বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য়
বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/৭ই আষাঢ়, ১৪৩১
ধারাবাহিক গল্প
সুনন্দিনী শুক্লা
বিস্মৃতবীর
[৯ম পর্ব]
পূর্বানুবৃত্তি ইউরোপিয়ান
শহরতলির ক্লাবে হামলা হয়। সফলভাবে অভিযান চালানোর পর ছুটতে ছুটতে হঠাৎ পড়ে যায়
প্রীতি। পুলিশ প্রায় ওদের ঘাড়ের কাছে। প্রীতি শুষ্ক মুখে হাসে। হাতের মুঠোটা
খুলে দেখিয়ে দেয়। কাগজের পুরিয়া। পটাশিয়াম সায়ানাইড। বীরেনের কিছু বুঝতে বাকি
থাকে না। মাঘ মাসের সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকারে সবাই একে একে বেরিয়ে এলাম। মাস্টারদা
কল্পনা ব্রজেন শান্তি মনিলাল সুশীল আমি। পুবদিকের রাস্তা ধরে খানিকক্ষণ এগোনোর পর
বাজখাঁই গলায় আওয়াজ এল - হল্ট! বুঝতে পারলেন মাস্টারদা, পুলিশ ঘিরে ফেলেছে।
তারপর…
১১ই জানুয়ারি ১৯৩৪।
আজকেই ফাঁসি হবে মাস্টারদার আর তারকেশ্বরের। ঢং ঢং করে রাত দশটার ঘন্টি বেজে ওঠে।
মাস্টারদাদের সেল থেকে কিছু দূরেই রাজবন্দিদের কক্ষ সেখান থেকে মাঝেমধ্যে সাথীদের
কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। বিকেল থেকেই শোনা যাচ্ছে বন্দেমাতরম ধ্বনি। তার মানে ওরাও
ফাঁসির খবরটা জানে। হঠাৎ মাস্টারদা কিছু পায়ের আওয়াজ
পান। কিছু লোক আসছে।
তারকেশ্বরের সেলে ঢুকল। হঠাৎ একটা অসহনীয় আর্তনাদে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ হয়ে গেল।
মাস্টারদা বুঝতে পারলেন তারকেশ্বরের উপর থার্ড ডিগ্রি প্রয়োগ করছে ওরা! আর থাকতে
পারলেন না তিনি। গরাদ ধরে ঝাঁকাতে লাগলেন। বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার। কিছুই কী করতে
পারবেন না উনি? গরাদের ওপারে জড়ো হচ্ছে কয়েকটা মুখ। এবার ওর সেলে ঢুকবে।
মাস্টারদা মনে মনে প্রস্তুত হলেন অসহনীয় অত্যাচারের জন্য।
তিন বন্ধু চুপ করে শুনছে। একটা টিকটিকি টিকটিক করে উঠল। বাইরে জোরালো বৃষ্টি কমে, এখন ঝিরঝিরি করে পড়ছে। বৃদ্ধ গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন,
- হাতুড়ি প্লাকার সব নিয়ে ওরা ঢুকেছিল সেলে। মাস্টারদার কনুই, কবজি, কাঁধ, পা, কোমর, শিরদাঁড়া প্রত্যেকটায় হাতুড়ি মেরে মেরে ভেঙে দেয় জয়েন্টগুলো। ঠোঁট দুটোকে ফাঁক করে প্রত্যেকটা দাঁত হাতুড়ি মেরে ভাঙে। প্লাকার দিয়ে তুলে ফেলে হাতের আর পায়ের সবকটা নখ। তারপর থেঁতলানো অচৈতন্য দেহগুলিকে ফাঁসি মঞ্চের দিকে নিয়ে গিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়। দেহের অন্তিম সংস্কার কিছু হয়নি। ফেলে দেয় সমুদ্রের জলে।
শিউরে ওঠে তিন বন্ধু।
- তারপর?
-তারপর আর কী! দীর্ঘ কারাবাস হয় আমাদের। ইতিমধ্যে ভারতের স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি। ভারতভাগের পরিকল্পনা ঘোষিত হয়। রেডক্লিফ সাহেবের কলমের এক খোঁচায় আমার প্রাণের চট্টগ্রাম, সূর্যদার সংগ্রামের ক্ষেত্র চট্টগ্রাম, চলে যায় সম্পূর্ণ অন্য একটা দেশে। দেশ স্বাধীন হয়। দ্বিখণ্ডিত হয়। আমরা যারা বেঁচে আছি, সেই দ্বিখণ্ডিত স্বাধীন ভারতবর্ষে এখনো জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি।
তার্কিক মনোজিৎ এই সময় একটা বেমক্কা প্রশ্ন করে বসে,
- আচ্ছা এই যে আপনারা এত সংগ্রাম করলেন, এত কষ্ট সহ্য করলেন, কখনো মনে হয় না, এর পরিবর্তে আপনারা কী পেলেন? স্বাধীন ভারতের স্বাধীন সরকার আপনাকে দিলটা কী? কিছু মনে করবেন না আপনার মতো একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং অতি অবশ্যই একজন শিক্ষিত মানুষের কি স্বাধীন ভারতবর্ষে চায়ের দোকানে বসে দিন কাটানোর কথা? একটা স্বাধীনতা সংগ্রামীর ভাতা অন্তত…
বৃদ্ধ হাসলেন। বললেন,
- জানো তো, আমরা যখন মাস্টারদার কাছে সংশয় প্রকাশ করতাম যে মাস্টারদা কী হবে? সফলতা আসবে তো? মাস্টারদার সবসময় বলতেন - মা ফলেষু কদাচন। কর্ম করে যাও। সঠিক কর্ম যদি কর তাহলে কর্মের মধ্যে সন্তুষ্টি পাবে। ফলের চিন্তা তোমাকে পীড়িত করবে না। দেশকে ভালবেসে, দেশের জন্য কাজ করেছি এটা জাহির করার মতো কোনো বিষয় বলে আমি মনে করি না। ভবিষ্যতে কোনদিন যদি সেই পরিস্থিতি আসে, আর আমার বিন্দুমাত্র ক্ষমতা থাকে, আমি আবার ঝাঁপিয়ে পড়ব। স্বাধীন সরকারের থেকে কোনরকম ভাতার ভরসায় জীবন কাটানোর শিক্ষা যে আমাকে মাস্টারদা দেননি! নিজের এই চায়ের দোকান খেটে দাঁড় করিয়েছি। একা মানুষ আমি। যা আয় হয় তাতে একার পেট চলে যায়। মাথা উঁচু করে বাঁচছি। যতদিন বাঁচব নিজের আদর্শ নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচব। কারোর ভিক্ষার প্রত্যাশী নই আমি। জীবনে অনেক ভয়ঙ্করতম মুহূর্তের মুখোমুখি হয়েছি। আমাদের শরীর-মন তোমাদের মতো নরম নয়। আমরা এয়ারগান নিয়ে হাঁস শিকার করে বীরত্ব দেখিয়ে বেড়াইনি। আমরা অন্য ধাতুতে তৈরি মানুষজন। এত সহজে জীবন আমাদের মাথা নোয়াতে পারবে না। এটুকু আমার গর্ব বল, অহংকার বল, যাই বল-রয়েছে। আচ্ছা দাদাভাইরা, এবার তো দোকান খুলতে হয়, সন্ধে ঘনিয়ে এল।
তিন বন্ধু বেরিয়ে আসে
নীরবে। হাঁটতে থাকে অহীন্দ্রর বাড়ির দিকে। সর্বক্ষণের জন্য খিঁচখিঁচ করা মনোজিৎ
নিশ্চুপ। একবারের জন্য পিছন ঘুরে দেখে তারা। বৃদ্ধ পুনরায় ক্ষিপ্রহস্তে চায়ের জল
বসিয়ে দিয়েছেন। এক-দুজন লোক বেঞ্চে এসে বসেছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে হেসে হেসে
সুখ-দুঃখের কথা বলছেন তিনি। স্বর্ণেন্দু বলল,
- নামটা তো জিজ্ঞেস করা হলো না!
অহীন্দ্র কপালে একবার হাত ঠেকিয়ে অস্ফুটে বলল,
- কী দরকার!
তিন বন্ধু চুপ করে শুনছে। একটা টিকটিকি টিকটিক করে উঠল। বাইরে জোরালো বৃষ্টি কমে, এখন ঝিরঝিরি করে পড়ছে। বৃদ্ধ গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন,
- হাতুড়ি প্লাকার সব নিয়ে ওরা ঢুকেছিল সেলে। মাস্টারদার কনুই, কবজি, কাঁধ, পা, কোমর, শিরদাঁড়া প্রত্যেকটায় হাতুড়ি মেরে মেরে ভেঙে দেয় জয়েন্টগুলো। ঠোঁট দুটোকে ফাঁক করে প্রত্যেকটা দাঁত হাতুড়ি মেরে ভাঙে। প্লাকার দিয়ে তুলে ফেলে হাতের আর পায়ের সবকটা নখ। তারপর থেঁতলানো অচৈতন্য দেহগুলিকে ফাঁসি মঞ্চের দিকে নিয়ে গিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়। দেহের অন্তিম সংস্কার কিছু হয়নি। ফেলে দেয় সমুদ্রের জলে।
শিউরে ওঠে তিন বন্ধু।
- তারপর?
-তারপর আর কী! দীর্ঘ কারাবাস হয় আমাদের। ইতিমধ্যে ভারতের স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি। ভারতভাগের পরিকল্পনা ঘোষিত হয়। রেডক্লিফ সাহেবের কলমের এক খোঁচায় আমার প্রাণের চট্টগ্রাম, সূর্যদার সংগ্রামের ক্ষেত্র চট্টগ্রাম, চলে যায় সম্পূর্ণ অন্য একটা দেশে। দেশ স্বাধীন হয়। দ্বিখণ্ডিত হয়। আমরা যারা বেঁচে আছি, সেই দ্বিখণ্ডিত স্বাধীন ভারতবর্ষে এখনো জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি।
তার্কিক মনোজিৎ এই সময় একটা বেমক্কা প্রশ্ন করে বসে,
- আচ্ছা এই যে আপনারা এত সংগ্রাম করলেন, এত কষ্ট সহ্য করলেন, কখনো মনে হয় না, এর পরিবর্তে আপনারা কী পেলেন? স্বাধীন ভারতের স্বাধীন সরকার আপনাকে দিলটা কী? কিছু মনে করবেন না আপনার মতো একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং অতি অবশ্যই একজন শিক্ষিত মানুষের কি স্বাধীন ভারতবর্ষে চায়ের দোকানে বসে দিন কাটানোর কথা? একটা স্বাধীনতা সংগ্রামীর ভাতা অন্তত…
বৃদ্ধ হাসলেন। বললেন,
- জানো তো, আমরা যখন মাস্টারদার কাছে সংশয় প্রকাশ করতাম যে মাস্টারদা কী হবে? সফলতা আসবে তো? মাস্টারদার সবসময় বলতেন - মা ফলেষু কদাচন। কর্ম করে যাও। সঠিক কর্ম যদি কর তাহলে কর্মের মধ্যে সন্তুষ্টি পাবে। ফলের চিন্তা তোমাকে পীড়িত করবে না। দেশকে ভালবেসে, দেশের জন্য কাজ করেছি এটা জাহির করার মতো কোনো বিষয় বলে আমি মনে করি না। ভবিষ্যতে কোনদিন যদি সেই পরিস্থিতি আসে, আর আমার বিন্দুমাত্র ক্ষমতা থাকে, আমি আবার ঝাঁপিয়ে পড়ব। স্বাধীন সরকারের থেকে কোনরকম ভাতার ভরসায় জীবন কাটানোর শিক্ষা যে আমাকে মাস্টারদা দেননি! নিজের এই চায়ের দোকান খেটে দাঁড় করিয়েছি। একা মানুষ আমি। যা আয় হয় তাতে একার পেট চলে যায়। মাথা উঁচু করে বাঁচছি। যতদিন বাঁচব নিজের আদর্শ নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচব। কারোর ভিক্ষার প্রত্যাশী নই আমি। জীবনে অনেক ভয়ঙ্করতম মুহূর্তের মুখোমুখি হয়েছি। আমাদের শরীর-মন তোমাদের মতো নরম নয়। আমরা এয়ারগান নিয়ে হাঁস শিকার করে বীরত্ব দেখিয়ে বেড়াইনি। আমরা অন্য ধাতুতে তৈরি মানুষজন। এত সহজে জীবন আমাদের মাথা নোয়াতে পারবে না। এটুকু আমার গর্ব বল, অহংকার বল, যাই বল-রয়েছে। আচ্ছা দাদাভাইরা, এবার তো দোকান খুলতে হয়, সন্ধে ঘনিয়ে এল।
- নামটা তো জিজ্ঞেস করা হলো না!
অহীন্দ্র কপালে একবার হাত ঠেকিয়ে অস্ফুটে বলল,
- কী দরকার!
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment