। চেতনা ফিরতে মাঘ মাসের শীতে কাঁপতে কাঁপতে সেও রওনা দিল হাবিলাস দ্বীপের দিকে। পৌঁছোতে পেরেছিল। ধরা পড়ে গেল মাস্টারদা আর ব্রজেন। হাত-পা বেঁধে প্রবল শীতের রাতে মাটিতে ফেলে রাখা হলো ওদের। সেদিন ছিল ১৯৩৩ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি, রাত দুটো।
- এমনকি? ধীরে ধীরে প্রশ্ন করে অহীন্দ্র।
মাস্টারদাকে লজ্জিত করতে একবার বিবস্ত্র করে দেয় ওরা - চোখ ভরা জল নিয়ে বলেন বৃদ্ধ।
তিন বন্ধু অধোবদন হয় ব্যথিত মুখে।
মাস্টারদার গ্রেপ্তারের পর সংগঠনের দায়িত্ব পড়ল তারকেশ্বরের উপর। কল্পনা তারকেশ্বর মনোরঞ্জন সুধীন আর আমি চলে এলাম গহিরা গ্রামের পূর্ণ তালুকদারের বাড়ি। পরিচয় গোপন করলাম না। জানালাম আমরা স্বদেশী। কিন্তু পূর্ণবাবু অনড়। স্বদেশী হোক আর যাই হোক অতিথিকে তিনি ফেরাবেন না। সবাই ঘুমোচ্ছে ভোরের দিকে। আধো ঘুম অবস্থায় রান্নাঘরের দাওয়ায় উঠতে গিয়ে কল্পনার চোখে পড়ল একজন সৈন্য রাইফেল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। এই সময় মনোরঞ্জন বলল - পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। পালাবার কোন সুযোগ নেই। দিনের আলো সুস্পষ্ট। ঠিক করলাম আশ্রয়কর্তাকে বাঁচানোর জন্য আমরা আত্মসমর্পণ করব। হঠাৎ গুলিবর্ষণ শুরু হল। আমি বললাম- কুইক, বেরিয়ে এসো সবাই। বেরিয়ে আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। পূর্ণ তালুকদারকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে ফেলেছে ব্রিটিশরা। চারপাশে নিশ্চল মূর্তির মতো তার স্ত্রী পুত্র। কল্পনার হাত একটি পাগড়ির কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলল পুলিশ। আমাদেরকে পিছমোড়া করে হাতকড়া লাগিয়ে দিল।
আমাদের সবার নামে যা যা মামলা আছে তার বিচার চলতে লাগল। সবার কারাদণ্ড হল বিভিন্ন মেয়াদের। মাস্টারদার পাশের সেলেই তারকেশ্বরকে রাখা হলো। বিচারের নামে হল কত প্রহসন! আদালতে দাঁড়িয়ে সওয়াল জবাব চলতে লাগল। সবাই জানে ফাঁসি দিতে ব্রিটিশ সরকার বদ্ধপরিকর, তাও এই বিচারের ভণিতা। মাস্টারদা আর তারকেশ্বরের ফাঁসির অর্ডার হল।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment