প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Wednesday, June 12, 2024

গন্ধ বদলে যায় | ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/০৭ই আষাঢ়, ১৪৩১

ধারাবাহিক গল্প

ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য


গন্ধ বদলে যায়

[৩য় পর্ব]

 

পূর্বানুবৃত্তি বাসস্ট্যান্ডে মৌসুমীর জন্য অপেক্ষা করে তপন। রাতে বিছানায় পিঠ ছোঁয়ালেই ঘুমিয়ে যায় লতিকা। নিজের মতো করে তখন বউকে আর কাছে পায় না তপন। মাঝে মধ্যে নিঝুম রাতে হরপা বান আসে তপনের মনে। ইচ্ছে হয় লতিকাকে সঙ্গে নিয়ে বানভাসি হয়। লতিকার গায়ে হাত রাখে তপন। ঘুম চোখে লতিকা বলে, "বিরক্ত কোরো না, ঘুমোতে দাও। বুড়ো বয়সে ভীমরতি। মেয়েদের বিয়ের বয়স…"। ভিতর থেকে কুঁকড়ে যায় তপন। তারপর…

হাতের মধ্যে লুকিয়ে ধরে সময় দেখে তপন। মিনিট দশেকের আগে বাস আসবার সম্ভাবনা নেই।
রাস্তার ওপারে যাবার আগে দুপাশ দেখে নেয় তপন। বড় রাস্তায় পা ফেলতেই শোনে কে যেন ডাকছে "তপনদা"
ঘুরে দেখে তপন, চায়ের দোকানের রঘু ডাকছে। রঘু কেন ডাকে? অন্য দিন তো তপন একাই দাঁড়িয়ে থাকে। কই তখন তো ডাকে না রঘু। ভয়ে বুক ছ্যাঁৎ করে ওঠে তপনের। মৌসুমী তপনকে ডেকেছে তা নজর এড়িয়ে যাবার কথা নয় রঘুর।
এই কথা অফিসের কাউকে না কাউকে বলবে রঘু। তারপরই শুরু হবে নতুন আর এক গল্প। রায়বাবু দত্তবাবু বলবে, "তপন বাড়িতে বউ আর মনে মউ!"  ইশ্‌। বড্ড লজ্জার কথা। আরো কিছুটা সময় পার করে ওপারে গেলে ভাল হতো। আপশোশ করে তপন। ততক্ষণে আরো দুই বার হাঁক দিয়েছে রঘু।
রঘুর দোকানে আসে তপন। কপট গাম্ভীর্য এনে গম্ভীর গলায় বলে, "যা বলবার তাড়াতাড়ি বলো রঘু। বাস আসবে। তার আগে ম্যাডামকে একটা জরুরি কাগজ দিতে হবে।" গলা কেঁপে ওঠে তপনের। তবে কথাটা বলতে পেরেছে। চায়ের প্যান থেকে চোখ তুলে তপনকে একবার দেখে রঘু। ভাবটা এমন, কায়দা মেরে লাভ নেই। আমি বুঝি সব। সসপ্যানে চামচ নাড়াতে নাড়াতে রঘু বলে, "এটা কী ঠিক কাজ হচ্ছে তপনদা? এইবার কিন্তু পাঁচজন জানবে। এতদিন চুপ ছিলাম। এইবার বলব সব।"
রঘুর কথা শুনে গলা শুকিয়ে আসে তপনের। তার মনের কথা রঘু জানল কী করে। বলে "রঘু, তুমি যা ভাবছ তা নয়। আসলে…”।
"আসলে আবার কী? লজ্জা নেই!" তপনকে থামিয়ে দিয়ে বলে রঘু।
"রঘু ভাই যা বলতে চাও একলা আমাকে বলবে। সবার সামনে বলে...।" অনেক কথা একসঙ্গে বাইরে আসতে চায়। আলাদা করে কোনো কথা বলতে পারে না তপন। খরিদ্দার দুই-চারজন যারা ছিল রঘুর দোকানে সবাই চেয়ে থাকে তপনের দিকে। তপনকে চেনে। কেউ কেউ পিয়োনবাবু বলে সম্মানও দেয়। কী বিপদ হলো! ছি ছি ছি।
"এটা কী ঠিক হচ্ছে তপন দা?"
"কোনটা?" গলাটা কেঁপে ওঠে তপনের।
রঘু বলে "আজ একমাস ধরে চলছে। কিছু বলছি না।"
"কী চলছে?"
"পান, চা আপনিই তো নিয়ে যান। তাই আপনাকেই শোনাচ্ছি। বলে দেবেন...।"
ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে তপনের। যাক। চা আর পানের কথা বলছে। দত্তবাবু রোজ ধারে পান নেয়। চা নেয়। পয়সা দেবার নাম নেই। "ঠিক আছে কাল এসে...।" রঘুকে আশ্বস্ত করে রাস্তার এই পারে আসে তপন।
মৌসুমী বলে ভিতরে বসুন। কখন থেকে ডাকছি। মৌসুমীর ঠিক পাশের চেয়ারে বসে তপন। সেই সুগন্ধে ভরে ওঠে মনমরুদ্যান। এক অপার্থিব সুখ হেসে ওঠে খিলখিল করে। সত্যি জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকা যায় মৌসুমীর পারফিউমের সুগন্ধে। আনন্দ ধারায় ভেসে চলে তপন। এই সময়ে ঠিক কী কথা বলা উচিত ভেবে পায় না। কেমন একটা অবাধ্য আড়ষ্টতা চেপে বসে। সময় এগিয়ে চলে ঘড়ির তালে।
বাস আসে। সময়ের চেয়ে অনেক পরে। ভিড়। ভীষণ ভিড়। তিল ধারণের জায়গা নেই। "ওঠা যাবে!"
তীব্র সংশয় মৌসুমীর গলায়।
"যাবে ম্যাডাম। আমার পিছন পিছন উঠে পড়বেন। পিছনের গেটে উঠলে পরিচিত কজন নিত্যযাত্রী থাকে। কোনো অসুবিধা হবে না আপনার।" তপনের আশ্বাস।
ভিড় ঠেলে ভিতর ঢোকে তপন। কোনো রকমে দাঁড় করায় নিজেকে। তারপর দেখতে চেষ্টা করে মৌসুমী উঠছে কিনা। দেখতে পায় না মৌসুমীকে। আবার গেটের দিকে ফিরে আসবার চেষ্টা করে। মানব জটলা ভেঙে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নিচ্ছে কন্ডাক্টর। মৌসুমীর কথা জিজ্ঞাসা করে তপন। সামনের গেটে উঠেছে মৌসুমী। কাল থেকে কত কী ভেবেছিল তপন। মৌসুমী আর তপন একই সঙ্গে বর্ধমান ফিরবে। নিত্যযাত্রীদের সাহায্য নিয়ে পাশাপাশি দুটো সিটে বসবে। মৌসুমীর থেকে দুটো-চারটে কথা শুনবে। যা কেউ শোনেনি। কোনোদিন শোনেনি। নিজের না-বলা কথা সাজিয়ে গুছিয়ে বলবে। আর মনমাতানো সুগন্ধে মাতিয়ে নেবে নিজেকে। আশাহত তপন। আজ পরিচিত নিত্যযাত্রীদের এড়িয়ে আলাদা থাকতে চায়। আরো জমাট ভিড়ের মধ্যে ঘাড় ধরে গুঁজে দেয় নিজেকে। ঘর্মাক্ত মানুষজনের মধ্যে নিজেকে সেঁদিয়ে দেয় তপন। উৎকট সোঁদা গন্ধ নাকে আসে। ভিড়ের মধ্যে ভিড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তপন।
 

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)